২১ নভেম্বর ২০১৮

রক্তাক্ত মাহমুদুর রহমান

রক্তাক্ত মাহমুদুর রহমান - ছবি : নয়া দিগন্ত

মাহমুদুর রহমান সরকারের পছন্দের লোক নন। দুই দফায় পাঁচ বছরের বেশি সময় জেলে কাটিয়েছেন। একাধিকবার রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটানা ৩৮ দিন তাকে রিমান্ডে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ১২৫টিরও বেশি মামলা চলমান রয়েছে। এর বেশির ভাগ ‘মানহানি’ মামলা। এ ছাড়া, রাষ্ট্রদ্রোহ ও তথ্যপ্রযুক্তি আইনেও মামলা রয়েছে। মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে এই মামলাগুলো হয়েছে তার বক্তব্যের জন্য। তিনি যা বলেন; অকপটে বলেন। কোনো প্রকার ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলেন না। ‘এটাও ঠিক, ওটাও ঠিক’ বলে মাঝপথে চলার লোক তিনি নন। তার বক্তব্য ক্ষমতাসীন দলের যে ব্যাপক বিরক্তি উৎপাদন করে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

মাহমুদুর রহমানের বক্তব্যের জবাব দেয়ার জন্য ক্ষমতাসীন দলের পক্ষের গণমাধ্যমের অভাব নেই। যদি তার বক্তব্যের জবাব দেয়ার প্রয়োজন মনে না করেন, তাহলে তাকে উপেক্ষাও করতে পারেন ক্ষমতাসীনেরা। সরকার সমর্থক সাংবাদিকদের একটি অংশ অবশ্য তিনি আদৌ সাংবাদিক কি না, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছেন। অথচ দেশে এখন ‘আলু-পটোলের দোকানদার’ পর্যন্ত পত্রিকার মালিক কিংবা সম্পাদক বনে গেছেন। মাহমুদুর রহমানকে নিয়ে কারো কারো বিশেষ ধরনের অ্যালার্জি আছে। অবশ্যই এর কারণ, মাহমুদুর রহমানের আদর্শিক ও রাজনৈতিক বিশ্বাস। ক্ষমতাসীনেরা তাকে মোকাবেলা করতে পারেন গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, শুরু থেকেই মাহমুদুর রহমানকে থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তার কথা বা লেখার ‘জবাব’ দেয়া হচ্ছে মামলার মাধ্যমে। তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে বা জেলে পুরে তার কথা বলার পথ বন্ধ করা হয়েছে। তিনি যে পত্রিকাটি সম্পাদনা করতেন, সেটি ২০১৩ সাল থেকে বন্ধ। এই পত্রিকার দুই শতাধিক সাংবাদিক দীর্ঘদিন বেকার হয়ে আছেন।

মাহমুদুর রহমানের ওপর আইনের নানা প্রয়োগ হয়েছে। বলা যায়, পরীক্ষা-নিরীক্ষাও হয়েছে। দেশ ত্যাগ করা সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা তাকে আদালত অবমাননার মামলায় আইনের বাইরে গিয়ে ‘আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা’বলে শাস্তি দিয়েছিলেন। এটা বাংলাদেশে তো বটেই, বিশ্বের আইনের ইতিহাসে বিরল ঘটনা বলে তথ্যাভিজ্ঞ মহলের অভিমত। বিশ্বের আর কোনো পত্রিকার সম্পাদকের বিরুদ্ধে এত মামলা হয়েছে কি না তাও আমাদের জানা নেই। এখন তার বিরুদ্ধে শতাধিকের বেশি যে মামলা চলছে, তার বেশির ভাগ ঢাকার বাইরে। ফলে প্রতি মাসে বিভিন্ন জেলায় তাকে হাজিরা দিতে হয়। এবার কুষ্টিয়ায় এ ধরনের একটি মামলায় হাজিরা দেয়ার সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তার ওপর হামলা করেছে। মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে গত ডিসেম্বরে মামলাটি দায়ের করেছিলেন কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি।

হামলার আগে তাকে তিন ঘণ্টার বেশি সময় অবরুদ্ধ অবস্থায় রাখা হয়েছিল। তিনি বিভিন্নভাবে পুলিশের সাহায্য চেয়েও পাননি। একপর্যায়ে পুলিশ তাকে নিরাপত্তা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দিলে, একটি গাড়িতে করে আদালত চত্বর ত্যাগ করার সময় তার গাড়িতে ইট, পাথর ও লাঠি দিয়ে হামলা চালানো হয়। এই হামলার ভিডিও এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেছে। ইট ও পাথর নিক্ষেপের সাথে তাকে কয়েক যুবক লাঠি দিয়ে আঘাত করছে, ভিডিওতে তা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।

গুরুতর আহত অবস্থায় মাহমুদুর রহমান এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মুখ, মাথা ও ঘাড় লক্ষ্য করে তার ওপর আঘাত করা হয়েছে। চোখের নিচেও ইট দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। নয়া দিগন্তের প্রতিবেদককে তিনি জানিয়েছেন, তার ওপর আঘাত আসছে, টের পাওয়ার পর তিনি প্রতিরোধ করেন। ফলে আঘাত তার চোখে না লেগে চোখের নিচে লেগেছে। নয়তো চোখটি নষ্ট হতে পারত। চোখের নিচের হাড় ফুলে বড় হয়ে গেছে। এখানে চারটি সেলাই দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। মাথার পেছনে যেখানে আঘাত করা হয়েছে, সেখানে তিনটি সেলাই লেগেছে। পিঠের আঘাতের স্থানেও দু’টি সেলাই লেগেছে। কাচ দিয়ে বিভিন্ন স্থান কেটে যাওয়ায় প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। তাকে হামলার ভিডিওগুলো দেখলে বোঝা যায়, তিনি বেঁচে গেছেন অল্পের জন্য।

হামলার সময় বিপুল সংখ্যক পুলিশ আদালত চত্বরে থাকলেও তাকে রক্ষার জন্য এগিয়ে আসেনি। কয়েক ঘণ্টা ধরে তিনি অবরুদ্ধ থাকার পরও পুলিশ দুর্বৃত্তদের সরিয়ে দেয়ার কোনো চেষ্টা করেনি। তার ওপর হামলার ব্যাপারে পুলিশের এক ধরনের নীরব সমর্থন ছিল, সেটি বোঝা খুব কঠিন নয়। এই হামলার ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন তা আরো বিস্ময়কর। মাহমুদুর রহমানের কুষ্টিয়া যাওয়ার বিষয়টি তিনি আগে থেকেই অবগত ছিলেন। তার নিরাপত্তা দেয়ার ব্যাপারে তিনি আগেই নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আমাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন-মাহমুদুর রহমান কুষ্টিয়ার আদালতে যাচ্ছেন, তাকে যেন নিরাপত্তা দেয়া হয়। এর মধ্যে শুনতে পাই তাকে ঘেরাও করা হয়েছে। তখনই কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার এস এম মেহেদী হাসানকে জানাই, কুষ্টিয়ায় একটি মানহানি মামলায় মাহমুদুর রহমান জামিন নিতে গিয়েছেন, তাকে যেন নিরাপত্তা দিয়ে গাড়িতে উঠিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু তারপরও এই হামলার ঘটনা ঘটল। যারা তাকে জখম করেছে, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে, (প্রথম আলো, ২৩ জুলাই ২০১৮)।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ভাষ্য থেকে স্পষ্ট যে, কুষ্টিয়ার পুলিশ তার নির্দেশ মান্য করেনি। উল্টো ক্ষমতাসীন দলের দুর্বৃত্তদের হাতে এক রকম তুলে দেয়ার ক্ষেত্রে পুলিশ ভূমিকা রেখেছে। ঘটনাটি ঘটেছে আদালত চত্বরেই। সেখানে মাহমুদুর রহমান ছিলেন স্রেফ একজন বিচারপ্রার্থী। তিনি কোনো রাজনৈতিক সভা সমাবেশে যাননি। এমন কথা বলার সুযোগ নেই যে, তার ওপর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হামলা করেছে। এই হামলার মধ্য দিয়ে আরেকটি বিষয় প্রমাণিত হলো, আদালত চত্বরে বিচারপ্রার্থীরা এখন আর নিরাপদ নন। আদালত প্রাঙ্গণে বিচারপ্রার্থীর ওপর হামলা আদালতের ওপর হামলার শামিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশ পাওয়ার পরও একজন বিচারপ্রার্থীকে যদি পুলিশ সুপার নিরাপত্তা দিতে না পারেন, তাহলে বুঝতে হবে- পুলিশের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ছে। এখন পুলিশ ও ছাত্রলীগ স্বাধীনভাবে তাদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। একজন আলোচিত সম্পাদক, যার নিরাপত্তা নিয়ে দেশের প্রধান বিরোধী দলের মহাসচিব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ফোন করে নিরাপত্তার জন্য অনুরোধ করেছিলেন, তারপরও তিনি নিরাপত্তা পাননি। তাহলে একেবারে যারা সাধারণ মানুষ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যন্ত যাদের যোগাযোগ করার সুযোগ নেই, তাদের নিরাপত্তা আজ কোথায়, তা সহজে অনুমান করা যায়।

কুষ্টিয়ায় মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে গত ডিসেম্বরে মামলা দায়ের করেন জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি। এই হামলার পর তিনি বলেছেন, ‘আমি যেহেতু মামলার বাদি, তাই শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করেছি। হামলার সাথে ছাত্রলীগের কোনো নেতাকর্মী জড়িত নয়।’ মাহমুদুুর রহমানের একটি বক্তব্যে সংক্ষুব্ধ হয়ে ছাত্রলীগ সভাপতি মামলা করেছিলেন। প্রশ্ন হলো- মামলা তো করা হয়েছে বিচারের জন্য। মাহমুদুর রহমান অপরাধ করলে বিচারে শাস্তি হবে। কিন্তু এ জন্য ছাত্রলীগকে প্রতিবাদ সমাবেশ করতে হবে কেন? তদুপরি শারীরিক আক্রমণ করা হলো কেন? মাহমুদুর রহমানের সরকারবিরোধী বক্তব্যের জন্য আদালত নয়, যেন ছাত্রলীগ শাস্তি দিতে চায়। শুধু কুষ্টিয়ায় মাহমুদুর রহমানের ওপর হামলা নয়, যেকোনো ঘটনায় ছাত্রলীগ এখন আইন হাতে তুলে নিয়ে বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। বেপরোয়াভাবে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নির্মম নির্যাতন, এমনকি হাতুড়ি দিয়ে পেটানোর ঘটনাও ঘটানো হয়েছে। সবখানে ছাত্রলীগ যখন এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটাচ্ছে, তখনো পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। ছাত্রলীগের বলপ্রয়োগের সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহায়ক ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে। আসলে ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনে পুলিশ ও ছাত্রলীগ যৌথভাবে তৎপরতা চালাচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডে ক্ষমতাসীন দল নীরব সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

দুর্ভাগ্য হচ্ছে, মাহমুদুর রহমানের ওপর হামলার পর দেশের বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকদের বিরাট একটি অংশ নীরব রয়েছে। আবার সামাজিক মাধ্যমে উগ্র ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা উল্লাস প্রকাশ করেছে। মাহমুদুর রহমানের ওপর হামলা উচিত কাজ হয়েছে- এমন কথা পর্যন্ত বলা হচ্ছে। যারা আজ নিশ্চুপ আছেন কিংবা মাহমুদুর রহমানের ওপর নগ্ন হামলাকে সমর্থন দিচ্ছেন, তারাই আবার আইনের শাসন ও মানবাধিকার রক্ষায় সোচ্চার হওয়ার কথা বলছেন। প্রথম যখন মাহমুদুর রহমানের ওপর খড়গ নেমে আসে তখন যারা নিশ্চুপ ছিলেন, তাদের অনেকে আজ রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। মাহমুদুর রহমানের ওপর এবারের হামলাও বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণের ধারাবাহিক যে প্রক্রিয়া চলছে; এই হামলা তারই অংশ।

মাহমুদুর রহমানকে চাইলে সরকার যেকোনো সময় জেলে নিতে পারে। কিন্তু তাকে কেন শারীরিকভাবে আক্রমণ করা হলো? আসলে এ ধরনের হামলার মধ্য দিয়ে সরকারের সমালোচনা করেন, এমন ভিন্নমতাবলম্বীদের বার্তা দেয়া হচ্ছে- চুপ থাকো, না হলে তোমার পরিণতি এমন হবে।’ সাধারণ মানুষের মনে ভয় ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। কিছু দিন ধরে আমরা এ ধরনের প্রবণতা লক্ষ করছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটাবিরোধী আন্দোলনে জড়িত ছাত্রদের এভাবে প্রকাশ্যে মারা হয়েছে, যাতে ছাত্ররা ভয়ে এই আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত না হন। ছাত্রদের ওপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের সমাবেশে হামলা করা হয়েছে। এভাবে হামলা বা রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মাধ্যমে অতীতে ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনের চেষ্টা হয়েছে। কথা বলার স্বাধীনতা হরণের অপচেষ্টা হয়েছে। কিন্তু তা কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মাহমুদুর রহমানের ওপর হামলার কারণে তিনি কথা বলা বন্ধ করবেন-এমন নয়, বরং তার এই ভূমিকায় আরো বেশি লোক অনুপ্রাণিত হবে এবং তার প্রতি মানুষের সহানুভূতি আরো বাড়বে।


আরো সংবাদ