২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

মুক্তিযুদ্ধে হতাহতদের কোটা

মুক্তিযুদ্ধে হতাহতদের কোটা - ছবি : নয়া দিগন্ত

সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকরিতে নিয়োগ ও পদ লাভে বর্তমানে যে পাঁচ ধরনের কোটা রয়েছে এর মধ্যে শুধু একটি কোটা মুক্তিযুদ্ধসংশ্লিষ্ট। কোটা প্রথা প্রবর্তনকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য শতকরা ৩০ ভাগ কোটা নির্ধারণ করে দেয়া হয়। সে ৩০ শতাংশ এখনো অক্ষুণœ রয়েছে। যদিও এর বিস্তৃতি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও তাদের সন্তানদের সন্তান অর্থাৎ নাতি-নাতনি অবধি গড়িয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোটা প্রথার প্রবর্তন করা হলেও ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর অবধি ‘মুক্তিযোদ্ধা’ শব্দটি সংজ্ঞায়িত ছিল না। বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধা শব্দটির যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তাতে বলা হয়েছে- ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণায় সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যেসব ব্যক্তি বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন তারাই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য হবেন।’ প্রজ্ঞাপনটিতে আরো উল্লেখ করা হয়- মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নতুনভাবে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধার বয়স ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে ন্যূনতম ১৩ বছর হতে হবে।

সংজ্ঞা নির্ধারণের আগে ১৯৭২ সালে যখন সর্বপ্রথম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করা হয় তখন মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল ৭০ হাজার ৮৯২। অতঃপর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ১৯৮৬ সালে যখন পুনঃসংখ্যা চূড়ান্ত করা হয় তখন সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় এক লক্ষ দুই হাজার ৪৫৮। সর্বশেষ ২০১২ সালে যখন যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংখ্যা নির্ধারণের কাজ সমাধা করা হয়, তখন দেখা গেল মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দুই লাখ চার হাজার ৮০০। মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা নির্ধারণের কাজ এখনো চলমান অবস্থায়। বর্তমানে এক লাখ ৫০ হাজার আবেদন তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধারা সরকারের পক্ষ থেকে যেসব সুযোগ-সুবিধা লাভ করে আসছেন তার মধ্যে অন্যতম হলো চাকরিতে নিয়োগ লাভে কোটা, চাকরিতে প্রবেশ ও অবসরে বয়স বাড়ানো এবং মাসিক ভাতা। কোটার অন্তর্ভুক্ত নয় এমন একজন সাধারণ চাকরিপ্রার্থীকে মেধাবীদের জন্য নির্ধারিত শতকরা ৪৪ ভাগ পদে যোগ্যতা প্রমাণসাপেক্ষে নিয়োগ লাভ করতে হয়। নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য একজন প্রার্থীর গড়ে শতকরা ৫০ নম্বর পাওয়ার আবশ্যকতা রয়েছে। একজন সাধারণ চাকরিপ্রার্থীর শতকরা ৫০ নম্বর পেয়ে চাকরি লাভের সুযোগ না ঘটলেও কোটাধারী মুক্তিযোদ্ধার ক্ষেত্রে শতকরা ৫০ নম্বর প্রাপ্ত হলে চাকরি না হওয়ার সঙ্গত কোনো কারণ থাকে না। একজন সাধারণ চাকরিপ্রার্থী বয়স ৩০ বছর হওয়া অবধি চাকরির জন্য আবেদন করতে পারেন কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে এ বয়সটি হলো ৩২ বছর। অনুরূপ একজন সাধারণ চাকরিজীবী ৫৯ বছরে উন্নীত হলে তিনি অবসরে চলে যান কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে এ বয়সটি হলো ৬০ বছর।

বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে যে কোনো ধরনের চাকরি পাওয়া সোনার হরিণসম। মুক্তিযোদ্ধারা চাকরিতে নিয়োগে, প্রবেশে এবং অবসরে বিশেষ সুবিধা ভোগ করার কারণে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা সন্তান পরবর্তী নাতি-নাতনি অবধি বিস্তৃত হওয়ায় বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধার সনদ অত্যন্ত লোভনীয় একটি দলিল। এ লোভের বশবর্তী হয়ে একশ্রেণীর মানুষ উৎকোচ দিয়ে অথবা ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সনদ লাভে পাগলপ্রায়। সরকারি সংস্থার তথ্য মতে, বর্তমানে তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের ৬২ হাজারের অধিক ভুয়া। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ যে মন্ত্রণালয়ের অধীন খোদ সে মন্ত্রণালয়ের সচিব ও যুগ্ম সচিবসহ অপর তিনটি মন্ত্রণালয়ের সচিবের মুক্তিযোদ্ধা সনদ জাল মর্মে সাব্যস্ত হওয়ায় সমগ্র জাতি বাকরুদ্ধ ও বিস্মিত। এদের বিরুদ্ধে অদ্যাবধি কার্যকর ফৌজদারি ব্যবস্থা গৃহীত না হওয়ায় তা দেশবাসীর জন্য গভীর মর্মবেদনা ও পীড়ার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ ও পদ লাভে সুযোগের সমতার কথা বলা হলেও মহিলা, শিশু এবং নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশের জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়নের উল্লেখ রয়েছে। এ বিধানটির আলোকেই নারীদের জন্য শতকরা ১০ ভাগ, পশ্চাৎপদ জেলার অধিবাসীদের জন্য ১০ ভাগ, উপজাতিদের জন্য ৫ ভাগ এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য ১ ভাগ কোটার প্রবর্তন করা হয়েছে। উপরোল্লিখিত চার শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্তরা যে কোটা প্রথা প্রবর্তনকালীন নাগরিকদের অনগ্রসর অংশ ছিল এ প্রশ্নে কোনো সংশয় নেই। দীর্ঘ দিন কোটা ভোগের সুবিধার কারণে উপরোল্লিখত শ্রেণীগুলোর অনগ্রসরতার যে ক্রমউন্নতি হয়েছে সেটিও অনস্বীকার্য। এ ধরনের ক্রমউন্নতির ক্ষেত্রে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কোটা প্রথার সংস্কারের মাধ্যমে হার কমানো হয়। আমাদের দেশে সংস্কারের মাধ্যমে এরূপ কমালে বাস্তবতার নিরিখে অনেকটাই যৌক্তিক বিবেচিত।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, জনতার যেমন প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল অনুরূপ এ দেশের সাধারণ জনমানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়, খাদ্য ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করার কারণে বিভিন্ন পরিবারকে অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এ ধরনের অসংখ্য পরিবারের সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার হকদার হলেও তাদের ললাটে তা জোটেনি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যারা প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন তারা যেমন দেশের সচেতন জনমানুষের অংশ, অনুরূপ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি নিজেদের জীবন বিপন্ন করে যারা সাহায্যের হাত প্রশস্ত করেছিলেন তারাও সচেতন জনমানুষ। এরূপ সচেতন নাগরিকদের অনগ্রসর অংশ বলা যায় কি না, সেটি বিবেচনার দাবি রাখে। তা ছাড়া মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং তাদের সন্তানাদি অর্থাৎ নাতি-নাতনি যে মুক্তিযোদ্ধাদের ন্যায় সমচেতনার ধারক ও বাহক হবেন সে নিশ্চয়তাটি কোথায়?

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যারা নিহত বা আহত হয়েছেন তারাই হতাহতের অন্তর্ভুক্ত। সময়ে সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন করে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হলেও হতাহতদের ক্ষেত্রে অনুরূপ ঘটেনি। যাদের জীবনদানের মাধ্যমে আমরা এ দেশ লাভ করেছি তাদের অবদান অপরিসীম। তাদের সম্মানিত করা আমাদের যেমন কর্তব্য অনুরূপ তাদের পরিবারের সদস্যদের দুঃখ-কষ্ট লাঘবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি। হতাহতদের একটি অংশ সুযোগ-সুবিধা পেলেও সংখ্যার নিরিখে বড় অংশটি সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তি হতে বঞ্চিত।
মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী প্রতিটি ব্যক্তিই জাতির গর্বিত সন্তান। এরূপ গর্বিত সন্তানেরা যেসব ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলার অধিবাসী এ ধরনের সব স্থানের ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদের কার্যালয়ে এদের তালিকা না থাকলে একদিন এদের অনেকেই বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবেন। এদের তালিকা না থাকার কারণেই আজ এদের সবার পরিবারের সদস্যদের মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান অথবা নাতি-নাতনিদের মতো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার অবকাশ সৃষ্টি হয়নি।

দেশের বিভিন্ন বাহিনীর সদর দফতরে বাহিনীর যারা স্বাধীনতার জন্য জীবনদান করেছেন এবং গণবিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন মহাবিদ্যালয় ও বিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারী আত্মদান করেছেন এদের নাম খোদাই করে স্মৃতিফলক স্থাপন একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এ উদ্যোগটির কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষে স্বাধীনতা দিবসে এদের পরিবারের প্রতি সম্মান জানানোর সুযোগ সৃষ্টি হয় কিন্তু অগণিত যাদের নাম খোদাই করে এরূপ স্মৃতিফলক স্থাপিত হয়নি এ সব পরিবারের সদস্যরা এ ধরনের সম্মানপ্রাপ্তি হতে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছেন।
মুক্তিযুদ্ধকালীন সম্মুখ সমরে আহত হয়ে যারা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন এদের জন্য রাজধানী শহরে একটি আশ্রয়স্থল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের ব্যবস্থা করা হলেও সে আশ্রয়স্থলে এ ধরনের সবার কি ঠাঁই হয়েছে? আর এদের তালিকাই-বা কোথায়? আবার এ ধরনের পরিবারের সদস্যদের রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কী ধরনের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে এমন তথ্যউপাত্ত দেয়ার মতো যেন কেউ নেই।

মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ, তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সংস্থাটির বরাবরে অর্পণ করা হলেও নানামুখী দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে এ সব সংস্থার কোনোটিই লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপ লাভ করতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধে যারা হতাহত হয়েছেন তাদের পরিবারের মঙ্গল ও কল্যাণার্থে এ ধরনের কোনো উদ্যোগ কখনো নেয়া হয়নি। সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের সরকারি চাকরিতে নিয়োগে কোটার আওতায় এনে সুযোগ-সুবিধা দেয়ার কারণে এ শ্রেণীভুক্তদের মূল্যায়ন হয়েছে, যদিও এদের আগে মুক্তিযুদ্ধে হতাহতদের সঠিক তালিকা প্রণয়ন-পরবর্তী তাদের প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মূল্যায়ন অত্যাবশ্যক ছিল।
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
E-mail: iktederahmed@yahoo.com


আরো সংবাদ