১৯ নভেম্বর ২০১৮

চোরাবালিতে সময়

চোরাবালিতে সময় - ছবি : নয়া দিগন্ত

বর্তমান নিয়ে ভাবনা এবং যন্ত্রণা নতুন নয়। আবার সুখের চিন্তাও এর সাথে সংযুক্ত। এসব এজন্য যে- ভবিষ্যৎকে কল্পনা করা যায়, নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। অথচ নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে জীবন স্বস্তিময় হওয়ার সম্ভাবনায় সন্দেহ থেকে যায়। ফলে বর্তমান ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় মানুষ সদাসন্ত্রস্ত ও ব্যস্ত। এজন্যই হয়তোবা বোদ্ধাজনেরা অতীতকে নিয়েও ভাবতে বলেছেন। এক দার্শনিক এই সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন যে, অতীতকে যারা ভুলে যায় অথবা প্রয়োজনেও স্মরণ করে না, অতীত তাদের কাছে বারবার ফিরে আসে। অর্থাৎ এ সময়ের সব সুখ আর যন্ত্রণা নতুন আবরণে আরো আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে।
এ ঘটনাগুলোর পুনঃপ্রকাশ ঘটছে বিশ্বব্যাপী। ধনী এবং উন্নত দেশ বলে পরিচিত বিশ্বের জনপদের এ অবস্থা থেকে অবশ্য অনুন্নত ও অধিকৃত দেশগুলোর অবস্থার প্রকাশ ভিন্ন হলেও তারা ফল ভোগ করছে একই রকমের।

তাই প্রখ্যাত মার্কিন নাট্যকার ক্রিশ ওয়েলজেনব্যাক বর্তমান বিশ্বকে একটি ‘মৃতের জাহাজ’ বলে বর্ণনা করেছেন। এ বর্ণনা তিনি নিয়েছেন জার্মান লেখক বি ট্রাভেনের ‘ডাস টোটেনচিফ’ (ডেথশিপ বা মৃত্যুর জাহাজ) নাটকের নাম থেকে। তার আরেকটি উপন্যাস ‘দি ট্রেজার অব সিয়েরে মাড্রে’ বিপুল পাঠক পায়। বই দু’টি ১৯২৬ এবং ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত হলেও আজো তার সংস্করণ বের হচ্ছে। এর বিশাল পাঠকপ্রিয়তার অন্যতম কারণ, তিনি মানুষ এবং সময়ের এক চমৎকার সমন্বয়ধর্মী রূপক অথচ বাস্তব চিত্র এঁকেছেন। পাঠক যেন নিজেকেই দেখতে পাচ্ছেন এই বর্ণনায়। ইউরোপের শক্তিসমূহের বিশ্ব দখলের জন্য যে মর্মান্তিক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে তার বাস্তব এক ছবি এঁকেছেন ট্রাভেন। তার তৎপরতার জন্য তিনি ইউরোপ ছেড়ে মেক্সিকোতে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। তিনি তার নাটকের চরিত্র, ‘গেলস’-এর মাধ্যমে, ইউরোপ এবং আমেরিকায় অভিবাসীদের প্রতি পদে পদে যে মানসিক ও বাহ্যিক সমস্যা এবং যন্ত্রণার সম্মুখীন হতে হয় তার সঠিক চিত্র আঁকেন। ঠিক একই বক্তব্য তার আরেকটি বই ‘ব্রিজ ইন দি জাঙ্গলে’ দিয়েছেন। তিনি দেখান যে, ‘মার্কিন বর্ডারে কেমন করে অভিবাসীদের কাগজপত্র ছিনিয়ে নিয়ে বিভিন্ন ডিটেনশন ক্যাম্পে রেখে তাদের ওপর অত্যাচার করা হয় অথবা তাদের বের করে দেয়া হয়। তারা কাগজপত্রহীন বা অবৈধ হয়ে যাওয়ায় কোনো দেশেই যেতে পারে না।’ চিত্রটি অত্যন্ত বাস্তব। এটা শুধু একটি ক্ষুদ্র ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করে। কারণ যে দেশের স্বার্থ রক্ষা করছে বলে এটা দাবি করা হয়, সেটা বাস্তবে সত্য নয় বলে বহু নিরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে। দেখা গেছে, এসব কথিত অবৈধ ব্যক্তিদের দিয়ে তারা অতি স্বল্প ব্যয়ে নানা কঠিন পরিশ্রমের কাজ করিয়ে নিতে পারে। মাঠের কাজ, বাড়িঘর পরিষ্কার, পরিচ্ছন্নতার কষ্টকর কাজগুলো এই ‘অবৈধদের’ দিয়ে করানো হয় বলে ট্রাভেন উল্লেখ করেছেন, যা অত্যন্ত বাস্তব। এটাই হলো ‘সভ্যতার চোরাবালি’, যা অসহায় মানুষের গন্তব্য হয়ে পড়েছে।

একই চিত্র এঁকেছেন নাবিকপুত্র ফিলিপ ফারাগুও তার ‘পনস অব ওয়ার’ নিবন্ধে। তিনি লিখেছেন, ‘ক্ষমতাবানদের একমাত্র কার্ড হলো, ‘ভয় দেখানো’। চমৎকার বর্ণনার মাধ্যমে তিনি ভিয়েতনামের যুদ্ধের চিত্র এঁকেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, সেখানে যারা যুদ্ধ করেছে এবং তাদের শিকার, উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত এবং যন্ত্রণা ভুগেছে। এরা কেউই যুদ্ধ চায়নি। অথচ তার কুফল তাদের ভোগ করতে হচ্ছে। ‘মেমোরিয়াল ডে’ নামে উদযাপিত সব দেশের এমন দিনগুলো উদযাপনের বিরুদ্ধে তিনি মন্তব্য করেছেন। এসব যুদ্ধ ও সঙ্ঘাতে হতাহতরা এ সঙ্ঘাত যেমন চায়নি, তেমনি এই হত্যাকাণ্ড যারা ঘটিয়েছে তারাও জানে না, কেন তাদের এমনটি করতে হচ্ছে। কেন তারা এই চোরাবালিতে? তিনি ব্রুকলিন অ্যাভিনিউর মিসেস লম্বারডো বলে জনৈক ট্রাফিক পুলিশের প্রতিদিনের কর্মকাণ্ডের চিত্র এঁকেছেন। লম্বারডো সেখানে শিশুদের হাসিমুখে রাস্তা পার হতে সাহায্য করতেন এবং সেজন্য তিনি ছিলেন সবার প্রিয়। তার পুত্র টমি তার বাল্যবন্ধু পেটি হারিসের সাথে আর্মিতে যোগ দিয়ে ১৯৬৮তে ভিয়েতনামের যুদ্ধে যায়। পেটি ফিরে আসতে পারলেও, টমি যুদ্ধে মারা গেছে। তার পর থেকে মিসেস লম্বারডোর সেই মিষ্টি হাসি হারিয়ে গিয়ে সেখানে পড়ে যন্ত্রণায় ছায়া। ফিলিপ লিখেছেন- ‘মেমোরিয়াল ডে’তে এসব মৃতকে বীর হিসেবে স্মরণ করা হয়। ভিয়েতনামে ৫৮ হাজার ২২০ জন আমেরিকান মারা যায় আর ২০ লাখ ভিয়েতনামী নিহত হয়। এদের ত্যাগ কার কাজে এসেছে, ফিলিপ জিজ্ঞেস করেন। তার জবাবও তিনি দিয়েছেন। লাভবান হয়েছে শুধু অস্ত্রব্যবসায়ী যুদ্ধবাজেরা।

এখন আরেকটি ভয়ঙ্কর অবস্থার উদ্ভব হয়েছে। সেটা সংবাদমাধ্যমকে কেন্দ্র করে। ফিলিপ দেখিয়েছেন কেমন করে যুদ্ধবাজেরা ‘ভুয়া খবর’ (ফেক নিউজ) সৃষ্টি করে যুদ্ধ বাধাচ্ছে। সংবাদমাধ্যম টিকে থাকার জন্য এই অন্যায় কাজে জড়িয়ে পড়ছে। এই যুদ্ধবাজ শক্তিমানেরা অতি কৌশলে কাজগুলো করছে। মার্কিন যুদ্ধবাজ জিবনিউ ব্রেজেনস্কি এর নাম দিয়েছিলেন ‘বিশাল পাশাখেলা’ (দি গ্রান্ড চেসবোর্ড)। ফিলিপ লিখেছেন, ‘এই কর্মকাণ্ড এখনো চলছে এবং সম্ভবত এর শেষ নেই।’ তাই তিনি আশা করেছেন, ‘যারা এই যুদ্ধ বাধাচ্ছে, সেসব (নেতা এবং যুদ্ধবাজদের) মানুষের বিচার এবং শাস্তি হওয়া উচিত।’
এ বিষয়ে ঐতিহাসিক ও লেখক ব্রান্ডন মার্টিনেজ অনুসন্ধানমূলক একটি বই লিখেছেন। তার ‘হিডেন হিস্টরি অ্যান্ড গ্রান্ড ডিসেপশন’ (লুক্কায়িত ইতিহাস এবং বিশাল ভাঁওতাবাজি) বইতে প্রমাণ করেছেন- ইসরাইলের নেতৃত্ব এবং অঙুলি হেলনে কেমন করে সারা বিশ্বে ‘অস্থিতিশীলতার নীতি’ চালু আছে এবং এই অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন যুগে নানা গোষ্ঠীর সৃষ্টি করা হয়েছে। এখন আইএসআইয়ের ভীতি ছড়ানো হচ্ছে। এতে লাভবান হচ্ছে শুধু অস্ত্রব্যবসায়ী এবং ইহুদি গোষ্ঠী।

মার্টিনেজ লিখেছেন, ‘এসব সত্য সামনে এলে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য বিশাল প্রচারণার জন্ম দেয়া হয়। তখন সত্যটা হারিয়ে গিয়ে মিথ্যাটাই প্রবল হয়ে ওঠে। যেমন একটি প্রচারণা হচ্ছে- সব যুদ্ধ-সঙ্ঘাত মুসলমানেরাই সৃষ্টি করছে। অথচ তারাই এই যুদ্ধ আর সঙ্ঘাতের প্রধান শিকার। তিনি প্রশ্ন করেছেন, কেন তেলসমৃদ্ধ ও মুসলিমপ্রধান মধ্যপ্রাচ্যে সঙ্ঘাত এবং যুদ্ধ চলছে? কারা এতে লাভবান হচ্ছে? পশ্চিমা সামরিক শক্তি কেন এই যুদ্ধ চালু রেখেছে?’
এসব যুদ্ধের জন্য দেশগুলোর শাসকেরা জনগণকে অত্যাচার করছে আর গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে বলে দাবি করে পশ্চিমা যুদ্ধবাজরা আক্রমণ চালায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে। মার্টিনেজ জিজ্ঞেস করেছেন, সেখানে কি গণতন্ত্র এসেছে? জনগণ কি স্বস্তিতে জীবনযাপন করতে পারছে? তিনি বলেছেন, এক কথায় (এর জবাব), ‘না’। অথচ তাদের সম্পদ তেলের ওপর থেকে তাদের সব অধিকার হারিয়ে গেছে এবং স্বাধীনতা বলতে তাদের কিছুই নেই। এক প্রতিবেদনে এসেছে, লিবিয়াকে যখন উন্নয়নের নিক্তিতে ইউরোপের পঞ্চম রাষ্ট্র বলে বিশ্বমাধ্যমে বর্ণনা দেয়া হচ্ছিল, তখনই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে সে দেশে পশ্চিমা আক্রমণ শুরু হয়। এখন লিবিয়ার করুণ অবস্থা সবার জানা। তাদের তেলসম্পদসহ অন্যান্য সম্পদ পশ্চিমাদের দখলে।

আসলে ভারতীয় লেখক পঙ্কজ মিশ্র তার বইয়ে (‘এইজ অব অ্যাংগার : অ্যা হিস্ট্রি অব প্রেজেন্ট’) বিষয়ে চমৎকার আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘বিশ্বের আজকে যে অবস্থা, তাতে যেকোনো স্থানে যেকোনো ঘটনা ঘটতে পারে এবং জনগণই হবে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত।’ এ বর্ণনার সাথে আজকের ঘটনাগুলো চমৎকার মিলে যায়।
বিখ্যাত লেখক জনাথন কুক সম্প্রতি তার এক নিবন্ধে একটি সত্য উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘২০১৮ সাল হলো এমন যে, অরওয়েলের ‘১৯৮৪’ আর এখন গল্পকথা নয় (২০১৮ হোয়েন অরওয়েলস ১৯৮৪ স্টপড বিইং ফিকশন)। অরওয়েল সে বর্ণনায় ক্ষমতাবানদের অত্যাচারের ঘটনা তুলে ধরেন।

অবশ্য কুক সাংবাদিকদের একহাত নিয়েছেন। তিনি নিজেও সাংবাদিক, তাই হয়তো তাদের অসহায়তাকে বকা দিয়ে সত্য কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আজ সংবাদমাধ্যম ক্ষমতার মুখপাত্র হয়ে তার সত্যিকারের দায়িত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব হলো, গণতন্ত্র ও জনগণের মুখপাত্র হওয়া। কিন্তু তারা প্রতিদিন ক্ষমতা নিঃসৃত নানা মিথ্যার মাঝে ডুবে গিয়ে নিজেদের দায়িত্ব ভুলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। অন্য দিকে, বক্তব্যের স্বাধীনতা ও চিন্তার স্বাধীনতাসহ সব অধিকার রাষ্ট্র ও ক্ষমতাবানেরা ক্রমান্বয়ে ছিনিয়ে নিচ্ছে। সেখানে সৃষ্টি হচ্ছে চোরাবালি, যা বিভ্রান্ত করছে সবাইকে।’ এখানে সাবেক আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধরের মন্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি কী করছেন, জিজ্ঞাসা করা হলে বললেন, ‘এই পাকিস্তান কেটে বাংলাদেশ লিখছি।’ সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের আইনগুলো তিনি পর্যালোচনা করছিলেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘কোনো ডুপ্লিকেশন হচ্ছে না তো?’ তিনি অনেক কথার মাঝে, এক মন্তব্য করলেন। ‘দেখুন এখানে মূল আইনগুলো ব্রিটিশদের তৈরি। তারা স্বল্পসংখ্যক আইন দিয়ে বিশাল ভারত শাসন করত। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশেও সেই আইনই চালু আছে।’ তাকে প্রশ্ন করা হলো, ‘তা হলে আপনারা কী করবেন?’ তার জবাব ছিল চমৎকার। তিনি বললেন, ‘কেন, ছোট ছোট আইন, যা নতুন আইন হবে প্রধানত : প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য। এটা এখন ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ অনুসরণ করছে’, তিনি মন্তব্য করেন। তাকে আর প্রশ্ন করা হয়নি। এখন একটু পেছন ফিরে এবং চার পাশে চোখ বুলালেই মনে হয় ধর বাবু যেন ভবিষ্যৎ দর্শন করেছিলেন এবং দলের কর্মকাণ্ডকে সংক্ষেপে বর্ণনা করেছিলেন।

এ অবস্থাগুলো স্মরণ করলে তাই চোরাবালির কথাই মনে আসে। সমুদ্রপাড় বা বিস্তীর্ণ বালিভূমির মাঝে চোরাবালির অবস্থান। এমন সুন্দর মুক্ত বিস্তীর্ণ এলাকাতে মানুষ আনন্দ করবে বা ঘুরবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এর মাঝে এই চোরাবালির অবস্থান তার মনে আসবে না, এটাও স্বাভাবিক। অথচ এর অবস্থান বাস্তব এবং সেখানে মানুষ পড়ছে, আহত-নিহত হচ্ছে। আজকের দুনিয়াটার অবস্থাও এমনিই হয়ে পড়েছে। এর থাবা থেকে বাঁচতে হবে। তার জন্য বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন এবং তৃতীয় বিশ্বের জন্য এটা বেশি প্রয়োজন। কারণ ক্ষমতালোভীরা আগের চেয়ে বেশি কৌশলী এবং তাদের সাহায্য করছে ক্রমসম্প্রসারণশীল প্রযুক্তি, যা একের পর এক চোরাবালির জন্ম দিচ্ছে। মানুষকে তাই সতর্ক হতে হবে। সময় এখন চোরাবালিতে।


আরো সংবাদ