১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮

মানসিক দাসত্ব ও বিবেকের স্বাধীনতা

মানসিক দাসত্ব ও বিবেকের স্বাধীনতা - ছবি : নয়া দিগন্ত

দেশ, সমাজ, জাতি, রাষ্ট্র, যুদ্ধ, বিগ্রহ, ধর্ম ও পারিবারিক বন্ধন সবকিছু মানুষকে নিয়েই। দেহতত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের মতে পঞ্চ ইন্দ্রিয় দ্বারাই মানুষ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে। চিকিৎসাবিদদের মতে, ২০৬টি অস্থি নিয়ে মানুষের দেহ গঠিত। এ ছাড়া রয়েছে বিভিন্ন উপাদান। তবে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে তার মন ও বিবেক।

অন্য দিকে, মানুষ জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে দুটি বিষয়- মানসিকতা ও বিবেক দ্বারাই তার অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। এ ছাড়া পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকেই দাসত্ব ও স্বাধীনতার পারস্পরিক বিরোধী বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে পরিবার, গোষ্ঠী, গোত্র, সমাজ, জাতি ও রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বন্ধন ও বিচ্ছেদ সৃষ্টি হয়েছে। দাসত্ব প্রথা শুরু ও শেষ হওয়ার আছে এক দীর্ঘ ইতিহাস। দাসত্ব শুরু হয় ‘শক্তির’ কাছে মাথা নত করার মাধ্যমে। দাসত্ব দুই প্রকারÑ শারীরিক ও মানসিক। একজন মানুষ শারীরিকভাবে দাসত্ব মেনে নিলেও মানসিকভাবে তা মানতে নাও পারে। এটা নির্ভর করবে শুধু মন-মানসিকতার ওপর। যখন তার স্বাধীন চেতনার ওপর আঘাত আসে, তখনি দাসত্বের সাথে অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হয় এবং এ অন্তর্দ্বন্দ্ব ও দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভের চিন্তা-চেতনার উন্মেষ ঘটানোর চেষ্টায় লিপ্ত হয়। যদি চেতনার উন্মেষ না ঘটে তবে দাসত্ব দাসত্বই থেকে যায়।

পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোথাও মাসের পর মাস, কোথাও বছরের পর বছর আবার কোথাও যুগের পর যুগ যুদ্ধ বা আন্দোলন করে একটি জাতি স্বাধীনতা লাভ করে সৃষ্টি করে থাকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্্র। স্বাধীন ও ঔপনিবেশিক বা পরাধীন রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে মৌলিক তারতম্য রয়েছে। স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রয়েছে যা পরাধীন রাষ্ট্রের নাগরিকদের নেই। স্বাধীন দেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হয় সংবিধান দ্বারা যদিও সব রাষ্ট্রের লিখিত সংবিধান নেই। সংবিধান যখন কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করতে ব্যর্থ হয়, তখনি সৃষ্টি হয় স্বৈরাচারের। তখন স্বাধীনতা হয়ে যায় কাজীর গরুর গোয়ালের মতো, বাস্তবতার সাথে যার কোনো মিল থাকে না।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে অনেক কথা, অনেক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, অনেক যুগান্তকারী রায় ও কথোপকথন হয়েছে। কিন্তু বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জনগণের মনে নিশ্চিত হয়েছে কি? বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ-৯৪(৪) এ উল্লেখ রয়েছে যে, ‘এই সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারক বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন’। অধিকন্তু সংবিধানের ১১৬ক অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘এই সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে বিচার কর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিরা এবং ম্যাজিস্ট্রেটরা বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন।’ স্বাধীন নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে সংবিধানের অনুচ্ছেদ-১১৮(৪) এ বলা হয়েছে যে, ‘নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবে এবং কেবল এই সংবিধান ও আইনের অধীন হইবেন।’ দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ এর ৩(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই কমিশন একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিশন হইবে।’ এরূপভাবে প্রত্যেকটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব পালনে স্বাধীনতার রক্ষাকবচ দেয়া সত্ত্বেও জনগণের কাছে কতটুকু বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেছে?

‘পরাধীন সুখের জীবনের চেয়ে কষ্টের স্বাধীন জীবন অনেক মধুর’ কথাটি ‘বাবুই পাখি’ কবিতার মর্মার্থ থেকে পাওয়া যায়। অন্য দিকে, আইন করে কি প্রকৃত স্বাধীন হওয়া যায়? আইনের সুফল কি সাধারণ জনগণ ভোগ করতে পারছে? বাংলাদেশে অনেক স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা আইনগতভাবে বা কাগজে-কলমে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন। রাষ্ট্র একটি সরকার দ্বারা পরিচালিত হলেও জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাংবিধানিকভাবে কেন স্বাধীনতা দেয়া হলো? এর মূল কারণ, সরকার তথা রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের নির্যাতন থেকে জনগণকে রক্ষা করে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার ‘রক্ষাকবচ’ হিসেবে জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাংবিধানিকভাবে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। অধিকন্তু, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে ‘ন্যায়পাল’ নামে একটি সাংবিধানিক পদ সৃষ্টির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সরকার ‘পদ’টি সৃষ্টি না করে জবাবদিহিতার মুখ বন্ধ রাখার জন্য একটি অসাংবিধানিক পন্থা গ্রহণ করে ‘ন্যায়পাল’ পদে কাউকে নিয়োগ দেয়নি। সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, ‘(১) সংসদ আইনের দ্বারা ন্যায়পালের পদ প্রতিষ্ঠার জন্য বিধান করিতে পারিবেন, (২) সংসদ আইনের দ্বারা ন্যায়পালকে কোন মন্ত্রণালয়, সরকারি কর্মচারী বা সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের যেকোনো কার্য সম্পর্কে তদন্ত পরিচালনার ক্ষমতাসহ যেরূপ ক্ষমতা কিংবা যেরূপ দায়িত্ব প্রদান করিবেন, ন্যায়পাল সেইরূপ ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করিবেন এবং (৩) ন্যায়পাল তাহার দায়িত্বপালন সম্পর্কে বার্ষিক রিপোর্ট প্রণয়ন করিবেন এবং অনুরূপ রিপোর্ট সংসদে উপস্থাপিত হইবে।’. যদি ‘ন্যায়পাল’ পদে সরকার কোনো ব্যক্তিকে নিয়োগ দিত, তবে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি কি স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে জাতিকে সেবা দিতে পারতেন? নাকি অন্যান্য কথিত স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের মতোই দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হতো?

অন্যায় ও মিথ্যার মুখোমুখি দাঁড়ানো একটি বড় যোগ্যতা। দেশ প্রেম একটি ভিন্ন বিষয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, সাধারণ সৈন্যদের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য কোনো যুদ্ধে পরাজয় ঘটেনি; বরং সেনাপ্রধানের বিশ্বাস ঘাতকতাই ছিল মুখ্য। আলেয়া একজন নর্তকী, তার দেশপ্রেম ছিল। কিন্তু সেনাপতি মীরজাফর আলী খাঁ’র তা ছিল না, ফলে ৬৫ হাজার সৈন্য নিয়ে ক্লাইভের তিন হাজার ৫০০ সৈন্যের নিকট বাংলার স্বাধীনতা ব্রিটিশের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে বিকিয়ে দিয়েছেন। মীরজাফর একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সেনাপ্রধান হওয়া সত্ত্বেও মানসিক দাসত্বের কারণে তার বিবেক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। যদি তার বিবেক স্বাধীনভাবে কর্মক্ষম থাকত, তবে শত লোভ-লালসা, অর্থ, প্রাচুর্য বা ক্ষমতার লোভে দাসত্বের পথ বেছে নিতেন না।

২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় ভিন্নপথে ক্ষমতা গ্রহণের বিষয়টি ত্বরান্বিত ও অতিসহজে সম্ভব হয়েছিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজ উদ্দিন আহমদের কারণে। তিনি নিজ ক্ষমতাকে অক্ষুণœ রাখার জন্য মাথা নত করেছিলেন। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংবিধানিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মেরুদণ্ড সোজা রাখার বিষয়ে জনগণের আস্থা কেন অর্জন করতে পারছে না? ১৬/৭/২০১৮ সালে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার আহূত, বরিশাল সিটি করপোরেশন মেয়র কাউন্সিলরদের মতবিনিময় সভায় প্রার্থীরা (সরকার দলীয় প্রার্থী ছাড়া), ‘নির্বাচনের আগের রাতেই ব্যালট বাক্সে সিলমারা ও ভোট ঢোকানোর আশঙ্কা রয়েছে বলে ভোটের দিন সকালে কেন্দ্রে ব্যালট পেপার ও ভোট বাক্স পাঠানোর অনুরোধ করেন’ (সূত্র: জাতীয় পত্রিকা ১৭/৭/২০১৮ ইং)। কয়েক বছর ধরে ঘটে যাওয়া নির্বাচনে মিডিয়ার বদৌলতে ভোট হরিলুটের সচিত্র প্রতিবেদন জনগণ দেখেছে, অথচ প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীলরা অনর্গল বলে যাচ্ছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। যদি নিজেদের মধ্যে মানসিক দাসত্ব না থাকত তবে শপথ গ্রহণকারী ব্যক্তিরা ভিত্তিহীন ও অসত্য কথা বলতে পারতেন না।

কবি হোমার বলেছেন যে, ‘একটি মানুষের ভুলের যোগফলের নাম জীবন’। সে ‘জীবন’ নিয়ে যখন কথা হয়, তখন চতুর্মুখী আলোচনা চলে আসে। ভুল, তঞ্চকতা, প্রবঞ্চনা ও দাসত্ব এক কথা নয়। ভুলের মাশুল অনুশোচনা হতে পারে। কিন্তু দাসত্বের কোনো পরিমার্জনা হতে পারে না এ কারণে যে, মানুষ লোভ ও স্বার্থের বশবর্তী হয়েই দাসত্ব করে। মুক্ত মানুষ কাগজে-কলমে স্বাধীন হয়েও দাসত্ব করে শুধু নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য, জাতীয় স্বার্থের পরিবর্তে। এর মাশুল জাতিকে দিতে হয় এবং জাতি বঞ্চিত হয় তার ন্যায্য অধিকার থেকে।

ইরাকের বাগদাদিয়া টেলিভিশনের সাংবাদিক মুনতাজের আল জাইদি ২০০৮ সালে ডিসেম্বর মাসে আমেরিকার সে সময়ের প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশকে প্রকাশ্যে জুতা মেরে বিচারিক আদালতে তিন বছরের জন্য দণ্ডিত হয়ে ছিলেন। জাইদির মস্তিষ্ক বিকৃত ছিল না। তিনি ছিলেন একজন সাংবাদিক, অশিক্ষিত ব্যক্তি নন। জেনে-শুনে কেন তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষমতাধর ব্যক্তি বুশকে জুতা নিক্ষেপ করলেন? কোন চেতনা থেকে তিনি উদ্বুদ্ধ হলেন সেটাও গভীরভাবে চিন্তার দাবি রাখে। কারো বিবেকের যদি স্বাধীনতা থাকে বা স্বাধীনভাবে নিজ বিবেককে খাটাতে বা প্রয়োগ করতে পারেন, তখন নিজ জীবনের মায়ার চেয়ে বিবেকই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। বিবেকের তাড়নায় ১৯৭১ সালে অস্ত্রহীন বাঙালি সামরিক সুসজ্জিত পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। অনুরূপ, দেশাত্ববোধ এবং বিবেককে স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করতে পারার কারণেই একজন সাংবাদিক আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে জুতা মারতে সাহস দেখিয়েছিলেন। বিবেক অনেক শক্তিশালী বিষয় যা মানুষের মেরুদণ্ডকে সোজা রাখে, সত্য কথা বলতে ও ন্যায়বিচার করতে তাড়না দেয়।

পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই স্বাধীন, তার চিন্তা-চেতনার দিক থেকে। কিন্তু পরাধীন হয়ে যায় দুর্বল মানসিকতার কারণে এবং সে দুর্বলতা সৃষ্টি হয় লোভ ও স্বার্থপরতা থেকে। কোনো ব্যক্তি তার কর্তব্য পালনে যদি নিজেকে নিজে স্বাধীন মনে না করে, তবে আইন করে দায়িত্ব পালনের স্বাধীনতা দেয়া একটি বাতুলতামাত্র। তাই দেখতে হবে- দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-বিচারক-ব্যক্তি নিজ দায়িত্ব পালনে নিজেকে স্বাধীন মনে করেন কি?হ
লেখক : কলামিস্ট ও আইনজীবী (আপিল বিভাগ)

taimuralamkhandaker@gmail.com


আরো সংবাদ