২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

মহানগরবাসী কার হেফাজতে আছেন?

মহানগরবাসী কার হেফাজতে আছেন? - ছবি : সংগ্রহ

রাজউক ভবনের দেয়ালে আরবি ও বাংলায় একটি বাণী খোদিত রয়েছে। বাণীটি হলো- ‘হে মহান সৃষ্টিকর্তা তুমিই এই নগরীর হেফাজতকারী।’ মহান আল্লাহ তায়ালা শুধু মহানগরী নয়, বিশ্ব জগতের ১৮ হাজার মাখলুকাতের হেফাজতকারী। তবে তিনি সরাসরি হেফাজত করেন না। হেফাজত করার জন্য কারো কারো ওপর তিনি দায়িত্ব অর্পণ করেন। যা হোক, ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটির হেফাজতে আছেন সংশ্লিষ্ট মেয়ররা। খুব কাছ থেকে দেখেছি এ দুটো মহানগরীকে। জীবনের পঞ্চান্ন বছর কাটিয়েছি এই দুই মহানগরীতে। ষাটের দশক থেকে ছিলাম চট্টগ্রাম ও এর বিভাগীয় এলাকায় এবং আশির দশকের শুরু থেকে কর্মজীবন নিয়ে ঢাকা মহানগরীতে।

একটি কঠিন সময় পার করছি আমরা। শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বের মানুষ। নৈতিক এবং মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে গোটা বিশ্ববাসী দিন অতিবাহিত করছে। ঢাকা উত্তর সিটির সাবেক মেয়র আনিসুল হক একজন ব্যবসায়ী ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হয়েও নগরপিতার দায়িত্ব যথেষ্ট দায়িত্বশীলতার সাথে পালন করেছিলেন। নগর পরিচ্ছন্নতায় এবং বিশেষ করে গুলশান, বনানী, বারিধারা ও মোহাম্মদপুর- বসিলা সড়ক পথ উন্নয়নে যথেষ্ট সাহসী ভূমিকা পালন করেছিলেন। কাওরানবাজার ও তেজগাঁও রেলস্টেশনসংলগ্ন ট্রাক ডিপো যা রেলওয়ের জায়গা হিসেবে চিহ্নিত, সেটি বেদখল হয়ে যায় এবং উচ্ছেদ অভিযানে মেয়র আনিসুল হকের ভূমিকা দৃষ্টি কেড়ে নেয় জনগণের। সব ক’টি টিভি চ্যানেল তার এ সাহসী তৎপরতার চিত্র তুলে ধরে। দলীয় লোকদের চাপ থাকা সত্ত্বেও তিনি নীতিতে অটল ছিলেন বলে সুবিধাবাদী মহলের বিরাগভাজন হয়েছেন।

এ দু’টি মহানগরীর উন্নয়নে বা সংস্কার কাজে সমন্বয়ের প্রচণ্ড অভাব। সেবা প্রতিষ্ঠান ওয়াসা, ডেসা, পিডিবি, তিতাস গ্যাস লিমিটেড ইত্যাদির কাজের মধ্যে সমন্বয় নেই। এক প্রতিষ্ঠান লাইন বসানোর জন্য রাস্তা কাটে, সেই রাস্তা মেরামত হতে না হতেই আরেক প্রতিষ্ঠান তার কর্মীবাহিনী নিয়ে সেখানে শাবল চালায়। এভাবে নগর দু’টির বেশির ভাগ রাস্তা দীর্ঘ দিন ধরে বেহাল অবস্থায় পড়ে থাকে। বছরে একাধিকবার সমন্বয়হীন কাজ হিসেবে যদি রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি চলতে থাকে, তাহলে শুধু যানজট নয়; মানুষের চলাফেরায় ভোগান্তিও সীমাহীনভাবে বেড়ে যায়।

রাজধানীর যানজট নিরসনে ব্যয় হয়েছে ৫২ হাজার কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে সরকারের নেয়া কোনো উদ্যোগেই সুফল আসেনি। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সর্বশেষ কান্ট্রি ডায়াগনস্টিক স্টাডিতে বলা হয়েছে- মহাপরিকল্পনার সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। ঢাকায় যানজটে বছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আর্থিক হিসাবে এ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা। যানজটের ক্ষতি পরিমাপে সময় ও তেলের অপচয়, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এবং মানুষের শহরমুখী প্রবণতা বৃদ্ধিকে বিবেচনায় এনেছে এডিবি। আশ্চর্য হতে হয়Ñ যানজটে বাংলাদেশের মধ্যে শুধু ঢাকা শহরে ক্ষতি হয় জিডিপির ৩ শতাংশ। অন্য দিকে, গোটা ব্রিটেনে জিডিপির ক্ষতি এক দশমিক ৫ শতাংশ। ফ্রান্সে জিডিপির এক দশমিক ৩ শতাংশ, জার্মানিতে দশমিক ৯ শতাংশ এবং গোটা আমেরিকায় জিডিপির ক্ষতি দশমিক ৬ শতাংশ। গত কয়েক বছরে যানজট নিরসনে ৯টি ফ্লাইওভার, ৬৬টি ফুটওভার ব্রিজ ও তিনটি আন্ডার পাস নির্মাণ এবং ২০ জোড়া ডেমু ট্রেন, ৯টি ওয়াটার বাস, বিআরটিসির ৪২টি আর্টিকুলেটেড ও ৩০৩টি ডাবল ডেকার বাস ক্রয় করা হয়েছে। চালু করা হয়েছিল অটোমেটিক সিগনালিং ব্যবস্থা ও লেন পদ্ধতি। এতে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অথচ যানজটের উন্নতি না হয়ে আরো অবনতি ঘটেছে। এ প্রসঙ্গে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান এবং নগর পরিকল্পনাবিদ প্রফেসর নজরুল ইসলাম বলেছেন, যানজট নিরসনে মহাপরিকল্পনার আওতায় যেসব সুপারিশ করা হয়েছিল, সেগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। ফলে সমস্যা দিন দিন জটিলতর হচ্ছে। ৯টি ফ্লাইওভার নির্মাণে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অনেকটা অপরিকল্পিতভাবে এসব নির্মাণ করা হয়- এ কারণে যানজট হচ্ছে ফ্লাইওভারে ওঠা ও নামার সময়।

২০১০ সালে ৬৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে চীন থেকে আনা হয় ২০ জোড়া ডেমু ট্রেন। অপ্রতুল যাত্রী ধারণক্ষমতা, আরামদায়ক না হওয়া, যান্ত্রিক ত্রুটি ও রেলওয়ে অবকাঠামোর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ না হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে ডেমু ট্রেনগুলো এখন রেলের বোঝায় পরিণত হয়েছে। দুই কোটি টাকায় দু’টি ওয়াটার বাস কিনেছিল অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন। পরে আরো সাতটি কেনা হয়। এতে তিন কোটি ৫০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এগুলো অব্যবস্থাপনা, দলীয়করণ, উৎকোচ গ্রহণ, স্বজনপ্রীতি, সমন্বয়হীনতা, ড্রেজিংয়ের অভাব ও ১৪টি সেতুর কারণে জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলেছে।

নগর পরিকল্পনাবিদ প্রফেসর নজরুল ইসলাম একবাক্যে উত্তর দিয়েছেন, পরিকল্পিত উপায়ে কিছু না করলে কোনো উদ্যোগই সফল হবে না।’ বর্তমান সরকারের আমলে একই কাজ ঘটছে অপরিকল্পিত ধারাবাহিকতা সব সরকারই চালু রেখেছে। রাজধানীতে কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে ৩০-৪০ শতাংশ মানুষ হেঁটেই চলাচল করে। তাও ফুটপাথ দখল হওয়ার কারণে মূল সড়ক ব্যবহার করে চলাচল করতে বাধ্য হয়। এতে রাস্তা আরো সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে। ফুটপাথ আরো প্রসারিত করে তা শুধু পথচারীদের ব্যবহারের জন্য সুনির্দিষ্ট করে দেয়া উচিত। কিন্তু সরকার তা করেনি। ফুটপাথ পুরো দখলে রেখেছেন হকাররা। ওয়ার্ড ও মহল্লার ফুটপাথও ওদের দখলে। এসব অনিয়মবাণিজ্য সর্বত্র হকাররা বলেন, এটুকু দোকানের জন্য প্রতি সন্ধ্যায় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা দিতে হয়। অন্য দিকে, রাস্তার দুই পাশে ২০ ফুট দখলে রেখেছেন গাড়ি পার্কিং ব্যবসায়ীরা। এ ধরনের একজন ব্যবসায়ীর সাথে মতিঝিলে কথা হয়। তিনি বলেন, মাসে ৪০-৫০ হাজার টাকা তার এ বাণিজ্য থেকে আসে। গাড়ি-বাড়ির মালিক তিনি। এভাবে চলছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর ‘সড়ক ব্যবস্থাপনা’।

ঈদের পর ২১ জুন সপরিবার কক্সবাজার বেড়াতে যাই। মাত্র তিন দিন ছিলাম। ঢাকা থেকে এসি মাইক্রোবাস ভাড়া করে ২১ জুন ভোর ৫টায় ঢাকা থেকে কক্সবাজার রওনা হই। দীর্ঘ ২০ বছর পর চট্টগ্রাম এলাম। অতিপরিচিত এলাকা। তবে পরিবর্তন হয়েছে অনেক। কিন্তু রাস্তাঘাটের অবস্থা ঢাকার চেয়ে খারাপ। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের চার লেনের রাস্তা মোটামুটি ভালো। কিন্তু কুমিল্লার সড়ক পথ ভাঙাচোরা। চট্টগ্রাম থেকে কর্ণফুলী সেতু পর্যন্ত তিন কিলোমিটার রাস্তা পার হতে সময় লেগেছে এক ঘণ্টারও বেশি। ফ্লাইওভার ব্রিজের নিচে ইট-পাথর, বর্জ্য ইত্যাদি দেখলে মনে হয় ছোটখাটো পাহাড়। কেউ বলে ইটপাথরের পাহাড় আবার কেউ বলে ময়লা-আবর্জনার (ভাগাড়) পাহাড়। দুর্গন্ধে পথচলা দায়। মানুষের কষ্ট দেখলাম। অনেকের কাছে শুনলাম, চট্টগ্রামের দেখভাল মরহুম মহিউদ্দিন আহম্মদ যতটুকু করেন সেটা বর্তমান মেয়র পারেননি। জলাবদ্ধতা চট্টগ্রামের নিত্যদিনের ব্যাপার, যদি বৃষ্টি হয়। যাওয়ার সময় কর্ণফুলী সেতু পার হয়ে ডানের রাস্তা দিয়ে আনোয়ারা-বাঁশখালী হয়ে চকোরিয়া দিয়ে কক্সবাজার যাই। রাস্তা খুব সরু। উন্নয়ন শ্লথগতিতে। অনেকটা ’৭১-এর মতোই পড়ে আছে আনোয়ারা-বাঁশখালী। বাঁশের ঘর বেশি, স্যানিটারি টয়লেট খুব কম। আমরা সিএনজি স্টেশনে গ্যাস ভরার জন্য নামি। সেখানেও ভালো টয়লেট নেই। আশ্চর্য লাগলÑ এক লিটার গ্যাসের মূল্য বাঁশখালীতে ৬৫ টাকার ওপরে। ঢাকার চেয়ে ২৫ টাকা বেশি প্রতি লিটার। কক্সবাজারেও গ্যাস প্রতি লিটার ৫৫ টাকা। এসব দেখার কেউ নেই। স্থানীয় লোকজন বলে, স্যার, গ্যাসের চেয়ে অকটেন সাশ্রয়ী। গাড়ি ভালো রাখে। এখানে গ্যাস ভালো না। অর্ধেক হাওয়া। বাংলাদেশে অনিয়ম কোথায় নেই? ঢাকা, চট্টগ্রাম, বাঁশখালী, আনোয়ারা, চকোরিয়া ও কক্সবাজার- সবখানেই অনিয়মের চিত্র চোখে পড়ল।

দেশের প্রতি কারো দয়ামায়া আছ বলে মনে হলো না। কক্সবাজারে ফাইভ স্টার হোটেল আছে কয়েকটি। পর্যটকদের বেশির ভাগই বাংলাদেশী। অল্প কিছু বিদেশী ট্যুরিস্ট দেখলাম। সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, কুয়ালালামপুরে বিদেশী ট্যুরিস্টদের আনাগোনা বেশি। কারণ পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। কক্সবাজারে ফাইভ স্টার ঙপবধহ চধৎধফরংব ঐড়ঃবষ-এ দুই রাত যাপন করি। সি-বিচ সংলগ্ন এলাকা। কিন্তু রাস্তা ভাঙাচোরা, অনেকটা চট্টগ্রামের মতো। একটি পর্যটন শহর যত সুন্দর হওয়ার কথা, সে রকম মনে হলো না। পুরনো কক্সবাজারে সব দোকান বার্মিজ পণ্যে ঠাঁসা। যারা রোহিঙ্গা মুসলমানদের গুলি করে হত্যা করল, শিশু নারীদের ধর্ষণ করল, বাড়িঘর জ্বালিয়ে নিজ দেশ ছাড়া করল- সেই দেশের পণ্য দ্বারা কক্সবাজার, টেকনাফ, হিমছড়ি ও ইনানি বিচ সয়লাব হয়ে গেছে। খুব খারাপ লেগেছে এসব দৃশ্য অবলোকন করে। ভারত, মিয়ানমার, চীন, থাইল্যান্ড, প্রধানত এ চার দেশের পণ্যের বাজার বলতে বুঝায় বাংলাদেশকে। দেশ নিয়ে অনেক কথা বলি, যাকে বলা হয় উন্নয়নের গল্প- গ্লোবালাইজেশনের খপ্পরে বাংলাদেশ। তবে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ ৭৪ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভ সড়ক পথটি খুবই সুন্দর। এটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিছুদিন আগে উদ্বোধন করেছেন। ঢাকার মতো চট্টগ্রাম, পটিয়া, বাঁশখালি, চন্দনাইশ, কক্সবাজারে সরকার দলীয় উন্নয়নের ফিরিস্তি ও পদপ্রার্থীর ছবি বিলবোর্ড আকারে শোভা পাচ্ছে। কোটি কোটি টাকার অপচয় দেখে ভাবলাম, দেশকে আমরা কতটুকু ভালোবাসি। অপচয় কি ভালোবাসার নমুনা? ঢাকা থেকে কক্সবাজার প্রায় ৪০০ কিলোমিটার রাস্তা যেতে সময় লেগেছে ১১ ঘণ্টা। আর আসার সময় লেগেছে ১৪ ঘণ্টা। বৃষ্টি এবং জ্যাম (ট্রাক) থাকার কারণে সময়ের হেরফের হয় তিন থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত। উন্নত বিশ্বে ননস্টপ (২০০০ সিসি) মাইক্রোবাসে (আমাদেরটা একই রকম ছিল) সময় লাগতো পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা। অব্যবস্থাপনার কারণে আমাদের ছয় থেকে সাত ঘণ্টা বেশি সময় লেগেছে। ২৪ জুন কক্সবাজার থেকে চকোরিয়া হয়ে ভিন্ন পথে এসেছি। চকোরিয়া হয়ে লোহাগাড়া, পদুয়া, সাতকানিয়া, দোহাজারী, চন্দনাইশ, কাঞ্চননগর, পটিয়া, হাশিমপুর এবং শিকলবাহা হয়ে কর্ণফুলী সেতু পার হয়ে চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ করি। ঢাকায় প্রবেশের সময় মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের মুখে প্রায়ই যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। পত্রিকায় এসেছে আলোর নিচে অন্ধকার। মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের নিচের সড়ক ও বঙ্গভবনের পাশের সড়ক, এ দু’টির অবস্থা খুবই খারাপ। সংস্কারের অভাবে এ সড়কগুলো বহুদিন ধরে যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে আছে। সব আবর্জনা ফ্লাইওভারের নিচে যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে। কাপ্তানবাজার থেকে রাজধানী সুপারমার্কেট পর্যন্ত এক কিলোমিটার সড়কের পুরোটাই ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়ে গেছে। আবর্জনার দুর্গন্ধে এ সড়ক দিয়ে চলাচল করা অসম্ভব। কার হেফাজতে নগর দু’টিতে আমরা আছি, বোধগম্য হচ্ছে না।
লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

harunrashidar@gmail.com


আরো সংবাদ