২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

‘নির্বাচন সুষ্ঠু না হলেও আইনানুগ হয়েছে’

‘নির্বাচন সুষ্ঠু না হলেও আইনানুগ হয়েছে’ - ছবি : সংগৃহীত

আইন অনুযায়ী বা আইন অনুসরণ করে বা আইন মেনে চলে কোনো কাজ সম্পন্ন করা হলে সে কাজটিকে ‘আইনানুগ’ মর্মে অভিহিত করা হয়। আইন মেনে চলা দেশের প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য। সংবিধান আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আইন। নাগরিক ও সরকারি কর্মচারীদের কর্তব্য বিষয়ে সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে- ‘সংবিধান ও আইন মান্য করা, শৃঙ্খলা রক্ষা করা, নাগরিক দায়িত্ব পালন করা এবং জাতীয় সম্পত্তি রক্ষা করা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য। সব সময় জনগণের সেবা করার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।’

যেকোনো কাজ আইনানুগ বা আইন মেনে চলে সম্পন্ন করা হলে, সে কাজটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে- জনমানুষের মধ্যে এমন ধারণা সৃষ্টি হয়। এক কথায় বলা যায়, যা কিছুই আইনানুগ, তা-ই সুষ্ঠু। আইনের বিধান অনুযায়ী, কোনো কিছু করতে না পারাকে আইনানুগ দাবি করে সুষ্ঠুর সাথে এটিকে ভিন্নভাবে দেখা প্রত্যাশিত নয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নির্বাচনী আইন অনুযায়ী জাতীয় সংসদ বা স্থানীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে যেকোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী প্রতিটি ভোটকক্ষে এক বা দুইজন করে প্রতিনিধি (এজেন্ট) নিয়োগ দিতে পারেন। সচরাচর দেখা যায়, নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ প্রার্থীদের মধ্যে এমন একজনও পাওয়া যায় না, যার পক্ষে ভোটকক্ষে প্রতিনিধি দেয়া সম্ভব হয় না। আমাদের দেশে বড় দু’টি রাজনৈতিক দল বলতে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিকে বুঝায়। দেশের সর্বত্র এ দু’টি দলের বিশাল কর্মী বাহিনী ও সমর্থক রয়েছে। এ দু’টি দলের যেকোনো একটি থেকে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ কোনো প্রার্থী ভোট গ্রহণের দিন ভোটকক্ষে কর্মী বা সমর্থকের অভাবে প্রতিনিধি দিতে ব্যর্থ হয়েছেন, এমন দাবি বাস্তবতার নিরিখে বিশ্বাসযোগ্য নয়। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অনেক কেন্দ্রে দেখা গেছে, বিএনপি দলীয় প্রার্থীর প্রতিনিধি ভোটগ্রহণকালে ভোটকক্ষে অনুপস্থিত ছিলেন। বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট গ্রহণের আগের দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অথবা ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র কর্মীদের ভীতি প্রদর্শনের কারণে প্রতিনিধিরা ভোটকক্ষে উপস্থিত হতে পারেননি। কোনো কোনো কেন্দ্রে প্রতিনিধিদের ভোটকেন্দ্র অভিমুখে যাওয়ার সময় তাদের বলপূর্বক তাড়িয়ে দেয়া হয়। আবার কোনো কোনো কেন্দ্র থেকে প্রতিনিধিদের ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার অব্যবহিত পর জোরপূর্বক বের করে দেয়া হয়েছে।

উপরি উক্ত দু’টি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সমাপ্ত হওয়ার পর দেখা গেল, বিএনপি দলের প্রার্থী বহু ভোটের ব্যবধানে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর কাছে পরাভূত হয়েছেন। এ দু’টি নির্বাচন যে সুষ্ঠু হয়নি, এ বিষয়টি নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে যারা নির্বাচন দু’টি পর্যবেক্ষণ করেছেন, তাদের ভাষ্যে এবং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করে, এমন প্রচারমাধ্যমে স্থান পেয়েছে।

জাতীয় সংসদ বা স্থানীয় সরকারব্যবস্থার অধীনে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে হলে নির্বাচন কমিশনকে প্রতিদ্বন্দ্বী সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ সংবলিত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হয়। খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি দলের প্রার্থীর সমর্থনে দলীয় নেতাকর্মীরা নির্বিঘ্নে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে গিয়ে পুলিশ কর্তৃক প্রতিনিয়ত বাধার সম্মুখীন হয়ে অনেকে আটক হয়েছেন; অনেকে আটক এড়াতে প্রচারণা থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছেন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর প্রতিদ্বন্দ্বী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে আটক অথবা পুরনো মামলায় আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে আটক করার বিষয়ে বিধিনিষেধ থাকলেও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলের নেতাকর্মীরা এ সুযোগের আওতায় থেকে যে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেননি, তা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে স্থান পেয়েছে। এ বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলের পক্ষ থেকে একাধিকবার অবহিত করা হলেও কমিশনের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ লক্ষ করা যায়নি।

খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠানকালে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর পক্ষ থেকে নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে ভোটারদের পুনঃপুন স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়, অতীতে তাদের দলের মনোনীত প্রার্থীদের নির্বাচিত না করার কারণে খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের উন্নয়নকার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এবারো যদি তাদের নির্বাচিত করা না হয়, তাহলে সে ধারা অব্যাহত থাকবে। আমাদের দেশের জন্য এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে, অতীতে খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন এবং অপর যে তিনটি সিটি করপোরেশনে ক্ষমতাসীন দলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাদের সবাইকে ফৌজদারি মামলায় জড়িয়ে সাময়িক বরখাস্ত করা ছাড়াও তাদের কারাভোগের মধ্যে পড়তে হয়েছিল। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন জনপ্রতিনিধি এ ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণের সম্মুখীন হলে, তা গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বড় ধরনের অশনিসঙ্কেত। তা ছাড়া ক্ষমতাসীন দলবহির্ভূত অপর কোনো দলের প্রার্থী জন-আকাক্সক্ষায় নির্বাচিত হলে, সে এলাকা সরকারের উন্নয়ন বরাদ্দপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হলে, এটি অপশাসনের বার্তা দেয়।

যেকোনো নির্বাচনে ভোট গ্রহণ চলাকালে একজন প্রার্থী তার ক’জন সহকর্মীসমেত ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন, তা আইন ও বিধি দ্বারা নির্ধারিত। খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, ক্ষমতাসীন দলের সমর্থিত প্রার্থী প্রতিটি ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনের সময় তার সাথে তার দলীয় ৩০-৪০ জন নেতাকর্মী ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করেন এবং তার প্রস্থানের পর তারা ভোটকেন্দ্রের অভ্যন্তরে প্রভাব খাটিয়ে ব্যালট পেপারে জোরপূর্বক সিল মেরে ভোটবাক্স পূর্ণ করেছেন। তাদের এহেন অবৈধ ও অন্যায় কাজের সময়ে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনরত কর্মকর্তাদের অসহায় পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা যায়।

নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনারগণ সাংবিধানিক পদধারী। তাদের নিয়োগ-পরবর্তী শপথ গ্রহণ করতে হয়। শপথ গ্রহণ ব্যতিরেকে তারা পদে আসীন হতে পারেন না। শপথ গ্রহণ করাকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের সুস্পষ্টরূপে অপরাপর বিষয়ের পাশাপাশি ব্যক্ত করতে হয় যে, তারা আইন অনুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সাথে তাদের পদের কর্তব্য পালন করবেন। তারা সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করবেন এবং তাদের সরকারি কার্য ও সরকারি সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বারা প্রভাবিত হতে দেবেন না।

সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন কমিশনকে যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, তা হলো- (ক) রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচন অনুষ্ঠান; (খ) সংসদ সদস্যদের নির্বাচন অনুষ্ঠান; (গ) সংসদ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ; (ঘ) রাষ্ট্রপতির পদের এবং সংসদের নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা প্রস্তুতকরণ। এ ছাড়া, উপরোল্লিখিত নির্ধারিত দায়িত্বগুলোর অতিরিক্ত যেরূপ দায়িত্ব এ সংবিধান বা অন্য কোনো আইনের দ্বারা নির্ধারিত হবে, নির্বাচন কমিশন সেরূপ দায়িত্ব পালন করবে।

নির্বাচন কমিশন স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) নির্বাচন বিধিমালা ২০১০ এবং সিটি করপোরেশন (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা ২০১০-এর অধীনে সিটি করপোরেশন নির্বাচন বিষয়ে তার নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করে থাকে। এ আইন ও বিধিদ্বয়ে নির্বাচন কমিশনকে যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তা যেকোনো নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানের জন্য সম্পূর্ণ সহায়ক। নির্বাচন অনুষ্ঠানকালে সরকারের বিভিন্ন বিভাগের যেসব কর্মকর্তা ও কর্মচারী নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করেন, সে সময়কালে তারা নির্বাচন কমিশনের অধীন ন্যস্ত থাকেন। এ সময়ের মধ্যে এ ধরনের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী কোনো ধরনের অন্যায় বা অনিয়মের সাথে সম্পৃক্ত হলে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন ১৯৯১ অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, নির্বাচনসংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্টতার গুরুতর অভিযোগ থাকলেও নির্বাচন কমিশন তা আমলে নেয়নি।

খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন শেষ হওয়ার পর একজন নির্বাচন কমিশনার সংবাদকর্মীদের সাক্ষাৎকার দেয়াকালে দাবি করেন- নির্বাচন দু’টি সুষ্ঠু না হলেও আইনানুগ হয়েছে। যে দু’টি নির্বাচন অনিয়ম ও কলুষতায় পরিপূর্ণ ছিল সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, সে দু’টি নির্বাচনকে এ নির্বাচন কমিশনার কিভাবে আইনানুগ দাবি করেছেন, তা এ দেশের সচেতন মানুষের কাছে বোধগম্য নয়। তা ছাড়া, ‘আইনানুগ’ ও ‘সুষ্ঠু’র মধ্যে তিনি যে ভিন্নতা দেখানোর প্রয়াস নিয়েছেন, তা একজন সাংবিধানিক পদধারী যিনি আইনানুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সাথে দায়িত্ব পালনের শপথ নিয়েছেন তার জন্য অনাকাক্সিক্ষত, অনভিপ্রেত ও অপ্রত্যাশিত। একজন দায়িত্ববান এবং যথাযথ বিবেকবোধ ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সাংবিধানিক পদধারীর পক্ষে এ ধরনের মন্তব্য সংবিধান ও আইন বিষয়ে অজ্ঞতার পরিচায়ক। আর এ ধরনের অজ্ঞ ব্যক্তি সাংবিধানিক পদে আসীন হলে তা দেশ ও জাতির জন্য গভীর মর্মবেদনা ও দুঃখের কারণ হিসেবে দেখা দেয়।
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
E-mail: iktederahmed@yahoo.com


আরো সংবাদ