১৭ নভেম্বর ২০১৮

বেহাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা

বেহাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা - ছবি : সংগৃহীত

একজন শিশু কোন পারিবারিক প্রেক্ষাপট থেকে এলো কিংবা সে একজন বালক না বালিকা, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সে একটি ভালো প্রাক-বিদ্যালয় কিংবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার পড়াশোনা শুরু করছে কি না। কারণ, একটি শিশুর শিক্ষাগত অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে তার প্রাথমিক শিক্ষার ওপর। সে বালক না বালিকা কিংবা সে বড় ঘরের সন্তান না গরিব ঘরের সন্তান, তার ওপর নয়। ভারতের ‘দ্য ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন’-এর গবেষকরা তাদের এক সমীক্ষার মাধ্যমে জানতে পেরেছেন, একজন ছাত্রের শিক্ষার ক্ষেত্রে তার স্কুলের শিক্ষার মানটিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তার লিঙ্গপরিচয় বা পারিবারিক প্রেক্ষাপট। তার বাবার আয়রোজগার কেমন কিংবা তার বাবা-মা কতটুকু শিক্ষিত, সেসব বিষয়ের তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ। উঁচুমানের প্রাক-বিদ্যালয়ে শিক্ষার পর যদি একটি শিশু কার্যকর একটি প্রাথমিক শিক্ষা পায়, তবে এই শিশুর বাকি জীবনের যাবতীয় বিকাশে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন ঘটে। তবে এই গবেষকরা বলেছেন, শিশুকে প্রেরণা জোগানোর ক্ষেত্রে পারিবারিক শিক্ষার পরিবেশেরও প্রয়োজন রয়েছে। সে জন্যই হয়তো বলা হয়, শিশুর শিক্ষক দু’জন- এক. বাবা-মা, দুই. স্কুলশিক্ষক।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা হচ্ছে প্রতিটি শিশুর জন্য সবচেয়ে অগ্রগণ্য মৌলিক অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করাই শুধু একটি দেশের অপরিহার্য দায়িত্ব নয়; এর পরের দায়িত্বটি পড়ে পরিবার বা বাবা-মায়ের ওপর। ভুললে চলবে না, প্রাথমিক শিক্ষাই কার্যত একটি দেশের গণমানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করে, তাদের সামনে খুলে দেয় সুযোগের দুয়ার এবং একই সাথে পথ করে দেয় আত্মোন্নয়নের পথ। এর মাধ্যমেই একটি জাতি খুঁজে পায় দারিদ্র্য নাশের উপায়। একটি কল্যাণ রাষ্ট্র ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে টেকসই উন্নয়নের একটি পরম পূর্বশর্ত। তাই একটি জাতির দায়িত্ব হচ্ছে- প্রতিটি শিশুকে সে বালক কিংবা বালিকা হোক, সবার আগে তার জন্য ভালো মানের প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার বিষয়টি নিশ্চিত করা। চারপাশের দুনিয়ার সাথে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হলে শিশুদের আকৃষ্ট করতে হবে প্রাথমিক জীবনের শিক্ষার প্রতি। এটি হচ্ছে পরবর্তী শিক্ষাজীবনের ভিত্তি। এই ভিত্তি নড়বড়ে হলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। এই সত্যটুকু আমরা বুঝতে চাই না, উপলব্ধি করতে চাই না। তেমনি প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্বটুকুও আমাদের নীতিনির্ধারকদের বিবেচনার বাইরেই থেকে যায়। ফলে মাঝে মধ্যেই আমাদের কাছে আসে দেশের প্রাথমিক শিক্ষাসংক্রান্ত নানা অশুভ সংবাদ, যা আমাদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সম্প্রতি একটি জাতীয় ইংরেজি দৈনিকের খবরে জানা যায়- দেশের ৬০ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নেই। খবর মতে, প্রতি ১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছয়টিই চলছে প্রয়োজনের চেয়ে কমসংখ্যক শিক্ষক নিয়ে। দেশে এমন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা আট হাজার ৫০০। তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোকেই সবচেয়ে কমসংখ্যক শিক্ষক নিয়ে চলতে হচ্ছে। এসব স্কুলের প্রতিটিতে মাত্র তিনজন শিক্ষক নিয়েই শিক্ষাক্রম চালাতে হচ্ছে। শিক্ষকের অভাবে এসব স্কুলের প্রতিদিনের শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মান বেসরকারি প্রথমিক বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর চেয়ে নিচে নেমে পড়ার প্রধানতম কারণ এটি। শিক্ষাবিদ ও শিক্ষক প্রতিনিধিরা এমনটিই মনে করেন।

২০১৭ সালের ‘বাংলাদেশ প্রাইমারি এডুকেশন অ্যানুয়েল সেক্টর পারফরম্যান্স রিপোর্ট’-এ দেখানো হয়েছেÑ আট হাজার ৫৬৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চলছে শিক্ষকের চরম অভাব। এসব স্কুলের মধ্যে সাতটি বিদ্যালয় চলছে মাত্র একজন করে শিক্ষক নিয়ে, ৭২১টি স্কুল চলছে মাত্র দু’জন করে শিক্ষক দিয়ে আর সাত হাজার ৭৬৪টি বিদ্যালয়ে রয়েছে তিনজন করে শিক্ষক। এই রিপোর্টে আরো উল্লেখ করা হয়েছেÑ কোনো মতে কাজ চালিয়ে নেয়ার জন্য প্রতিটি বিদ্যালয়ে কমপক্ষে চারজন ‘ওয়ার্কিং টিচার’ থাকা প্রয়োজন। তা না হলে মানসম্পন্ন শিক্ষাদান কিছুতেই সম্ভব নয়।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, ‘এটি সত্য, আমরা শিক্ষক-ঘাটতিতে ভুগছি, তবে সমস্যাটি মোকাবেলা করার জন্য আমরা শিক্ষক নিয়োগ দিচ্ছি। তবে কতজন শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে সেটাই বড় প্রশ্ন। উল্লেখ্য, ইউনেস্কোর সুপারিশ হচ্ছে প্রতি ক্লাসের জন্য একজন করে শিক্ষক দরকার। সে অনুযায়ী, প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছয়জন করে শিক্ষক থাকার কথা। কারণ, এখন প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত মোট ছয়টি করে শ্রেণী রয়েছে। সেখানে যখন শুনি, কোনো কোনো স্কুলে একজন করে শিক্ষক রয়েছেন, তখন উদ্বেগের পারদ কতটুকু তা সহজেই অনুমেয়। আর যে একজন শিক্ষক সেখানে স্কুল চালাচ্ছেন, তার যে কী অবস্থা তা ভাবতেও মাথা খারাপ হওয়ার কথা। সেখানে ওই শিক্ষক শিশুদের সামলাবেন, না ক্লাসে পড়াবেন। মানসম্পন্ন শিক্ষার কথা সেখানে ভাবাও কঠিন।

২০১৭ সালের ‘অ্যানুয়েল প্রাইমারি স্কুল সেন্সাস (এপিএসসি)’ রিপোর্ট মতে, দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৪ হাজার ১২২টি। এর মধ্যে ৩৮ হাজার ৮৫৬টি চলছে ছয়জনের চেয়ে কম শিক্ষক নিয়ে। এই রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে- আট হাজার ৫৬৪টি স্কুল চলছে তিনজন করে শিক্ষক নিয়ে, ২২ হাজার ৫২৭টি স্কুলে রয়েছে চারজন করে শিক্ষক নিয়ে আর সাত হাজার ৭৬৫টি স্কুলে রয়েছে পাঁচজন করে শিক্ষক। এই রিপোর্ট মতেÑ এটি স্পষ্ট যে, ‘প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলগুলোতে শিক্ষকস্বল্পতা সবচেয়ে বেশি। তাই শহর এলাকা থেকে গ্রাম এলাকায় শিক্ষক নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে প্রণোদনা দেয়া দরকার।’

যেসব স্কুলে একজন কিংবা দু’জন শিক্ষক রয়েছেন, সেসব স্কুলই সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার। সহজেই অনুমেয়, এসব স্কুলের শিক্ষকদের কাজ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে। কারণ, তাদের ক্লাস নেয়ার বাইরে প্রশাসনিক, দাফতরিক ও অন্যান্য কাজও সারতে হয় বাধ্য হয়ে। যেখানে একজন শিক্ষক কর্মরত আছেন, তার অসুস্থ হয়ে পড়ার অর্থ স্কুলটি শিক্ষকশূন্য হয়ে পড়া। আর যে স্কুলে দু’জন শিক্ষক রয়েছেন সে স্কুলে একজন অসুস্থ হয়ে পড়লে বাকি একজনের কাঁধে পড়ে পুরো স্কুল চালানোর দায়িত্ব। প্রাইমারি স্কুলের এ ধরনের সমস্যা বোঝার জন্য কোনো বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। এ কারণে বাংলাদেশে প্রাইমারি শিক্ষা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বৃহত্তর জোটের নেতা মোহাম্মদ শামসুদ্দিন। তিনি বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতিরও সভাপতি।

এ ধরনের শিক্ষকস্বল্পতা নিয়ে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা সুষ্ঠুভাবে চলতে পারে না, এটি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। দেশের প্রাথমিক স্কুলগুলো যে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে, তা কিন্তু সরকারি মহল স্বীকার করতে নারাজ। তাদের মুখে শুধু উন্নয়নের জারিজুরি। তাদের মুখে উন্নয়নের জারিজুরি শুনলে মনে হয়, তারা দেশটিকে এরই মধ্যে উন্নয়নের স্বর্গে পরিণত করেছেন। তাদের অবস্থা যেন এমন, এখন কোথায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালাবেন সেসব জায়গা খুঁজে পাচ্ছেন না। কিন্তু দেশের ভিত্তিমূলের প্রাথমিক শিক্ষা যে ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে, তা দেখার অবকাশ তাদের নেই।

বাস্তবে আমরা দেখছি, অনেক স্কুলেই প্রধান শিক্ষক নেই। একজন প্রধান শিক্ষককে একটি স্কুলের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পালন করতে হয়। এ জন্য তাকে প্রচুর সময় দিতে হয়। তাকে প্রশাসনিক কাজের জন্য শিক্ষা অফিসের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে হয়। প্রতিদিনের স্কুলের কর্মকাণ্ডের ব্যবস্থাপনা করতে হয়। শিক্ষকস্বল্পতা থাকুক না থাকুক তাদের অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার বাস্তবায়নের গুরুদায়িত্ব পালন করতে হয়। তার সুচারু পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে একটি স্কুলের মানসম্পন্ন শিক্ষাদানের বিষয়টি। যেসব স্কুলে প্রধান শিক্ষক নেই, সেখানে সহকারী শিক্ষকদেরই চালাতে হয় প্রধান শিক্ষকের কাজ। তার ওপর এই বাড়তি চাপের ফলে অনেক সময় ক্লাসে পাঠদানে প্রয়োজনীয় মনোযোগ ও সময় দিতে পারেন না। তা ছাড়া, প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক স্কুলে শিক্ষকের শূন্যতা সৃষ্টি হয় শিক্ষকদের পিটিআইসহ নানা ধরনের প্রশিক্ষণ, অবসরে যাওয়া, পদত্যাগ ও মৃত্যুর কারণে। এর বাইরে অনেক শিক্ষিকা দীর্ঘ সময় থাকেন প্রসবকালীন ছুটিতে। এর ওপর আছে অনেক শিক্ষকের অসুস্থতাজনিত দীর্ঘ ছুটি কাটানোর বিষয়টিও। এসব শূন্য পদ সহজে পূরণ হয় না। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকরা শিক্ষার গুণগত মান রক্ষা করতে পারেন না।

ছয়টি শ্রেণী চালু রয়েছে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে একটি প্রাথমিক স্কুল কী করে একজন-দু’জন শিক্ষক দিয়ে চলতে পারে। শিক্ষার মান রক্ষা করা তো পরের ভাবনা। অথচ এটাই বাস্তবতা দেশের হাজার হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য। এই সমস্যা দীর্ঘ দিন ধরেই চলছে। অথচ এ সমস্যা সমাধানের জন্য ভাবার কেউ আছে বলে মনে হয় না। অথচ ভুললে চলবে না, এটি হচ্ছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তিস্তরের শিক্ষা। সরকারকে মনে রাখতে হবে, এসব নানা কারণে আমাদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কেউ তাদের সন্তানদের পাঠাতে চান না, বরং পয়সা খরচ করে বেসরকারি স্কুলে কিংবা কিন্ডারগার্টেনে পাঠাতেই এরা বেশি আগ্রহী। কারণ, তারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান সম্পর্কে ভালো করেই জানেন। তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সে সুযোগ না থাকায় অভিভাবকরা অগত্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই তাদের সন্তানদের পাঠান। আমাদের উপলব্ধি থাকা চাই, এই স্তরের শিক্ষাকে দুর্বল করে রাখার অপর অর্থ সামগ্রিক শিক্ষাকেই দুর্বল করে রাখা। শিক্ষকস্বল্পতা প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার জন্য একটি মৌলিক সমস্যা। এ সমস্যাটি মনে হচ্ছে দিন দিন আরো বাড়ছে, সমস্যাটি ধারণ করছে জটিলতর আকার। অথচ এই সমস্যা সমাধানে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। কেন নেই তাও বোঝা এক কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা শুধুই শুনছি দেশ উন্নয়নের দিকে মহাগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, অথচ প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে এর কোনো প্রমাণ মিলছে না কেন- সেটিও একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষকস্বল্পতার কারণেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্ররা পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করতে পারছে না।

প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার গত পাঁচ বছরের ফলাফলে এর প্রতিফলন মিলে। ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের এই পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ গ্রেড পয়েন্ট পাচ্ছে হাইস্কুল-সংযুক্ত প্রাইমারি স্কুলগুলোর ৪০-৪৪ শতাংশ ছাত্রছাত্রী, কিন্ডারগার্টেনের ২২-২৪ শতাংশ ছাত্রছাত্রী এবং সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয়ের ২.৭ শতাংশ ছাত্রছাত্রী। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের দেয়া তথ্য মতে, নতুন করে জাতীয়করণ করা স্কুলের ১.৯৬ শতাংশ, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৬.১২ শতাংশ, উচ্চবিদ্যালয়ের সাথে সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪৪-৪৫ শতাংশ এবং কিন্ডারগার্টেন স্কুলের ২২.৪১ শতাংশ ছাত্রছাত্রী ২০১৭ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়েছে। ২০১৭ সালে এই পরীক্ষায় ৯ শতাংশের বেশি ছাত্রছাত্রী জিপিএ ৫ পেয়েছে। নতুন প্রতিষ্ঠিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই পরীক্ষায় সার্বিক পাসের হার ২০১৭ সালে হাইস্কুল সংযুক্ত প্রাইমারি স্কুল ও কিন্ডারগার্টেনের তুলনায় ছিল ৫.৬৯ শতাংশ ও ৫.৬৫ শতাংশের চেয়ে কম।

আজকের দিনে বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিষ্ঠিত করা হয় এবং পরিচালিত হয় রাজনৈতিক নেতাদের খেয়ালখুশি মতো। এ বিষয়টি সত্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও। ফলে যেখানে প্রাইমারি স্কুলের প্রয়োজন নেই সেখানে স্কুল গড়ে তোলা হচ্ছে, আবার যেখানে স্কুলের প্রয়োজন সেখানে স্কুল স্থাপন করা হচ্ছে না। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের ২০১৭ সালের প্রাথমিক শিক্ষাসংক্রান্ত বার্ষিক চূড়ান্ত খসড়া কর্মসাফল্য প্রতিবেদন মতে, সারা দেশে পাঁচ হাজার ৩৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে যেখানে ছাত্রসংখ্যা ১০০ জনের নিচে, আর এগুলোর মধ্যে ৬৭৭টির ছাত্রসংখ্যা ৫০ জনেরও নিচে। অথচ সেসব এলাকার কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোতে এর চেয়ে অনেক বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।

প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, দেশে ৬৪ হাজার ১২২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গড় ছাত্রসংখ্যা ২০৮ জন। দেশের যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে সর্বোচ্চসংখ্যক শিক্ষার্থী রয়েছে, সেটির শিক্ষার্থী তিন হাজার ৭৬৮ জন এবং সবচেয়ে কমসংখ্যক ছাত্র নিয়ে চলা স্কুলটির শিক্ষার্থী তিনজন। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, কী অভাবনীয় মাত্রায় অপরিকল্পিতভাবে স্কুল গড়ে তোলা হয়েছে। অথচ সারা দেশেই রয়েছে শিক্ষকের স্বল্পতা। এমনও স্কুল আছে, যেগুলোতে ছাত্রসংখ্যা ৫০ জনেরও কম। রাজনৈতিক নেতাদের ইচ্ছামতো যেখানে-সেখানে স্কুল গড়ে তোলার কারণেই এমনটি হচ্ছে। এসব স্কুল দ্রুত উপযুক্ত স্থানে সরিয়ে আনা দরকার বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক আবু হেনা মোস্তফা কামাল স্বীকার করেন, কিছু স্কুলে ছাত্রসংখ্যা খুবই কম, তবে তারা এগুলো একীভূত করতে পারছেন না।

কারণ, অনেক স্কুল প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে প্রভাবশালী মহল। জানা গেছে, সরকার পরিকল্পনা করছে দেশের শহর ও গ্রাম এলাকায় আরো এক হাজার স্কুল স্থাপনের। ‘ক্যাম্পেইন ফর পপুলার এডুকেশন’-এর নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী মনে করেন, এসব স্কুল প্রতিষ্ঠার আগে প্রয়োজন স্কুল ম্যাপিং : কোথায় স্কুল প্রয়োজন এবং কোথায় নয়, তা নির্ধারণ। তবে এসব স্কুল প্রতিষ্ঠার সময় আগে থেকে নিশ্চিত করতে হবে এসব স্কুলে যেন শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের ঘাটতি না থাকে।
২০১৭ সালের এএসপিআর রিপোর্ট অনুযায়ী, আট হাজার ৫০৪টি স্কুলে চরম শিক্ষকস্বল্পতা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ৭৯টি চলছে একজন শিক্ষক নিয়ে, ৭২১টি চলছে দু’জন শিক্ষক দিয়ে আর সাত হাজার ৭৬৪টিতে রয়েছে তিনজন করে শিক্ষক। জানা যায়, সরকারি পাথমিক বিদ্যালয়ে আরো ২৫ হাজার শিক্ষক নিয়োগ দিলে আমরা শিক্ষকস্বল্পতা সমস্যাকে মোটামুটি একটা সহনশীল পর্যায়ে নিতে পারব। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞজনেরা মনে করেন, সবার আগে এই কাজটি দ্রুত করা দরকার। এক মুহূর্ত দেরি না করার অবকাশ নেই।


আরো সংবাদ