১৬ নভেম্বর ২০১৮

‘অভিধান’ পরিবর্তনের সময় এসেছে

‘অভিধান’ পরিবর্তনের সময় এসেছে - ছবি : নয়া দিগন্ত

যুগ চলছে পরিবর্তনের, পৃথিবীর আদিকাল পার হয়ে মধ্যযুগ শেষ করে মানুষ এখন আধুনিক যুগে প্রবেশ করে নিজেদের সভ্য সমাজের সদস্য হিসেবে দাবি করে আত্মতৃপ্তি লাভ করছে। মানুষের আত্মতৃপ্তি ও বাস্তবতা কি এক বিষয়? ইতিহাসের পাতায় যখন সব কিছু ঘুরপাক খায়, তখনই প্রকৃত বিষয়টির বিশ্লেষণ উঠে আসে, যেমন- দুধ থেকে মাখন। বর্তমান যুগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ‘সভ্য’ না ‘বর্বর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে, তা ভবিষ্যৎ সময়ই বলে দেবে। সব আলোচনা-সমালোচনার ঊর্ধ্বে থেকেও বলতে হয়, বর্তমান যুগ চলছে পরিবর্তনের যুগ, আদর সোহাগের সুরে বর্তমান যুগকে অনেকেই ‘ডিজিটাল’ যুগ হিসেবে আখ্যায়িত করতে ভালোবাসেন, কেউ বলেন কলিকাল চলছে। মানুষের রুচির পরিবর্তনের সাথে তার শখের পরিবর্তন হয়। আবার অবস্থার পরিবর্তনের (আর্থিক) সাথে তার জীবনযাত্রার মানের পরিবর্তন ঘটে। অন্য দিকে ক্ষমতাসীনদের চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তে মানুষ তার অবস্থা পরিবর্তনে বাধ্য হয়। এ ছাড়া অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো কোনো বিষয়ের সংজ্ঞা বা মর্মার্থ নিজ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে।

যুদ্ধবিগ্রহের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সীমানা ও নাম পরিবর্তন হয়েছে, স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের নাম পরিবর্তন বা মূল নামে ফিরে গেছে। অন্য দিকে বলতে হয়, সৃষ্টিজগতে পরিবর্তন ও রূপান্তর পাশাপাশি চলে। তবে যুগ এক জায়গায় থেমে থাকে না। বর্বরতার যুগ পেরিয়ে মানুষ সভ্য সমাজে প্রবেশ করার যে দাবি, তা-ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কিভাবে মূল্যায়িত হবে, তা অনুমান করা যায় যখন মিয়ানমারের সাম্প্রতিক গণহত্যাসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অত্যাচার-নির্যাতনের কাহিনী, যার ফলে এক রাষ্ট্রের নাগরিক অন্য একটি রাষ্ট্রের রিফিউজিতে পরিণত, ক্ষুধা নিবারণের জন্য খাদ্যের প্রয়োজনে কাঠের নৌকায় সাগর পাড়ি দিতে যেয়ে সাগরের বুকেই সলিল সমাধি হচ্ছে। প্রায় রাষ্ট্রেই অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বে প্রতিপক্ষকে হত্যা ও নির্যাতনের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের অধিকারবঞ্চিত রাখার লোমহর্ষক কাহিনী নিয়ে ইতিহাস যখন রচিত হবে তখন (পরবর্তী সময়ে) মানুষের মন মানসিকতার ভিত্তিতেই ‘সভ্য’ শব্দটির মূল্যায়ন হবে।

জাতীয় সঙ্গীত, জাতীয় পতাকা একটি জাতি ও রাষ্ট্রের প্রতীক। বহু রাষ্ট্র তাদের জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তন করেছে। বড় বড় রাষ্ট্র যেমন- ফ্রান্স, চীন ও রাশিয়া ছয়বার, জার্মানি তিনবারসহ ছোট ছোট রাষ্ট্র যেমন- সোমালিয়া, ব্রাজিল, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, পর্তুগাল, পোল্যান্ড, ফিলিপাইন এমন শতাধিক রাষ্ট্র কয়েকবার তাদের জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তন করেছে; যার বিস্তারিত বিবরণ দিলে লেখাটির পরিধি বেড়ে যাবে। তবে পুস্তিকা আকারে প্রকাশের সময় রাষ্ট্র ও পরিবর্তন করা জাতীয় সঙ্গীতের শিরোনাম লিপিবদ্ধ করা হবে।
‘পরিবর্তন’ অনেক সময় জোর করে চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত, অনেক সময় জনতার দাবি তথা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বা আন্দোলনের ফসল হিসেবে পরিবর্তন এসেছে, অনেক সময় কালের অবক্ষয় বা জাতিসত্তার নিজস্ব অবস্থান থেকে সরে যাওয়ার কারণে ‘পরিবর্তন’ হয়েছে। প্রতি বিষয়েরই রয়েছে অর্থ, ব্যাখ্যা এবং নিজস্ব গুণ বিচারে এর ‘সংজ্ঞা’। ‘অর্থ’, ‘ব্যাখ্যা’ বা ‘সংজ্ঞা’ নির্ধারণ করে যে পুস্তিকা যুগে যুগে প্রকাশিত হয়ে আসছে বাংলা ভাষায় তা ‘অভিধান’, ইংরেজি ভাষায় ডিকশনারি হিসেবে পরিচিত। অভিধান ছাড়াও নিজস্ব মতবাদ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন সময়, যা ক্ষেত্রবিশেষে বেদবাক্য বা নীতিমালা বা সিদ্ধান্ত নেয়ার রূপরেখা হিসেবে মূল্যায়িত হয়েছে। কালের বিবর্তনে তা-ও পরিবর্তন হয়েছে। যেমনÑ একসময় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন গণতান্ত্রিক সরকারের ব্যাখ্যায় বলেছিলেন, `A Government which is of the People, by the People and for the People.' কিন্তু বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার গঠন বা ব্যবস্থায় পিপল-এর আর কোনো প্রয়োজন হয় না। রাষ্ট্র পরিচালনা বা সরকার গঠনে পিপল, অর্থাৎ জনগণের মতামত বা ভোটাধিকার এখন উপেক্ষিত। মাসলম্যান ও কামান-বন্দুকে সুসজ্জিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদতলেই এখন গণতন্ত্র। তাই গণতান্ত্রিক সরকারের সংজ্ঞা কার্যত ‘A Government who is of the Massuelman, by the Police (Law & order Agencies), for the Ruling Party man & Leaders.’ বর্তমান পেক্ষাপটে গণতন্ত্রের বর্ণিত সংজ্ঞাটিই যথাযথ বলে মনে করি, অবশ্যই এ মর্মে মন্তব্য করবেন পাঠক সমাজ ও দেশবাসী।

‘আইন’ বলতে বলা হয়, আইন সবার জন্য সমান, আইন নিজস্ব গতিতে চলে, জনগণের কল্যাণের জন্য প্রণীত হয় আইন। কিন্তু বর্তমান পেক্ষাপটে আইনের যে বর্ণনা অভিধানে রয়েছে তা কি যথাযথ? রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কোনো কালেও আইন সবার জন্য সমান ছিল না; বর্তমানে তো এর নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। যারা আইন সবার জন্য সমান অর্থ করেছেন, তারা মিথ্যা কথা লিখেছেন। বর্তমান অবস্থাদৃষ্টে ‘আইন’ অর্থ ক্ষমতাসীনদের কল্যাণে, ক্ষমতাসীনদের দ্বারা প্রণীত প্রতিপক্ষকে দমনের জন্য বিধিবিধান, নিয়মকানুনই বেশির ভাগ আইন। আইন নিজস্ব গতিতে চলে না, বরং আইন প্রয়োগকারী কর্তৃক নির্দেশিত পথে চলে। শাসক দলের জন্য আইন একভাবে প্রয়োগ হয়, বিরোধীদের জন্য প্রয়োগ হয় উল্টোভাবে।
‘নির্বাচন’ বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান প্রণীত আইন শব্দকোষ ‘বইতে’ নির্বাচন সম্পর্কে (পৃষ্ঠা-৩৪৯) বলা হয়েছে, ‘নিজের পছন্দমাফিক কোনো কাজ সম্পন্ন করিবার জন্য একাধিক ব্যক্তির মধ্য হইতে এক বা ক্ষেত্র মতো একাধিককে পছন্দ করার পদ্ধতিকে নির্বাচন বলা হয়।’ কিন্তু বর্তমান নির্বাচনী ব্যবস্থায় নিজের পছন্দমতো প্রার্থীকে নির্বাচিত করার সুযোগ আছে কি? বর্তমান নির্বাচন পদ্ধতিকে বলতে হবে, ‘জোর যার মুল্লুক তার।’ ভোটাররা ভোট দিতে পারবে না, পুলিশের উপস্থিতিতে ক্ষমতাসীনদের দখলে চলে যাবে ভোটকেন্দ্র, এজেন্ট বের করে দেয়া হবে, ক্ষমতাসীনদের নির্দেশে পুলিশ মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করবে প্রতিপক্ষের লোকজনকে; তারপরও নিজের পছন্দমতো প্রার্থীকে ভোট দেয়ার ব্যবস্থা করার শপথ নিয়ে সাংবিধানিক দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচন কমিশন অনর্গল মিথ্যা বলে যাবে, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে; অথচ ভোটাররা নিজের ভোট নিজে দিতে পারেননি, এটাই এখনকার ‘নির্বাচন’। নিজের পছন্দমতো প্রার্থীকে ভোট দেয়ার পদ্ধতিকে ‘নির্বাসন’ দিয়ে ‘জোর যার ভোট তার’ পদ্ধতিকেই এখন ‘নির্বাচন’ বলা উচিত নয় কি?

‘বুদ্ধিজীবী’ তারাই যারা বুদ্ধিমাফিক কথা বলেন, অনগ্রসর সমাজকে আলোর পথ দেখান, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্যের দিকে ধাবিত হন, অগণিত সমস্যা সমাধানের পথ খোঁজেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন, তারাই বুদ্ধিজীবী। সব আরাম-আয়েশকে ভুলে গিয়ে কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, হাতে বই, পকেটে কলম নিয়ে সত্যের সন্ধানে ছুটে বেড়িয়েছেন- তাদেরকেই দেশের মানুষ বুদ্ধিজীবী হিসেবে চিনত, যারা কারো কাছে মাথা নত করত না, কারো কাছে বিক্রি হতো না, কারো কাছ থেকে বাড়তি সুবিধা নিত না, নিজেকে প্রকাশ করত জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য বক্তব্য ও লেখনীর মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমান বুদ্ধিজীবীদের দেখা যায় ব্যাংকের ঋণে পাজেরো জিপ বা বিলাসবহুল গাড়ি-বাড়ি ও সরকারি বিভিন্ন চেয়ারে বসে সরকারের চাটুকারিতা করাই বুদ্ধিজীবীদের প্রধান পরিচয়। সরকার তাদের সব অপকর্ম বুদ্ধিজীবীদের চাপাবাজির মাধ্যমে জায়েজ করে। বুদ্ধিজীবীদের চাপাবাজিতে কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা তা নির্ধারণেও জনগণ খেই হারিয়ে ফেলে। এটাই এখন ‘বুদ্ধিজীবীদের’ শনাক্ত করার নমুনা।
এমনিভাবে প্রতিটি বিষয়ে নাম ও কাজ বা গুণাগুণের কোনো সামঞ্জস্য নেই। অভিধানে মর্মার্থ যেভাবে লেখা রয়েছে, বর্তমানে বাস্তবতার সাথে তার কোনো মিল নেই। ফলে এখন সময় এসেছে বাস্তবতার সাথে মিল রেখে অভিধান পরিবর্তন করার। ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ধোঁকা থেকে রক্ষা পাবে।
লেখক : কলামিস্ট ও আইনজীবী (আপিল বিভাগ)

E-mail : taimuralamkhandaker@gmail.com


আরো সংবাদ