২১ নভেম্বর ২০১৮

ভীতির সংস্কৃতির অবসান ঘটুক

ভীতির সংস্কৃতির অবসান ঘটুক - ছবি : সংগৃহীত

দেশের রাজনীতি নিয়ে এক কথায় মন্তব্য করা কঠিন। সত্য উচ্চারণ করতে গেলে ঝুঁকি রয়েছে। সত্য আড়াল করে কথা বলা অনেকটা বোবা শয়তানের মতো আচরণ করা। বাস্তবে দেশের সংসদে বিরোধী দল নেই। যারা প্রকৃত বিরোধী দল তাদের ঘরে-বাইরে কোথাও টিকতে দেয়া হচ্ছে না। ভিন্নমত সহ্য করতে সরকার মোটেও রাজি নয়। জনগণের ক্ষোভ প্রকাশের স্থান বা গণমাধ্যমগুলোও একটা পক্ষ নিয়ে নিয়েছে। নয়তো অস্তিত্ব রক্ষায় নিজেদের জন্য নিজেরা একটা পথ করে নিয়েছে। সেই পথ অনেকটা সুবিধাবাদের। সরকারি দল ও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলো এতটা বেপরোয়া ও মারমুখো হয়ে আচরণ করে যা গণতন্ত্র কেন সাধারণভাবেও আশা করা হয় না। তাই প্রত্যেকটি বিবেকসম্পন্ন মানুষ চুপ থাকাকে নিজের জন্য কল্যাণকর ভাবতে বাধ্য হচ্ছে।

কারণ প্রতিবাদী মানুষেরা হয় গুম হয়ে যায়, না হয় নানা বাহানায় গ্রেফতারের হয়রানিতে পড়ে যাচ্ছে। তার ওপর ক্রসফায়ারের আতঙ্ক সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। এখন নতুন করে মাদকের দোহাইতে হয়রানি করার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।

এখন ক্ষীণ কণ্ঠে দাবি জানানোর উপায় এতটা সীমিত হয়ে এসেছে যে, প্রেস ক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে দু’চারটা কথা বলা, তা-ও পুলিশের ইচ্ছার ওপর বা মর্জির ওপর নির্ভর করতে হয়। তা ছাড়া সরকারি দলের ক্যাডাররা যেকোনো ইস্যুতেই তেড়ে আসছে। আওয়ামী লীগ একটি গণতান্ত্রিক দল হিসেবে দাবি করে আসছেÑ অথচ তাদের আজকের আচরণ শুধু গণতন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিকই নয়, এতটা বিপরীতধর্মী যে, দলটিকে রাজনৈতিক দল না ভেবে ‘শাসক দল’ হিসেবে চিহ্নিত করাই বেশি যৌক্তিক মনে হয়। দেশের সব ক’টি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এমনভাবে শাসক দল নিয়ন্ত্রণ করছে যার ইতিহাস এই দেশের মাটিতে আগে কখনো এতটা উৎকটভাবে দেখা যায়নি।

শাসক দলের মুখপাত্ররা দেশের রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের কোনো কথা সহ্য করতে নারাজ। নানাভাবে হুমকি ও ভীতি প্রদর্শন করার বাইরেও হয়রানি করার অপচেষ্টা চালানো হয়। এখন বিদেশী রাষ্ট্রদূতরাও নীতিগত কথা বলে নিন্দিত হচ্ছেন। মন্ত্রীরা পর্যন্ত বক্তব্য দিয়ে তাদের সমালোচনা করার রেওয়াজ চালু করে দিয়েছেন। একটি শাসক দল কতটা বেপরোয়া হলে কিংবা কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভুলে গেলে এমনটি করতে পারে তা ভাবতেও অবাক লাগে। সাধারণত কূটনীতিকেরা কোনো মন্তব্য করলে- তার জবাব কূটনৈতিকভাবে দেয়ার নিয়ম চালু আছে। অথচ রাষ্ট্রদূতরাও এখন রাজনৈতিক আক্রমণের শিকার হচ্ছেন, অন্তত কথার আক্রমণ যেন থামতেই চায় না, কেউ কেউ কোনো রাষ্ট্রদূতকে বিশেষ দলের মুখপাত্র পর্যন্ত বলা থেকে সংযত হতে পারেননি।

সরকার নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক আগেই নষ্ট করে দিয়েছে। এখন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন এতটাই আস্তার সঙ্কটে রয়েছেÑ তাদের তত্ত্বাবধানে আর কোনো নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য হওয়ার সুযোগ নেই। তাই নির্বাচনব্যবস্থাটাই শুধু আস্থার সঙ্কটে পড়েনি, এর প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদাও ভূলুণ্ঠিত হওয়ার অবস্থায় এসে ঠেকেছে।

দেশে বাস্তবে কোনো রাজনীতি নেই। অত্যন্ত সুকৌশলে সরকার দেশের পরিবেশ এমনটি করেছে যে, দল থাকবে রাজনীতি করতে পারবে না। গণতন্ত্র থাকবে তার অনুশীলন চলবে না। আইন থাকবে কিন্তু আইনের শাসন চলবে না। সরকার যা বলবে তাই জনগণকে চোখ বুজে মেনে নিতে হবে। এ অবস্থার অবসান জরুরি। এর জন্য সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা যেমন জরুরি তেমনি জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টারও বিকল্প নেই। সেই ক্ষেত্রে জাতীয় নেতাদের উচিত জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে জনগণকে প্রতিবাদী হতে উদ্বুদ্ধ করা। কারণ সব কিছুর আগে ভীতির সংস্কৃতির অবসান ঘটানো জরুরি হয়ে পড়েছে।


আরো সংবাদ