২১ নভেম্বর ২০১৮

এক দশকে দেশের ব্যাংক খাতে প্রবৃদ্ধির ধস

এক দশকে দেশের ব্যাংক খাতে প্রবৃদ্ধির ধস -

বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি ১০ বছরে সর্বনিম্ন। এ ব্যাপারে ব্যাংকারদের সুস্পষ্ট অভিমত, আমানতের ওপর আবগারি শুল্কের খড়গ, একের পর এক ব্যাংক কেলেঙ্কারি, আমানতের সর্বনিম্ন সুদহারসহ নানা কারণে মানুষ ব্যাংক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংক থেকে লাগামহীন সঞ্চয়পত্র বিক্রি, পোস্ট অফিসভিত্তিক সঞ্চয় প্রকল্পের কারণেও ব্যাংক আমানতে মারাত্মক টান পড়েছে। অন্য দিকে রেকর্ড আমদানি ব্যয় মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার কিনতে গিয়েও আমানতের টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকে চলে যাচ্ছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরেও ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ২১ শতাংশের ওপরে। ১০ বছর পর ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় তা কমে ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। উল্লেখ্য, ১০ বছর ধরেই ব্যাংক খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি রয়েছে ১২ শতাংশের ওপরে। অর্থাৎ বিগত এক দশকে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমেছে। অন্য দিকে ঋণের প্রবৃদ্ধি দ্বিগুণ বেড়েছে।

এটা শুভ লক্ষণ নয়। এখানে সমতা থাকছে না আমানত ও ঋণপ্রবাহের মধ্যে। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেছেন, সঞ্চয়পত্র ও পোস্ট অফিসভিত্তিক সঞ্চয় প্রকল্পে বড় অঙ্কের টাকা চলে যাচ্ছে। রফতানি ও প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) তুলনায় আমদানির প্রবৃদ্ধি অনেক বেশি। প্রায় ২৫ শতাংশ আমদানি প্রবৃদ্ধির দায় মেটানোর জন্য ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রতিনিয়ত ডলার কিনছে। এ কারণে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যাংকগুলো থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে চলে যাচ্ছে। ফলে ব্যাংকিং খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধিতে টান পড়েছে। দেশের আর্থিক খাতকে সুসংহত করার জন্য বন্ড মার্কেট শক্তিশালী করা সময়ের দাবি। এ ছাড়া, দ্বিতীয় কোনো বিকল্প নেই। মনে রাখা দরকার, স্বল্পমেয়াদি আমানত দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সম্ভব নয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০০৯ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল দুই লাখ ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এক বছর পর ২০১০ সালের জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় তিন লাখ ১৬ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা। ফলে বছরটিতে ব্যাংক আমানত বাড়ে ৫৬ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা বা ২১ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এরপর ২০১০-১১ অর্থবছর শেষে ব্যাংক খাতে আমানত ২১ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় তিন লাখ ৮৫ হাজার ৫৩০ কোটি টাকায়। এরপর থেকেই আমানতের প্রবৃদ্ধি নি¤œমুখী। ২০১১-১২ অর্থবছরে ১৮ দশমিক ৯১ শতাংশ আমানত প্রবৃদ্ধি হলেও ২০১২-১৩ অর্থবছরে তা ১৬ দশমিক ৮৩ শতাংশে নেমে আসে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি আরো কমে দাঁড়ায় ১৬ দশমিক ৩৬ এবং ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১২ দশমিক ১৭ শতাংশে। ২০১৬ জুনের শেষে ব্যাংকিং খাতের আমানতের পরিমাণ দাঁড়ায় সাত লাখ ৯৩ হাজার ৭১০ কোটি টাকা। অর্থবছরটিতে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ৫২ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার এক আর্থিক বুলেটিনে বলেছে, ব্যাংকিং খাতের আমানত প্রবৃদ্ধিতে মূল বিপর্যয় শুরু হয় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে। তখন ব্যাংকিং খাতে আমানত প্রবৃদ্ধি হয় মাত্র ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ। এরপর ২০১৭-১৮ অর্থবছরের এপ্রিল শেষে ব্যাংকিং খাতে তলবি ও মেয়াদি আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৩১ হাজার ১২১ কোটি টাকা।

সব ধরনের আমানতসহ বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে মোট প্রায় ১০ লাখ কোটি টাকার আমানত রয়েছে। আমানতের অর্থ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করেছে ৯ লাখ ৭২ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা। এক কথায় বলতে গেলে ব্যাংক খাত এখন দেশে সবচেয়ে সমালোচিত। ব্যাংক খাতে অবাধ লুটপাট, ঋণখেলাপি এবং অর্থ পাচারের মহোৎসব হলেও এসবের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। বেসিক ব্যাংক ও ফারমার্স ব্যাংক কেলেঙ্কারি সবাইকে হতবাক করেছে। এসব কেলেঙ্কারির মূল হোতাদের বিরুদ্ধে এখনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। বড় বড় ঋণখেলাপি থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অন্য দিকে বারবার সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাংক খাতকে সহায়তা দেয়া হচ্ছে। কয়েক বছর ধরে বাজেটে ব্যাংকিং খাতের ঘাটতি মেটাতে আলাদা মূলধন রাখতে হয়েছে। নতুন অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাতকে সহায়তা দেয়ার জন্য করপোরেট কর কমানো হয়েছে। পরিস্থিতির যে উন্নতি হবে, এমন ভরসা কেউ রাখতে পারছে না। পুঁজিবাজার খাত এবং ব্যাংক খাত- এ দু’টি খাতই অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। কিন্তু বিগত এক দশকে খাত দু’টির সামান্যতম উন্নতিও হয়নি। এসব দেখে সাধারণ মানুষের দেশের সবচেয়ে বড় দু’টি আর্থিক খাতের প্রতি আস্থা উঠে গেছে। এক দশক সময় কম নয়- এর মধ্যে খাত দু’টি ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়নি। এটা অর্থ মন্ত্রণালয়ের চরম ব্যর্থতা ছাড়া অন্য কোনো বিশেষণে ভূষিত করা যায় না। ব্যাংক খাতের দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে যদি প্রথম থেকে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর হতো, তবে আজ এমন সঙ্কট তৈরি হতো না; মানুষের আস্থাও নষ্ট হতো না। একটা সময় যখন সাধারণ মানুষের আমানত সঞ্চয়ের প্রধান ক্ষেত্র ছিল ব্যাংক, তখন সুদের হার ভালো ছিল; ঋণখেলাপির সংখ্যাও আজকের মতো বাড়েনি। তাই মানুষ ব্যাংকে টাকা আমানত রাখতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেনি- যেটা এখন দেখা যাচ্ছে। যার ইতিবাচক ফল ব্যাংকিং খাত ভোগ করেছিল সেই সময়ে। বর্তমানে আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক আরোপ আর সর্বনি¤œ সুদহার সাধারণ মানুষকে এ খাত থেকে সরে আসতে বাধ্য করেছে। ব্যাংক সুদহারের তুলনায় সঞ্চয়পত্রের সুদহার বেশি হওয়ায় সেখানে বিনিয়োগ বাড়ছে।

অনেকে এর পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও অধিক মুনাফার আশায় পুঁজিবাজারসহ অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ করছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধিতে। আবার বর্তমান পরিস্থিতির জন্য বেসরকারি ব্যাংকগুলোর আগ্রাসী বিনিয়োগ মনোভাবও অনেকটাই দায়ী। ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক সঙ্কটের জন্য বেসরকারি ব্যাংকগুলোর আগ্রাসী বিনিয়োগকে দায়ী করেন অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে ১০০ টাকা আমানত নিয়ে ৯০ টাকাই ঋণ দিয়ে দিয়েছে। বেসরকারি ব্যাংক থেকে মানুষের আস্থা উঠে গেছে। এসব কারণে দেশে বিগত দশকে বিনিয়োগে স্থবিরতা বিরাজ করছিল। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হলেও ব্যবসা-বাণিজ্যে তেমন গতি লক্ষ করা যায়নি। টাকার লেনদেন বাড়লে ব্যাংকিং খাতও সচল থাকে। আমানতের সুদের হার কমে যাওয়ার কারণে ব্যাংকিং খাতের সঙ্কট দীর্ঘায়িত করেছে। এখন বেসরকারি ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের ১২-১৪ শতাংশ সুদ দেয়ার প্রস্তাব করেছে। তারপরও বাড়ছে না ব্যাংকগুলোর আমানত প্রবৃদ্ধি। এপ্রিল ২০১৮ ব্যাংকগুলোর আমানত প্রবৃদ্ধি নেমে এসছে মাত্র ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশে। (সূত্র : বণিকবার্তা, ২৬ জুন ২০১৮)। ২৫ জুন ২০১৮ প্রভাবশালী একটি দৈনিক লিখেছে- ৩০টি সরকারি প্রতিষ্ঠানে ৩১ হাজার কোটি টাকা ঋণখেলাপি হিসেবে আটকা পড়ে আছে। এসব টাকা কখনো আদায় হবে বলে মনে হয় না- সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে এসব কথা বেরিয়ে আসছে। ব্যাংক যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হয়, তাহলে সঙ্কট এভাবে চলতে থাকবে এবং নিকট ভবিষ্যতে তা আরো তীব্র আকার ধারণ করবে বলে আমরা মনে করি। অতীত ও বর্তমান বিশ্লেষণ জরিপ থেকে এসব তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যাচ্ছে। 
লেখক : গ্রন্থকার ও গবেষক

E-mail : harunrashidar@gmail.com


আরো সংবাদ