২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

কোটা আন্দোলন দমনে এ কোন পন্থা?

কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগেরহামলা - ছবি : নয়া দিগন্ত

প্রতিপক্ষের ওপর নির্দয়-নির্মম আচরণের বিষয়গুলো সব সমাজেই আছে বা ছিল। কিন্তু সামাজিক মূল্যবোধ, আইনকানুন, রীতি-রেওয়াজ ও ভদ্রতা সভ্যতার আভরণে আচ্ছাদিত থেকেছে সব সময়। এগুলো যখন সমাজ ও রাষ্ট্রের অনুসৃত নীতি ও কার্যক্রম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন বুঝতে হবে সেখানে সর্বনাশ বিরাজ করছে। রাজনীতিতে অন্যায়-অনাচার, নির্মমতা ও প্রতারণা অনেক আগে থেকেই চলে আসছিল। কিন্তু যখন কৌটিল্য ও ম্যাকিয়াভেলি এসব অনৈতিকতাকে জায়েজ করার দর্শন দেন, তখন এসব বিষয় প্রাতিষ্ঠানিকতা পায়। বাংলাদেশের নৈতিকতায় অনেক সর্বনাশ সাধিত হয়েছে। কিন্তু চুরি করা মহাপুণ্যের কাজ, এ কথা কেউ এখনো বলেনি। যেভাবে নৈতিকতার ধস নেমেছে, একদিন তা বলতেও পারে। যে দেশে অসদুপায়কে উৎসাহিত করা হয়, পরীক্ষায় নকলের পক্ষে মিছিল হয়, অভিভাবক দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রীর জন্যও প্রশ্ন ফাঁস করেন, সেই অসম্ভবের দেশে কী না হতে পারে? এ ক্ষেত্রে শাসকদলের সোনার ছেলেরা কোটা আন্দোলন দমনে যে কীর্তিকলাপ করেছে, তাকে নির্মম-নির্দয় আচরণ ছাড়া আর কী বলা যায়? কোনো একটি বিষয় সরকারের অমত-দ্বিমত থাকতে পারে। সরকার তার নিয়মনীতি, আইনকানুন ও শাসন-প্রশাসনের মাধ্যমে তা প্রকাশ ও ব্যবস্থা নিতে পারে। কোটা আন্দোলন সম্পর্কে ইতঃপূর্বে সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নাগরিক সাধারণ লক্ষ করেছে। প্রধানমন্ত্রী সংসদে কোটা বিলোপের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাকে এ জন্য অভিনন্দনও জানিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে কী এমন হলো, যার জন্য সরকার লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা না নিয়ে আজ ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দেয়া হলো। যারা নির্মমভাবে পিটিয়েছে কোটা আন্দোলনকারী সাধারণ ছাত্রদের। তাও আবার পুলিশকে সাথে নিয়ে।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরপরই সরকারের খয়ের খাঁ ব্যক্তিরা এমনসব কথাবার্তা ও কাজকর্ম করে, যা থেকে সন্দেহ, অবিশ্বাস ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়। যেমন- মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা বিলোপের বিরুদ্ধে সরকারের এক রকম পৃষ্ঠপোষকতায় আন্দোলনের সূচনা করা হয়। আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলা হয়। সরকারের শীর্ষপর্যায়ের ব্যক্তি আন্দোলনটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রীর খোলামেলা এবং দ্ব্যর্থহীন উক্তি নিয়েও বিভিন্ন ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন সরকারের কর্তাব্যক্তিরা। শিক্ষার্থীরা সরকারের তরফ থেকে একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত চাচ্ছিল। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাটিই যদি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বলে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হতো, তাহলে শুরুতেই ভুল বোঝাবুঝির অবসান হতো। কিন্তু সরকার কমিটি গঠনের কথা বলে কার্যকর না করায় সন্দেহ-অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়। ছাত্ররা একসময় অস্থির ও অধৈর্য হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ছাত্রদের মতো সমষ্টিকে বলা হয় ‘এনোমিক গ্রুপ’ বা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী’। কারণে বা অকারণে তারা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারে।

বিগত সামরিক সমর্থিত সরকারের সময় খেলা দেখার মতো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্ররা যে প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল, সে সরকার তা দমনে হিমশিম খেয়েছিল। সুতরাং এসব ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বনই শ্রেয়। ছাত্রদের ঘোষিত আলটিমেটাম শব্দটি শীর্ষপর্যায়ে ইগোর সৃষ্টি করে। এটি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যারা রাজনীতি করেন, সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেন, তাদের জেদ করা চলে না। সহজেই তারা আলটিমেটাম শব্দটিকে অগ্রাহ্য করে, বুদ্ধিমত্তা, সমঝোতা ও সহনশীলতার মনোভাব দেখাতে পারতেন। একটি ইতিবাচক কাজ আরেকটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দেয়। অপর দিকে জেদ, অহঙ্কার, ঔদ্ধত্য অনেক সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কথায় বলে, ‘পাপে পাপ আনে পুণ্যে আনে সুখ।’ গত কয়েক দিনে কোটা আন্দোলনকারীদের সাথে যে ব্যবহার করা হয়েছে, তা কোনো ক্রমেই কোনো সরকারের স্বাভাবিক আচরণের মধ্যে পড়ে না। সরকারের দুই লাইনের একটি ঘোষণা আন্দোলনটিকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য যথেষ্ট ছিল, অথচ সরকার শক্তি প্রয়োগ তা আবার বেআইনি শক্তি প্রয়োগ করে আন্দোলন দমন করতে চাইল। রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকারই শক্তি প্রয়োগের বৈধতা রাখে। যদি পুলিশ সমাবেশকে বেআইনি ঘোষণা করত অথবা সোনার ছেলেদের পরিবর্তে পুলিশই যদি গ্রেফতার কিংবা পণ্ড করত, নেতিবাচক হলেও তার একটি বৈধতা থাকত। কিন্তু তা না করে এরা যা করেছে তা অন্যায়, অনভিপ্রেত, অগ্রহণযোগ্য ও লজ্জাকর।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ৩০ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে হামলা চালায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন, যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হকসহ অনেক আন্দোলনকারী আহত হয়েছে। পূর্বঘোষিত সংবাদ সম্মেলনের আগমুহূর্তে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করা হয়। সচিত্র প্রতিবেদনে দেখা যায়, ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা উদ্যোক্তাদের লাথি, কিলঘুষি মারছে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সেদিন সকাল ১০টার দিকে মধুর ক্যান্টিনে জড়ো হয়। সেখান থেকে তারা আন্দোলনকারীদের সংবাদ সম্মেলন স্থান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের সামনে অবস্থান নেয়। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সেখানে ‘শিবির ধর’ বলে আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হয়। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান গ্রন্থাগারিক অধ্যাপক এস এম জাবেদ আহমদ দুই পক্ষকে চলে যেতে বলেন। কিন্তু ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সেখানে উপস্থিত আন্দোলনকারীদের এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করে। সবচেয়ে বেশি মারধরের শিকার হয় যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক। তার নাক-মুখ ফেটে রক্ত বের হচ্ছিল। সে অধ্যাপক জাবেদ আহমদের পা জড়িয়ে ধরে বাঁচার আকুতি জানাতে থাকে। ওই শিক্ষক নিজের পরিচয় দিয়ে ছাত্রটিকে রক্ষার চেষ্টা করলেও হামলাকারীরা নিবৃত্ত হয়নি, বরং তিনি নিজের হাতে আঘাত পান।

মারধরের শিকার আহত নুরুলকে হাসপাতালে নিতেও বাধা দেয় হামলাকারীরা। পরে তাকে পেছনের দরজা দিয়ে হাসপাতালে নেয়া হয়। ছাত্রলীগের মারমুখী নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ধাওয়া করে কেন্দ্রীয় মসজিদ, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ও আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের সামনে গিয়ে মারধর করে। পরে পরিচিতজনেরা আহতদের ধরাধরি করে হাসপাতালে নেন। সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার সময় গ্রন্থাগারের সামনে ছাত্রলীগের বিদায়ী কমিটির ৫০-৬০ জন নেতা উপস্থিত ছিলেন। অনেকেই পরবর্তী কমিটিতে পদপ্রার্থী। মারধরে অংশ নেয়া নেতাকর্মীদের বেশির ভাগই কনিষ্ঠপর্যায়ের। উল্লেখ্য, আজকাল ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের মেধা-মননের চেয়ে মারধরে পারঙ্গমতা বিশেষ গুণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে জুনিয়রদের দ্বারা সিনিয়রদের আঘাত করে হাতেখড়ি দেয়া হয়। সংবাদপত্রে ছাত্রলীগের এসব নেতাকর্মীর নাম ও পদসহ বিস্তারিত পরিচয় প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধা দেয় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। ওইদিন বেলা দেড়টার দিকে শাহবাগে কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগার থেকে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক জসিম উদ্দিনসহ পাঁচজনকে বের করে আনে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে জসিমকে থানায় নিয়ে আসা হয়। পুলিশ ক্যাম্পাসের ভেতর প্রবেশ না করলেও আশপাশে তাদের অবস্থান ছিল আক্রমণাত্মক। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তেমন কোনো তৎপরতা পরিলক্ষিত হয়নি, বরং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে তাদের মন্তব্য ও কার্যক্রম লক্ষ করা যায়। উপাচার্য আক্তারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, বিশ^বিদ্যালয়ে বিশৃঙ্খলার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে বলা হয়, ক্যাম্পাস স্বাভাবিক রাখতে ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সব ধরনের ব্যবস্থা নেবে। পরের দিনের চিত্র আরো ভয়াবহ।

১ জুলাই মারধরের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আহূত ধর্মঘট পণ্ড করতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দেশের সর্বত্র আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হয়। ঢাকার শাহবাগে আন্দোলনকারী সন্দেহে এবং ফেসবুকে মারধরের সমালোচনা করে স্ট্যাটাস দেয়ায় কয়েকজনকে পেটানো হয়। আন্দোলনকারীদের একজন নেতা রাশেদ খানকে ১ জুলাই দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ভাসানটেকের মজুমদার মোড় এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তার সঙ্গে থাকা যুগ্ম আহ্বায়ক মাহফুজ খানকেও গ্রেফতার করার চেষ্টা করে। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় আইনবিষয়ক সম্পাদক আল নাহিয়ান খান শাহবাগ থানায় রাশেদ খানের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। এজাহারে বলা হয়, গত ২৭ জুন রাত ৮টা ৮ মিনিটে রাশেদ খান ফেসবুক লাইভে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মানহানিকর বক্তব্য দেন। অবশ্য এ ধরনের বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণ করতে পারেননি মামলাকারী আল নাহিয়ান। রাশেদকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সনেশন ক্রাইম ইউনিটের সাইবার ক্রাইম বিভাগ। অবশেষে তার বিরুদ্ধে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। হামলায় আহত অপর নেতা নুরুল হককে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে ১ জুলাই রাতে বের করে দেয়া হয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তার কোনো হদিস মেলেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী ব্যানার নিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন। সেখানে আন্দোলনকারীদের ওপর দফায় দফায় হামলা করা হয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের জড়ো হতে দেয়নি ছাত্রলীগ। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মানববন্ধনে বাধা দেয় ছাত্রলীগ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের বাধার মুখে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করা হয়। টানা চার দিন ধরে আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের নিপীড়ন-নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে। ২ জুলাই আন্দোলনকারীরা শহীদ মিনারে জড়ো হতে গেলে ছাত্রলীগের কর্মীরা তাদের মারধর করে। ওইদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ আবার আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করে। আন্দোলনের নেতারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ৩, ৪ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দিনভর মোটরসাইকেল মহড়া দেয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ছাত্রলীগ তাদের অবিভাবকদের মতো ‘কৌশলী’ উত্তর দিচ্ছে, ‘এটা কোটা আন্দোলনের দুই পক্ষের মধ্যে ঝামেলা, কোটা সংস্কার আন্দোলনের পেছনে দুরভিসন্ধি আছে। তারা বিএনপি-জামায়াতের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে আন্দোলন করে সরকারকে উত্তেজিত করতে চায়।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এত কিছুর পরও সাংবাদিকদের বলেন, ‘তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত নন।’ কারণ, কেউ তাকে লিখিত বা মুঠোফোনে কিছু জানায়নি। ৩ জুলাই বিকেল ৪টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে উদ্বিগ্ন অভিভাবক ও নাগরিক সমাবেশ পুলিশের হস্তক্ষেপে অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। শত শত পুলিশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে প্রেস ক্লাব পর্যন্ত কর্ডন করে রাখে।

সারা দেশে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ন্যায্য দাবির সমর্থনে আন্দোলনকারীদের ওপর গুণ্ডামি ও পুলিশি হামলার প্রতিবাদ করেছে সব রাজনৈতিক পক্ষ। কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন মেনে নেয়া সরকারের তামাশা ছিল বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। গণফোরাম নেতা ড. কামাল হোসেন ও মোস্তফা মহসীন মন্টু সব ধরনের নির্যাতন বন্ধ ও গ্রেফতার করা সব ছাত্রছাত্রীর মুক্তির দাবি জানান। যুক্তফ্রন্টের সভাপতি ও বিকল্প ধারার প্রেসিডেন্ট এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি আ স ম আবদুর রব এবং নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ছাত্রদের প্রতি নিষ্ঠুরতার নিন্দা করেন। অপর দিকে স্বাধীনতাবিরোধীদের চাকরিচ্যুত করার দাবি করেছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খান। দৃশ্যত আন্দোলনকারীদের বিপরীতে এসব উসকানিমূলক মন্তব্য করা হয়। ইতোমধ্যে কোটা পদ্ধতি পর্যালোচনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করেছে সরকার। এই কমিটিকে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হলেও মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেছেন ভিন্ন কথা। তিনি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো সাংবাদিকদের অবহিত করতে গিয়ে একপর্যায়ে বলেন, ‘আসলে বিষয়টা আপনারা যতটা সহজভাবে বিশ্লেষণ করছেন, এত সহজ নয়। জটিল আছে। এটা অনেক বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত আসবে। তার আলোকে আমরা সিদ্ধান্ত নেব।’

সরকারিভাবে ঘোষিত কার্যক্রম এবং রাজপথের নিগ্রহ প্রমাণ করে, দুয়ের মধ্যে এক সাগর ব্যবধান রয়েছে। বিশেষ করে সরকারের ইচ্ছায় ও পুলিশের সহায়তায় সোনার ছেলেদের দিয়ে যে নির্মমতার চিত্র প্রকাশিত হয়েছে, তা যেকোনো নাগরিক মনকে বিচলিত না করে পারে না। লক্ষণীয় যে, উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের কথা বলার অধিকারটুকুও তারা কেড়ে নিয়েছে। এটি সামগ্রিকভাবে সরকারের কর্তৃত্ববাদী চরিত্রের প্রতিফলন। এই বল প্রয়োগের ফলাফল ভয়াবহ হতে পারে। ‘বাধা দিলে বাধবে লড়াই’- এই প্রবাদবাক্য সবারই জানা। বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, বাধাটি সরকারের আইন ও শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক না হয়ে রীতিমতো পেটোয়া বাহিনী দিয়ে করা হয়েছে। এটা দৃশ্যত পেশীশক্তি প্রয়োগের শামিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অতীতে এনএসএফ তথা খোকা পাঁচপাত্তুরদের এ ধরনের দেখেছে। আজ এদের কাছে সে ইতিহাস ম্লান হয়ে গেছে। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদ করেছিল। গুণ্ডামি তা যে সময়ে, যে কালেই অনুষ্ঠিত হোক না কেন তা গুণ্ডামিই। এর বিরুদ্ধে বিশেষত সাধারণ ছাত্রদের জানমালের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব কোনো বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকই এড়িয়ে যেতে পারেন না। বার্ট্রান্ড রাসেল ক্ষোভের সাথে একবার বলেছিলেন, ‘Politics is the last resort of scoundrels.’ দুর্ভাগ্যের বিষয় সরকারি দল তাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে ওই প্রবাদের প্রতিনিধিত্ব করল। মনীষী প্লেটোর ভাষায়- ‘অধম প্রবৃত্তির দল এবার তাদের হাতে বন্দী আত্মাকে তার সব মহৎ গুণ থেকে শোধন করতে শুরু করে। এবার তারা দম্ভ, অনাচার, অমিতব্যয় ও নির্লজ্জতাকে মশাল শোভাযাত্রা সহকারে পুষ্পমাল্যে ভূষিত করে এবং প্রশংসার মধুর বাণী উচ্চারণ করে বরণ করে এনে আত্মশূন্য ঘরে তাদের প্রতিষ্ঠা করে। এবার তারা ঔদ্ধত্যকে অভিহিত করে আভিজাত্য বলে, অরাজকতাকে বলে স্বাধীনতা এবং অপব্যয়কে মহানুভবতা আর মূর্খতাকে বলে বিক্রম।’ (রিপাবলিক ৮ : ৫৬০)।
লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Mal55ju@yahoo.com


আরো সংবাদ