২৩ মার্চ ২০১৯

বিপন্ন হালদা নদী এবং ডাক্তার ও মেহমানের গল্প

বিপন্ন হালদা নদী এবং ডাক্তার ও মেহমানের গল্প - ছবি : সংগ্রহ

উত্তর চট্টগ্রামে বন্যা-দুর্যোগ
গাজীপুর নির্বাচন নিয়ে এই কলামের একদম শেষে একটি অনুচ্ছেদ আছে। শনিবার ১৬ জুন ছিল পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন। এর তিন দিন আগে থেকেই বাংলাদেশের দক্ষিণে, বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছিল। এ কারণে সৃষ্টি হয়েছিল দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া; কোনো দিন ৪ নম্বর বিপদ সঙ্কেত, কোনো দিন ৩ নম্বর সঙ্কেত দেখানো হয়েছিল। লঘুচাপের কারণে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে। চাঁদের হিসাবে রোজার মাসের শেষ রাত ছিল অমাবস্যার। সাধারণত অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় জোয়ারের পানি অস্বাভাবিকভাবে বাড়ে। এবার ঈদুল ফিতরের সময় বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট বন্যার সঙ্গে যোগ হয়েছিল অমাবস্যা। বৃষ্টিপাত একনাগাড়ে হলে সেই বৃষ্টির পানি সরে আসতে সময় লাগে, ফলে বন্যা সংঘটিত হয়। উত্তর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, রাউজান উপজেলা এবং চট্টগ্রাম মহানগর বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। উত্তর চট্টগ্রামের অন্যতম বিখ্যাত নদী হালদা। যখন এই কলাম লিখছি, এই সন্ধ্যায়ও বিভিন্ন টেলিভিশনের স্ক্রলে দেখাচ্ছে একটি সংবাদ : ‘ভয়াবহ দূষণে আক্রান্ত হালদা নদী, মাছ ও জলজ প্রাণী মরে ভেসে উঠছে।’ অর্থাৎ হালদা নদীতে মাছের মহামারী লেগেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত হালদা রিভার রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রখ্যাত গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা শিক্ষক প্রফেসর মঞ্জুরুল কিবরিয়া এ বিষয়ে প্রচুর লেখালেখি করছেন দায়িত্বশীলদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। আমার ফেসবুকেও এ প্রসঙ্গে লিখেছি। উত্তর চট্টগ্রামে কর্তব্যরত জাতীয় ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পত্রিকার সাংবাদিক ভাইয়েরা, যেমন কেশব কুমার বড়–য়া, মনসুর আলী, খোরশেদ আলম শিমুল, আবু তালেব, মোহাম্মদ হোসেন, আসলাম পারভেজ, জাহাঙ্গীর আলম, মোহাম্মদ আলী, জিয়া চৌধুরী, আবুল বাশার, জাবেদ মঞ্জু, বাবলু দাস, বোরহান উদ্দিন প্রমুখ এ প্রসঙ্গে লিখেই চলেছেন।

হালদা নদী স্বর্ণগর্ভা কেন?
হালদা নদীর তীরবর্তী মানুষের কাছে এ নদী স্বর্ণগর্ভা হালদা। কিন্তু কেন? হালদা নদীর উৎপত্তিস্থল হলো খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার দক্ষিণ-পূর্ব অংশে বদনাতলী পাহাড়মালা। সরু পানিপ্রবাহ যেগুলোকে পার্বত্য অঞ্চলে ছড়া বা ছড়ি বলা হয়, এ রকম একটি পানিপ্রবাহ হিসেবে এটি বর্তমান খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলার উত্তর-পূর্ব কোণ দিয়ে চট্টগ্রাম জেলায় প্রবেশ করেছে। এরপর হালদার উভয় তীরেই ফটিকছড়ি উপজেলা এলাকা। কিছু দূর আসার পর হালদার পশ্চিম পাশে শুরু হয় হাটহাজারী উপজেলা এবং পূর্ব পাশে শুরু হয় রাউজান উপজেলা। হালদা নদীর দৈর্ঘ্য কম-বেশি ৮০ কিলোমিটার। কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত কালুরঘাট এলাকায় এসে হালদা নদী কর্ণফুলীর সঙ্গে মিশে যায়। আমার জন্মস্থান বা পৈতৃক বাড়ি হালদা নদীর তীরে হাটহাজারী উপজেলার সর্বদক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে, সর্বশেষ ইউনিয়নের সর্বশেষ গ্রাম উত্তর বুড়িশ্চরে। আমি ‘হালদাপাড়ের ইবরাহিম’। হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলার নদীতীরবর্তী মানুষের প্রাণ হালদা নদী ও এর পানি। কালুরঘাট থেকে হালদা নদীর উজানের দিকে ছয়-সাত কিলোমিটার যাওয়ার পর শুরু হয় নদীর ওই অংশ, যার কারণে এটাকে স্বর্ণগর্ভা বলা হয়। ওই স্বর্ণগর্ভা অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় পাঁচ-ছয় কিলোমিটার। বাংলাদেশের আবহাওয়ার হিসাব মোতাবেক, গ্রীষ্মকালের প্রারম্ভেই কোনো একটি মেঘাচ্ছন্ন বৃষ্টিবাদলের দিনে বা রাতে, মেঘের তর্জন-গর্জনের সময় এখানে মিঠাপানির মাছ ডিম ছাড়ে। এ ডিমগুলোকে স্থানীয় মৎস্যচাষী বা জেলেরা সংগ্রহ করেন। এ ডিমগুলো এতই ক্ষুদ্র যে, খালি চোখে দেখা খুবই কষ্টকর। দুই থেকে তিন দিন বয়সের হলে ডিমগুলো থেকে পোনা বের হয়। সেই পোনাও অতি ক্ষুদ্রাকৃতির এবং কোনোমতেই হাতে ধরা যায় না। এই পোনা মৎস্যচাষীরা ওপরে আনেন, রক্ষণাবেক্ষণ করেন, একটু বড় করেন এবং বাংলাদেশের মৎস্যচাষীদের কাছে বিক্রি করে থাকেন। যদি ১২ মাসের একটি চক্র কল্পনা করি, এই পোনার বেচাবিক্রি, পোনা থেকে বড় হওয়া মাছের বেচাবিক্রি; সব কিছু মিলে চার থেকে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার ব্যবসায় হয়। ডিম থেকে পোনায় রূপান্তরিত হওয়ার সময় স্বচ্ছ পানিতে ওই পোনাগুলোকে সোনালি রঙের দেখায়। এই ব্যবসায় মৎস্যজীবীদের যে লাভ হয়, সেটি স্বর্ণ কেনাবেচার থেকেও বেশি; এটি আরেকটি কারণ। এ দুই কারণে হালদাকে বলা হয় ‘স্বর্ণগর্ভা’।

স্বর্ণগর্ভা নদী এখন বিপন্ন
সেই স্বর্ণগভা হালদা ভীষণ বিপন্ন। ঈদুল ফিতরের আগে-পরে যে বন্যা হয়েছে, এতে গ্রামের পর গ্রাম খাল-বিল, পুকুর-দীঘি, রাস্তাঘাট, উঠান-বাড়ি, হাটবাজার, স্কুল ইত্যাদি পানিতে তলিয়ে যায়। যেখানে মাছের চাষ হতো, সেগুলো বেরিয়ে গেছে। খাল-বিলে, ঘরবাড়ির আশপাশে যেখানে যত দূষিত পানি বা ময়লা জমেছিল, সেগুলোও বন্যার পানির সঙ্গে মিশে হালদায় গিয়ে পড়তে থাকে। হালদার উভয় তীরে অবস্থিত বেশ কিছু পেপার মিল বা ট্যানারি বা অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য অল্প অল্প করে সব সময়ই সারা বছর ধরে হালদা নদীতে এসে পড়ছে। সরকারি বা প্রশাসনিক দুর্বলতার জন্য এই দূষণপ্রক্রিয়া বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। এবার বিপুল পরিমাণে সর্বপ্রকার বিষাক্ত বর্জ্য হালদার পানিতে মিশে যায়। বন্যার পানি নামতে সাত-আট দিন লেগে গেছে। ফলে হালদার পানি বিষাক্ত ও ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। সংখ্যায় হাজার হাজার এবং ওজনে অনেক মণ মাছ বিষক্রিয়ায় মারা যাচ্ছে, ভেসে উঠছে। কিছু মানুষ সে মাছ সংগ্রহ করে বিক্রি করছে। ওই মাছ খেয়ে মানুষ অসুস্থ হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, সবচেয়ে বিপদের কথা হলোÑ স্বর্ণগর্ভা হালদা বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। যেকোনোভাবে হালদাকে বাঁচাতে হবে। হালদার অসুস্থতা স্থানীয় নয়, জাতীয় বিপদ, দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। হালদাপাড়ের একজন সচেতন নাগরিক হয়ে আমি দেশবাসী এবং সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি এ ব্যাপারে। হালদাপাড়ের মানুষের হাহাকার সাময়িক নয়, এই হাহাকারের মেয়াদ দীর্ঘস্থায়ী হবে; যদি নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা না হয়। এশিয়া মহাদেশের অন্যতম বৃহৎ এবং বাংলাদেশের মিঠাপানির মাছের একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হয়ে গেলে বাংলাদেশ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।

জীবন থেমে থাকে না
দুর্যোগের মধ্যেই এবার ঈদ পার হয়েছে। তবে বহু জায়গায় নামাজ পড়া সম্ভব হয়নি। কারণ মসজিদ ও ঈদগাহগুলো ছিল পানির নিচে। পানি কিঞ্চিৎ নামার পর মানুষ বাড়িঘর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেছে। একটু দেখাসাক্ষাৎ হয়েছে। ঈদের দিনসহ পরবর্তী দিনগুলোতে দানশীল ব্যক্তিরা ত্রাণ দিয়েছেন দুর্গত মানুষকে; সরকার ত্রাণ দিয়েছে কিন্তু নগণ্য। এসবের ফাঁকে ফাঁকেই মানুষজনের সাথে আলাপ। বাঙালি রাজনীতিপ্রবণ। আমি একজন রাজনৈতিক কর্মী। অতএব, রাজনীতির কথা উঠবেই। একজন আলাপকারী টাকা-পয়সার সাথে রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে মন্তব্য করছিলেন। তখন দুর্নীতি ও লুটপাটের কথাও উঠে এসেছিল। বিশদ বক্তব্য না দিয়ে তিনি বললেন, ইবরাহিম ভাই, দু’টি গল্প শুনুন। ছোটকালে স্কুলে ঈশপের গল্প পড়ে যেমন উপসংহার লিখতেন, এবার আমার দু’টি গল্প শুনেও আপনি নিজের মতো করে উপসংহার লিখবেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, যথাÑ বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির শ্রমবিষয়ক সম্পাদক এবং জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি আলহাজ নাজিমুদ্দিনের কাছ থেকে শোনা, একদিন দুপুরে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি, ব্যারিস্টার আন্দালিব পার্থ) অন্যতম সহসভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ জুলকারনাইনের বাসায়। গল্প শোনার পর প্রবীণ রাজনীতিবিদ নাজিমুদ্দিনকে বললাম, আপনার এ দু’টি গল্প আমার কাছে এত ভালো লেগেছে যে, এটা বৃহত্তর পরিসরে তথা পত্রিকার পাঠক এবং ফেসবুকের পাঠকদের সাথে শেয়ার করতেই হবে। সম্মানিত পাঠকদের ওপরই এ দু’টি গল্পের নীতিবাক্য বা শিক্ষণীয় বিষয়টি উদ্ধার করার ভার ছেড়ে দিতে চাই।

প্রথম গল্প : আগে সাঁতার শিখো, পরে ডাক্তার হও
ঝড়বৃষ্টির রাত। আলোবিহীন পল্লী অঞ্চল। কোনো এক বাড়িতে একজন সঙ্কটাপন্ন রোগী। রোগীর আত্মীয়স্বজন ডাক্তার খুঁজে বাড়িতে আনলেন। ডাক্তারের বাড়ি এবং রোগীর গ্রামের মাঝখানে একটা নদী। ঝড়বাদলের কারণে নদীতে স্রোত ও ঢেউ বেশি। ডাক্তার যখন রোগীর বাড়িতে আসেন, তখন নৌকায় করে নদী পার হয়েছেন। রোগীর আত্মীয়স্বজন যখন ডাক্তারকে নিয়ে রোগীর বাড়িতে প্রবেশ করল তখন আর অবস্থা আরো বেশি সঙ্কটাপন্ন; প্রাণ যায় যায় অবস্থা। এরই মধ্যে ডাক্তার রোগীকে একটু পরীক্ষা করলেন, এখানে-ওখানে হাত দিয়ে ধরে দেখলেন, হালকা চাপ দিয়ে দেখলেন। এ অবস্থাতেই ডাক্তারের উপস্থিতিতে রোগী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। ডাক্তার আফসোস করে বললেন, আরেকটু আগে আসতে পারলে হয়তো বা বাঁচানো যেত। কিন্তু গভীরভাবে শোকাহত, সদ্যমৃত রোগীর অতি ঘনিষ্ঠ কয়েকজন অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে উঠলেন। তারা বলা শুরু করলেনÑ রোগী আরো কিছুক্ষণ বাঁচত, কিন্তু ডাক্তারের টিপাটিপিতে তাড়াতাড়ি মারা গেছে। এহেন উদ্ভট অভিযোগ ক্রমান্বয়ে আরো অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করল এবং সবাই বলাবলি শুরু করেÑ ঠিকই তো, ডাক্তার ছাড়া গত তিন দিন বেঁচে ছিল; কিন্তু ডাক্তার আসামাত্রই মরে গেল। ডাক্তার কুফা, অলক্ষ্মী। এই ডাক্তার যেখানে যাবে, সেখানেই রোগী মরে যাবে। অতএব, ওকে বন্দী করো এবং কাল সকালেই তাকে আমরা মেরে ফেলব। ডাক্তার অনেক অনুনয়-বিনয় করলেন এবং বোঝাতে চাইলেন, মৃত্যুটা এরূপ সঙ্কটাপন্ন রোগীর স্বাভাবিক পরিণতি। তিনি চিকিৎসা করার সুযোগই পাননি। তীব্র বৈরী পরিবেশে ডাক্তার সাহেবের বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা এবং জীবন ভিক্ষা কেউই কানে তুলল না, কেউই গ্রহণ করল না। বরং তাকে বেঁধে রাখা হলো রাতটা পার করার জন্য, সকালেই মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে। অতঃপর সবাই এদিক-ওদিক গেল, কেউ সুর করে কান্নাকাটি শুরু করল, কেউ মৃতের গোসলের জন্য চেষ্টা শুরু করল, কেউ দূরবর্তী অঞ্চলের আত্মীয়দের খবর দেয়ার কাজে ব্যস্ত হলো। সবার মনোযোগ অন্য দিকে বুঝতে পেরে ডাক্তার বন্দিদশা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য চেষ্টা শুরু করলেন। একপর্যায়ে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে বন্দী অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে অন্ধকার রাতে নদীর দিকে দৌড় দিলেন। নদী পার হতে পারলেই নিজের গ্রাম। ডাক্তার পালিয়েছে, ওই বাড়ির মানুষ এটা বুঝে গেল কিছুক্ষণ পর। তখন হইহই রইরই করে ডাক্তারের পিছে পিছে ছুটল তাকে ধরার জন্য। ততক্ষণে তিনি নদীর পাড়ে। ঝড়বাদলের রাত, কোনো নৌকা নেই। যদি অপেক্ষা করেন নৌকার জন্য তাহলে যারা ধাওয়া করে আসছে তারা পুনরায় বন্দী করবে। অন্য দিকে নদী যদি সাঁতরে পার হতে হয়, তাহলে সম্ভাবনা থাকে ডুবে যাওয়ার। ডাক্তার আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠলেন। কারণ তিনি ভালো সাঁতারু ছিলেন। আল্লাহর নাম নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিলেন সাঁতরে ওই পারে যাওয়ার জন্য। সোজাসুজি অপর পারে না পৌঁছলেও বেশ কিছু ভাটিতে গিয়ে তিনি অপর পারের মাটি পেলেন। ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত হয়ে নিজ বাড়িতে পৌঁছলেন। তখনো ভোর হতে বাকি। দেখলেন, নিজের ছেলে এখনো পড়ছে। বলে রাখা ভালো, ছেলেও ডাক্তারি পড়ছিলেন; মেডিক্যাল কলেজের শেষ বর্ষের ছাত্র। বাবা জিজ্ঞেস করলেন, এত গভীর রাতে কেন পড়ছো? ছেলে উত্তর দিলো, বাবা পরীক্ষা অতি সন্নিকটে। বাবা বললেন, প্রস্তুতি নিচ্ছ, ঠিক আছে, কিন্তু বলো তো : তুমি কি সাঁতার পারো? ছেলে উত্তর দিলো, না। ডাক্তার সাহেব বললেন, আগে সাঁতার শিখো, তারপর ডাক্তার হও।

দ্বিতীয় গল্প : রুটি ও ডালের বিরল মহামিলন
জনবসতি খুবই হালকা, এমন একটি অঞ্চল। মনে করুন, পাঁচ বা সাত শ’ বছর আগে ইরাকের কুফা শহর থেকে বাগদাদের দিকে একজন ব্যক্তি যাচ্ছেন। তৎকালীন বাগদাদ জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রসিদ্ধ কেন্দ্র ছিল। মুসাফির সারা দিন পথচলার পর সন্ধ্যায় আশ্রয় খুঁজছেন। একটি বাড়ি দেখতে পেলেন। অতঃপর সে দিকে এগিয়ে গেলেন। বাড়ির কর্তা মুসাফিরকে দেখে সাদরে গ্রহণ করলেন। কারণ মুসাফিরের খেদমত করার রেওয়াজ ওই অঞ্চলে অতি প্রসিদ্ধ ছিল। রাতে খাওয়ার সময় হলো। মুসাফির ঘরের বারান্দায় বসে আছেন, যেন বাইরের বাতাস উপভোগ করা যায়। তাকে রাতে খাওয়ার জন্য আয়োজন করা হলো। বাড়ির কর্তা প্রথমে একটি রুটি এনে মুসাফিরের সামনে দিলেন। বললেনÑ ডাল নিয়ে আসছি। কিছুক্ষণ পর ওই বাড়ির কর্তা ছোট বাটিতে করে ডাল নিয়ে এসে মুসাফিরের সামনে রাখলেন, কিন্তু দেখলেন রুটি শেষ। এখানে যে একটি রুটি ছিল, তার কোনো চিহ্নই দেখা যাচ্ছে না। বাড়ির কর্তা মুসাফিরকে বললেন, আমি রুটি নিয়ে আসছি। কিছুক্ষণ পর আরেকটি রুটি নিয়ে এলেন এবং মেহমানের সামনে রাখলেন। কিন্তু দেখলেন, রেখে যাওয়া ডালের বাটি পরিষ্কার, মানে ডাল শেষ। বাড়ির কর্তা মেহমানকে আশ্বস্ত করলেন এই বলে যে, আবার ডাল নিয়ে আসছি। কিছুক্ষণ পর বাড়ির কর্তা আবার ডাল নিয়ে এলেন ছোট একটি বাটিতে, কিন্তু এসে আগের দৃশ্যই দেখতে পেলেন। অর্থাৎ রুটি শেষ। এভাবে রুটি ও ডালের মধ্যে লুকোচুরি খেলা চলতে লাগল। অর্থাৎ বাড়ির কর্তা ডাল আনলে দেখেন রুটি শেষ এবং রুটি আনলে দেখেন ডাল শেষ। এ রকম করতে করতে সপ্তমবারে তিনি ডাল এনে দেখলেন, এখনো রুটিটি আছে। বাড়ির কর্তা খুশি হলেন এবং শান্তিও পেলেন, আর রুটি ও ডাল লাগবে না। মনে যা-ই থাকুক না কেন, মুসাফিরের কাছে দুঃখ প্রকাশ করলেন একসাথে ডাল আর রুটিকে সামনে পরিবেশন করতে না পারার জন্য। পরের দিন খুব ভোরে মুসাফির বিদায় নেবেন। মুসাফির বললেন, এত ভোরে আমি কিছু খাবো না, তাই আপনার কষ্ট করতে হবে না। রাত শেষ হলো, ভোরের লক্ষণ দেখা দিলো। মুসাফিরকে বিদায় দেয়ার জন্য গৃহকর্তা প্রস্তুত। তিনি মুসাফিরকে বিনয়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি বাগদাদ কেন যাচ্ছেন? মুসাফির উত্তর দিলেন, আমার বাড়ি যে শহরে সেখানে বড় ডাক্তার নেই, বাগদাদে বড় ডাক্তার আছে। আমার চিকিৎসার জন্য যাচ্ছি। বাড়ির কর্তা জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কী অসুস্থতা? মুসাফির উত্তর দিলেন, খাওয়া-দাওয়ায় রুচি কমে গেছে, বেশি কিছু খেতে পারছি না, এটাই আমার অসুস্থতা। গৃহকর্তা বললেন, আপনি একটু দাঁড়ান, ভেতর থেকে আসছি, তারপর যাবেন। গৃহকর্তা বাড়ির ভেতরে গেলেন এবং কয়েক মিনিট পর ফিরে এসে খালি হাতে হাসিমুখে মুসাফিরকে বিদায় দিলেন, কিন্তু মুসাফির কৌতূহলী। মুসাফির জিজ্ঞেস করলেন, আপনি ভেতরে গেলেন, তাড়াতাড়ি ফিরে এলেন, আমাকে আগে বিদায় দিলেন না, পরে বিদায় দিলেন; এর কারণটা কি বলবেন? কেন গেলেন? কেন দেরিতে বিদায় দিচ্ছেন? গৃহকর্তা উত্তর দিলেন : ‘আমি ভেতরে গিয়ে চুপচাপ আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে শুকরিয়া জানালাম যে, তিনি আমার বাড়িতে মেহমান দিয়েছিলেন। আবার এই প্রার্থনাও করলাম, ওই মেহমান যেন বাগদাদ থেকে ফেরত যাওয়ার সময় এই পথ দিয়ে না যান, অন্য রাস্তা দিয়ে যান, অন্যত্র রাত্রিকালীন আশ্রয় গ্রহণ করেন।’ ধন্যবাদ জানিয়ে মেহমান বিদায় নিলেন।

গাজীপুর নির্বাচন
এ মুহূর্তে যেসব সংবাদ আমার মনকে উদ্বিগ্ন রেখেছে তার মধ্যে অন্যতম হলো, মঙ্গলবার ২৬ জুন অনুষ্ঠিতব্য গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন। যখন কলামটি লিখছি, তখন আমার মন বারবার বলছে, কিছু বদ অভ্যাস হঠাৎ করে বদলায় না। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয়েছে একটি সরকারি বদ অভ্যাস, যথা- নির্বাচন খেয়ে ফেলা, জনগণ কর্তৃক ভোট প্রদানের অধিকারকে পদদলিত করে নির্বাচন অনুষ্ঠান করা; ভোট কেন্দ্র দখল করা, ব্যালট পেপার দখল করে আগেভাগে সিল মেরে বাক্সভর্তি করা, প্রতিপক্ষের পোলিং এজেন্টদের স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য করা ইত্যাদি কাজ এখন সরকারি পক্ষের জন্য যেন পান্তাভাত। নির্বাচন কমিশনকে এখন আর স্বতন্ত্র কোনো সাংবিধানিক সংগঠন বলে মনেই হয় না। সম্মানিত পাঠক এই কলাম পড়বেন বুধবার ২৭ জুন; ইতোমধ্যে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ফলাফল ঘোষিত হয়ে যাবে। এর বেশি মন্তব্য এ মুহূর্তে (এশার নামাজের আগে-পরের সময়, রোববার ২৪ জুন ২০১৮) আর করছি না।
লেখক : মেজর জেনারেল (অব:); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
www.generalibrahim.com


আরো সংবাদ

iptv al Epoksi boya epoksi zemin kaplama Daftar Situs Agen Judi Bola Net Online Terpercaya Resmi

Hacklink

instagram takipçi satın al ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme

instagram takipçi satın al