১৯ নভেম্বর ২০১৮

ইরাকে ১৫ বছরের হত্যাযজ্ঞ

ইরাকে ১৫ বছরের হত্যাযজ্ঞ - ছবি : সংগৃহীত

এ মাসেই ১৫ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করেছিল দু’টি উদ্দেশ্য নিয়ে। একজন ডিক্টেটরকে সরিয়ে দেয়া এবং জনগণের জন্য শান্তি প্রতিষ্ঠা করে গণতন্ত্র নির্মাণ করা। যখন এই হামলা শুরু হয় (১৯ মার্চ ২০০৩), প্রথম আঘাতে এত মানুষের মৃত্যু ঘটে যে, সবাইকে তা স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। মার্কিন জেনারেল টমি ফ্রাঙ্ককে সাংবাদিকেরা নিহতের সংখ্যা জিজ্ঞেস করলে, তিনি এর জবাব দিতে অস্বীকার করে বলেন, ‘আমরা মৃতদেহ গণনা করি না।’ সাধারণ মার্কিনিদের জানানো হয়, কয়েক শ’ বা হাজারখানেক মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। কিন্তু মৃত্যুর খবরগুলো একত্র করে অনেক রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে। এতে দেখা যায়, মৃত্যুর সংখ্যা ১৪ লাখ থেকে ৩৪ লাখ। সংখ্যাগুলো ইরাকে প্রতিদিন বাড়ছে; কেননা যুদ্ধ থামেনি এবং বোমাবর্ষণ স্থগিত হয়নি।

ব্রিটিশ ভোট নিবন্ধন অনুসন্ধানী সংস্থা ওপিনিয়ন রিসার্চ বিজনেস (ওআরবি) এবং জাস্ট ফরেন পলিসি পৃথকভাবে হিসাব করে বলেছে, এ মৃত্যুর সংখ্যা হবে ২৪ লাখ এবং ৩৪ লাখের মধ্যে।

ইরাকি মৃত্যুর সংখ্যা এত বৃহৎ, অথচ মার্কিন এবং তার সহযোগী আক্রমণকারীদের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য কেন? এর জবাব দিয়েছেন বিভিন্ন অনুসন্ধানকারী। তারা দেখিয়েছেন, যুদ্ধ বেশির ভাগই একতরফা। ইরাকের ছোট্ট প্রতিরোধ গোষ্ঠীর কোনো অস্ত্র নেই বললেই চলে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিমান থেকে বোমা বর্ষণ করে তাদের সমর্থিত বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সহায়তা করার জন্য। এতে সাধারণত মৃত্যুবরণ করে নিরপরাধ নাগরিক। আক্রমণকারীদের পক্ষ থেকে তখন এই নিরপরাধ মানুষকে ‘জঙ্গি’ ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়। এটা করতে গিয়ে প্রচারবিদেরা কয়েকটি ইংরেজি শব্দের ব্যাপক ব্যবহার করে।

তা হলো প্রিপেয়ার (প্রস্তুতি), পারসু (অনুসরণ করো বা ধরো), প্রিভেইল (কর্তৃত্ব করো), প্রোপাগান্ডা (প্রচার), প্রোভোক (উসকানি দেয়া) এবং প্রফিট (লাভ)। আজকের দুনিয়ার সব সঙ্ঘাত, সংঘর্ষসহ নানা কর্মকাণ্ডে এ ধরনের ব্যবহার দেখা যায় বলে মন্তব্য করেছেন সামরিক ও বৈদেশিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ লেখক ব্রায়ান ক্লগলে। তিনি দেখিয়েছেন, সাম্রাজ্যবাদ শুরু হওয়ার পর এবং আজকে দুই পরাশক্তি ও তাদের সহযোগীদের সব জনবিরোধী কর্মকাণ্ডে এসব পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে।

তবে যখন বেপরোয়া হয়ে পড়ছে তখন তারা প্রকাশ্যে যুদ্ধ শুরু করছে। ইরাক আক্রমণ ঠিক এমনি। ইরাকে ডব্লিউএমডি (উইপনস অব ম্যাস ডেস্ট্রাকশন বা মহাধ্বংসের অস্ত্র) আছে বলে আক্রমণ চালিয়ে যখন দেখল, এই ভুয়া প্রচারকে প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে না, তখন তারা প্রচার চালায়- এই অশান্ত দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আক্রমণ করছে এবং জন্ম হলো ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ (ওয়ার অন টেররিজম), যা আজ সারা বিশ্বকে জড়িয়ে ধরেছে।

ইরাক ‘বিশ্বের জন্য এক মহাবিপদ’ বলে মার্কিনি প্রচারণা তার অতিবশংবদ অনুসারীরাও বিশ্বাস করতে পারল না। এটা বহির্বিশ্বে জায়গা না পেলেও যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের মধ্যে খানিকটা স্থান করে নিতে পারে। এর কয়েকটি কারণের মধ্যে একটি প্রধান কারণ হলো ক্ষমতাবানদের বিশাল ভীতির প্রচারণা। এ প্রচারণার ছোট্ট ইতিহাস এখানে বলা প্রয়োজন।

প্রথমেই মনে রাখতে হবে, বিশ্বের ভয়ানক ঘটনার অনেক সূত্র অনুল্লেখিত থাকে। কখনো এগুলো এত ক্ষুদ্র যে, তা সাধারণ মানুষের বিশ্বাসযোগ্য হয় না। এই প্রচারণার মূলে ছিল এক সুন্দরী। দুই ক্ষমতাধরÑ ডোনাল্ড রামসফেল্ড ও কলিন পাওয়েল (যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বারবার যুদ্ধে জড়িয়েছে) তাদের এক প্রিয় সুন্দরী কর্মীকে ঠিক করে। নাম শার্লটি বিয়ারস। সে সবার দৃষ্টিতে আসে যখন তার দু’টি বিজ্ঞাপনী প্রচার সবাইকে হার মানিয়ে শীর্ষে উঠে যায়। এর একটি ‘হেড অ্যান্ড শোল্ডার’ আরেকটি আঙ্কল বেনের রাইস (চাল)। শীর্ষ প্রচার সংস্থা অগিলভি ও ম্যাথিউস এবং জে ওয়াল্টার ম্যাথিউস তাকে নিয়োগ দেয় এই প্রচারে। সে কংগ্রেসের কাছ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার (৫০ কোটি) নেয় ‘ব্র্যান্ড আমেরিকা’ প্রচার চালানোর জন্য। উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো বিয়ারস এই অর্থ দিয়ে মুসলিম দুনিয়ার তরুণদের মগজ ধোলাইয়ের জন্য প্রথম কার্যক্রম শুরু করে। তার থিওরি আজ সারা বিশ্বে অনুসৃত। তা হলো, তথ্য প্রচার একমুখী হতে হবে অপর সব মতকে ছাপিয়ে। খানিকটা, অবাধ বোমাবাজির (কারপেট বোম্বিং) মতো।

জেফরি সেন্ট ক্লেয়ার তার ‘কেমন করে তারা ইরাক যুদ্ধ গ্রহণযোগ্য করল’ প্রবন্ধে চমৎকারভাবে এর বিশ্লেষণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সব হত্যাকাণ্ড, যুদ্ধ এবং ভয়াবহ ঘটনাগুলোকে আজকের যুগে অতি সহজেই প্রচারের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য করে তোলা সম্ভব। তাই ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যে যে ভয়াবহ ধ্বংসকাণ্ড চলছে তা সাধারণ মানুষের কাছে ‘গা-সওয়া’ হয়ে গেছে।

যেমন তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট বুশ এক সংবাদ সম্মেলনে বললেন, “ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন হামলা সে দেশে ‘শান্তি ও গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার জন্য।” আজ ১৫ বছরের যুদ্ধের পর সে দেশের যে গর্ব করার মতো সরকারি কাঠামো এবং উন্নতির চিহ্ন তা মুছে গেছে। মৃত্যুবরণ করেছে প্রায় ৩১ লাখ লোক; মৃত্যুর মিছিল এখনো চলছে। বারবারা নিমরি আজিজ তার ‘ইরাক আউটসাইড হিস্ট্রি’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ‘সভ্যতার জন্মভূমিকে আজ বিরান করা হয়েছে। ‘বাগদাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান-আলোচনা ছিল বিশ্বের আলোকবর্তিকা। উল্লেখযোগ্য হলো, লেখার জন্য অন্তরের সৃষ্টি হয়েছিল বাগদাদে, অন্যান্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা বাদই দিলাম। মার্কিন আগ্রাসনের পর ইরাকের এই প্রযুক্তির নেতারা বিশ্বে বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েন এবং তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানে নেতৃত্ব দেয়ার পথ তৈরি করে দেন। তাদের হাজার হাজার প্রযুক্তিবিদ পশ্চিমা বিশ্বে সাধারণ কর্মী হিসেবে কাজ করছেন এবং তাদের প্রযুক্তিকে পশ্চিমারা নিজের প্রযুক্তি বলে চালিয়ে যাচ্ছে।’

ইরাক সভ্যতার উৎসভূমি কেমন ছিল, এখানে ক’টি লাইনে তার বর্ণনা দেয়া যায়।
যেমন মেসোপটেমিয়ার নাম কে না জানে। ইরাকের পুরনো নাম। টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদীতীরের এই দেশটিতে খ্রিষ্টপূর্ব ৯০০০ সালে আজকের কৃষির উদ্ভাবন ঘটেছিল।

এখানে সুমেরীয় গোষ্ঠী আবিষ্কার করে ‘চাকা’, যা বিশ্বের চেহারাই চিরদিনের জন্য পাল্টে দিলো। তারা হিসাব-নিকাশের পদ্ধতি আবিষ্কার করে এবং আদান-প্রদানের জন্য প্রথমে কাঁসা, পরে পিতল ইত্যাদি। তারা অক্ষর ও সংখ্যা উদ্ভাবন করল যেন কেনাবেচার পদ্ধতিকে সচল রাখা যায়।

তারা সাহিত্য ও গল্প সৃষ্টি করল, যা বাইবেলেও বলা হয়েছে। নূহ আ:-এর নৌকার কাহিনী সবার জানা। বাবেলের টাওয়ারের কাহিনী সবার জানা। এই বিশাল টাওয়ার তৈরি করা হয়েছিল ‘স্বর্গে যাওয়ার জন্য’।
সুমেরিয়ানরাই প্রথমে বিশ্বে সাম্রাজ্য সৃষ্টি করেছে। রাজা হামমুরাবি তার ‘চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাঁত নীতি দিয়ে এ সাম্রাজ্য সৃষ্টি করেন ইরাকেই। আজকের বিশ্ব এখনো এই নীতি অনুসরণ করছে। ইরাকের রাজা নেবুচাদনেজার তৈরি করেন ব্যাবিলনের সেই ‘ঝুলন্ত বাগান’, যা বিশ্বের সপ্তম বিস্ময়ের একটি। দেশটি বারবার আক্রমণের শিকার হলো। আলেক্সান্ডার এর অন্যতম আক্রমণকারী। মুসলিম বিজয়ের পর ইরাক এক নতুন পথে চলতে শুরু করে। তখন এটা শুধু জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্রই নয়, হয়ে যায় কৃষ্টি ও সংস্কৃতির কেন্দ্রভূমি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানি সাম্রাজ্যের পতন হলে এবং ইউরোপীয় ক্ষমতার বিকাশ ঘটলে বাগদাদের দুর্দশা শুরু হয়। আজো তার রেশ চলছে। সর্বশেষ আক্রমণকারী হলো যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা শক্তিগুলো।

সাদ্দামকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল মার্কিনিদের নেতৃত্বে পশ্চিমা শক্তিগুলো; কিন্তু যখনই সাদ্দাম একটু স্বাধীনভাবে চলতে চাইলেন এবং ইরাকের উন্নতি করতে অগ্রসর হলেন, তারা রুষ্ট হলো এবং নির্মমভাবে তাকে সরিয়ে দিলো। তার আগে নানা অশান্তি-সঙ্ঘাত সৃষ্টি করে তাদের নিজেদের আড়াল করে রাখতে চাইলো।
সাদ্দামের শেষের বক্তব্যগুলো খানিকটা ভবিষ্যদ্বাণীর মতো শোনাবে। যখন তাকে ফাঁসিতে ঝোলাতে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন বিদ্রোহী সৈন্য এবং মার্কিনিদের একজন চিৎকার দিয়ে বলল, ‘এখন যাও জাহান্নামে।’ শান্ত গলায় সাদ্দাম জবাব দিলেন ‘সেটাও এখন ইরাক।’ তিনি তাদের বললেন, ‘শিগগিরই তোমরা বলতে থাকবে, সাদ্দাম যদি এখন থাকতেন।’

ওয়াশিংটন পোস্টে উইল বার্ডেন ওয়াপার লিখেছেন, ‘সাদ্দামের মৃত্যুর ১০ বছর পর এবং বুশের বক্তব্য যে সাদ্দামের পরে ইরাকে ফিরে আসবে, এমন শান্তি ও উন্নতি যে এই এলাকার সবার ওপর তার প্রভাব পড়বে, তা শুধু মিথ্যাই হয়নি বরং এই বছরগুলোতে শুধুই প্রতিটি গৃহ থেকে আগুনের ধোঁয়াই দেখা গেছে। এখন প্রতিটি বাড়ি মৃত্যুর আবাসস্থল।’ ইরাকে গণতন্ত্র ও শান্তি দূরের কথা, সামান্যতম স্বস্তি নেই বলে সবাই জানে।

বার্ডেন ওয়াপারের উপসংহারের সাথে সবাই একমত। ‘সাদ্দাম মৃত্যুর আগে যে মন্তব্য করেছিলেন (তোমরা এক সময় ইচ্ছা প্রকাশ করবে, আমি যদি ফিরে আসতাম), তা যেমন ভবিষ্যদ্বাণীর মতো হয়েছে; তেমনি বুশের দাবি ইরাকে মারণাস্ত্র (ডব্লিউএমডি) আছে এবং সাদ্দাম সন্ত্রাসীদের সাথে এক হয়ে যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করবে, তা সর্বৈব মিথ্যা প্রমাণ হয়েছে। আসলে ইরাক যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য ছিল এলাকাটিকে নিয়ন্ত্রণের জন্য অশান্ত পরিবেশে রাখা। এর পরিণামে আজ এটা মানবতার চরম অবমাননা এবং ধ্বংসের প্রতীক হিসেবে বিরাজ করছে। এটা মার্কিনিদের ক্ষমতা পরিবর্তন (রেজিম চেঞ্জ) নীতির আরেকটি ব্যর্থতা।’ এই নীতি কোনো শান্তি বা সুবিচার আনতে পারে না।

 


আরো সংবাদ