২৩ অক্টোবর ২০১৮

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে ভারতের ভূমিকা

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে ভারতের ভূমিকা - ছবি : সংগৃহীত

ভারত ও বাংলাদেশ দু’টি পৃথক জাতি-রাষ্ট্র। কিন্তু পত্রপত্রিকার খবর পড়ে মনে হচ্ছে যেন ভারত সরকার ইচ্ছা করলেই পারে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করতে। আর তার ইচ্ছার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশে কোন দল রাষ্ট্রক্ষমতায় আসবে অথবা টিকবে। এরকম ভাবনার পরিবেশ কী করে সৃষ্টি হতে পেরেছে জানি না। কিছু দিন আগে এরকম কথা কেউ ভাবতে পারত না। কিন্তু এখন জিয়াউর রহমানের তৈরি জাতীয়তাবাদী দলের একটা অংশ ছুটছে দিল্লিতে। যেটা বাংলাদেশের অনেকের কাছেই দলটি সম্পর্কে সৃষ্টি করছে নানা জিজ্ঞাসা।

গত ১০ জুন (২০১৮) নয়া দিগন্তে ‘নির্বাচনের আগে কূটনৈতিক তৎপরতায় বিএনপি’ নামে একটি খবর বেরিয়েছে; যা পড়ে খুবই ব্যথিত হলাম। কারণ, যেকোনো রাষ্ট্রের প্রথম পরিচয় হলো সার্বভৌমত্ব। কিন্তু বিএনপির আচরণ মনে হচ্ছে না একটি সার্বভৌম দেশের রাজনৈতিক দলের আচরণের মতো। মনে হচ্ছে, দলটি যেন উন্মাদ হয়ে উঠেছে ক্ষমতালাভের লক্ষ্যে। কিন্তু ভারতের সহায়তায় বাংলাদেশের কোনো দল রাজনৈতিক ক্ষমতায় এলে অথবা টিকলে, তাকে শুনে চলতে হবে ভারত সরকারের কথা। সে পারবে না কোনো স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে। সব গণতন্ত্রে ক্ষমতার উৎস হলো সে দেশের জনসাধারণ। তাদের বাদ দিয়ে কোনো দল প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী হতে পারে না। এ সত্য বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় সমভাবে প্রযোজ্য। বেগম খালেদা জিয়া এখন কারাবন্দী। তাকে কারাগারে রেখে বিএনপির পক্ষ থেকে ভারতের সাথে দহরম-মহরম অনেক বিএনপি সমর্থকের কাছে মনে হচ্ছে উৎকট এক সুবিধাবাদ।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ, যা সাধারণভাবে সারা ভারতে আরএসএস নামে পরিচিত। তা হলো আধা সামরিক কায়দায় গঠিত উগ্র হিন্দুত্ববাদী দল। এ দলটিকে ১৯২৫ সালে নাগপুরে গঠন করেন কেশব বলরাম হেজওয়ার (Keshav Baliram Hedgewar)। ১৯৩০ সালে দলটির নেতৃত্ব যায় এম এস গলওয়ালকার (M S Golwalkar)-এর হাতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দলটি হয়ে ওঠে এডলফ হিটলারের বিশেষ ভক্ত। দলটি মনে করে আর্যরা হলো বিশ্বের সেরা জাতি আর নানা সভ্যতার জনক। এ দলটি ভয়ঙ্করভাবে মুসলিমবিদ্বেষী। আর এরা মনে করে যে, এই উপমহাদেশ থেকে মুসলমানদের বিতাড়িত করা উচিত। নরেন্দ্র মোদি তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন একজন আরএসএসের সদস্য হিসেবে। বিএনপির কিছু নেতা কেবল বিজেপির কিছু নেতার সঙ্গে দেখা করে ক্ষান্ত হননি, করেছেন একাধিক আরএসএস নেতার সঙ্গে মতবিনিময়।

১৯৪৮ সালে ভারতে আরএসএস-কে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কেননা, নাথুরাম বিনায়ক গডসে নামে একজন উগ্র হিন্দুত্ববাদী যুবক ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি গুলি করে মহাত্মা গান্ধীতে হত্যা করেন। সন্দেহ করা হয় গডসে একজন আরএসএস সদস্য। তাই আরএসএস-কে করা হয় নিষিদ্ধ দল। কিন্তু পরে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন, গডসে আরএসএসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। তাই এ দলটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা আর থাকে না। কিন্তু কংগ্রেস দলের কোনো সদস্য আরএসএসের সদস্য হতে পারবে না, কংগ্রেস দলের এই নীতি বজায় থাকে। সম্প্রতি ভারতের ভূতপূর্ব রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় হেজওয়ারের বিশেষ প্রশংসা করে আরএসএসের সভায় বক্তৃতা করেছেন। মনে হয় তিনি কংগ্রেস ছেড়ে আরএসএসে যোগ দিতে চলেছেন কোনো এক বিশেষ কারণে। প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সাথে বিএনপির একটা অংশের নাকি রাজনৈতিক যোগাযোগ স্থাপিত হতে যাচ্ছে। বিএনপি যেভাবে ভারতকে খুশি করে ভাবছে বাংলাদেশে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার কথা, তার সাথে ইসলামপন্থী দলগুলোর মতৈক্য আদর্শগত কারণেই হতে পারে না। তাই মনে হচ্ছে ২০ দলের যে ঐক্যজোট ছিল, তা আর টিকবে না। উদ্ভব হবে নতুন জোটের।

১৯৪৬ সালে নোয়াখালীতে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা হয়েছিল। এই দাঙ্গা থামানোর জন্য মহাত্মা গান্ধী ১৯৪৬ সালের নভেম্বর মাসে অথবা তার কিছু পরে আসেন নোয়াখালীতে। তিনি অবাধে নোয়াখালীতে চলাফেরা করার সুযোগ পেয়েছিলেন। তার চেষ্টায় থেমেছিল দাঙ্গা। মুসলমানেরা ভাবেননি তাকে মেরে ফেলার কথা। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনামলের বাংলা প্রদেশ ভাগ হওয়ার সময় তেমন কোনো হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা হয়নি। অথচ ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে পাঞ্জাব প্রদেশ ভাগ হওয়ার সময় ঘটেছিল ভয়াবহ দাঙ্গা। যাতে একপক্ষে ছিলেন পাঞ্জাবি মুসলমান আর অপর পক্ষে পাঞ্জাবি হিন্দু ও শিখ। এই দাঙ্গায় মারা গিয়েছিল কমপক্ষে পাঁচ লাখ মানুষ। কিন্তু বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে এরকম দাঙ্গা হয়নি। পূর্ব বাংলা থেকে দলে দলে উচ্চবর্ণের বাঙালি হিন্দু চলে যান ভারতে। তারা ভেবেছিলেন, এভাবে তারা পূর্ববঙ্গ ছেড়ে গেলে পূর্ববঙ্গ টিকবে না। কিন্তু তাদের সেই ধারণা সত্যে পরিণত হয়নি। যা ছিল পূর্ববঙ্গ, পরে পূর্ব পাকিস্তান, তা হয়েছে বর্তমান বাংলাদেশ। আর এই দেশের মানুষ চাচ্ছে পৃথক ও স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকতে।

শ্রীমতি গান্ধী ১৯৭১ সালে অনুমান করতে পেরেছিলেন না যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন বঙ্গোপসাগরে পাঠাবেন সপ্তম নৌবহর। সপ্তম নৌবহর আসার ফলে পাক-ভারত যুদ্ধের চেহারা বদলে যায়। ভারত যেভাবে বাংলাদেশের ওপর আধিপাত্য স্থাপনের কথা ভেবেছিল, তা সম্ভব হয় না। বাংলাদেশ থেকে ভারতকে তার সৈন্য সরিয়ে নিতে রাজি হতে হয়। মেনে নিতে হয় রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব। বর্তমান পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসতে পারেন ২৪ হাজার বাংলাভাষী মুসলমান সৈন্য। পাকিস্তান থেকে ফিরে আসা সৈন্যদের মধ্যে অফিসারের সংখ্যা ছিল ১১ হাজার। পাকিস্তান থেকে ফিরে আসা সাধারণ সৈন্য ও অফিসাররা দেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক চালচিত্রকে সম্পূর্ণভাবে বদলে। যেটার কথা ভাবা সম্ভব ছিল না ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের। ভারতের সব থিঙ্কট্যাংঙ্ক ব্যর্থ হয় এ ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশ হওয়ার পর ভারতে অনেক কিছু ঘটেছে। শিখরা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনুরূপ স্বাধীনতার দাবি করতে থাকেন ভারতে। শ্রীমতি গান্ধী বলপ্রয়োগের মাধ্যমে এই স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমন করতে সক্ষম হন। কিন্তু তিনি নিহত হন দিল্লিতে তার নিজস্ব সরকারি ভবনের আঙিনায়, শিখ দেহরক্ষীদের গুলিতে। যারা ছিলেন আসলে শিখ স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর তার পুত্র রাজীব গান্ধী ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু তারও স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। তিনি নিহত হন তামিল জাতীয়তাবাদীদের হাতে। ভারতের কংগ্রেস এখন আর ক্ষমতায় নেই। ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। কিন্তু তাই বলে ভারতের রাজনৈতিক জটিলতা কেটে গেছে, তা বলা যায় না। শিখদের স্বাধীনতা আন্দোলন আবার উদ্দীপিত হতেই পারে। যা হয়ে উঠবে বিজেপির জন্য এক জটিল সমস্যা। বিজেপির হিন্দুত্ব আর শিখদের নিরাকার একেশ্বরবাদী ধর্মীয় ধ্যানধারণা মিলতে পারে না। তা ছাড়া, শিখরা বিজেপির মতো বিশ্বাস করেন না আর্যরক্তের মাহাত্ম্যবাদে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ও ভারত কারো কাছেই পারমাণবিক অস্ত্র ছিল না; কিন্তু এখন আছে। ১৯৯৮ সালের ১১ মে ভারত তার পশ্চিম রাজস্থানের মরুভূমিতে ভূগর্ভে তিনটি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। ১৩ মে আবার ভারত একই স্থানে আরো দু’টি পরীক্ষা চালায়। ২৮ মে ১৯৯৮ পাকিস্তান বেলুচিস্তানের পশ্চিম-দক্ষিণে তার প্রথম পাঁচটি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। ৩০ মে পাকিস্তান দ্বিতীয় দফায় আবারো বিস্ফোরণ ঘটায়। গত ২০ বছরে পাকিস্তান ও ভারত পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে অনেক উন্নত হতে পেরেছে। পাকিস্তান এখন নিজেই এমন রকেট বানাতে সক্ষম যে, তার দ্বারা সে পারে ভারতের যেকোনো জায়গায় তার পারমাণবিক বোমা দিয়ে আঘাত করতে। তাই নরেন্দ্র মোদি সহজেই পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চাইবেন না। আর বাংলাদেশের ঘরোয়া রাজনীতিতে জড়ানোর ক্ষেত্রেও তিনি নিশ্চয়ই কিছুটা ভিন্নভাবে ভাববেন। আওয়ামী লীগ-বিএনপির কথায় মেতে উঠবেন না।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট


আরো সংবাদ