বেটা ভার্সন

‘যদি জনগণ নিয়ন্ত্রণে, তবে কোনো সমস্যা নেই’

‘যদি জনগণ নিয়ন্ত্রণে, তবে কোনো সমস্যা নেই’ -

সময়টা এখন কেমন? প্রশ্নটা প্রায়ই শোনা যায়। এর একটি কারণ, সময় হয়তোবা এমন জটিল অবস্থায় কখনোই ছিল না। মাত্র একটি বর্ণনা দিয়ে এর সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা সম্ভব নয় বলে।
বিশ্বের দিকে দৃকপাত করলে দেখা যাবে- সঙ্ঘাত, সংঘর্ষ ও হত্যা-গুম-খুন যেন সাধারণ ব্যাপার। প্রতিদিনের সংবাদপত্রেও এগুলো আর প্রধান শিরোনামে আসছে না। ইসরাইলের সর্বশেষ ঘৃণ্য কর্মটিও তেমন ঢেউ তুলল না। ভাবখানা এমন- শক্তিমান এবং তাদের অনুসারীদের এসব অন্যায় কর্মকাণ্ডের অধিকার আছে। প্রখ্যাত দার্শনিক ভাষাবিদ নোয়াম চমস্কি এ অবস্থা এভাবে একবাক্যে প্রকাশ করেছেন। তিনি আরো বলেছেন, মার্কিন সরকার এবং সমাজব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কিন্তু কথাটি সার্বজনীন সত্য। চমস্কি বলেছেন, ‘তাদের (মার্কিন সরকার এবং মার্কিন সমাজকে) পরিচালনা করে একটি নীতি। তা হলো, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত জনগণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে, সবকিছুই সুন্দর এবং ঠিক। আর শক্তিমানেরা তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য সব উপায় অবলম্বনের অধিকারী। এমন অবস্থায় জনগণের ইচ্ছার কোনো দাম নেই।’

চমস্কি আরো বলেছেন, ‘আজকের রাজনৈতিক চিত্রে একই অবস্থার প্রতিফলন ঘটছে। শক্তিশালী দেশগুলোর আচরণ থেকে বোঝা যায়, তারা যা ইচ্ছা তাই করার অধিকার রাখে। শক্তিমান দেশের নেতারা অন্যায় অথবা ভিত্তিহীন বক্তব্য দিলেও তাদের বিরোধিতা বা প্রতিবাদ করাকে অন্যায় বলে ধরা হয় এবং এমন প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে নেয়া হয় ব্যবস্থা।’
একটি কথাকে বিশ্বের সব দেশের ক্ষমতাসীনেরা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে থাকেন। তা হলো- ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ বিষয়টি। এই ধুয়া তুলে সরকারগুলো দু’টি কাজ নির্বিঘেœ করে থাকে; প্রতিরক্ষার নামে মিলিটারি পুলিশ ও এমন নানা প্রতিরক্ষা বাহিনীর বাজেট বাড়িয়ে দেয়া এবং বিরোধী শক্তিকে দমিয়ে দেয়া ও কোনো ধরনের বিরোধিতাকে সহ্য না করা। চমস্কি বলছেন, ‘এ কর্মকাণ্ডগুলোই জাতির বেশির ভাগ সমস্যার জন্য দায়ী; যেমন জাতীয় ঋণ এবং দায়বদ্ধতা।’
এ অবস্থানগুলো আবার কৌশলে সরকার তৈরি করে এবং তা জিইয়ে রাখে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিশ্বব্যাপী ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ (ওয়ার অন টেরর) চলছে। আর উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এ যুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য শুধু মুসলমানেরাই। যেমন বলা হয়, সন্ত্রাসী ঘটনাগুলো মুসলমানেরা ঘটাচ্ছে এবং বিশ্ব শান্তি ও পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি এটি বিরাট হুমকি। কোনো অনুসন্ধান ছাড়াই এ কথা এবং ছবি সবার নিকট অতি পরিচিত যে, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডগুলো মুসলিম দেশেই সীমাবদ্ধ এবং এর প্রধান শিকার মুসলমানেরাই। অথচ এটা অত্যন্ত সাধারণ বুদ্ধির বিষয় যে, মুসলমানেরা কেন নিজেদের ক্ষতি করে এমন ঘটনা ঘটাবে? মধ্যপ্রাচ্যে যে ধ্বংসযজ্ঞ গত তিন দশক ধরে চলছে, এর সত্যিকারের কারণ এবং অবস্থা কখনোই সামনে আসে না। আর একটি ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, এই সন্ত্রাসে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশের কোনো না কোনো শক্তি জড়িত।
মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম দেশগুলোতে যে ধ্বংস ও সঙ্ঘাত চালু রয়েছে তার প্রকৃত কারণ কি তেল এবং মুসলমান- প্রশ্ন করেছেন অনেক বিশ্লেষক। এ প্রশ্ন ওঠার কারণ হলো, সঙ্ঘাতগুলো স্তিমিত হয়ে বা থেমে যাচ্ছে যখনই তেলের সরবরাহ বা দখল আগ্রাসনকারীদের নিয়ন্ত্রণে যাচ্ছে।

এমন উপসংহার অনেকেই টানতে পারেন, মধ্যপ্রচ্যের অশান্তি তেল পাওয়ার সাথে যুক্ত। অপরটি হলো, মুসলিম সমস্যা। ‘এখন সারা বিশ্বে ‘মুসলিম সমস্যা’ অত্যন্ত উচ্চারিত। এটা হচ্ছে এ জন্য যে, উচ্চারণের কোনো বাহনই মুসলমানেরা নিয়ন্ত্রণ করে না।’ বরং এর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা চলে গেছে ইসলাম এবং মুসলিমদের সমালোচকদের হাতে।
নোয়াম চমস্কির ভাষায়, তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য মতামত নিয়ন্ত্রণ এবং বংশবদদের সাহায্য করা। যেমন, তিনি বলেছেন (বহুল সমালোচিত) ‘বিন লাদেন ছিল ইউএসের একমাত্র সমর্থক। দেশটি (ইউএস) বিশ্বের সব স্বৈরাচারী সরকারকে যেমন মিসর, তিউনিসিয়া, জর্জিয়া, জর্ডান এবং কলম্বিয়াকে সাহায্য করে থাকে।’ তিনি আরো মারাত্মক মন্তব্য করেছেন, ‘মার্কিন সরকার প্রধানত স্বৈরাচারী সরকারগুলোকে সমর্থন দিয়ে গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ করেছে।’ তিনি এ মন্তব্যে সেপ্টেম্বর ৯/১১ পরের এক রিসার্চ রিপোর্টকে উদ্ধৃত করেছেন।
সরকার কেন জনমন নিয়ন্ত্রণ করতে চায় এবং কোন পদ্ধতিতে? চমস্কি বলেছেন ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একটি বিষয়ের ওপর লড়াই চলছে অবিরত। নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে এবং কারা তা মানবে। অবশ্য ঐতিহাসিকভাবে মার্কিন জাতির প্রতিষ্ঠাতারা গণতন্ত্র নিয়ে খানিকটা দ্বিমুখী। সেজন্যই এ দেশের সংবিধান প্রণেতারা শঙ্কিত ছিলেন, জনগণ যদি সত্যিই ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে, তাহলে তাদের বিশেষ সুবিধা সীমিত হয়ে যাবে। তাই জেমস ম্যাডিসন এ ক্ষমতা সিনেটের হাতে ন্যস্ত করেন, জনপ্রিতিনিধিরা যেন বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্তের স্বার্থ রক্ষা করে।’ ম্যাডিসন ছিলেন সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম।
এ পদ্ধতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের গণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডে। আর স্বৈরাচারী শক্তি গণতন্ত্রকে এখন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে। ফলে বেশির ভাগ দেশে গণতন্ত্রহীন ‘গণতান্ত্রিক’ সরকার বিরাজ করছে।

চমস্কির আরো একটি তথ্য জননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বুঝতে সাহায্য করবে। তিনি বলেছেন, যখন গণতন্ত্র মানুষের কাছে প্রিয় হলো এবং শ্রম অধিকার নিয়ে মানুষ সোচ্চার হতে থাকে, তখন সব ব্যবসায়ী আলোচনা করে ঠিক করলেন, এর বিরুদ্ধে কর্মসূচি নিতে হবে। এর নেতৃত্বও দেয় যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, দেশটির ইতিহাসের সাথে ভয়াবহ দাস প্রথা জড়িত। জনগণ তাদের নব্যলব্ধ স্বাধীনতার অধিকার ব্যবহার করতে শুরু করলে ব্যবসায়ীরা এর বিরুদ্ধে পন্থা খুঁজতে থাকলেন। আলোচনায় এলো, শুধু বিরুদ্ধ প্রচারণা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। জন্ম হলো জনসংযোগ পদ্ধতি (পাবলিক রিলেশন) এবং বাজারজাতকরণ (মার্কেটিং ইন্ডাস্ট্রি)। এই পদ্ধতিতে কোনো বিষয়েরই আসল তথ্য দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এখানে জনসম্মোহন করার জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় বক্তব্য ও বিষয় নিয়ে প্রবল আন্দোলন করা হয়। যেমন- স্লোগানের ব্যবহার। এ সেøাগান জনগণকে কোনো পার্টি বা তাদের আন্দোলনের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে বুঝতে দেয় না। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো- এসব আন্দোলন বা স্লোগানের পেছনে থাকে এক ছোট্ট সঙ্ঘবদ্ধ গোষ্ঠী এবং তাদের স্বার্থ। এ চিত্রটি তখনই স্পষ্ট হয় যখন আর এক গোষ্ঠী তাদের সেøাগান এবং নতুন বক্তব্য নিয়ে হাজির হয়ে পুরনো স্লোগান এবং আন্দোলনের স্বরূপ চিত্রায়িত করে। তবে সব খেলাই জনগণ নিয়ে, এবং তাদের নামেই খেলাগুলো খেলা হয়। চমস্কি একটি উদাহরণ দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট বুশের ‘ট্যাক্স মওকুফের’ ঘোষণায় বলা হয়েছিল, এতে জনগণের উপকার হবে। কিন্তু সুফল পেলো জনগণের এক শতাংশ-ধনীরা। ওরা আরো ধনবান হলো। মওকুফের কোন সুফল জনগণ পেলনা। কারণ এই ট্যাক্স মওকুফের আইনটা এমনভাবে করা হয়েছিল যা সাধারণ মানুষের উপকারে না এসে ধনীদের সাহায্য করল, যদিও প্রচারে এর সুফল জনগণ পাচ্ছে বলা হলো।

আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই চিত্রটি সারা বিশ্বের জন্যও প্রযোজ্য। সেখানে প্রতিটি আইন এবং সুবিধা সকল শক্তিমান এবং সুবিধাবাদীদের পক্ষেই চলে যায়। যেমন লেখক- চিত্রকর ভ্যালেরী রেনসো তার “পলিটিকস অব মাস ইনকারসারেশন” (গণগ্রেফতার) প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে সাদাদের পরিচালিত সংঘাত ঠেকানোর নামে কেমনভাবে কালোদের গণগ্রেফতার করা হয়। কালোদের নামে দুর্নাম রটিয়ে এ কর্মটি করা হয়। চিত্রটি সার্বজনীন। টাফট বিশ্ববিদ্যালয়ের ড: নাসের ঘায়েমি তার চমৎকার অনুসন্ধানী বই ‘অ্যা ফার্স্টরেট ম্যাডনেসে’ দেখিয়েছেন, কেমন করে জনপ্রতিনিধি (ল’ মেকারস) এবং ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ ক্ষমতাপাগল মানসিক রোগগ্রস্তদের ক্ষমতায় বসান। ডেভিড সিরোটা তার ‘স্টপিং ইনস্যানিটি’ প্রবন্ধে এসব শঙ্কা উল্লেখ করে সবাইকে আহ্বান জানিয়েছেন ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার এই ক্রমবর্ধমান উম্মাদগ্রস্ততাকে ঠেকাতে। সিরোটা আহবান জানিয়ে বলেছেন এই উম্মাদগ্রস্ত শাসকশ্রেণীর শাসন তৃতীয় বিশ্বে এতই প্রকট যে, সেখানে সাধারণ মানুষেরা এমন অবস্থাকেই বাস্তবতা বলতে বাধ্য হচ্ছে। তারা তাদের বশংবদদের দিয়ে নির্বাচন পরিচালনা করছেন এমনভাবে, যেন জনগণ তাদের সত্যিকারের ইচ্ছার প্রকাশ না ঘটাতে পারে। নির্বাচন প্রাক্কালে তারা তাদের বিরোধীদলের বিরুদ্ধে নানা মামলা দিয়ে বা কারারুদ্ধ করে এমন বিভীষিকাময় অবস্থার সৃষ্টি করে যে, প্রতিবাদ করার সাহস বা অবকাশ জনগণের থাকে না। এমনকি গুম-খুন-সংঘর্ষের ঘটনা এত বেড়ে যায় যে, তখন সাধারণ মানুষ স্বস্তির জন্য নির্বাচনই চায় না। ক্ষমতালোভীরা এই অবস্থাই কামনা করে। আসলে বর্তমান সময়ে জার্মান প্রচারমন্ত্রী ড. যোসেফ গোয়েবলসের উক্তিকে ক্ষমতাবানেরা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে।

তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি যদি একটি বড় মিথ্যা বল এবং বারবার তা বলতে থাক, তবে মানুষ অবশেষে তা বিশ্বাস করবে। এ মিথ্যা অবশ্য ততদিনই টিকবে যতদিন রাষ্ট্র জনগণকে এর রাজনৈতিক, আর্থিক এবং সামরিক কুফল থেকে রক্ষা করবে। এ জন্যই রাষ্ট্রের জন্য প্রতিবাদ বা ভিন্নমতকে দাবিয়ে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সত্য হলো মিথ্যার জানের শত্রু এবং সে হিসেবে রাষ্ট্রেরও সবচে বড় শত্রু।’ ( If you tell a lie big enough and keep repeating it, people will eventually come to believe it. The lie can be maintained only for such time as the state can shield the people from the political, economic and or military consequences of the lie. It thus becomes vitally important for the State to use all of its powers to repress dissent, for the truth is the mortal enemy of the lie, and thus by extension, the truth is the greatest enemy of the state." Dr. Joseph Goebbels.) জার্মানীর হিটলার ছিলেন গোয়েবলস ভক্ত। তিনি এক কাঠি উপরে উঠে বললেন, ‘সরকার সব সময় মিথ্যা বলে। তবে বড় মিথ্যা। কারণ ছোট মিথ্যা বললে জনগণ দ্রুত তা ধরে ফেলে। কেননা তারাও ছোট ছোট মিথ্যা বলে। এজন্যই সরকারের মিথ্যাগুলো যখন অবশেষে প্রকাশ পায়, জনগণ এর বিশালত্ব দেখে বিস্মিত হয়। ততদিনে মিথ্যাচারী সরকার বিদায় নিয়ে থাকে।’

বর্তমান প্রযুক্তির যুগে মিথ্যার ব্যাপকতা গোয়েবলের বক্তব্যকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর স্থাপন করে, ক্ষমতাবানেরা জনগণের অধিকার কেড়ে নিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করছে। তাই চমস্কি বলেছেন, গণতন্ত্র এখন নেই এবং সেই সাথে জনমতও। শুধু আছে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র এবং জনমত। এর প্রধান লক্ষ্য জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং সেটা সম্পন্ন হলে সব ঠিক। এর প্রতিষ্ঠার জন্য মিথ্যা, সন্ত্রাস, সংঘর্ষসহ সব কিছু ব্যবহার করা বৈধ। অথচ এখন যারা শিকারের লক্ষ্য, তাদেরকেই দোষী সাব্যস্ত করা হচ্ছে। হ


আরো সংবাদ