মঙ্গলবার, ১৯ জুন ২০১৮
বেটা ভার্সন

জনতার ব্যথা বাড়ছে

জনতার ব্যথা বাড়ছে - ছবি : নয়া দিগন্ত

সম্প্রতি ক্রসফায়ারের চেয়ে আতঙ্ক করে তুলছে গুপ্তহত্যা। ভুক্তভোগী স্বজনদের অভিযোগ, ক্রসফায়ারে লাশের সন্ধান মেলে, কিন্তু গুপ্তহত্যায় লাশের সন্ধান পাওয়া যায় না। রাজধানীসহ সারাদেশে বেওয়ারিশ লাশ দাফন করে দাতব্য প্রতিষ্ঠান আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম। এ প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর গড়ে প্রায় দেড় হাজার বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়। দিনবদল এখন একটি বাজে শব্দে পরিণত হয়েছে। গণতন্ত্রের অপরিহার্য দুই অংশÑ গণমাধ্যম ও সিভিল সোসাইটিকে সরকার যখন প্রতিপক্ষ মনে করে, তখন বুঝতে হবে সরকার ভুল পথে আছে। ৪৭ বছর ধরে আমরা শুধু তলিয়ে যাচ্ছি। রাজনীতি এখন উৎকৃষ্ট এবং লাভজনক বিনিয়োগে রূপ নিয়েছে। রাজনীতি করলেই পকেট গরম থাকে। অন্য দিকে দেশে নারী ও শিশু ধর্ষণের উৎসব চলছে। নারী তুমি সাবধান। মনে রাখা উচিত, নির্মূলের রাজনীতি করলে একসময় সেই দলটিকে নির্মূল হতে হয়- অতীত ইতিহাস ঘাটলে শাসকদলের সেই পরিণতি আমরা দেখেছি; এসব কথা সচেতন মানুষ এখন বলছেন।

প্রতিবেশী ভারতের সাথে আমাদের ভালোবাসাটা কেমন হবে- সেটাও বুঝেও বুঝতে চাই না। এক পা নয়, দু’পা নয়, অনেক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। ভারতকে যা কিছু দেয়ার সবই দিয়ে দিয়েছে, কিন্তু ভারত পিছিয়েছে তার চেয়েও বেশি। এখনো তিস্তার পানি পাইনি। একতরফা বাণিজ্য চলছে ৪৭ বছর ধরে। এভাবে ভালোবাসা হয় না। ভালোবাসা একপক্ষে হয় না। দুইপক্ষ সমান সমান না হলে সে ভালোবাসা কিভাবে টিকবে। জোর যার মুল্লুক তার, এ নিয়ে সে ভালোবাসা ভঙ্গুর হতে বাধ্য। অভিন্ন আন্তর্জাতিক নদীর উজানে একটি দেশ এক পক্ষীয়ভাবে বাঁধ দিয়ে আর বলবে, এটা তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। বাংলাদেশের নদীগুলোর অকাল মৃত্যু ঘটছে। কারণ, নদীর ওপর যেকোনো ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ সেটি বাঁধ, ব্যারাজ কিংবা বিদ্যুতকেন্দ্র যাই হোক, তা পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করবেই। ধীরগতির কারণে পানির প্রবাহ কমে গেলে পলি জমে একসময় নদীর তলা ভরাট হয়ে যায়, এভাবেই নদীর মৃত্যু ঘটে। আমাদের নদীগুলো সে পথেই ধাবিত হচ্ছে। যাকে বলা হয় অনিবার্য মৃত্যু।

একটি জাতির নৈতিক শক্তিই বড় শক্তি। সেই নৈতিক শক্তি এখন নড়বড়ে। দেশ ও জাতি কিভাবে এগিয়ে যাবে? গোড়ায় গলদ থাকলে আগায় ফল, ফুল দেখা যাবে না। পরিচর্যাটা আগায় নয়, গোড়ায় করতে হবে। আমরা মাটিতে রাসায়নিক সার দিয়ে মাটির উর্বরতা শক্তি নষ্ট করে ফেলেছি। এ জন্য খাদ্যে কোনো প্রাণশক্তি নেই। শেষ আশ্রয়স্থল হাসপাতাল। এখন মুড়ির মতো ওষুধ সেবন করতে হয়। কারণ, খাদ্যে কোনো প্রোটিন নেই। অসুস্থ হয়ে বেঁচে থেকে লাভ কি। এগুলো গড় আয়ু বাড়ানোর আর একটি উদ্ভট অঙ্ক। মানুষ যত বেশি অসুস্থ হবে- ডাক্তার, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার- এগুলো বাড়বে লাভজনক কারণে। এ কারণে চিকিৎসক সমাজ ভেজালের বিরুদ্ধে কথা বলে না, তাদের ভেজালবিরোধী কোনো কার্যক্রম নেই, বিবৃতিও নেই। ভেজালের বিরুদ্ধে কথা বললে মানুষ সুস্থ থাকবে, সে ক্ষেত্রে তাদের আয় কমে যাবে। আমাদের শিক্ষিত সমাজের নৈতিক মানদণ্ড কোন স্তরে চলে গেছে একবার ঠাণ্ডা মাথায় ভাবা দরকার।

আমাদের দেশে এখন এক শ্রেণীর বাণিজ্য বেগবান। যেমন ধরুন- একজন শিক্ষক একমাস পড়িয়ে দেড় হাজার টাকা নিলে তা যেমন কোচিংবাণিজ্য, ঠিক তেমনি একজন ডাক্তার দুই মিনিটে ১৫০০ টাকা নিলে তা হবে ভয়াবহ প্র্যাক্টিস- আজব এই দেশ, আজব আমাদের মানসিকতা। হরদম চলছে এসব অনৈতিক প্র্যাক্টিস। লিখে শেষ করা যাবে না।
এখন দেশে বন্দুকযুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধে দুই পক্ষের লোক হতাহত হবে, কিন্তু দেখছি প্রতিপক্ষ মরছেÑ তাহলে সেটা বন্দুকযুদ্ধ হয় কিভাবে। ১৫ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত দেশে ১১৫ জন মানুষ খুন হয়েছে, ৩০ মে জাতীয় দৈনিকের এ সংবাদ মানুষকে অনিশ্চিয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। জনতার ব্যাখ্যাটা হলো- অপরাধীকে ধরবে এবং তার থেকে মাদক পাচারকারীদের তথ্য নেবে, আসলে কি সে মাদকব্যবসায়ের সাথে জড়িত? এসব চিন্তা-ভাবনা না করে বন্দুকযুদ্ধের তকমা লাগিয়ে প্রতিপক্ষকে শুধু খুন করা হবে- এটা তো জাহেলিয়াতের যুগের আলামত। বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সভ্যদেশে হয় না। যে দেশ বর্বর, সেই দেশেই বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে দেশের গুণী ব্যক্তিরা বলেছেন। বাম নেতা কমরেড খালেকুজ্জামান বলেছেন, মাদক নিয়ন্ত্রণের নামে মানুষ খুন করা হচ্ছে বিচার বহির্ভূতভাবে। তিনি আরো বলেছেন, অপরাধ দিয়ে অপরাধ দমনের চেষ্টায় সাময়িক সাফল্য দেখানো গেলেও সুদূরপ্রসারী ফলাফল ভালো হয় না।
‘আমরা সবসময় উন্নয়নের কথা বলি- অতীতের সব সরকারই বলেছে। যদি এত উন্নয়ন হয়, তাহলে বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার চেয়ে কয়েকগুণ ছোট দেশ হওয়া সত্ত্বেও মালয়েশিয়ার পর্যায়ে পৌঁছতে কেন পারেনি। দেশের বয়স তো প্রায় অর্ধশত বছর। মালয়েশিয়া ২০ বছরে যা পেরেছে, আমরা ৪৭ বছরেও তার অর্ধেকও অর্জন করতে পারিনি। আত্মজিজ্ঞাসা করে এর উত্তর খোঁজ করুন। মালয়েশিয়ার সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজির রাজাক অনেক উন্নয়ন করেছেন। অনেক কিছু নির্মাণ করে দেশটাকে আরো গতিময় করেছেন। কিন্তু এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে বড় মাপের দুর্নীতি ছিল। মাহাথির বলেছেন, মালয়েশিয়াকে শেষ করে দিয়েছে নাজির রাজাক। মাহাথির এবং দেশের জনগণের যে বিদ্রোহ- তা ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে। তিনি মিডিয়াকে একটি কথাই সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, আমাদের দেশে কোনো ধরনের দুর্নীতি সহ্য করা হবে না। এ ব্যাপারে আমরা জিরো টলারেন্স।

এরকম একটি শব্দমালা আমাদের দেশের শাসকেরাও বলেন, কিন্তু বাস্তবে তার নিদর্শন নেই। কিন্তু মালয়েশিয়ায় নাজিব রাজাকের অসৎ উপায়ে অর্জিত কয়েক শত কোটি ডলারের সম্পত্তি ক্রোক করেছে সদ্য বিজয়ী মাহাথির মোহাম্মদের নেতৃত্বে জোট সরকার। ক্ষমতায় বসেই প্রথমে জ্বালানি তেলের দাম অর্ধেক নামিয়ে দিয়েছেন। ৯৫ শতাংশ শিক্ষা খরচ সরকারি তরফ থেকে নিশ্চিত করায় জনগণ শিক্ষা লাভের অবারিত সুযোগ পাচ্ছে। প্রায় শতভাগ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে বেকারত্বের অভিশাপ মুক্ত করে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন লাভ করেছে নতুন সরকার। দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে ধনী-গরিবের ব্যবধান কমিয়ে এনেছে। পশ্চিমা দুুনিয়া মালয়েশিয়ার উন্নতি-অগ্রগতিতে অবাক ও বিস্মিত হয়। হিংসায় মাহাথিরের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায় বিশেষ করে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, হজ প্রথার সংস্কারের কারণে দেশ-বিদেশের কুচক্রি মহলের সমালোচনা হজম করতে হয়। তারপরও তিনি দমে যাননি। তিনি আধুনিকতা বজায় রাখতে গিয়ে ধর্মকে খাটো করার নীতি অবলম্বন করেননি। কিন্তু আমাদের দেশে যারাই ক্ষমতায় আসেন- তাদের প্রধান টার্গেট থাকে কিভাবে জনগণের পকেট কাটা যায়- সেই চিন্তা প্রথমে মাথায় থাকে এবং প্রতিবছর বাজেট এলেই বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, জ্বালানি তেল, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কিভাবে বাড়ানো যায় তা নিয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে যায়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় প্রতি বছরই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। হাইব্রিড খাদ্যপণ্য- যা স্বাস্থ্যসম্মত নয়, এসব পণ্যের দামও বাড়ছে। হাইব্রিড করলা, বেগুন ৮০ টাকা কেজি দরে পবিত্র রমজান মাসে বিক্রি হচ্ছে। সরকার নীরব। কারণ তাদের লোকজনেরাই সিন্ডিকেট করে এসব কর্মকাণ্ড করছে।

শুধু ঢাকায় যানজটের কারণে বছরে ক্ষতি হয় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। অর্থাৎ যানজটে নষ্ট হয় ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা, যার আর্থিক মূল্য ৩৭ হাজার কোটি টাকা। গণপরিবহনের গতিবেগ ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটার, যেখানে পায়ে হেঁটে চলার গতিও পাঁচ কিলোমিটার। সম্প্রতি বুয়েটে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল আলোচনায় ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড: মোয়াজ্জেম হোসেন বলেছেন, যদি যানজট ৬০ শতাংশ কমিয়ে আনা যেত; তাহলে অন্তত ২২ হাজার কোটি টাকা বেঁচে যেত। যানজটের সমস্যা এখন সারাদেশেরই সমস্যা। রাজধানীর মূল সড়ক নয়, এখন অলি গলিতেও তীব্র যানজট পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেশের অর্থনীতির লাইফ লাইন বলে পরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজট ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে।

অতীতের রেকর্ড ভঙ্গকারী এই যানজট ১২০ থেকে ১৩৯ কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে গাড়ি এক ইঞ্চি পরিমাণ এগুতে না পারার মতো বাস্তবতাও প্রত্যক্ষ করা গেছে। দুর্ভোগ এখন চরমে পৌঁছেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গাড়ি চলাচল করে দৈনিক ২৫ থেকে ৩০ হাজার। এর ৬০ শতাংশ মালবাহী গাড়ি। বিনিয়োগ বোর্ডের এক গবেষণা থেকে জানা যায়, সারাদেশে যানজটের কারণে বছরে জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতি হয় এক লাখ কোটি টাকা।
উৎপাদন ক্ষতি, স্বাস্থ্যগত ক্ষতি ও দুর্ঘটনার ক্ষতি ধরলে এর পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াবে দেড় লাখ কোটি টাকা। ক্ষতির এই পরিমাণ জাতীয় বাজেটের প্রায় অর্ধেক এবং এই অর্থ দিযে বছরে অন্তত পাঁচটি পদ্মাসেতু নির্মাণ করা সম্ভব। বিনিয়োগ বোর্ডের গবেষণা তথ্যে জানা যায়, যে পরিমাণ রাস্তা থাকার কথা, তা নেই। দ্বিতীয়ত, রাস্তার অনুপাতে গাড়ির সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। এর সাথে লাখ লাখ অযান্ত্রিক যানবাহনও চলাচল করে। এই বাস্তবতায় যানজট হতে বাধ্য। সুষ্ঠু পরিকল্পনা ছাড়া কোনো কাজই যে ঠিকঠাক মতো চলে না- এটা আমাদের বর্তমান ও অতীতের সরকারগুলো বুঝতে চায় না বলেই জনগণের কষ্ট-ব্যথা অন্তরেই থেকে যায়। যার কারণে জনগণের কষ্টের কোনো সুরাহা হয় না।হ
লেখক : গ্রন্থকার

E.m.harunrashidar@gmil.com


আরো সংবাদ