মঙ্গলবার, ১৯ জুন ২০১৮
বেটা ভার্সন

বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জগুলো বাজেটে উপেক্ষিত

অর্থমন্ত্রী এ এম এ মুহিত - ছবি : সংগ্রহ

অর্থমন্ত্রী এ এম এ মুহিত গত বৃহস্পতিবার ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য চার লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার একটি বড় আকারের বাজেট ঘোষণা করেছেন। বাংলাদেশে বরাবরের মতো এটি একটি ঘাটতি বাজেট। এবারে বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ এক লাখ ২১ হাজার ২৪২ কোটি টাকা। প্রতিবারের মতো এবারের বাজেটেও ব্যয়ের মাত্রা অতি মাত্রায় বেশি, কিন্তু আয়ের মাত্রা কম। সে কারণে এটি অত্যাধিক ঋণভারে জর্জরিত বাজেট। বাড়তি ঘাটতি মেটাতে হচ্ছে ঋণের টাকায়। সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় বাড়তি খরচ করতে হবে ঋণের সুদ পরিশোধ করতে। আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে ৫১ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে শুধু সুদ পরিশোধের জন্য, যা অনুন্নয়ন খাতের বাজেটের ১৮ শতাংশ এবং সামগ্রিক বাজেটের ১১.১০ শতাংশ।

মোটা দাগে এই বাজেটের যেসব সমালোচনা করা যায় তা হলো- এই বাজেট বাস্তবায়নের অনুপযোগী এবং তা প্রণয়নে সরকারের অর্থনৈতিক বাস্তবতার চেয়ে সরকারের পপুলিজম তথা জনতুষ্টির নীতির প্রতিফলন প্রবল। এ জন্য বলা হচ্ছে, এটি ভোটের বাজেট। তা ছাড়া, ভোটের এই বাজেটে আছে ভ্যাটেরও চাপ। এ বাজেটে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর কোনো দিকনির্দেশনা নেই। উচ্চবিত্তের সুযোগ সুবিধা বাড়ালেও এ বাজেট বাড়াবে গরিবের কষ্ট। সেই অর্থে এটি গরিব মারার বাজেট। যেসব সমালোচক এই বাজেটকে গরিব-বিরোধী ও উচ্চবিত্তের তুষ্টিমূলক বাজেট বলে অভিহিত করেছেন, অর্থমন্ত্রী বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে ক্ষেপে গিয়ে তাদের ‘স্টুপিড’ ও ‘নন-প্যাট্রিয়টিক’ বলে অভিহিত করেছেন।

এই বাজেট বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অর্থমন্ত্রী নিজে তা স্বীকার করেন। তবে তিনি মনে করেন, এই বাজেট বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ থাকলেও তা বাস্তবায়নযোগ্য। কিন্তু সমালোচকদের অনেকেই মনে করেন, এই বাজেট বাস্তবায়নের অযোগ্য। অর্থমন্ত্রীকে আমরা তার আমলের পূর্ববর্তী ৯টি বাজেট ঘোষণার সময়েও ‘বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য’ বলে ঘোষণা করতে শুনেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমালোচকদের ভবিষ্যদ্বাণীর প্রতিফলন ঘটিয়ে, আগের কোনো বাজেটই বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। সমাপ্তপ্রায় অর্থবছর ২০১৭-১৮ সালের চিত্রও দেখা গেছে একই। এই অর্থ বছরের শেষ প্রান্তে এসে বাজেট কাটছাঁট করতে হয়েছে। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা কমাতে হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যথাসময়ে বাস্তবায়ন না হওয়ায় অর্থমন্ত্রীকে আমলাদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। মোট কথা, নতুন বছরের প্রস্তাবিত বাজেটও বাস্তবায়নের দিক থেকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। তা ছাড়া, তার আমলের বাজেট বাস্তবায়নের হারের চিত্রও সুখকর নয়। তার আমলের প্রতিটি বাজেট বাস্তবায়নের হার অব্যাহতভাবে নি¤œমুখী প্রবণতার শিকার হয়েছে। ২০১১-১২ অর্থবছর থেকে শুরু করে পরবর্তী সাত ঝছরের বাজেট বাস্তবায়নের হার ছিল যথাক্রমে ৯৩.১৯ শতাংশ, ৯০.৭৬ শতাংশ, ৮৪.৫৯ শতাংশ, ৮১.৫৯ শতাংশ, ৮০.৮০ শতাংশ, ৭৯.১২ শতাংশ এবং ৭৪.২০ শতাংশ। এই নি¤œমুখী প্রবণতাদৃষ্টে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের প্রাক্কলিত হার ধরা হয়েছে ৭১.০৭ শতাংশ। অতএব কী করে বিশ্বাস রাখি, এবারের বাজেট অর্থমন্ত্রীর কথামতো, বাস্তবায়নযোগ্য হবে।

আসলে আমাদের বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেগুলো মোকাবেলার কোনো পদক্ষেপ নেই এই বাজেটে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যেসব সংস্কার পদক্ষেপ নেয়া দরকার ছিল, তার উপস্থিতি নেই এই বাজেট উদ্যোগে। কিংবা বলা যায়, এর আগেও এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি, যেগুলো এসব চ্যালেঞ্জ দূর হতে পারে। এই চ্যালেঞ্জগুলো বুঝতে আমাদের নজর দিতে হবে, কোন অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে আজকের এই বাজেট ঘোষিত হচ্ছে। আমরা এ ক্ষেত্রে তিনটি প্রধান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করতে পারিÑ সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, মধ্যমেয়াদি আর্থসামাজিক উন্নয়ন চিত্র এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতা।
অস্বীকার করার উপায় নেই, বাজেট বাস্তবায়নের পথে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে আমাদের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আজ হুমকির মুখে। কারণ, আমরা লক্ষ করছিÑ স্থানীয় মুদ্রায় বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়হার ক্রমেই নিচে নেমে আসছে। কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালান্সে আছে বড় মাপের ঘাটতি। তা ছাড়া, আছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। মধ্যমেয়াদে দারিদ্র্য বিমোচনের হারে এসেছে ধীরগতি। দেশের উত্তরাঞ্চলের পাঁচটি জেলার অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। প্রকৃত খাতে, বিশেষত কৃষি ও শিল্প খাতে বৈচিত্র্যের অভাবে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান খাতে ধীরগতি কাটানো সম্ভব হয়নি। মূলধনের আয় ও শ্রমের আয়ে ব্যাপক পার্থক্যের কারণে এক দিকে অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়েছে, অপর দিকে বিভিন্ন খাতে বেড়েছে অব্যাহত লুটপাট। সামাজিক খাতে মানসম্পন্ন ব্যয়ের অভাবে মানব মূলধনের ক্ষেত্রে বিরাজ করছে বড় ধরনের হতাশা।

এর বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতা অর্থনীতির প্রতিটি খাতে সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত। ফলে এসব খাতে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মাঝে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। নতুন অর্থবছরের প্রথমার্ধে আসছে জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনের বছরে নানা অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগসম্পর্কিত সিদ্ধান্তের প্রশ্নে বিনিয়োগকারীরা অবলম্বন করছেন ‘ওয়েইট অ্যান্ড সি পলিসি’। কিভাবে কোন প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার হস্তান্তর হবে, সেটি শান্তিপূর্ণভাবে হবে কি না- সে ব্যাপারে বিনিয়োগকারীরাসহ সাধারণ মানুষ শঙ্কায় ভুগছেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ব্যবসায়িক পরিবেশ স্মরণে এনে সবাই আগামী নির্বাচন প্রশ্নে একই ধরনের শঙ্কিত। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে বাজেট বাস্তবায়নের এসব চ্যালেঞ্জ অবসানে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না।
এবার বাজেটের আকার বিদায়ী অর্থবছরের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে ১৬.০৬ শতাংশ। তবে যেখানে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৭৪.২০ শতাংশ এবং টানা ৯ বছর ধরে বাজেট বাস্তবায়নের হার অব্যাহতভাবে কমছে, সেহেতু এবারের বাজেটের আকার নির্ধারণে একটি সংরক্ষণবাদী ভূমিকা পালন করাই ভালো ছিল। অর্থনৈতিক বাস্তবতার আলোকে বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হলে, সেই বাজেট যেমন সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তেমনি অর্থনৈতিক শৃঙ্খলাও বজায় রাখা সম্ভব হয়। বাজেটের ঋণনির্ভরশীলতাও কমে। কিন্তু সম্ভবত নির্বাচনী বছরের বাজেট হওয়ায় অর্থমন্ত্রী সেদিকে যেতে পারেননি। সে জন্যই হয়তো তিনি অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জগুলো মাথায় না রেখে জনতুষ্টিমূলক বাজেট প্রণয়ন করেছেন। সমালোচকেরা যখন এই বাজেটকে নির্বাচনমুখী বলে সমালোচনা করছেন, তখন অর্থমন্ত্রী নিজেই বলছেন, ‘আমার প্রতিটি বাজেটই নির্বাচনমুখী।’

তবে বলা দরকার- অর্থনীতির পরিধি বিবেচনায় বাজেটের এতটা আকার বাড়ানো খুব একটা বেশি হয়েছে, তা-ও বলা যায় না। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার আমাদের জিডিপির মাত্র ১৮.৩ শতাংশ। এই বাজেট-জিডিপির অনুপাতের হার অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায়, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় কমই রয়েছে। ভারতের বাজেট-জিডিপির অনুপাতের হার ২৬ শতাংশ, মালয়েশিয়ার বেলায় ২৭ শতাংশ, অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের বেলায় এই বাজেট-জিডিপির অনুপাতের হার মোটামুটি ৩১ শতাংশ। এসব বিবেচনায় বাজেটের আকার খুব একটা বেশি বলা ঠিক হবে না। এরপরও কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের বাজেট বাস্তবায়নের হারে ছিল নি¤œমুখী প্রবণতা। এ কথাটি মনে রেখে বাজেটের আকার নির্ধারণ করা দরকার বাজেট প্রণেতাদের।

সরকারের মাথায় আছে, সরকার চালানোর জন্য অর্থের প্রয়োজন। আবার এ বিবেচনাও ছিল যে, বছরটি ভোটের বছর। অতএব, নতুন কোনো কর বসিয়ে ভোটারদের রাগানো যাবে না। তাই এবারের বাজেটে এক দিকে যেমন সরকারি চাকরিজীবী ও ব্যাংক বীমা মালিকদের সুবিধা দেয়া হয়েছে, অন্য দিকে সরকারের আয় বাড়ানোর জন্য কৌশলে ভ্যাটের আওতা বাড়ানো হয়েছে ব্যাপকভাবে। ভ্যাটের কারণে আসন্ন অর্থবছরে সাধারণ মানুষ বেশ চাপের মুখে পড়বে। তাদের পকেট থেকে প্রচুর অর্থ চলে যাবে সরকারের পকেটে। এই কৌশলী ভ্যাট আরোপের মাধ্যমে অর্থমন্ত্রী বাড়তি আরো ৩০ হাজার কোটি টাকা আয়ের পরিকল্পনা নিয়েছেন বাজেটের মাধ্যমে। এবার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তিন লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। আমরা ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটের দিকে ফিরে তাকালে দেখতে পাই, আমাদের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই লাখ ৪৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে সরকার এরই মধ্যে রাজস্ব আদায়ের এ লক্ষ্যমাত্রা ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা কমিয়ে পুনর্নির্ধারণ করেছে দুই লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। বাস্তবে দেখা গেছে, পুনর্নির্ধারিত এই টার্গেটও পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ, কর কর্মকর্তারা এই অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সংগ্রহ করেছেন মাত্র এক লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব। এবার গত বছরের তুলনায় ৫১ হাজার ৯০ কোটি টাকা বাড়ানো কতটুকু যুক্তিসঙ্গত, সে প্রশ্ন অবশ্যই আসে।

সরকার এই বাজেটের মাধ্যমে মধ্যবিত্তের কষ্টের এবং উচ্চবিত্তের তুষ্টিবিধান করেছেন বললে ভুল হবে না। একজন মধ্যবিত্ত একটি ছোটখাটো ফ্ল্যাট কিনলেও তাকে এখন গুনতে হবে অতিরিক্ত নিবন্ধন ফি। কিন্তু উচ্চবিত্তরা যখন বড় আকারের ফ্ল্যাট কিনবেন, তখন তাদের ফ্ল্যাটের নিবন্ধন খরচ কমবে। মধ্যবিত্ত যারা ‘পাঠাও-উবারে’ চড়বেন তাদের খরচও বেড়ে যাবে নতুন অর্থবছরে। ব্যাংক মালিকদের জন্য বড় ধরনের সুবিধা করে দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী এই বাজেটে। ব্যাংকের করপোরেট কর কমানো হয়েছে আড়াই শতাংশ। অর্থমন্ত্রীর বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী ২০১৩ সালে অনুমোদন পাওয়া ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করের হার ৪০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৩৭ শতাংশ করা হয়েছে। এ ছাড়া, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করহার বর্তমান ৪২.৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশ করা হয়েছে। তবে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য এভাবে কর ছাড়ের প্রস্তাব করেননি অর্থমন্ত্রী। তা ছাড়া, ব্যাংকিং কমিশন প্রতিষ্ঠা থেকেও মন্ত্রী ইউটার্ন দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ব্যাংকিং কমিশনের বিষয়টি ছেড়ে দিয়েছি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর।

মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশ বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যা মোকাবেলার কোনো প্রতিফলন নেই প্রস্তাবিত বাজেটে। দারিদ্র্য বিমোচনের হারে ধীরগতি দেখা গেছে, কিছু কিছু ভৌগোলিক পকেটে দারিদ্র্য আরো ঘনীভূত হয়েছে। এ কথা সত্য, দেশে কর্মসংস্থানবিহীন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটছে। এর কুফলও রয়েছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধি হার বেড়ে চললেও আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি কমে যাওয়া, ভয়াবহভাবে যুবসমাজের বেকারত্বের হার বেড়ে যাওয়া, সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার ফলে অর্থনীতিতে গতিশীলতা কমেছে। প্রকৃত খাতে, অর্থাৎ কৃষি ও শিল্প খাতে বৈচিত্রায়নের অভাবে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নেমে এসেছে ধীরগতি। সামগ্রিক অর্থনৈতিক নীতিকাঠামো সফলতা পায়নি সম্ভাবনাময় কৃষি ও শিল্প খাতের সম্প্রসারণে। এই অবস্থা চলছে সেই ২০১০-১১ অর্থবছর থেকেই। শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধির হারও ক্রমেই নিচে নামছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে যেখানে বৃহদাকার শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১০.০১ শতাংশ, সেখানে পরের অর্থবছরে তা নেমে আসে ৯.৯৬ শতাংশে। এর পরের অর্থবছরে তা নামে ৯.৬৪ শতাংশে এবং এরও পরের অর্থবছর ২০১৩-১৪এ তা নামে ৮.১৬ শতাংশে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ৯.৬৭ শতাংশে এবং পরের অর্থবছরে তা আরো বেড়ে দাঁড়ায় ১১.০০ শতাংশে। কিন্তু ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আবার তা নেমে আসে ১০.৫ শতাংশে। তাই বলা চলে, বৃহদাকার শিল্প উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধিতে বিরাজ করছে এক ধরনের অস্থিতিশীলতা। এটা দূর করায় বাজেটে কোনো পদক্ষেপ নেই। আমাদের বাজেটের আরেকটি বড় দুর্বলতা হচ্ছে, প্রতি বছরই সরকারি ব্যয়ের একটা বড় অংশ ব্যয় করা হয় অনুৎপাদনশীল খাতে। বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা ও ঋণের অর্থের সুদ পরিশোধের পেছনে। প্রস্তাবিত বাজেটে এক লাখ ১২ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে এই বেতনভাতা ও সুদ পরিশোধ খাতে। আর এই অঙ্ক মোট বাজেটের ২৪.১৭ শতাংশ। অনুৎপাদনশীল খাতে অব্যাহতভাবে বাজেটের বিরাট একটি অংশ ব্যয় করায় এক ধরনের ‘জিরো সাম গেম’ পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে, যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রকৃত খাত, বিশেষ করে কৃষি ও শিল্প খাত। সে কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক খাতের বরাদ্দে এক ধরনের নিশ্চলতা বিরাজ করছে। প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে যথাক্রমে ১৪.৬ শতাংশ, ৫ শতাংশ ও ৫.১ শতাংশ। অনুৎপাদনশীল খাতে সরকারের ব্যয় কমাতে পারলে এসব খাতে বরাদ্দ আরো বাড়ানো যেত। বাংলাদেশ এর বিপুল জনগোষ্ঠীকে সত্যিকারের মানবসম্পদে পরিণত করে এ থেকে ব্যাপকভাবে উপকৃত হওয়ার সুযোগটি বরাবর হারিয়ে চলেছে ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থার কারণে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০১৭ সালের হিউম্যান ক্যাপিটাল রিপোর্ট মতে, শিক্ষা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থা দুঃখজনক। এ ক্ষেত্রে বিশ্বের ১৩০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১১তম। বেকারত্ব সবচেয়ে বেশি শিক্ষিত তরুণদের মাঝে। বিশেষ করে উচ্চ মাধ্যমিক ও তৎপরবর্তী পর্যায়ের শিক্ষিতদের মাঝে বেকারত্ব প্রবল। তা ছাড়া, পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত সাম্প্রতিক জরিপ রিপোর্ট মতে, মোট বেকারদের ৩৯ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত। বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশের ৭০ শতাংশ বেকারই গ্র্যাজুয়েট। ২০১০ ও ২০১৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে মাথাপিছু ক্যালরি গ্রহণও কমে গেছে।

প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতা অর্থনীতির প্রায় সব ক্ষেত্রে বিরাজমান। বিশেষ করে, ব্যাংক খাত ও শেয়ারবাজার এই ভঙ্গুরতার শিকার সবচেয়ে বেশি। ব্যাংক খাতের দুর্নীতি ও লুটপাট এবং শেয়ারবাজারের নানা বিপর্যয় বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীন করে তুলছে। ব্যাংক খাতের সাম্প্রতিক সঙ্কট থেকে এটুকু স্পষ্টÑ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের রয়েছে বিরাট দুর্বলতা। এর ফলে এশিয়ার বিকাশমান দেশগুলোর মধ্যে আমাদের আর্থিক খাতের পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছ। অব্যাহত বেড়ে চলেছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। এমন ঋণখেলাপিও রয়েছে, যাদের নাম-ঠিকানাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বেনামি ঋণখেলাপি এখন ব্যাংকগুলোর মাথার বোঝা। ফলে অনেক ব্যাংক মূলধন পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছে। এ পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি হতাশাজনক সরকারি খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে এবং উন্নয়ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে। সরকার এসব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণ করছে জনগণের করের টাকায়। প্রতি বছর বাজেটে এ জন্য থোক বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। ১০ বছর ধরে এসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ত্রুটি দূর করার কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে সরকার শুধু জনগণের ওপরই এর বোঝা বাড়িয়ে চলেছে। এর মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জাতীয় অর্থনীতি। তা ছাড়া, ব্যাংক খাতের তারল্য সঙ্কটের কারণে ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়তে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে বেসরকারি খাতে মূলধন-ব্যয় বেড়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ থাকলেও প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক খাতের জন্য কোনো সংস্কার উদ্যোগ নেই। ব্যাংক কমিশন গঠন করা থেকেও সরে এসেছে সরকার। শেয়ারবাজারে সক্রিয় রয়েছে একটি কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। আর্থিক খাতে এসব নানা ধরনের আশঙ্কাজনক অবস্থা বিরাজমান থাকলেও এসব নিরসনে বাজেটে কোনো দিকনির্দেশনা নেই। অধিকন্তু রয়েছে নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। এমন অবস্থায় বিদেশী বিনিয়োগকারীরা চলে যাচ্ছেন শেয়ারবাজার ছেড়ে। গত মে মাসে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারে তাদের শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন ৬২৪ কোটি টাকার, অপর দিকে তারা কিনেছেন ৩৪১.৮৩ কোটি টাকার শেয়ার। বিরাজ করছে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে এক ধরনের অচলাবস্থা।

এসবই বাজেট বাস্তবায়নের জন্য এক-একটি চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে শুধু নির্বাচনমুখী জনতুষ্টিমূলক কিংবা উচ্চাভিলাষী বাজেট ঘোষণা করে তা বাস্তবায়ন করা যাবে না, তা বুঝতে সাধারণ মানুষেরও অসুবিধা হয় না। আর অতীত রেকর্ড তাই প্রমাণ করে। এখন প্রয়োজন অতীতের কয়েক বছরের বাজেট বাস্তবায়নের ইতিহাসের পাতাটি উল্টে দেখা।


আরো সংবাদ