১৭ আগস্ট ২০১৮

মাদকাসক্তি : অপরাধ নয়, রোগ

মাদকাসক্তি : অপরাধ নয়, রোগ - ছবি : সংগৃহীত

সরকার সারা দেশে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করেছে মাসাধিক কাল হলো। এর মধ্যে দেড় শতাধিক লোক এই অভিযানে প্রাণ হারিয়েছে। গ্রেফতার হয়েছে হাজার হাজার লোক। এই অভিযান শুরু করা হয়েছিল র‌্যাবকে দিয়ে। পরে পুলিশ বাহিনীও এই অভিযানে যোগ দেয়। বলা হয়েছিল, এই অভিযানের মাধ্যমে দেশ থেকে মাদক একেবারে নির্মূল করা হবে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই মাদকাসক্তির সমস্যা রয়েছে; কিন্তু কোনো দেশই তার সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করতে পারেনি। অনেক দেশই এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু ফলাফল শেষ পর্যন্ত শূন্যই থেকে গেছে। মাদকের বিরুদ্ধে সব চেয়ে নিষ্ঠুর অভিযান পরিচালনা করেছেন ফিলিপিনসের প্রেসিডেন্ট দুতার্তে। তার এই অভিযানে ১২ হাজার লোক প্রাণ হারিয়েছে। এই বিপুল মানুষ হত্যার পর তিনি শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেছেন, মাদকবিরোধী অভিযানে হত্যা কোনো সমাধান নয়।

সরকারের সব পর্যায় থেকে জোরেশোরে ঘোষণা করা হয়েছে, মাদকের সাথে যেই জড়িত থাক না কেন, তাদের কারো রেহাই নেই। সেখানে মাদক ব্যবসায়ী, তাদের ভাড়াটে বহনকারী ও মাদকসেবী সবাই রয়েছে। এখন সবচেয়ে সর্বনাশা মাদক হলো ইয়াবা, যার বেশির ভাগই আসছে মিয়ানমার থেকে। কিছু রিপোর্টে দেখা যায়, এখন দেশেরও কোনো কোনো স্থানে ইয়াবা তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দেশের সর্বস্তরের মানুষের দাবি, এই মাদকের করাল গ্রাস থেকে দেশের তরুণ সমাজকে রক্ষা করা হোক। সরকার বলছে, এই দাবির প্রতি সাড়া দিয়ে তারা মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করেছে।

কিন্তু মাদকবিরোধী অভিযানে যারা নিহত হয়েছেন, তাদের নিয়ে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে। সে প্রশ্ন হলো মাদকবিরোধী অভিযানে যাদের হত্যা করা হয়েছে, তারা সবাই অপরাধী কি না, কিংবা আসলেই তাদের মাদকের সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা আছে কি না। দেশের সাধারণ মানুষ ও সুশীলসমাজের দাবি ছিল, এই অভিযানে মাদকের গডফাদারদের ধরে শাস্তি দেয়া হোক। কিন্তু সরকার সে পথে যায়নি। মাদকবিরোধী অভিযানে যারা খুন হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ, কী তাদের অপরাধ, সেটাও এখন সাধারণ মানুষ জানতে চাইছে। তাদের মতে, এই হতাকাণ্ডগুলো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। আমরা খুনের খবর জানি। কিন্তু নিহত লোকটি সত্যি দোষী কি না, সে কথা জানতে পারি না। বিচারবহির্ভূত হত্যা তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধের কাহিনী এই সরকার দশ বছর আগেও যা বলেছে, এখনো তাই বলে যাচ্ছে। এর আগে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যার শিকার হয়েছেন, এই সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। আর মাদকবিরোধী অভিযানে যারা খুন হচ্ছেন, তাদের নিয়েও সরকার একই কাহিনী বলে যাচ্ছে। সামান্য হেরফেরও নেই। ফলে এর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছে। সরকারের বন্দুকযুদ্ধের কাহিনী প্রহসনে পরিণত হয়েছে।

এই যে দেড় শতাধিক মানুষ বিনা বিচারে খুন হলো, তার জন্য সরকার বাহবা দাবি করছে। কিন্তু দেশের মানবাধিকার কর্মীরা যেমন, তেমনি বিশ্বসমাজও এই বিচারবহির্ভূত হত্যাযজ্ঞের তীব্র প্রতিবাদ ও উদ্বেগ জানিয়েছে। এই অভিযানে যারা খুন হয়েছেন, তাদের অনেকের আত্মীয়স্বজন সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেছেন, মাদকবিরোধী অভিযানে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের কাছে টাকা দাবি করেছিল। সে টাকা তারা দিতে পারেননি বলে তাদের স্বজনকে হত্যা করা হয়েছে। সরকার এসব অভিযোগ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এমনকি জাতিসঙ্ঘ পর্যন্ত সরকারকে অবিলম্বে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করার আহ্বান জানাচ্ছে। তারা এ পর্যন্ত সংঘটিত সব বিচারবহির্ভূত হত্যার তদন্ত দাবি করেছে।

মাদকবিরোধী অভিযানের নামে যে সত্যি সত্যি পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ চলেছে, তার প্রমাণ মিলেছে টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর একরামুল হকের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। একরাম আওয়ামী লীগেরই নেতা ছিলেন। তিনি এলাকায় মাদক বিস্তারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তাকে ধরে নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকেরা। তার পরের কাহিনী আছে সব ঘটনার অডিওতে। একরামের সঙ্গে কথা বলেন তার স্ত্রী ও কন্যা। একরামের ফোন অন ছিল। তার স্ত্রী যখন তার সঙ্গে কথা বলেন, তখন তার সঙ্গে সব কথোপকথন তিনি মোবাইলে রেকর্ড করে রাখেন। তাতে শোনা যায়, সেখানে বন্দুকযুদ্ধের কোনো ঘটনাই ঘটছে না। বরং একরামকে ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। একরামের স্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে সে অডিও রেকর্ড সাংবাদিকদের কাছে হস্তান্তর করেন। সে অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। পৃথিবীর লাখ লাখ মানুষ সে অডিও শোনেন এবং নিজেদের মতো বুঝে নেন, বাংলাদেশে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে আসলে কী হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে বলে ফেললেন যে, এত বড় অভিযান, কিছু ভুলত্রুটি হতেই পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বারবার ফেল করা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও সে মতে তালিয়া বাজাতে শুরু করলেন। কিন্তু এদের এটা উপলব্ধি করার ক্ষমতা নেই যে, এ রকম একেকটা ভুলত্রুটি একেকটি পরিবারে কী মারাত্মক বিপর্যয় আর শোকের জন্ম দেয়। আর ন্যায়বিচারের মূল বাণী হচ্ছে, ১০ জন অপরাধী খালাস পেলে পাক, কিন্তু একজন নিরপরাধ ব্যক্তি যেন কখনো সাজা না পায়। সরকার ন্যায়বিচারের এই বাণীই বদলে দিতে চাইছে।

আর সরকার মাদকবিরোধী অভিযানে এ পর্যন্ত কোনো মাদকের গডফাদার বা পাচারকারীকে ঘায়েল করতে পারেনি। এই অভিযানে যারা খুন হয়েছেন, তাদের মধ্যে যারা মাদকসেবী তাদের আত্মীয়স্বজন থানায় অভিযোগ করতেও সাহস পায়নি। অভিযোগ করলে যদি পরিবারের অপর কোনো সদস্য বন্দুকযুদ্ধের শিকার হয়। ফলে বাংলাদেশে এখন কবরের নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। ওবায়দুল কাদের ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, এই মাদক চেইনের সঙ্গে যারাই জড়িত, তাদেরই নির্মূল করা হবে। কিন্তু টেকনাফ উখিয়ায় মাদকের গডফাদার বলে পরিচিত আওয়ামী লীগের এমপি আবদুর রহমান বদির প্রতি সরকার অনেক নমনীয়। কাছা খুলে তার পক্ষ নিয়েছে আওয়ামী লীগ। লীগের সাধারণ সম্পাদক কাদের বলেছেন, বদি যে গডফাদার, তার প্রমাণ কী? আমরাও তো সে কথাই বলছি। মাদকবিরোধী অভিযানের নামে কথিত বন্দুকযুদ্ধে যে দেড় শতাধিক মানুষ ইতোমধ্যে প্রাণ দিয়েছে, তারা যে অপরাধী, তারই বা প্রমাণ কী?

পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই, যেটি মাদক সমস্যায় ভুগছে না। পার্থক্য শুধু এর ব্যাপকতার। মাদকবিরোধী অভিযানে ফিলিপিনসে ইতোমধ্যে ১২ হাজার লোককে হত্যা করা হয়েছে। এতে মাদকের ব্যাপকতা কমেনি, এমন বলা যাবে না। তবে মাদক নির্মূল হয়নি। সেখানে চাহিদাও আছে, সরবরাহও আছে। যুক্তরাষ্ট্র মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করেছিল সেই সত্তরের দশকে রিচার্ড নিক্সনের আমল থেকে। কিন্তু এই অর্ধশতাব্দীতে সেখানে মাদক নির্মূল করা যায়নি। বরং অতিরিক্ত মাদক গ্রহণ করে যুক্তরাষ্ট্রে প্রাণ হারিয়েছেন ৬৪,০০০ লোক; যা ভিয়েতনাম যুদ্ধে নিহত মার্কিন নাগরিকদের চেয়ে অনেক বেশি। ২০০৩ সালে থাইল্যান্ড মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করে। তাতে বিনা বিচারে ২৮০০ লোককে হত্যা করা হয়। কিন্তু সেখানে এখনো মাদকের সমস্যা প্রকট। মাদক ফিরে এসছে। থাই সরকার এখন বলছে, মাদকবিরোধী অভিযানে নির্বিচার হত্যা ভুল ছিল।
চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামও কঠোর হাতে মাদক সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিল। তারা মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবী নির্বিশেষে সবার বিরুদ্ধেই কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছিল। ১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সিঙ্গাপুরে মাদক সংশ্লিষ্টতায় ২৪৭ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। চীনে যাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে, তাদের তেরো শতাংশের অপরাধ ছিল মাদকসংশ্লিষ্ট। কিন্তু তাতে কোনো সুবিধা হয়নি। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় মাদকাসক্তের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। আর থাইল্যান্ড এখন মাদক বৈধ করা ও মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন করার কথা ভাবছে। নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, ইকুয়েডর, সুইজারল্যান্ড, উরুগুয়ে ও মেক্সিকো এখন ভাবছে, তারা মাদকসেবীকে আর অপরাধী হিসেবে গণ্য করবে না। কিন্তু মাদক ব্যবসায়ীদের অপরাধী গণ্য করবে। তারা মনে করছে, মাদকসেবীরা স্বাস্থ্য সমস্যার শিকার, নৈতিকতা বা অপরাধের শিকার নন। এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর করার ফলে পর্তুগালে মাদকসেবীর সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। উরুগুয়ে গাঁজা সেবন বৈধ করেছে। তবে তা সরকার নির্ধারিত দোকান থেকে কিনতে হবে।

জাতিসঙ্ঘও এখন মাদকের ব্যাপারে নতুন করে চিন্তা করছে।
জাতিসঙ্ঘ তার ২০১৬ সালের মাদকসংক্রান্ত কনভেনশনে বলেছে, মাদক নীতি হতে হবে তথ্যভিত্তিক এবং এই নীতি হতে হবে জনগণের স্বাস্থ্যভিত্তিক, অপরাধভিত্তিক নয়।

কিন্তু বাংলাদেশে মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীকে একই কাতারে ফেলা হয়েছে। মাদকসেবীদের সমস্যা যে স্বাস্থ্যগত, সেটা বিবেচনায় না নিয়ে তাদের অপরাধী তকমা দিয়ে ক্রসফায়ারে দেয়া হচ্ছে। মাদকসেবীদের দুই থেকে ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধান করা হয়েছে। ১৬ কোটি লোকের বাংলাদেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৬০ থেকে ৭০ লাখ। কিন্তু তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসুবিধা খুবই সীমিত। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মাত্র ২৮০০ লোকের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি সুবিধা আছে মাত্র ১১৫ জনের।
এখন মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য সবার আগে দরকার সরবরাহ লাইন উৎস যেকোনো মূল্যে বন্ধ করা। একই সঙ্গে মাদকসেবীদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। তাদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করা।
লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
rezwansiddiqui@yahoo.com


আরো সংবাদ