২২ জুন ২০১৮

বাংলাদেশ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি

বাংলাদেশ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি - ছবি : নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশ, এর জাতি সত্তা এবং এর রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে অনেক কথা দীর্ঘ দিনের। কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে, বঙ্গোপসাগর থেকে জেগে ওঠা বিরাট চর, অর্থাৎ বদ্বীপের অংশই বর্তমান বাংলাদেশ। একটি ভূখণ্ড, সাগরের বুক চিরে দ্বীপ জাগতে পারে। কিন্তু একটি জাতি শুধু ভূখণ্ডভিত্তিক গড়ে ওঠে না। একটি ভূখণ্ড ও একটি জাতিসত্তা নিয়েই একটি জাতি প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতিসত্তার নিজস্ব সংস্কৃতি যথেষ্ট গুরুত্ব লাভ করলেও সত্তাটিই জাতির মূল পরিচয়। বিভিন্ন গোষ্ঠী, জাতি, উপজাতির বিভিন্ন সংস্কৃতি থাকতে পারে; কিন্তু এক ও অভিন্ন সত্তা না হলে কোনো জাতি গঠিত হয় না। যদিও কাগজ-কলমে একটি জাতি গড়ে উঠতে পারে, কিন্তু তাতে জাতিসত্তার চেতনা পরিস্ফুটিত হয় না।

বাঙালির বীরত্বগাথাপূর্ণ অনেক ইতিহাস (যেমন- ফকির ও কৃষক বিদ্রোহ, ফরায়েজি ও জিহাদ আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ প্রভৃতি) রয়েছে। কিন্তু সার্বিক ইতিহাসে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাঙালি ব্যক্তিবিশেষের কর্মকাণ্ড জাতীয়তাবাদের পক্ষে নয়, বরং বিশ্বাসঘাতকতার নজির খুবই নোংরা। মুষ্টিমেয় বিশ্বাসঘাতকদের কাছে গোটা জাতি বিভিন্ন সময় বিপর্যস্ত হয়েছে।
অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, শুধু বাঙালি বা বাংলার ক্ষেত্রে নয়, বিশ্ব ইতিহাসে ঈমানদারের চেয়ে বেঈমানের সংখ্যা বেশি, বিশ্বস্ততার পরিবর্তে বিশ্বাসঘাতকদের ঘটনা ঘটেছে অনেক, ত্যাগীর চেয়ে স্বার্থবাদী ও সুবিধাভোগীদের সব সময়ই দৃশ্যমান জয় হয়েছে বেশি। অবশ্য সব জয়ই সম্মানের নয়। যেমনÑ মীরজাফরের কারণে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ে মীরজাফর কলঙ্কিত হয়েছে, সম্মানিত হয়নি মোটেও। কারবালার প্রান্তরে ইয়াজিদের হাতে হজরত হোসাইন রা:-এর পরাজয়ে বিশ্ব মুসলিমের নিকট হোসাইন রা: পরম সম্মানিত হয়েছেন। বাংলা শাসন করেছে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও মুসলিমরা। তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ছিল। কিন্তু বর্তমানে চলছে ধর্মনিরপেক্ষতার নামান্তরে নাস্তিকতার সংস্কৃতি। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র গান গাইতে গাইতে যখন ধার্মিকদের বিশ্বাসের চাদরে হাত পড়ে যায়, তখনই দেখা দেয় মতবিরোধ। তবে ধার্মিকেরা এখন কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। কারণ, ধর্মের কথা বলতে গেলেই বলা হয় ‘সাম্প্রদায়িক’। তেমনটি ঘটেছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের পরপরই।

গবেষক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান স্বাধীনতার পরবর্তী সার্বিক অবস্থা তুলে ধরে আমাদের জাতিসত্তার বিকাশধারা বইতে (পৃষ্ঠা ১৯৩-১৯৪) লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই বাংলার মুসলমানদের ঐতিহ্যবাহী সংগ্রামের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অর্জিত নিজস্ব বোধ, বিশ্বাস এবং জাতিগত চেতনা ও প্রেরণার ধারাটি পাল্টে দেয়ার জন্য তাদের জীবন থেকে নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলো মুছে ফেলার বা জোর করে উৎখাত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর প্রথম ঈদুল আজহার প্রাক্কালে কোরবানির বিরুদ্ধে এক শ্রেণীর হঠাৎ রঙ পাল্টানো বুদ্ধিজীবীর বিবৃতি প্রচার করা হয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের ৯ মাস ধরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে কুরআনের বাণী প্রচার করে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা হলেও স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বেতারে কুরআন তেলাওয়াত, আসসালামু আলাইকুম, খোদা হাফেজ, প্রভৃতি বন্ধ করে দেয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রাবাসগুলোর নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দেয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম এবং শিক্ষা বোর্ডের মনোগ্রাম থেকে কুরআনের আয়াত মুছে ফেলা হয়। সেখানে এ এলাকার জনগণের বোধ-বিশ্বাসের বিপরীতে মঙ্গল প্রদীপ প্রতিস্থাপন করা হয়। হাজী মুহাম্মদ মুহসিনের দানের টাকায় প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় কাজী নজরুল কলেজ। সীমাহীন হীনম্মন্যতার কারণে এই পরিবর্তনের সময় অর্থের তোয়াক্কা না করে কবি নজরুলের নামের শেষাংশের ইসলাম শব্দটিও বাদ দেয়া হয়।

ইসলামের প্রতি অসহিষ্ণু একটি দৃষ্টিভঙ্গি হঠাৎ করেই এমনভাবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে যে, দৈনিক পূর্বদেশের এক উপসম্পাদকীয় নিবন্ধে সে সময় জুমার খুতবা ও নামাজ শেষে মুনাজাতে সাম্প্রদায়িক বক্তব্য রাখার অভিযোগ করা হয়। আজানের সময় কথাবার্তা বন্ধ রাখার ঐতিহ্য এখানে দীর্ঘ দিনের। অথচ স্বাধীনতার পরপর বিভিন্ন জনসভায় বক্তৃতা চলাকালে মসজিদে আজান দিতে গিয়ে মুয়াজ্জিনরা বাধাপ্রাপ্ত হন। বিভ্রান্তির সেই চোরাবালিতে দাঁড়িয়েই দাউদ হায়দার রচনা করে মহানবী সা:-এর বিরুদ্ধে এক চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ কবিতা। যে দেশের মুক্তিযোদ্ধারা ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি দিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং তাদের মা-বোন তাদের সাফল্যের জন্য রোজা রেখে নামাজ পড়ে দোয়া করেছে, এসব ঘটনা সেই জনগণের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। সাম্প্রদায়িকতা নির্মূলের নামে এভাবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আবেগ-অনুভূতির প্রতি এবং তাদের সত্তার গভীরে প্রোথিত বিশ্বাস ও মূল্যবোধের প্রতি আঘাত দেয়ার ফলে সৃষ্টি হয় জনমনে বিভ্রান্তি। দ্বাদশ শতকের সেন শাসিত বাংলাদেশে বৌদ্ধ সভ্যতা নির্মূলের জন্য যে ব্রাহ্মণ্যবাদী আর্য আগ্রাসন চালানো হয়েছিল, বিশ শতকের বাংলাদেশের এসব ঘটনা মুসলিম সভ্যতা নির্মূলের জন্য তেমনি আরেকটা অভিযানের আলামত মনে করে জনচিত্ত দারুণভাবে আলোড়িত হলো।’

প্রসঙ্গটি এ কারণে আনা হলো যে, সংস্কৃতি জোর করে চাপিয়ে দেয়া যায় না। যেমনটি শোনা গেছে, স্বাধীনতার আগে পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর মোনয়েম খান বুদ্ধিজীবীদের উদ্দেশে বলেছিলেন (কোনো সূত্র নেই, তবে শোনা কথা) আপনারা রবীন্দ্রসঙ্গীত লিখতে পারেন না?’ বুঝে না বুঝে হয়তো তিনি রবীন্দ্রনাথের নাম উল্লেখ করেছেন। কারণ, রবীন্দ্রনাথ নিজে লিখলেই এটা রবীন্দ্রসঙ্গীত, অন্য কেউ লিখলে সেটা সেই লেখকের নামের সঙ্গীত হবে। যেমন নজরুলের লিখিত সঙ্গীত নজরুলসঙ্গীত নামেই পরিচিত। স্পষ্ট করে বলতে চাই, জোর করে কোনো সংস্কৃতি মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়া যায় না, যেমনটি হয়তো চেয়েছিলেন মোনয়েম খান। বর্তমানে তা করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন কলকাতামনস্ক ধর্মহীন বুদ্ধিজীবীরা।
ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে খুদিরামের ফাঁসি হয়েছে, এর জোগান দিয়েছে বাঙালি পুলিশ, ইলা মিত্রের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন করেছে বাঙালি পুলিশ, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রজনতার ১৪৪ ধারা ভঙ্গের জন্য গুলি বর্ষণের নির্দেশ দিয়েছিলেন ঢাকা জেলার বাঙালি পুলিশ সুপার বাহাউদ্দিন, বাংলাদেশের দুইজন রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করেছে সেনাবাহিনীর বাঙালি কর্মকর্তারা, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে (১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর) গুলি চালিয়ে চার নেতাকে হত্যা করার সময় একজন বেঁচে গিয়েছিলেন। তার বাঁচার খবর দেয় একজন বাঙালি কারারক্ষী, সে খবর পেয়ে পুনরায় গুলি চালিয়ে তাকেও হত্যা করা হয় নির্মমভাবে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী থাকার সময়ে এ কাহিনী শুনেছি। এখনো যারা জেনেশুনে শেখ হাসিনাকে তুষ্ট রাখার জন্য সরকারবিরোধীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিচ্ছে, জামিনের পর মিথ্যা মামলায় শ্যোন এরেস্ট করছে বা জেল গেট থেকে গ্রেফতার করছে এবং রিমান্ড-বাণিজ্য করছে, তারাও বাঙালি। যে ম্যাজিস্ট্রেটরা পুলিশের এই বাণিজ্যকে তাপ অর্থাৎ উষ্ণতা দিচ্ছেন (মা-মুরগি যেভাবে ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানোর জন্য তাপ সৃষ্টি করে) তারাও বাঙালি। মিথ্যা মামলায় কেন নির্দোষ ব্যক্তিদের নাজেহাল করা হচ্ছে, এ মর্মে জিজ্ঞেস করা হলে পুলিশ বলে- ওপরের নির্দেশে করছি। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি পুলিশ এ ধরনের জবাবই দিত। ম্যাজিস্ট্রেট ও জজরা বলেন- আমরা নিরুপায়।

চাপের মুখে দেশ ছেড়ে যাওয়া প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন, নি¤œ আদালত মানে আইন মন্ত্রণালয়। তার বক্তব্য যে শতভাগ সত্য, এখন তারই প্রমাণ মিলছে। এ অবস্থায় গণতান্ত্রিক অধিকার ও গণতন্ত্রের কথা বলতে যেয়ে দেশবাসী স্বাধীনতার সুফল পাচ্ছে কোথায়? এ দেশের মানুষ এখন আর মোগল, ব্রিটিশ, পাকিস্তান বা জমিদার শ্রেণী দ্বারা নির্যাতিত নয়, বরং দেশে সরকারি চাকরিরত (পুলিশ/ম্যাজিস্ট্রেট তথা নি¤œ আদালতের বিচারক) সোনার ছেলেদের দ্বারা নির্যাতিত। কারণ, নিজ নিজ কর্তাদের তোষণ করে টাকা কামানো এবং সুবিধামতো পোস্টিং ও প্রমোশনই তাদের একমাত্র টার্গেট। ঢাকার বাড়ি-গাড়ির তো অভাব নেই, বরং বিদেশেও তাদের এখন সেকেন্ড হোম গড়ে উঠছে।

কলকাতায় বাংলাদেশের অর্থে ভবন গড়ে উঠুক বা কারো কপালে ভাগ্য ফোঁটা দেয়া হোক, তাতে দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে মানুষকে সরানো যাবে না বা নতুন করে কোনো দেশ থেকে আনা সংস্কৃতিকে চাপিয়ে দেয়া যাবে না। এ দেশের রাজনীতিকদের মনে রাখতে হবে, মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের একটি মাইলফলক। ফলে যারা মনে মনে হলেও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চেতনাকে লালন করেন, তাদের জনগণ গ্রহণ করবে না। অন্য দিকে জোর করে শাসনক্ষমতায় থাকার জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করার ছদ্মাবরণে যারা এই চেতনাবিরোধী কাজ করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করছেন, দেশ লুটে খাচ্ছেন, বাকস্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকার হরণসহ প্রতিপক্ষকে বিপর্যস্ত করছেন; তারাও জনগণের সমর্থন ও শ্রদ্ধা হারাচ্ছেন। তবে এখন মানুষ প্রতিবাদ করতে পারছে না; যেমনটি পারেনি ব্রিটিশ ও পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে। কিন্তু যখন বাঙালি স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সোচ্চার হয়েছে, তখন কেউই রেহাই পায়নি। তা ছাড়া, ধর্মবিদ্বেষী ও নাস্তিকদের রাজনীতি এ দেশে চলবে না। কারণ উচ্চ বর্ণের হিন্দু, হিন্দু জমিদার ও বৌদ্ধশাসকদের নির্মম অত্যাচার থেকে মুসলিম পীর দরবেশ সুফি সাধকেরা গরিব, কৃষক, খেটে খাওয়া দিনমজুর বাঙালিদের রক্ষা করায় স্বেচ্ছায় নিরীহ নিপীড়িত জনগণ ইসলাম গ্রহণ করেছিল। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার প্রজা নিপীড়ন করার সংবাদ কাঙ্গাল হরিনাথ তার সম্পাদিত ‘গ্রামবার্তা’ পত্রিকায় প্রকাশ করায় দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের (কবিগুরুর পিতা) রোষানলে পড়েছিলেন।

এ দেশে বেঈমানির ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। ‘আলীবর্দী খান ১৭৪০ সালে শাসনক্ষমতা লাভ করার পর থেকে তাকে এক দিকে ইংরেজ ও তাদের এদেশীয় কোলাবোরেটরদের ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করতে হয়, অন্য দিকে বহিঃসীমান্তে মারাঠা বর্গি ও রোহিলাদের সাথে লড়াই চালাতে হয়। এই দ্বৈত সঙ্কটের সুযোগে ১৭৫৪ সালে ইংরেজরা কলকাতায় উইলিয়াম দুর্গ নির্মাণ করে। ইংরেজ কর্মচারীদের তখনকার চিঠিপত্র থেকে দেখা যায়, মুসলিম শাসন ধ্বংসের ইঙ্গ-হিন্দু ষড়যন্ত্র তখন পরিণতপর্যায়ে উপনীত হয়েছিল। ১৭৫৬ সালে আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর সে ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের চরম সুযোগ উপস্থিত হয়। তারা ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিখণ্ডি হিসেবে বেছে নেয় মীরজাফরকে। ১৭৫৭ সালের ১ মে কলকাতায় ইংরেজ কমিটি তাদের বর্ণ হিন্দু দালালদের সহায়তায় মীরজাফরের সাথে ১১ দফা চুক্তিপত্র সম্পাদন করেছিল। সেই ষড়যন্ত্রমূলক চুক্তির ভিত্তিতেই ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আমবাগানে যুদ্ধ প্রহসনের মধ্য দিয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটে। সেই সাথে লুপ্ত হয় বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার স্বাধীনতা। পলাশীর এই যুদ্ধকে কোনো কোনো হিন্দু লেখক ‘দেবাসুর সংগ্রাম’ নামে অভিহিত করেছেন। এখানে ‘দেবতা’ হলেন ক্লাইভ আর ‘অসুর’ রূপে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার লড়াইয়ের শহীদ তরুণ নবাব সিরাজকেই চিহ্নিত করা হয়। পলাশীর শোকাবহ বিপর্যয়কে কলকাতায় ‘পলাশীর বিজয়োৎসব’ রূপে পালন করা হয় এবং দুর্গাদেবীর অকালবোধনের মাধ্যমে বসন্তকালীন দুর্গোৎসবকে শারদীয় দুর্গোৎসব রূপে পালন করে ক্লাইভকে দেবতুল্য সংবর্ধনা দিয়ে বরণ করা হয়েছিল। (সূত্র : আমাদের জাতিসত্তার বিকাশধারা, পৃষ্ঠা ২৫-২৬)।

সাম্প্রদায়িকতাকে ইসলাম প্রশ্রয় দেয় না। ফলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিও এ দেশের মানুষ মেনে নেবে না। ইসলাম নিজেই একটি অসাম্প্রদায়িক ধর্ম। শুধু ধর্মীয় কারণে কাউকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার রেকর্ড ইসলাম ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা হজরত মুহাম্মদ সা:-এর জীবনীতে পাওয়া যায় না। অথচ যারা ইসলাম ধর্ম নিয়ে কথা বলে, তাদের সাম্প্রদায়িক আখ্যা দেয়া হয়। ‘ধর্ম’ কোনো কারণেই কাউকে নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হতে পারে না।

ধর্মকে বাদ দিয়ে বা উপহাস করে যারা সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাদের মায়াকান্নায় বিভ্রান্ত হলে চলবে না। ধর্মই মানুষের জীবনের প্রধান সংস্কৃতি। বকধার্মিক নয়, বরং সৃষ্টিকর্তার নিকট জবাবদিহিতার মানসিকতাই একজন ধার্মিকের প্রধান পরিচয়। পরিস্ফুটিত বা আলোকিত হবে নিজ কর্ম থেকে এবং মানুষ হিংস্রভাবে নয়, বরং মানবিক গুণাবলি নিয়ে বেঁচে থাকে। এই সেই বাংলাদেশ, যেখানে দু’জন রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক খুন হয়েছেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি (এরশাদ/মোশতাক) কারাবন্দী হয়েছেন, বর্তমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীদ্বয় জেল খেটেছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের পুলিশ পেটায় (বাবর, মতিন চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম)। ধমকের মুখে চাকরিরত অবস্থায় প্রধান বিচারপতিকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়, সাবেক প্রধান সেনাপতিকে আমেরিকায় কুকুরে তাড়া করে, সাবেক প্রধান উপদেষ্টাকে জনতার রোষানলে পড়ে পালাতে হয় জানাজার নামাজ থেকে, এসব দেখার পরও ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী মনে করে বিরোধীদের ওপর নিপীড়ন করা হচ্ছে। তাতে বর্তমান শাসকদের ভাগ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে কি কোনো বোধোদয় হচ্ছে? একটু সতর্কতা বোধ কি তাদের মধ্যে কাজ করবে না? তাই সময় ফুরানোর আগেই অবচেতন মন বলে- ‘সাধু সাবধান’!হ
লেখক : কলামিস্ট ও আইনজীবী (আপিল বিভাগ)


আরো সংবাদ