১৭ আগস্ট ২০১৮

সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক

সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক - ছবি : সংগৃহীত

সংস্কৃতি কী
সংস্কৃতি কী এবং কী নয়, এ সম্পর্কে বিতর্ক রয়েছে ১০০ বছর ধরে। এ বিতর্ক বেড়ে যায় মার্কসবাদের উত্থানের পর। মার্কসবাদের উত্থানের পর একটি নতুন দর্শন আসে Art for life sake নামে। তখন এ নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয় : Art for art sake bv Art for life sake। এ বিতর্ক আগে ছিল না। কমিউনিস্টরা এ বিতর্ক তুলে ধরে। এটি করতে গিয়ে তারা বাড়াবাড়িও করে। আর্ট এখানে সংস্কৃতি অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। সংস্কৃতির ভেতর যে একটি সৌন্দর্য থাকতে হবে, তা তারা হাইলাইট করতে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। তারা সম্পূর্ণভাবে এটিকে উপেক্ষা করে।

অন্য দিকে, যারা ‘আর্ট ফর আর্টস সেক’-এর পক্ষে, তারাও এ ইস্যুকে রাজনীতিকায়ন করেছেন। তারা বলেন, আর্ট আর্টের জন্য। অর্থাৎ এর মধ্যে সৌন্দর্য থাকতে হবে; সৌন্দর্যের চেতনা থাকতে হবে। জীবনের বিভিন্ন দিককে সাহিত্যকলায় যা কিছুই সুন্দর করে এবং সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তাই সংস্কৃতি।
সংস্কৃতির প্রশ্নে যদি আমরা সুবিচার করতে চাই, তাহলে সেখানে আর্ট বা সংস্কৃতিতে দু’টি দিকই থাকতে হবে। জীবনের জন্য তা প্রয়োজনীয় হতে হবে। জীবনের জন্যই হবে, জীবনকে বাদ দিয়ে নয়। এর মাধ্যমে জীবনকেই ধারণ করতে হবে। এটিই সত্য কথা। অন্য দিকে এটিও সত্য, যা কিছু সুন্দর নয় তা আর্ট বা সংস্কৃতি হবে না, তা জীবনের জন্য হলেও। কাজেই দু’টি উপাদানই প্রয়োজন; দু’টিই সত্য। এ বিতর্কের পরিসমাপ্তির প্রয়োজন রয়েছে। তবে আমার মনে হয়, বর্তমানে তার পরিসমাপ্তি কিছুটা হয়েও গেছে। মার্কসিজমের পতনের পর এ বিতর্ক আর খুব একটা আছে বলে মনে হয় না।

যেকোনো আদর্শভিত্তিক দলও এ কথা তুলতে পারে যে, আর্ট ফর লাইফ সেক। এটি তারাও নিয়ে নিতে পারে। এটি কেউ কেউ কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়েও নিয়েছে। কিন্তু এটি প্রয়োজনীয় নয়। এ বিতর্ক ইসলামপন্থীদের দরকার নেই। ইসলামপন্থীদের সংস্কৃতির মধ্যে এ দু’টি বিষয়ের সমন্বয় ঘটাতে হবে।
এ তাত্ত্বিক কথার বাইরে বলা যায়, সংস্কৃতির বহু দিক রয়েছে। বহু ডাইমেনশন রয়েছে। সাহিত্য, শিল্প, সিনেমা, নাটক- সবই সংস্কৃতির অংশ।

সংস্কৃতির ডাইমেনশনের কথা বলতে গিয়ে তার বিভিন্ন ডাইমেনশনের কথা আসে। সঙ্গীত, সাহিত্য থেকে আরম্ভ করে নাটক, সিনেমা- সব কিছুই সংস্কৃতির মধ্যে রয়েছে। আরেক দিক থেকে বলতে গেলে বলা যায়, মানুষের জীবনাচারই সংস্কৃতি। মানুষের গোটা জীবনপদ্ধতিই সংস্কৃতি। সে হিসেবে সংস্কৃতির আরো ব্যাপক অর্থ দাঁড়ায়।
সংস্কৃতির সংজ্ঞার ক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু মৌলিকভাবে আমরা স্বীকার করি, সংস্কৃতি একটি ব্যাপক বিষয়। সংস্কৃতি গোটা জীবনব্যবস্থার সাথেই সংশ্লিষ্ট। সংস্কৃতি প্রতিটি জাতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এর যেমন অনেক দিক বা ডাইমেনশন রয়েছে, তেমনি সর্বোপরি এটি জীবনকে সার্ভ করতে হবে। সৌন্দর্যকেও সার্ভ করতে হবে। আবারো বলি, সংস্কৃতিকে সুন্দরও হতে হবে এবং জীবনের জন্যও হতে হবে।

সংস্কৃতি ও মানুষ
সংস্কৃতি ও মানুষকে আলাদা করা যায় না। তবে এভাবে বলা যায়, ‘সংস্কৃতির জন্য মানুষ নয়; মানুষের জন্য সংস্কৃতি।’ সংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা সমাজ কল্পনা করা যায় না। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে সংস্কৃতি রয়েছে। ব্যক্তির একটি স্বতন্ত্র সংস্কৃতিও রয়েছে। তার চালচলন আর স্বভাবের মধ্যে সেসব পরিস্ফুটিত হয়ে ওঠে। প্রতিটি পরিবারের একটি সংস্কৃতি রয়েছে। তার মধ্যেও স্বাতন্ত্র্য থাকতে পারে। তার ধরনে, বলনে, কথনে, বক্তব্যে, চলনে এটা থাকতে পারে; সমাজের থাকতে পারে; একটি জাতির থাকতে পারে। সুতরাং সংস্কৃতির বাইরে মানুষ নয়। আবার মানুষের বাইরেও সংস্কৃতি নয়।
সংস্কৃতির ভিত্তি

সংস্কৃতিকে কয়েকটি ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে হবে। সুস্থ বিশ্বাসের ওপর সংস্কৃতিকে দাঁড়াতে হবে। যদি দুর্নীতিগ্রস্ত চিন্তার (করাপট থট) ওপর সংস্কৃতি দাঁড়ায়, সে সংস্কৃতিও দুর্নীতিগ্রস্ত হবে। কারণ বিশ্বাস আচরণকে প্রভাবিত করে। সংস্কৃতি হচ্ছে আচরণ- তার পেছনে রয়েছে বিশ্বাস। এ বিশ্বাস দুর্নীতিগ্রস্ত হলে আচরণও তাই হবে। বিশ্বাস সুস্থ হলে সেটিও সুস্থ হবে।

এখানে মুসলিম জাতির কথা বললে তার ভিত্তি অবশ্যই তাওহিদ হতে হবে। তাওহিদ বলতে আমরা বুঝি, একজন স্রষ্টা রয়েছেন। সব সৃষ্টির একটি উদ্দেশ্য রয়েছে। আমরা মানুষ এবং আল্লাহর প্রতিনিধি। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে তার মিশনকে এ বিশ্ব, আকাশ- সর্বত্র কার্যকর করা। এ জন্য মুসলিম সংস্কৃতিকে সব সময়ই শিরকমুক্ত হতে হবে। মুসলিম সংস্কৃতি এমন হতে হবে যেন খলিফার মর্যাদা রক্ষা পায়। তাঁর যে প্রতিনিধি মানুষ, তার সাথে যেন খাপ খায়। অর্থাৎ তা ভদ্র হতে হবে। সৌন্দর্যমণ্ডিত হতে হবে। মার্জিত হতে হবে। অমার্জিত হলে চলবে না। এটি অশ্লীলতামুক্ত হতে হবে।
লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার


আরো সংবাদ