২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮
রাজনৈতিক সমীক্ষা-৪

তৃণমূল রাজনীতিতে দলীয় আনুগত্য ও মানুষের ভালোবাসা

তৃণমূল রাজনীতিতে দলীয় আনুগত্য ও মানুষের ভালোবাসা - ছবি : নয়া দিগন্ত

তৃণমূল রাজনীতির স্তর : উপজেলা
‘তৃণমূল রাজনীতি’ বলতে সাধারণত ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের নির্বাচনী রাজনীতি বোঝায়। ১৯৮৫ সালে জেনারেল এরশাদের আমলে উপজেলা পদ্ধতি প্রবর্তিত হয়; তখন আইনশৃঙ্খলার স্তর আলাদা করা হয়; এখনো সেরকম চলছে। উপজেলা স্তরের উপরে কেন্দ্রীয়ভাবে সমগ্র দেশের জন্য প্রযোজ্য নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্বশীল স্তর হচ্ছে জাতীয় সংসদ বা পার্লামেন্ট। বাংলাদেশ পার্লামেন্টের জন্য ৩০০টি নির্বাচনী আসন আছে। প্রত্যেকটি নির্বাচনী আসনের এলাকা বা জনসংখ্যা সমান নয়, তবে মোটামুটি একটি নীতিমালার উপর প্রতিষ্ঠিত। আজকের কলামে বাংলাদেশের সব নির্বাচনী এলাকার কথা তুলে ধরতে পারব না; প্রতীকী অর্থেই একটি এলাকার কথা তুলে ধরব। ওই নির্বাচনী এলাকার বিস্তৃতি বা সীমানা হলো চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলা পূর্ণভাবে এবং হাটহাজারী উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১ ও ২ নম্বর ওয়ার্ড। নির্বাচনী আসনটি হলো চট্টগ্রাম-৫।

একটি প্রসিদ্ধ উপজেলা
হাটহাজারী উপজেলার পূর্ব পাশের সীমান্ত হচ্ছে বিখ্যাত নদী হালদা। জ্ঞানীরা বলেন, ‘স্বর্ণগর্ভা হালদা’। প্রতি বছর বৈশাখ মাসের শুরুর দিকে কোনো একটি সুনির্দিষ্ট চন্দ্র-তিথিতে, ঝড় বাদল পূর্ণ রাতে বা দিনে, এই হালদা নদীর একটি সুনির্দিষ্ট অংশে মিঠা পানির কয়েক প্রজাতির মাছ ডিম ছাড়ে। সেই ডিম জেলেরা সংগ্রহ করেন; সেই ডিম থেকে মাছের পোনা উৎপন্ন হয়; সেই পোনা দেশব্যাপী বিস্তৃত হয় বাণিজ্যিকভাবে; মৎস্য চাষীরা পুকুরে বা জলাশয়ে মাছ চাষ করেন; পরবর্তীতে সেই মাছ দেশীয় বাজারে যেমন বিক্রি হয়, তেমন বিদেশেও রফতানি হয়। পূর্ণ প্রক্রিয়ায় চার হাজার কোটি টাকার অধিক মূল্যের বাণিজ্য হয়ে থাকে। এ জন্যই হালদা নদীকে বলা হয় ‘স্বর্ণগর্ভা’। এই হালদা বাংলাদেশে তো বটেই, এশিয়া মহাদেশেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। হাটহাজারী উপজেলার সর্বশেষ ইউনিয়নের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে উত্তর বুড়িশ্চর গ্রাম, হালদা নদীর তীরে, এখানে আমার জন্ম এবং বংশের শেকড় নিহিত। চট্টগ্রাম থেকে কাপ্তাই যাওয়ার প্রধান সড়কের উপরেই, হালদা নদীর উপর মদুনাঘাট ব্রিজের আগেই আমার জন্মভিটা।

ওয়াহিদুল আলম এবং আমাদের পরিবার
আজকের রচনা উপস্থাপনার জন্য আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি একজন মানুষের রাজনৈতিক জীবন ও রাজনৈতিক কর্ম দ্বারা এবং গত ২৮-২৯ মে (সোম ও মঙ্গলবার) তার সেই কর্মের প্রতিফলন দেখে। আমি নিজে একজন নবীন রাজনৈতিক কর্মী। অনুপ্রাণিত হয়েছি আরেকজন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ সফল রাজনৈতিক নেতার জীবন ও কর্মে। তিনি তৃণমূল পর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মী ও জাতীয় পর্যায়ের নেতা। যার কথা বলছি তিনি হলেন সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম। তার বাবা হচ্ছেন মরহুম আলহাজ সৈয়দ আব্দুস সাত্তার। তার জন্মস্থানের প্রসিদ্ধ নাম লালিয়ারহাট; চট্টগ্রাম থেকে হাটহাজারী যাওয়ার প্রধান সড়কের উপরেই এটি অবস্থিত। মরহুম সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম পারিবারিক সূত্রে আমার মামা; আমার একমাত্র চাচী সানোয়ারা বেগমের ছোট ভাই। ওয়াহিদুল আলম বয়সে আমার দুই-তিন বছরের বড়। তিনি আমার মরহুম বাবার অতি ঘনিষ্ঠ, অসম বয়সের বন্ধু এবং আস্থাভাজন ছিলেন। তিনি আমার বাবাকে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ পরামর্শক ও গুরুজন হিসেবে গণ্য করতেন। সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের প্রথম সন্তান ব্যারিস্টার সৈয়দা শাকিলা ফারজানা, যিনি জাতীয়তাবাদী আইনজীবী সংগঠনের সাথে সক্রিয়ভাবে নেতৃত্বস্থানীয় পর্যায়ে সংযুক্ত। ফারজানা হাটহাজারী এলাকাতেও জনগণের কাছে একজন শ্রদ্ধাভাজন রাজনৈতিক নেতা। দ্বিতীয় সন্তান সৈয়দা আকলিমা ফারজানা। তিনি একজন ব্যস্ত সমাজসেবক। মরহুম ওয়াহিদুল আলমের স্ত্রী ফরিদা ওয়াহিদ, বৃহত্তর চট্টগ্রামের চকরিয়া উপজেলার একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের বিদূষী সন্তান। ওয়াহিদুল আলমের জনমুখী পরিশ্রমী কর্মকাণ্ডের প্রেরণা ও উৎসাহের ভাণ্ডার ছিলেন তিনি। আমার মরহুম বাবার জ্যেষ্ঠতম ফুফুর শ্বশুরবাড়িও ছিল ওই লালিয়ারহাট সংলগ্ন গ্রামে।

মৃত্যু সবাইকে একত্র করল
মানুষকে ভালোবাসতে হয়, মানুষকে ভালোবাসা যায় এবং মানুষকে ভালোবাসলে ভালোবাসার মাধ্যমেই মানুষ সেটার সম্মান রক্ষা করে। এর উজ্জ্বল উদাহরণ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের রাজনৈতিক জীবন। মূলত এই কথাটি তুলে ধরার জন্যই আজকের কলামের অবতারণা। উদ্দেশ্য, যাতে তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক কর্মীরা দিকনির্দেশনা পেতে পারেন। মৃত্যু এবং পরে ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানের কথা দিয়েই শুরু করি। ২০১৮ সালের ২৭ মে সন্ধ্যা ৭:৪০-এর দিকে খবর পেলাম, সাবেক সংসদ সদস্য তথা আমার মামা সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম ইন্তেকাল করেছেন। প্রায় দুই বছর আগে তিনি দ্বিতীয়বার ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন। দেশ-বিদেশে চিকিৎসা নিয়েও সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। মৃত্যুসংবাদ কানে আসা মাত্রই হাটহাজারী ও চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ হাসপাতালে ছুটে গেলেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও ছুটে গেলেন। বর্তমান সংসদে চট্টগ্রাম-৫ আসনের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত এমপি ও মন্ত্রিসভার সদস্য, হাটহাজারীর সন্তান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রী এবং বিএনপির অন্যতম ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান, সাবেক প্রতিমন্ত্রী-সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বর্তমানে বিএনপির অন্যতম ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল ইবরাহিম বীর প্রতীক, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মীর হেলাল, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি ডাক্তার শাহাদত হোসেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডাক্তার ফাইয়াজ হোসেন শুভ, সাংবাদিক নেতা ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য কাদের গণি চৌধুরীসহ অনেকেই হাসপাতালে সমবেত হন। দলমত নির্বিশেষে একজন পরলোকগত জননেতার প্রতি শ্রদ্ধা ও মর্যাদাপূর্ণ বিদায় জানানোর জন্য ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ওয়াহিদুল আলমের সদ্য বিধবা স্ত্রী এবং বড় মেয়ে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা এতে সহায়তা করেন। রাজনৈতিক নেতা হিসেবেও ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা তার বাবার নির্বাচনী আসনের জনগণের কাছে সুপরিচিত ও শ্রদ্ধাভাজন।

জানাজায় সব দলের নেতাকর্মী ও মানুষের ঢল
ওয়াহিদুল আলম সর্বশেষ পার্লামেন্ট সদস্য ছিলেন ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত। প্রায় সাড়ে ১১ বছর পর তিনি ইন্তেকাল করেছেন। সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের প্রথম জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয় ঢাকার মোহাম্মদপুর কাদেরিয়া তৈয়বিয়া আলিয়া মাদরাসা প্রাঙ্গণে ২৭ মে রাতে। দ্বিতীয় জানাজা জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ২৮ মে বেলা ১১টায়। তৃতীয় জানাজা হয় সেদিন দুপুর সাড়ে ১২টায়, ঢাকার নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে। তারপর মৃতদেহ হেলিকপ্টারে করে চট্টগ্রাম নিয়ে যাওয়া হয়। ২৮ মে বাদ আসর চট্টগ্রাম মহানগরের বিখ্যাত জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদ প্রাঙ্গণে চতুর্থ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ১০ হাজারের বেশি মানুষ শরিক হয়েছিলেন। চট্টগ্রাম মহানগরের সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং সামাজিক নেতৃবৃন্দ, আলেম-ওলামা জানাজায় অংশগ্রহণ করেন। ২৯ মে বেলা ১১টায় হাটহাজারী উপজেলার সদরে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের মাঠে পঞ্চম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এর প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, স্মরণকালের কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক নেতার জন্য এতবড় জানাজা এই মাঠে অনুষ্ঠিত হয়নি। যদিও মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ (জেনারেল এরশাদের) জাতীয় পার্টির সদস্য এবং ওয়াহিদুল আলমের ঘোরতর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন, তথাপি ব্যারিস্টার আনিসই হাটহাজারী উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেন, যেন জানাজার সব প্রশাসনিক বন্দোবস্ত করা হয়। এখানেও হাটহাজারী উপজেলার এবং প্রতিবেশী উপজেলাগুলোর সব দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। ষষ্ঠ এবং শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হয় লালিয়ারহাটের প্রধান সড়কের পাশেই মাদরাসা প্রাঙ্গণে। উল্লেখ্য, এখানেই মরহুমের নিজ বাড়ি। সেই জানাজাতেও হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত ছিলেন এবং নামাজের কারণে প্রধান সড়ক প্রায় ২০ মিনিট বন্ধ ছিল। হাটহাজারীতে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখি; লালিয়ারহাটে উপস্থিত ছিলাম, বক্তব্য রাখি এবং জানাজায় অংশগ্রহণ করি। মীর নাসির, ব্যারিস্টার আনিস এবং উপজেলা চেয়ারম্যান, তারাও হাটহাজারীতে বক্তব্য রেখেছেন।

পরিচয়ের অনেকগুলো আঙ্গিক
আমি হাটহাজারী উপজেলার সন্তান। এলাকার জনগণের কাছে আমার পরিচিতি ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে বা ভিন্ন ভিন্ন সুবাদে। যেমন- কেউ চেনেন রণাঙ্গণের মুক্তিযোদ্ধা বীর প্রতীক হিসেবে, কেউ চেনেন কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে, কেউ চেনেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা হিসেবে, যিনি রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে সততার ও সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলে তাদের বিশ্বাস, কেউ চেনেন ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা যিনি ম্যাডাম খালেদা জিয়ার আস্থাভাজন, কেউ চেনেন শহীদ জিয়ার অনুসারী ও ভক্ত হিসেবে, কেউ চেনেন তারুণ্য-বান্ধব রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে, কেউ চেনেন পত্রিকায় জনপ্রিয় কলাম লেখক হিসেবে, কেউ চেনেন টেলিভিশন টকশোতে স্পষ্টবাদী সৌজন্যপ্রিয় বক্তা হিসেবে, কিংবা একজন ইসলামি চিন্তাবিদ ও বক্তা অথবা নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিসেবে। বিশেষত হাটহাজারীতে কেউ চেনেন সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের ভাগিনা হিসেবে। গত ছয় বছর আট মাস রাজনৈতিকভাবে নিজের সময়, সম্পদ ও মেধাকে দুই জায়গায় বিনিয়োগ করেছি। প্রথমটি হলো হাটহাজারী উপজেলা তথা চট্টগ্রাম-৫ নির্বাচনী আসন এবং দ্বিতীয়টা হলো ঢাকাসহ অবশিষ্ট বাংলাদেশ, ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে এই জোটেরই অনুকূলে এবং বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি আনুগত্যে। ছয় বছর আট মাস আগে যখন কল্যাণ পার্টি নতুন ১৮ দলীয় জোটে প্রবেশ করছিল, আমার রাজনৈতিক জীবনের সেই গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে, দেশনেত্রী বেগম জিয়া নির্দেশ দিয়েছিলেন, আমি যেন আমার সময়, মেধা ও সম্পদ নিজের জন্মস্থানে ব্যয় করি।

ওয়াহিদুল আলমের পক্ষ থেকে স্বাগত
আমার মামা সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম হাটহাজারীতে আমার রাজনৈতিক কর্মজীবনের সূচনাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। ১১ নভেম্বর ২০১১ সালে ওয়াহিদুল আলমের মা, আমার নানী ইন্তেকাল করেন; তার ছয়দিন পর চট্টগ্রামের ধর্মীয়-সামাজিক রেওয়াজ অনুযায়ী নানীর সম্মানে মেজবান অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই সময় মামার সাথে অনেক ইন্টার-অ্যাকশন হয়। আবেগমিশ্রিত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘ভালোই হলো, মামা-ভাগ্নে একসঙ্গে থাকব, মামা না থাকলে ভাগিনা থাকবে’। তার অভিজ্ঞতা আমার চিন্তা-চেতনায় ধাবিত করার জন্য সর্বদাই আগ্রহী ও তৎপর থাকতেন। সেই সুবাদে হাটহাজারী উপজেলার জাতীয়তাবাদী ঘরানার সর্বস্তরের নেতাকর্মীর সাথে আমার নিবিড় ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে, কারো সাথে কম কারো সাথে বেশি। এই অভিজ্ঞতার আলোকে ২৭-২৮-২৯ মে ২০১৮, এই তিন দিনের দৃশ্যপট মূল্যায়ন করলাম। সব পর্যায়ের সব রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী জানাজার মাঠে মাইকে হোক অথবা আলাপচারিতার সময় হোক, একবাক্যে স্বীকার করেছেন অনেকগুলো কথা। ওয়াহিদুল আলম সব মানুষকে সাথে সাথে আপন করে নিতে পারতেন এবং করতেনও। তিনি সব ধর্মের মানুষকে নিয়ে চলতেন প্রত্যেককেই প্রাপ্য মর্যাদা দিয়ে। তিনি সব রাজনৈতিক দলের মানুষকে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন; সন্ত্রাস, প্রতিহিংসামূলক কর্মকাণ্ডকে কোনো দিনই উৎসাহিত করেননি বা কোনো প্রশ্রয় দেননি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেননি। তিনি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেননি। হাটহাজারী উপজেলায় অবস্থিত কওমি শিক্ষাধারার দেশ বিখ্যাত বৃহৎ মাদরাসা দারুল উলুম মইনুল ইসলামসহ সব কওমি মাদরাসার প্রতি সম্মানের মনোভাব পোষণ করতেন এবং সহযোগিতা করতেন। অনুরূপভাবে একই উপজেলারই ছিপাতলী ইউনিয়নে পীর-এ-তরিকত হজরত মাওলানা আজিজুল হক আল-কাদেরি প্রতিষ্ঠিত জামেয়া গাউসিয়া মঈনীয়া বহুমুখী কামিল মাদরাসাসহ অন্যান্য আলিয়া মাদরাসার প্রতিও সম্মানের মনোভাব দেখিয়ে সহযোগিতা করতেন। বহু জননেতা নিজ নিজ এলাকায় স্কুল -কলেজ ও মাদরাসা স্থাপন করে থাকেন। স্কুল-কলেজের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠাকারীরা সাধারণত প্রতিষ্ঠানের নামের সাথে নিজের নাম যুক্ত রাখেন। কিন্তু সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম নিজ উদ্যোগে নিজের ইউনিয়নে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন যার নাম তিনি তার প্রিয় নেতার নামে দিয়েছেন। কলেজটির নাম কে সি জিয়াউর রহমান কলেজ। এটি একটি বিরল ও অনুকরণীয় ঘটনা।

বাস্তবতার আলোকে রাজনৈতিক শিক্ষক
মামার সাথে প্রচুর গল্প হয়েছে, প্রচুর রাজনৈতিক আলাপ হয়েছে, কিন্তু বেশির ভাগই একান্তে বা সামাজিক পরিবেশে। গল্পচ্ছলে আলাপের সময় তার রাজনৈতিক কর্মজীবনের অনেক মিষ্টি অভিজ্ঞতা, অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন এবং আমাকে বলতেন, রাজনীতি করতে গেলে অনেক রকমের অপ্রত্যাশিত বিপদ-আপদ আসে, সেগুলো ধৈর্যের সাথে, বুদ্ধি দিয়ে মোকাবেলা করতে হয়। মামা বলতেন, প্রত্যেক রাজনৈতিক দলে সংসদীয় আসনভিত্তিক এলাকায় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকতে বাধ্য। মামা বলতেন, প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন কোনো দিন সামাজিক ও আত্মীয়তার সম্পর্কে প্রভাব না ফেলে, সেটা খেয়াল রাখতে হবে। আমাকে উৎসাহিত করতেন, কারণ তিনি আমার রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির ব্যস্ত জীবন এবং সফল কর্মকাণ্ডের সাথে পরিচিত ছিলেন। মামা বলতেন, ‘পাহাড়ি মানুষকে তুমি আপন করে নিয়েছিলে, তোমার জন্মস্থানের মানুষকে আপন করে নেয়া তোমার জন্য কোনো ব্যাপারই না। পাহাড়ে যেমন ছেলেমেয়েদের আদর করতে, পাহাড়ি মুরব্বিদের যেমন সম্মান করতে, তেমনি হাটহাজারী এলাকাবাসীকেও সম্মান করবে, আপন করে নেবে। অবশ্যই এলাকার মানুষকে বুকের ভেতরে ধারণ করবে। দোয়া করি তোমার সাফল্যের জন্য।’

মাটি ও মানুষের সাথে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক
সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের কর্মময় রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় হাটহাজারী উপজেলার প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে ১৯৮৫ সালে। তখন তার বয়স ছিল ৩৮ বছর। নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে যেমন প্রতি পাড়া-মহল্লায় গিয়েছেন, তেমনি নির্বাচিত হওয়ার পরও সর্বত্র যেকোনো প্রয়োজনে, যেকোনো অনুষ্ঠানে, ছোট-বড় নির্বিশেষে, সব জায়গায় যাতায়াত করতেন। এই সুবাদে উপজেলাব্যাপী মানুষের সাথে তার নিবিড় পরিচয় ও হৃদ্যতা ছিল। এই কারণে তার প্রতি মানুষের সম্মান, ভালোবাসা এবং জনপ্রিয়তা সর্বদাই দৃশ্যমান হতে থাকে। এর প্রতিফলন দেখা গেছে ২৭, ২৮, ২৯ মে’র অনুষ্ঠানে। এই পৃথিবী থেকে তার বিদায় যাত্রায় মানুষ অশ্রুসজল নয়নে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে প্রার্থনা করে তাকে বিদায় দিয়েছেন। ১৯৯১ সালে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন; ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্বিতীয়বার এবং সে বছর জুনে তৃতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এরপর বিরোধীদলীয় হুইপ মনোনীত হয়েছিলেন। ২০০১ সালে চতুর্থবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং সরকারদলীয় হুইপ মনোনীত হন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচন যদি হস্তক্ষেপবিহীন হতো, তাহলে তিনি আবারো নির্বাচিত হতেন এবং বিপুল ভোটে নির্বাচিত হতেন বলেই আমাদের বিশ্বাস।

হাটহাজারীর এমপিরা : মুক্তিযোদ্ধা?
বাংলাদেশের ৩০০টি নির্বাচনী আসনে বহু ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু কোনো কোনো আসনের ব্যক্তিরা নিজ বৈশিষ্ট্যে জনগণের স্মৃতিতে উজ্জ্বল ও ভাস্বর থাকেন। কোনো কোনো ব্যক্তিত্ব নিজ কর্মপরিচয়ে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশের একমাত্র নোবেলবিজয়ী ব্যক্তিত্ব ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বাড়ি হাটহাজারী উপজেলায়। হাটহাজারীর সন্তান অনেক আমলা সচিব হয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ স্বরাষ্ট্র সচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব হয়েছেন হাটহাজারীর সন্তান আবদুুল করিম। ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের আপন নানা ব্যারিস্টার ড. মাওলানা সানাউল্লাহ ছিলেন অবিভক্ত বাংলার মুসলমানদের মধ্যে একদম গোড়ার দিকের ব্যারিস্টার ও ডক্টরেট। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অন্যতম প্রধান লে. জেনারেল হারুন অর রশিদ বীর প্রতীকের বাড়িও হাটহাজারী। স্বাধীন বাংলাদেশে হাটহাজারী আসনের প্রথম সংসদ সদস্য ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল ওয়াহাব (জনগণের কাছে সুপরিচিত ‘ওয়াহাব মিয়া’ নামে)। হাটহাজারীর মানুষ আবেগাশ্রিত আরেকজন মুক্তিযোদ্ধাকে হাটহাজারী আসনে দেখার জন্য; কিন্তু তারা এর জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনা করেন। ১৯৭৯ সালে বিএনপির টিকিটে নির্বাচিত হন ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। পরবর্তী দুই সংসদ নির্বাচন তথা ১৯৮৬ এবং ১৯৮৮ সালে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ জাতীয় পার্টির টিকিটে নির্বাচিত হলেন। ২০০৮ সালে ১৪ দলীয় জোটের মনোনয়নে ব্যারিস্টার আনিস জাতীয় পার্টির টিকিটে নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১৪ সালে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ক্ষমতাসীন জোট থেকে নির্বাচিত হন। যা হোক দলের প্রতি আনুগত্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম।

শেষ প্রার্থনা
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে, ফেনী নদীর দক্ষিণে এবং নাফ নদীর উত্তরে যে জনপদ, যার নাম বৃহত্তর চট্টগ্রাম, সেই জনপদে সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম একজন সফল জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা এবং মাটি ও মানুষের নেতা হিসেবে, মানুষের স্মৃতিতে দীর্ঘ দিন উজ্জ্বল থাকবেন। ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক নিজেও মরহুম ওয়াহিদুল আলমের রাজনৈতিক জীবন থেকে কিছু শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং তরুণ সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন, তারাও যেন সেই পথে আগ্রহী হন।হ

লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি

 


আরো সংবাদ