১৫ নভেম্বর ২০১৮

একরামের মৃত্যু বনাম জোসেফের মুক্তি

একরামের মৃত্যু বনাম জোসেফের মুক্তি - ফাইল ছবি

বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারে মৃত্যুর একটি গল্প থাকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গল্প আর নিহত ব্যক্তির পরিবারের গল্প এক নয়। মাদকবিরোধী অভিযানে কক্সবাজারে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার আগে টেকনাফের পৌর কাউন্সিলর একরামুল হকের সাথে টেলিফোনে ‘শেষ কথোপকথনের’ অডিও রেকর্ড প্রকাশ করেছে তার পরিবার। এতে মৃত্যুর আগের আসল গল্পটি জানা গেছে।

মৃত্যুর আগে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় পর্যায়ের এই নেতার সাথে কথা হয় তার সন্তানের। মেয়ে বাবার কাছে জানতে চান তার আসতে কত সময় লাগবে। বাবা বলছেন, এই তো আসছি আম্মু; তুমি ঘুমাও। এরপর ফোন কেটে যায়। মেয়ে আবার ফোন করে। ‘আব্বু তুমি কোথায় যাচ্ছো’? ‘যাচ্ছি, যেতে হচ্ছে মা’...। মেয়ে বলছে, ‘আব্বু, তুমি কান্না করতেছ যে...।’ এভাবে দু’বার কথা বলার পর পরবর্তী সময়ে ফোনে শোনা যায় অপর প্রান্তে গুলির শব্দ, পুলিশের সাইরেন, চিৎকার-হাঁকডাক ও গালিগালাজ এবং এ প্রান্তে একরামের দুই কন্যা আর স্ত্রীর আহাজারি। সব মিলিয়ে লোমহর্ষক এক পরিস্থিতির বিবরণ উঠে এসেছে অডিও রেকর্ডে। একরামের ফোন খোলা ছিল বলে এ প্রান্তে পুরো ঘটনাপ্রবাহ রেকর্ড হয়েছে ফোনের অটোরেকর্ডারে।

ফোন সচল থাকা অবস্থায় গুলির শব্দ পান তার স্ত্রী ও সন্তানেরা। একটি ইংরেজি দৈনিকে কথোপকথনের পূর্ণ বিবরণ আর অনলাইনে অডিও রেকর্ড প্রকাশ করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনার পর কক্সবাজারের এই হত্যার বিবরণ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে মানুষের সামনে উঠে এসেছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দু’টি ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের নেতা নিহত হয়েছেন। দু’টি ঘটনার পেছনে স্থানীয়পর্যায়ের ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব বিস্তারের রাজনীতির সম্পর্ক আছে। শীতলক্ষ্যা নদীতে লাশ ভেসে ওঠার কারণে নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের রহস্য উন্মোচিত হয়েছিল। একরাম হত্যার কথোপকথন মোবাইল ফোনে রেকর্ড হয়েছিল বলে তার পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে একরামুলের দুই কন্যার বুকফাটা আর্তনাদ মানুষকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছে।

আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা দাবি করেছেন, একরামুল হক মাদক ব্যবসায়ী ছিলেন না। তাছাড়া একরামুল মাদক ব্যবসায়ী হোক বা না হোক, বিচার ছাড়া এভাবে কোনো মানুষের মৃত্যু সভ্য সমাজে সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু মানুষকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়ে আমরা সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজছি। মাদক আসার রাস্তা বন্ধ না করে আমরা মানুষ মেরে মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে চাইছি। আবার ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে একই পথ গ্রহণ করছি। মাদকবিরোধী অভিযানে গত ১৮দিনে মারা গেছে ১২৭ জন। একরামুল হত্যার পর ক্ষমতাসীন দলের নেতারা এবং ‘প্রগতিশীল’ সাংবাদিকেরা সোচ্চার হয়েছেন। এর আগে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ও পরে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা এভাবে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন। সে সংখ্যাও তিন শতাধিকের ওপর। বিএনপির অভিযোগ, এ সরকারের সময় তাদের ৭৪৭ জন নেতাকর্মী অপহৃত হয়েছেন; সরাসরি ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে খুন’ হয়েছেন ৫২০ জন এবং ১৫৭ জন এখনো নিখোঁজ।

একরামুল নিহত হওয়ার ঘটনার পর ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও ক্ষমতাসীন দলের প্রতি অনুগত অনেক সাংবাদিকও এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এ পরিস্থিতি এক দিনে ঘটেনি। শিবির, ছাত্রদল ও জামায়াত বলে বহু মানুষকে এভাবে হত্যা করা হয়েছে। তখন ক্ষমতাসীন দলের বিবেকবান কোনো নেতা, প্রগতিশীল সাংবাদিক এমনকি মানবাধিকারজীবীরা নিশ্চুপ ছিলেন। তখন যদি বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে সবাই সোচ্চার হতো, আজকে এমন পরিস্থিতি হতো না। একরামের পরিবারের মতো খিলগাওয়ের ছাত্রদল নেতা জনির ১৭ টি গুলিবিদ্ধ লাশের ছবি কখনোই ভুলতে পারবে না তার সন্তান সম্ভবা স্ত্রী। কিংবা ঝিনাইদহের ১৬ বছরের কিশোর, শিবির কর্মী সোহানের চোখ উপড়ে ফেলা লাশের ছবি কিভাবে ভুলবেন তার বাবা- মা। ছাত্রদল কিংবা শিবিরের আরো যেসব কর্মী এভাবে হত্যার শিকার হয়েছেন কিংবা গুম হয়েছেন, তাদের পরিবারের সদস্যরা একই রকম আর্তনাদ করেছেন। গুম হওয়ার পরিবারের সদস্যরা পথচেয়ে আছেন, হয়তো তাদের প্রিয়জন ফিরে আসবেন। তথাকথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ মারা গেছেন, যাদের পিতামাতার চোখের জল এখনো মুছে যায়নি। এই গনমাধ্যমের একটি অংশ এসব রাজনৈতিক বিচারবর্হিভুত হত্যাকান্ডে সমর্থন যুগিয়েছে কিংবা হত্যাকান্ডের পক্ষে নায্যতা প্রমানের চেষ্টা করেছে। এখন ক্ষমতাসীন দলের নেতা বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন বলে বিরোধী দলের নেতারা নিশ্চুপ থাকতে পারেন না। আগেরবার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সন্ত্রাসী চিহ্নিত করে বন্দুকযুদ্ধ চালানো হয়েছে। এখন মাদকবিরোধী অভিযানের নামে ফিরে এসেছে। আগামীতে ভিন্ন নামেও ফিরে আসতে পারে।
২.
যুবলীগের সাবেক নেতা একরামুলের মাদক কারবারের প্রমাণ না পাওয়া গেলেও তিনি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে প্রাণ দিয়েছেন। অথচ একই সময়ে মানুষ হত্যায় দণ্ড পাওয়ার পর একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় মুক্তি পেয়েছেন। দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী তোফায়েল আহমেদ জোসেফ কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বিদেশে চিকিৎসার জন্য চলে গেছেন। সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা খুবই সীমিত। অনেকে বলে থাকেন, কবর জিয়ারত ও শপথ পাঠ ছাড়া রাষ্ট্রপতির আর কোনো ক্ষমতা নেই। কিন্তু রাষ্ট্রপতির ক্ষমার ক্ষমতা নিয়ে কয়েক বছর ধরে ব্যাপক আলোচনা চলছে। রাষ্ট্রপতি কারাদণ্ড পাওয়া যেকোনো আসামিকে ক্ষমা করতে পারেন। দণ্ডপ্রাপ্ত যে কাউকে ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতা রয়েছে রাষ্ট্রপতির। বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির পদ অনেকটা ‘আলঙ্কারিক’ হলেও সাংবিধানিকভাবে তিনি এই ক্ষমতার অধিকারী। সংবিধানের ৪৯ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির এই ক্ষমতা সম্পর্কে বলা হয়েছে- ‘কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত যেকোনো দণ্ডের মার্জনা, বিলম্বন ও বিরাম মঞ্জুর করিবার এবং যেকোনো দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করিবার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকিবে।’ শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফকেও রাষ্ট্রপতি এই ক্ষমতাবলেই অপরাধ মার্জনা করেছেন।

বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদের শাসনে রাষ্ট্রপতি এ ধরনের বহু অপরাধীকে ক্ষমা করে দিয়েছেন; যার মধ্যে বেশির ভাগ আবার খুনের মামলার আসামি। যারা ক্ষমা পেয়েছেন, তারা ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সাথে সম্পর্কিত। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা জিল্লুর রহমান। ওই বছরের নভেম্বর মাসে তিনি জাতীয় সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর ছেলে শাহাদাব আকবরকে ক্ষমা করে কারামুক্তির ব্যবস্থা করে দেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতি দমন কমিশন ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চারটি মামলায় পলাতক শাহাদাবকে ১৮ বছরের কারাদণ্ড ও এক কোটি ৬০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছিলেন আদালত। এরপর এক বছরের মাথায় ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে মৃত্যুদণ্ডের সাজা পাওয়া ২০ জনকে একসাথে ক্ষমা করে দেন রাষ্ট্রপতি। নাটোরে যুবদল নেতা সাব্বির আহমেদ গামা হত্যা মামলায় ওই সাজাপ্রাপ্তদের বেশির ভাগই ছিলেন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী। এভাবে ক্ষমার ধারাবাহিকতা চলতে থাকে। বছর ঘোরার আগেই ২০১১ সালের জুলাই মাসে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান লক্ষ্মীপুরের আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক পৌরমেয়র তাহেরপুত্র এ এইচ এম বিপ্লবের সাজা কমান । আলোচিত নুরুল ইসলাম হত্যাসহ অপর একটি হত্যা মামলায় ফাঁসির জন্য কারাগারে দিন গুনছিল বিপ্লব। মামলার বিভিন্নপর্যায়ে বিপ্লবের সাজা কমানোর আবেদন করা হয়েছিল, কিন্তু আপিল বিভাগ পর্যন্ত সব তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে বিপ্লব হত্যাকারী হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছিল। তার সাজা কমানোর আবেদন মঞ্জুর হয়নি। লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলামকে হত্যার পর তার লাশ টুকরো টুকরো করে মেঘনা নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছিল। এই মামলায় বিপ্লবকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন বিচারিক আদালত।

আদালতে ব্যর্থ হলেও অপরাধী ছেলেকে রক্ষা করতে বিপ্লবের বাবা তাহের তার রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহার করেন। মাত্র সাত মাসের ব্যবধানে দু’টি হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপতি দু’বার তার সাজা কমান। দুই ক্ষেত্রেই তার মৃত্যুদণ্ড থেকে কমিয়ে ১০ বছরের কারাদণ্ড করা হয়। ২০১৪ সালের মার্চ মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল সংসদে জানান, ২০০৯ থেকে এ পর্যন্ত মোট ২৯ জনের সাজা মওকুফ হয়েছে।
সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ খুনের মামলায় দণ্ড পাওয়া তোফায়েল আহমেদ জোসেফকে ক্ষমা করলেন। ১৯৯৬ সালের ৭ মে মোহাম্মদপুরে ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানকে গুলি করে হত্যার দায়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী তোফায়েল আহমেদ জোসেফকে ১৯৯৯ সালে মৃত্যুদণ্ড দেন বিচারিক আদালত। অবশ্য কোনো জটিল রোগ ছাড়াই ২০১৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৭ সালের ৮ মে পর্যন্ত টানা ২০ মাস কারাগারে না থেকে হাসপাতালে ছিলেন জোসেফ। রাষ্ট্রপতির ক্ষমার পর হাসপাতাল থেকে মুক্ত হয়ে বিদেশ চলে গেছেন জোসেফ। অপরাধীর সাজা মওকুফে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা থাকলেও এর সাথে রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। মূলত সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত থেকে রাষ্ট্রপতি আসামিদের ক্ষমা করে দেন। যদিও এ ধরনের সাজা মওকুফ করার ক্ষেত্রে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর সাথে পরামর্শ করার কথা উল্লেখ করা হয়নি। রাষ্ট্রপতি চাইলে সাজা মওকুফের সুপারিশ ফেরত পাঠাতে পারতেন। রাষ্ট্রপতি যদি এ ধরনের নৈতিক অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা দেখাতে পারতেন, তাহলে দেশে আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা আরো বেড়ে যেত।

সন্ত্রাসী জোসেফের মুক্তি আর একরামুলের মৃত্যুর মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রয়েছে। জবাবদিহিতাহীন একটি সরকার জনতুষ্টি কিংবা দায়বদ্ধতার জন্য যেকোনো সময় যেকোনো পথ গ্রহণ করতে পারে। কেন জোসেফের মতো শীর্ষ সন্ত্রাসী বা খুনের মামলার আসামিকে রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করছেন; অপর দিকে একরামুলের মতো তৃণমূলের নেতা বন্দুকযুদ্ধে মারা যাচ্ছেন। তার কারণ তাদের খুঁজতে হবে। এটি ক্ষমতাসীন দলের ঘোর মাদকতার মতো ক্ষমতার রাজনীতির অসুখ। বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা যে সব সময় এমন টার্গেট হবেন তা নয়, ক্ষমতাসীনেরাও এর ফাঁদে আটকে পড়তে পারেন। ফলে একরামুলের মৃত্যু এখন আর অস্বাভাবিক নয়।


আরো সংবাদ