২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

বিচারের বাণী সরবে সদর্পে কাঁদে

বিচারের বাণী সরবে সদর্পে কাঁদে - ছবি : নয়া দিগন্ত

প্রবাদটি ছিল এ রকম- ‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।’ সময়ের সাথে সাথে যেমন সবকিছুর পরিবর্তন ঘটে, এ প্রবাদটিরও পরিবর্তন হচ্ছে। আগের দিনে বিচারকরা রাজা-বাদশাহর বিপক্ষে বা বিরুদ্ধে রায় দিতে ভয় পেতেন। ‘অত্যাচারের খড়গ কৃপাণ’ প্রবহমান ছিল। তাই বিচার প্রার্থীরা ন্যায়বিচার না পেয়ে নীরবেই অশ্রুপাত করতেন। বিচারকরাও ছিলেন অসহায়।

কালক্রমে রাজতন্ত্রের পতন ও প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী হয়েছে মানবসভ্যতা। তাই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্রমশ বিকশিত হয়েছে। রাষ্ট্রের একটি অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিচার বিভাগ। অন্যান্য বিভাগ থেকে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র থেকে বিচার বিভাগ যাতে শাসন বিভাগের ক্ষমতার রাশ টেনে ধরতে পারে, সেজন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বার বার ‘ক্ষমতার ভারসাম্যে’র কথা বলেছেন। মনীষী মন্টেস্কু ‘ক্ষমতার বিভাজন’ নীতির উদ্ভব, বিকাশ ও প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। আধুনিক শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক দল একটি অপরিহার্য বিষয় হওয়ায় প্রায় সব রাষ্ট্রেই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। অনেক সময় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিছক শত্রুতায় পর্যবসিত হয়। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশে^ এটি অনেক প্রকট।

এ রকম একটি ‘রাজনৈতিক শত্রুতা’র উদাহরণ বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতির অভিযোগ। সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে উভয় নেত্রীর বিরুদ্ধে প্রায় সমসংখ্যক রাজনৈতিক মামলা করা হয়। ক্ষমতায় গিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার তাদের নেত্রীর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাগুলো খারিজ বা মীমাংসা করে নেয়। অথচ বিরোধী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একইভাবে দায়েরকৃত মামলাগুলো বহাল রাখে। শুধু তাই নয়, প্রতিটি মামলায় অভিযুক্তকরণ প্রক্রিয়া শেষে রায় বা শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

দেশের প্রধান বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম জিয়া যে মামলার রায়ে এখন কারাদণ্ড ভোগ করছেন, সেটি উপরিউক্ত মামলাগুলোর একটি। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় তাকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়। প্রতিপক্ষ ‘এতিমের টাকা’ মেরে খাওয়ার অভিযোগ উদ্দেশ্যমূলকভাবে বারবার প্রচার করলেও মূলত ট্রাস্টের অর্থ আদান প্রদানে প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কথা জানানো হয়েছে। উল্লেখ্য, যে ব্যাংকে রক্ষিত ওই অর্থ ইতোমধ্যে তিনগুণ হয়েছে। ৮ ফেব্রুয়ারি রায় ঘোষণা করার পর তাকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। এ নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ পরিলক্ষিত হলেও বেগম জিয়া আন্দোলনের পরিবর্তে আইনগত প্রক্রিয়া অবলম্বন করে তাকে মুক্ত করার নির্দেশ দেন।

এ ক্ষেত্রে জনরোষের ঘটনা বলতে গেলে ঘটেইনি। বিএনপির ‘সম্মিলিত নেতৃত্ব’ আইনি প্রক্রিয়াই অগ্রসর হলেন। আইন-আদালত সম্পর্কে যাদের মোটামুটি জ্ঞান আছে তারা বলাবলি করছিলেন, এ ধরনের মামলায় জামিন না পাওয়ার কোনো কারণ নেই। বেগম জিয়া হয়তোবা কারাবাসের দু-তিন দিনের মাথায় মুক্ত হবেন। বাস্তবে তিনি এ কলম লেখা পর্যন্ত মুক্ত হননি। দৃশ্যত, তিনি একটি রাজনৈতিক নীলনকশার অংশ হিসেবে কারাগারে আছেন। মামলার রায় থেকে এ পর্যন্ত ঘটনাগুলো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করলে এর প্রমাণ মিলবে। ক্ষমতাসীন সরকার ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে ৩০টি মামলা দায়ের করেছে। এর বাইরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে করা মামলার সংখ্যা চার। এগুলোর মধ্যে বিচারাধীন ১৯টি, তদন্তাধীন ১২টি এবং তিনটি স্থগিত করা হয়েছে। মামলার পরিসংখ্যান থেকে যে কেউ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ব্যাপকতা বুঝতে পারবেন। মামলাবাজ হিসেবে বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলের লোকদের দুর্নাম আছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়- জাতীয় সরকারকে একই মানসিকতাদুষ্ট বলে উল্লেখ করতে হচ্ছে। বেগম জিয়াকে দীর্ঘ দিন কারাগারে রেখে ক্ষমতাসীন সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চিরতরে নিঃশেষ করে দেয়ার মতলব আঁটছে। তাদের আশু উদ্দেশ্য হচ্ছে- তাকে জেলে রেখে ঘোষিত সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করা।

এখন এদেশের কোনো বালকও বোঝে যে, সত্যিকার একটি নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ জয়লাভ করবে। নিশ্চিত পরাজয় এড়ানোর জন্য সরকার কারসাজি, দীর্ঘসূত্রিতা ও অবৈধ সহযোগিতার মাধ্যমে খালেদার কারাবাস দীর্ঘায়িত করছে। দেখা যাচ্ছে, একটি মামলায় জামিন পেলে সাথে সাথে আরেকটি মামলা দিয়ে তা ঠেকিয়ে দেয়া হচ্ছে। তার আইনজীবীরা অভিযোগ করছেন, আইনি প্রক্রিয়া নয়; বরং সরকারের সদিচ্ছার ওপর তার মুক্তি নির্ভর করছে। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলছেন, এ ধরনের বক্তব্য আদালত অবমাননাকর। কারণ, আদালত জামিন দিচ্ছেন, আবার জামিন স্থগিতও করছেন। অবশ্য রাজনৈতিক মহল প্রশ্ন উত্থাপন করছেন, বাংলাদেশের বিচার বিভাগ সরকারের বিরুদ্ধে রায় দেয়ার সম্ভাবনা কতটুকু আছে! জনগণ সম্প্রতি সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চায়। এরপরও জেষ্ঠ্যতর বিচারপতিকে লঙ্ঘন করে যেভাবে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করা হয়েছে তা রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তথা দলীয়করণের অভিযোগপুষ্ট।

বেগম জিয়ার জামিন শুনানির প্রথম দিন থেকেই সরকারের কারসাজি লক্ষ করা যায়। নি¤œ আদালত থেকে উচ্চ আদালতে মামলার নথি প্রেরণে সময় নিয়েছে ১৫ দিন। দ্বিতীয় পর্যায়ে জামিন যখন আইনগতভাবে অনেকটা নিশ্চিত, তখন কুমিল্লার নাশকতার ঘটনায় করা দুটো মামলায় বেগম জিয়াকে অ্যারেস্ট দেখানো হয়। পরে হাইকোর্ট তাকে এ দুটো মামলায় ছয় মাসের জামিন দিয়েছিলেন। তবে একই দিন আদেশের জন্য রাখা নড়াইলের মানহানির মামলাটির জামিন আবেদন খারিজ করে দেয়া হয়। অর্থাৎ জামিন দেয়া এবং একই সাথে জামিন না দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। পরে অবশ্য চেম্বার জজ হাইকোর্ট প্রদত্ত জামিন আদেশ স্থগিত করে দিয়েছেন। মানহানি এবং মিথ্যা তথ্য দিয়ে জন্মদিন পালনের অভিযোগে ঢাকায় দায়ের করা পৃথক দুটো মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হলে তিনি আবারো জামিন লাভ করেন। তবে বারবার জামিন আর নতুন নতুন মামলার হেরফেরে তিনি মুক্তি পাচ্ছেন না। স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য দেয়ার অভিযোগে নড়াইলের আদালতে দায়ের করা অপর একটি মামলায় বেগম খালেদা জিয়াকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। আগামী ৫ জুন এ বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে জনমনে নানা প্রশ্ন। নি¤œ আদালত অতীত থেকে দুর্নীতিগ্রস্ত। সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এ পর্যায়ে। উচ্চ আদালত নিয়ে এ ধরনের টানাপড়েন চলছিল। সরকার উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অভিযুক্তকরণের দায়দায়িত্ব জাতীয় সংসদের হাতে দিতে চাইলে বিরোধের সূচনা ঘটে। সুপ্রিম কোর্ট সরকারের ওই উদ্যোগকে বাতিল করে দেয়। এরপর একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতিকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। বিদেশেও বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। ভারতের প্রবীণ ও প্রখ্যাত সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার বেগম খালেদা জিয়াকে অভিযুক্তকরার পরিপ্রেক্ষিতে মন্তব্য করেন, ‘বাংলাদেশের বিচার বিভাগ এতটাই চাপের মুখে, এটা বিশ^াস করা কঠিন যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে দেয়া পাঁচ বছরের কারাদণ্ড প্রকৃত কি না। বিচারকরা দৌড়ের ওপর আছেন। কারণ, প্রধানমন্ত্রী কথিত মতে, তাদের ওপর অসন্তুষ্ট। একজন বিচারক বিদেশ গেছেন; কিন্তু তিনি আর নাও ফিরতে পারেন। কারণ বলা হয়ে থাকে, তিনি প্রধানমন্ত্রীর সুনজরে নেই। এটা বোধগম্য, যদি তিনি কখনো ঢাকায় আসেন তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে বলে আশঙ্কা আছে। সত্যি বলতে কী, সমগ্র বিচার বিভাগ বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করছে। ক্রমশ বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে এবং সত্য-ন্যায় প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। বিচারকরা যদি অন্যায়, নিপীড়ন ও নিগ্রহ থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে না পারেন, তাহলে তা বিচারব্যবস্থার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে। হয়তো এ রকম অবস্থা থেকেই উচ্চারিত হয়েছিল সেই অমোঘ বাণী- ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা, আজ জেগেছে সেই জনতা।’ মনীষী সক্রেটিস বলতেন- ‘চারটি জিনিস বিচারকদের নিজস্ব থাকতে হবে। বিনয় সহকারে শোনা, জ্ঞানীর মতো উত্তর দেয়া, সংযত হয়ে বিবেচনা করা এবং কোনো পক্ষপাতিত্ব না করা।’

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Mal55ju@yahoo.com


আরো সংবাদ