২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

আমাদের চলমান অর্থনীতির হালচাল

আমাদের চলমান অর্থনীতির হালচাল - ছবি : সংগ্রহ

ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে যা বহুল প্রচলিত অর্থনৈতিক খাতে। সেটা হলো ‘Investment ouales employment if it is productive investment kills employment if it is unproduc'tive'। এরই সূত্র ধরে যদি আমরা পাটিগণিতের অঙ্ক কষি তাহলে দেখব, বিগত ৪৬ বছরে আমাদের পুঁজি কোন খাতে বেশি বিনিয়োগ হয়েছিল Productive না Unproductive খাতে, ঝানু অর্থনীতিবিদরা এর সরল ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন।

সে দিকে একটু তাকাই- প্রয়াত বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রফেসর মোজাফফর আহমদ, যিনি আমার অর্থনীতি গ্রন্থ ‘রাহুর কবলে বাংলাদেশের অর্থনীতি’ লেখা। এর ওপর একটি রিভিউ লেখেছিলেন। প্রথম শ্রেণীর একটি পত্রিকায় রিভিউটি ছাপানো হয়েছিল। এ ছাড়া রয়েছেন আরো কয়েকজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ যেমন- ড. ওয়াহিদুদ্দিন মাহমুদ, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের রেহমান সোবহান এবং নির্বাহী পরিচালক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এবং সাবেক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ড. মঈন খান। সবাই উল্লিখিত বাক্যটি যথার্থতার ওপর বক্তব্য রেখেছিলেন মিডিয়া এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আয়োজিত অর্থনৈতিকবিষয়ক গোটাকয়েক গোলটেবিল আলোচনায়।

একটি আলোচনা সভায় তারা বলেছিলেন, দেশে বিগত সময়ে বৈদেশিক সাহায্য হিসেবে আমরা অর্জন করেছিলাম বিপুল অঙ্কের টাকা, এর ৭৫ শতাংশ লুটপাট হয়েছে অসৎ উপায়ে এবং অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হয় যেটাকে ব্যক্তিগত খাতও বলা যায়। এই বিপুল অর্থের মাত্র ২৫ শতাংশ বিগত ৪৬ বছরে জনগণের কল্যাণে ব্যয় হয়েছে। সেই একই চিত্র ৪৬ বছর ধরে এখনো চলমান- অর্থনৈতিক খাতে। এই হলো আমাদের বৈদেশিক সাহায্যের অর্থ লুটপাটের একটি প্রামাণিক দলিল। এ কারণে চার দশকেও আমরা মালয়েশিয়ার ধারেকাছেও যেতে পারেনি। এশিয়ার একটি দেশ ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান। বর্তমানে দেশটির মাথা পিছু গড় আয় ২০ হাজার ইউএস ডলার। আর আমাদের জাতীয় গড় আয় বণিকদের বেশির ভাগ অর্থের সাথে যোগ করে জগাখিচুড়ি দিয়ে যে মাথাপিছু গড় আয় গণমাধ্যমে সরকার প্রকাশ করে, তা দেশের আসল চিত্র নয়। একজন রিকশাচালককে আমি বললাম, কেন তোমরা গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় ভিড় জমাচ্ছ। উত্তর শোনে গোটা শরীর ঝাঁকুনি দিলো। সে বলল, টিভির বাক্স এবং পত্রিকায় যা প্রকাশ হয় তা অসত্য। অর্থাৎ সরকার উন্নয়নের মহাসড়কে দেশ না বলে যদি বলত সরকারদলীয় লোকজন উন্নয়নের মহাসড়কে অবস্থান করছে। সে বলল, স্যার গ্যারামে যদি কাজকাম থাকত, তাহলে কি আমরা যানজটের নাকাল শহর ঢাকায় আসি। এখানে টাকা বাতাসে ওড়ে। আমরাও কিছু পাই, ভিক্ষুকরাও পায়। সে জন্য গ্রাম থেকে বাড়তি আয়ের আশায় ঢাকায় এসে আমরা আয় রোজগার ভালোই করছি। সরকারের নীতির কারণেই মানুষ ঢাকায় আসতে বাধ্য হচ্ছে। দেশের সার্বিক অবস্থা বুঝতে হলে একজন বড় অর্থনীতিবিদ হতে হবে, এ কথা শতভাগ সত্য নয়? একজন দিনমজুর, পেশাজীবী ভিক্ষুক, এরাও একেকজন বড় বড় অর্থনীতিবিদ। অর্থ কোথায় গেলে মিলবে এটা ওরা ভালো করেই বোঝে। ৬০ থেকে ৮৫ টাকা কেজি চাল কিনে খেতে হলে- গ্রাম ছাড়তে হবে। এ হলো খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের হৃদয়ের কথা।

১৯৭০ সালে অঙ্ক বইতে দেখেছিলাম, এক ডলার সমান ৪ দশমিক ৭৬ পয়সা- তা ৪৬ বছর পর দাঁড়িয়েছে ৮৩ দশমিক ৫০ পয়সা (তথ্য সূত্র : যুগান্তর-৪-০৪-১৮)। টাকার মান আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে লাফিয়ে লাফিয়ে কমছে। বাড়ছে ইউএস ডলার, ব্রিটিশ পাউন্ড, ইউরো, জাপানি ইয়েন, কানাডিয়ান ডলার, সুইস ফ্রাঁ, অস্ট্রেলিয়ান ডলার, সিঙ্গাপুর ডলার, সৌদি রিয়াল, ইন্ডিয়ান রুপি, সুইডিশ ক্রোনা, উল্লিখিত দেশগুলোর মুদ্রামানের কাছে আমরা হেরে যাচ্ছি। একজন উপস্থাপক যখন কোনো বিষয় উপস্থাপন করেন, তখন সে হাইভোল্টেজ মোটিভেশনের কথা বারবার বলতে থাকে। কারণ, একটি কোম্পানির উপস্থাপক বা ট্রেইনার কোনো শিল্পপণ্যের বিক্রি যাতে বাড়ে সেই আঙ্গিকে বক্তব্য দেন। সরকারও একই কায়দায় ভোটব্যাংক বাড়ানোর জন্য ট্রেইনার ও উপস্থাপকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু এসব সায়েন্স ফিকশনের বক্তব্যের মতোই অসার প্রলাপবাক্য। তবে এ দেশের মানুষ বহু আগে থেকেই এসব ধাপ্পাবাজি বক্তব্য শুনে হাসে আর বলে- পত্রিকার পাতা ওল্টালেই দেশের সার্বিক চিত্র-যখন দেখি, তখন মনে হয় বিশ্ববেহায়ার সংখ্যা এখন একজন নয় বহুজন। আড়াইবছরের একটি কন্যাশিশু মুসলিম প্রধান দেশে গণধর্ষণের শিকার হয়, তখন তাদের চেহারাটা কিভাবে টিভির পর্দায় প্রকাশ করে এ ধরনের একটি তথ্য বিদেশী গণমাধ্যমে ঝড় তুলেছিল। তারপর আমাদের লজ্জা হয় না। কাছিমের মতো একবার মাথা বের করি আবার ঢুকিয়ে ফেলি। লজ্জা শরম বলতে আমাদের কিছুই নেই। জলজ প্রাণীর মতো হয়ে গেছি আমরা। দেশের ব্যাংকগুলো যখন জালিয়াতির চরমে অবস্থান করে এবং শেয়ারবাজার যখন বারবার মুখ থুবড়ে পড়ে তারপরও শাসকশ্রেণী বলে দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে ধাবমান। যে দেশে ১৪০ কোটি টাকা ঘুষ নিয়ে ঋণ দেয়া হয় এবং একটি ব্যাংকে হাজার কোটি টাকার আত্মসাতের ঘটনা প্রকাশ হয় জাতীয় দৈনিকে। তখনো বলে, দেশের অর্থনীতি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন ভালো। দুর্নীতির উন্নতি আর সত্যের অবনতি ঘটলে যারা বলে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে আবার যখন শিশুকন্যা ধর্ষিত হলে তারাই আবার বলে- দেশে নারী জাগরণ ঘটছে। সেই দেশে কোনো মানুষের বিবেক আছে বলে মনে হয় না। আমরা এমন একটি দেশের নাগরিক- যেখানে সত্য কথা বলতে ভয় হয়, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে ভয় হয়, জিজ্ঞেস করলে বলে- ভয়ের কারণ রাজাকার অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি তকমা পিঠে লাগিয়ে দেয়।

এবার আমি একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে, সরকার বলছে মানুষের আয় উন্নতি বেড়েছে। ভালো কথা, আমরাও চাই উন্নতি, কিন্তু পরিসংখ্যানে দেখি উল্টো চিত্র। পত্রিকায় উঠেছে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১৫০০ ইউএস ডলারে পৌঁছেছে। কিছুদিন পরপরই সরকার এসব তথ্য প্রকাশ করছে। পত্রিকায় এও উঠেছে- বাংলাদেশের জীবনযাত্রার ব্যয় সিঙ্গাপুরের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সিঙ্গাপুরের জীবনযাত্রার ব্যয় খুব বেশি। ২০১৪ সালে আমি সিঙ্গাপুরে গিয়ে তেমন আহামরি দাম বৃদ্ধি মনে হলো না। কারণ তাদের মাথাপিছু গড় আয় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার ইউএস ডলার। সে হিসেবে জীবনযাত্রার ব্যয় মোটেও বাড়েনি। সিঙ্গাপুরে আয়ের তুলনায় ব্যয় অনেক কম।

আসল কথা হলো পৃথিবীর সব দেশেই আয়-ব্যয়ের মধ্যে চমৎকার একটি সামঞ্জস্য বজায় থাকে। সরকারই এসব মনিটরিং করে থাকে। আমার কয়েকজন নিকটাত্মীয় কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড এবং আমেরিকায় থকে। তাদের কাছ থেকে যে তথ্য আমি পেয়েছি, তাতে একমাত্র বাংলাদেশ ছাড়া খুব কম দেশেই আয় ও ব্যয়ের মধ্য আকাশ-পাতাল ব্যবধান থাকে। ঘুম থেকে সকালে উঠে দোকানে গেলে শুনি ডিমের হালি ১০ টাকা, চালের কেজি পাঁচ টাকা বেড়েছে। এ রকম দৃশ্য ২৫ দিন ভারতে থেকেও আমি দেখেনি। এ এক আজব রাষ্ট্র- যেখানে প্রতিদিন পণ্যমূল্য বাড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে। আর এই সুযোগে সরকারও চালাকি করে মানুষের মাথাপিছু গড় আয়ের একটি ছক পত্রিকায় পাঠিয়ে দেয়। এভাবেই চলছে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক হালচাল দীর্ঘ ৪৬ বছর ধরে। ’৭০-এর নির্বাচনে শুনেছিলাম আট আনার চাল আর ছয় আনার কাগজের দিস্তা, আড়াই টাকা সরিষার তেলের গল্প। ক্ষমতায় এলে জনগণকে সুখের নহরে ভাসিয়ে দেবে সরকার। কিন্তু ’৭২-’৭৪ সালে মানুষ দেখল দুর্ভিক্ষ। চালের কেজি ১০ থেকে ১২ টাকা। কাগজের দিস্তা আড়াই টাকা। সরিষার তেল ২০ টাকা। ’৭০-এর নির্বাচনে শুনলাম কি- আর এখন কী দেখছি এসব। এক বছরে কি সাড়ে সাত কোটি মানুষ ১৫ কোটি হয়ে গেছে। কারণ, শাসক দল দাম বাড়লো এ কথাটি বেশি বলে জনসংখ্যা বেড়েছে না, দাম তো বাড়বেই। পৃথিবীতে শুধু কি জনসংখ্যা বাংলাদেশেই বাড়ে। চীন-ভারতে জনসংখ্যা কি কমেছে না বেড়েছে? তাহলে ভারতের কলকাতায় একটি হোটেলে ৩৫ রুপি দিয়ে পেট ভরে ভাত-মাছ কিভাবে খাওয়া যায়। আমি খেয়েছি- সে জন্য সত্যি কথাটা প্রয়োজন। ওসব দেশে যদি পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকে- তাহলে বাংলাদেশে সকালে এক দুপুরে আরেক দাম কেন হবে? নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার মিথ্যাচার আউরিয়ে জনগণকে বেশি দিন অন্ধকারে রাখা যায় না। মূল কথা হলো- আমরা এতটাই লোভী যে, কেজিতেই ১০ টাকা লাভ করতে চাই। আর শাসক দল চেয়ে চেয়ে দেখে- কারণ, তাদের লোকজনই তো এসব করছে।

সম্প্রতি এসএ টিবি মহাখালীর কাঁচাবাজারের একটি দোকান তুলে ধরে- তাতে ক্রেতারাই বলছে- বাজারের প্রতিটি দোকানে সিন্ডিকেট করে মূল্য বেঁধে দেয়। ভোক্তারা কিনতে তা বাধ্য হয়। মানুষের পকেট কাটার এ দৃশ্য টিভি পর্দায় প্রায় দেখা যায়। কিন্তু শাসক দল নীরব- কারণ তাদের প্রত্যক্ষ ইশারায় এসব হচ্ছে। এখান থেকে ভালো একটা ইনকাম শাসক দল এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পকেটেও ঢুকছে। সড়ক পথের দুই ধারে হকার এবং গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবসাও জমজমাট বাংলাদেশে। মনে হয় দেশটা স্বাধীন করেছি লুটপাটের জন্য। বঙ্গবন্ধু বলেই ফেলেছেন, মানুষ পায় সোনার খনি, আমি পেয়েছি চোরের খনি। আট কোটি কম্বল এলো, আমি কম্বল পেলাম না। এ হলো আমাদের সোনার বাংলার সোনার মানুষের নিখুঁত চরিত্র। আট কিলোমিটার রাস্তায় যে দেশে ৬৯টি ট্রাফিক জ্যাম থাকে তাহলে সেই দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে- এ ধরনের কাল্পনিক গল্প কিভাবে বিশ্বাসযোগ্য। প্রতিদিন কর্মঘণ্টা যানজটের কারণে নষ্ট হওয়ার কারণে বছরে ক্ষতি ৩৭ হাজার কোটি টাকা। ১২ বছর আগে ঘণ্টায় গতি ছিল ২১ কিলোমিটারে বর্তমানে গতি ৩৫ কিলোমিটার। এই গতি যদি নিয়ন্ত্রণ করা যেত, তাহলে সাশ্রয়ী হতো ১২ হাজার কোটি টাকা (তথ্য : বুয়েট)।
স্বদেশী পণ্য কিনে হই ধন্য- এই স্লোগান এখন সেমিনারের ফাঁকা বুলি ছাড়া আর কিছুই নয়। এর বাস্তব প্রমাণ পাবেন বসুন্ধরা, যমুনার মতো বৃহৎ শপিং মলে গেলে। সব দোকানেই বিদেশী পণ্যে ঠাসা। বিদেশী পণ্য কেন আসছে, কারণ মানুষ শিল্পের পেছনে অর্থ বিনিয়োগ করতে ভয় পায় বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকির কারণে। এই ভীতিটা দূর করতে হবে।

অর্থনীতির জনক অ্যাডাম স্মিথের ভাষায় অর্থনীতি হচ্ছে সম্পদের বিজ্ঞান। অভাব অসীম তবে সম্পদ সসীম। অসীম অভাব ও সসীম সম্পদের সমন্বয় সাধন করে মানুষের সর্বাধিক উন্নয়ন, কল্যাণ নিশ্চিত করার প্রয়াস চালাতে হবে। আমাদের জুট, চিনি, কাপড়, চামড়া, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, এমনকি উদীয়মান গার্মেন্টস ব্যবসাতেও মন্দাভাব চলছে। পাকিস্তান আমলে ১২টি সেক্টর করপোরেশন লাভের মুখ দেখেনি বহু বছর ধরে। এই যদি অবস্থা হয় তাহলে তো ১৭ কোটি মানুষের ভরণপোষণের জন্য বিদেশনির্ভর হয়ে থাকতে হবে। এভাবে কতদিন? তারও কোনো ডেডলাইন নেই। বোঝা যায় বাণিজ্যেও সমতা আসতে আরো বহু বছর অপেক্ষা করতে হবে। বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পগুলো যদি সচল না হয় তাহলে পরনির্ভরশীল অর্থনীতির একটি রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের বেঁচে থাকতে হবে।

৪৭ বছর যার বয়স? সেই দেশটি স্বাবলম্বী হতে পারবে না কেন? কোথায় সমস্যা- এ নিয়ে শাসকদলের কোনো ভাবনা আছে কি? দেশে আবাসন শিল্পে শুধুু বিনিয়োগ হচ্ছে কারণ লাভজনক- এ জন্য ঢাকার অলিগলিতে বহুতল ইমারত ভরে গেছে। গাছপালা কেটে, নদী, খাল, বিল, জলাশয় ও পুকুর ভরাট করে আবাসন নির্মাতারা প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। কিন্তু প্রযুক্তি খাতে শুনি শুধু অ্যাসেম্বল বা প্যাকেজিং করে বাজারজাত হচ্ছে। ভারী শিল্প-’৭১-এর আগে যা ছিল উদাহরণস্বরূপ জুটশিল্প, প্রগতি, কাগজ, ইস্টার্ন রিফাইনারি, স্টিল মিল, সুগার মিল, এ ধরনের বহু কোম্পানি এখন মৃতপ্রায়। অক্সিজেন দিয়ে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা যায় না। বাঁচিয়ে রাখতে হলে মানুষের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত পুষ্টির। মানুষকে সুস্থভাবে দীর্ঘজীবন কর্মক্ষম রাখতে যেমনি পুষ্টিকর খাদ্যের প্রয়োজন তেমনি শিল্পের জন্য অবকাঠামোগত প্রযুক্তি নামক পুষ্টির প্রয়োজন। পাশাপাশি সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন সুশাসনের। মানুষকে কর্মসংস্থান দিতে না পারলে দেশে সন্ত্রাস বাড়বে।

মানুষ কাজকর্মে নিয়োজিত থাকলে সন্ত্রাস কমে যাবে- এটাই বাস্তবতা। কথায় বলে- অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। শিল্পের জন্য বরাদ্দ ঋণ যাতে ব্যক্তিখাতে অর্থাৎ অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় না হয় সে দিকে নজর দেয়া একান্ত প্রয়োজন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও সততা বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করতে হবে। অন্যথায় ’৭১-এর স্বপ্ন ‘জাতির অর্থনৈতিক মুক্তি ও বৈষম্যহীন অর্থনীতি’; বাস্তবায়ন তা শুধু স্বপ্নই থেকে যাবে। লোক দেখানো রূপকল্প এসব দিয়ে মানুষকে কিছু দিনের জন্য মোহগ্রস্ত করে রাখা যায়। অবশেষে তা মিথ্যাচারে পরিণত হয় এবং কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। ইতিহাসের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা রায় এটাই। একটি দেশ উন্নতির দিকে ধাবিত হচ্ছে- তখন বলা যাবে, যখন বৈদেশিক বিনিয়োগ, কার্যকর হচ্ছে, বেকার সমস্যা লাঘব হচ্ছে, মানুষের জমাকৃত অর্থ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে না। আয় এবং ব্যয়ের মধ্যে পুরোপুরি সামঞ্জস্য বজায় থাকছে। প্রতিষ্ঠিত রুগ্ন শিল্পগুলো তরতাজা হচ্ছে, রাস্তাঘাট সড়কপথ আধুনিকায়ন হচ্ছে, বারবার কাটাছেঁড়া হচ্ছে না। জীবনযাপনে টানাপড়েন নেই, ঘুষ দুর্নীতি বাড়ছে না, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পাকাপোক্ত হচ্ছে, তাহলেই শুধু বলা যাবে বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্রের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

লেখক : গ্রন্থকার

E.m. harunrashidar@gmail.com


আরো সংবাদ