২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

১৯৮১ সালের মে মাসের বিদ্রোহ এবং শহীদ জিয়া

জিয়াউর রহমান - ছবি : সংগ্রহ

মরণশীল মানুষের কেউ কেউ ইতিহাসে অমর
জীবন ও মৃত্যু মহান আল্লাহ তায়ালার হাতে। এখানে বান্দার হাত রাখার কোনো জায়গা নেই। মানুষ হিসেবে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কোনো-না-কোনো দিন মারা যেতেন। পৃথিবীর বহু দেশের বহু রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী বা জাতীয় নেতা দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় আততায়ীর হাতে শহীদ হন। আমাদের দেশে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান পরিবেশগত কারণে শাহাদত বরণ করেছেন; কিন্তু স্মৃতিতে অমর। সংক্ষিপ্ত একটি কলামে শহীদ জিয়াউর রহমানের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন অসম্ভব ও অবাস্তব। কিন্তু এই সপ্তাহের বুধবারটি, অর্থাৎ আমার সাপ্তাহিক বা নিয়মিত কলাম প্রকাশের দিন ৩০ মের সাথে মিলে গেল; সেহেতু আমি এই কলামের মাধ্যমে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। নিবেদনের অংশ হিসেবে যৎকিঞ্চিত মূল্যায়ন উপস্থাপন করছি।

মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ও স্বাধীনতার ঘোষণা
১৯৭১ সালের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি বা মার্চ- এই সময়টাকে আমরা খেয়ালে আনি। সময়টা ছিল উত্তাল। রাজনৈতিকভাবে অস্থির। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করেছে প্রাদেশিক ও জাতীয় পর্যায়ে। সবার দৃষ্টি নবনির্বাচিত সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত নতুন জাতীয় সংসদের অধিবেশনের দিকে। সুনির্দিষ্ট তারিখ হলো ৩ মার্চ ১৯৭১। এই দিন জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসবে ঢাকায়। রাজনীতিবিদেরা রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছিলেন। জ্যেষ্ঠ বাঙালি সেনাকর্মকর্তারা নিজেদের নিয়মে রাজনীতিবহির্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা করছিলেন। চট্টগ্রাম সেনানিবাসে বেঙ্গল রেজিমেন্টের জ্যেষ্ঠতম বাঙালি অফিসার ছিলেন ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুর রহমান মজুমদার। তিনি ছিলেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের কমান্ড্যান্ট। তার পক্ষে প্রকাশ্যে অনেক কিছু করা সম্ভব ছিল না। সৈনিকদের চাকরিরতদের সাথে অন্যতম জ্যেষ্ঠ ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। চট্টগ্রাম মহানগরের বর্তমান ষোলশহর ২ নম্বর মোড়ের কাছে যেখানে চিটাগং শপিং কমপ্লেক্স আছে, সেখানেই অবস্থিত ছিল অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ভেতরে আবাসনের সঙ্কট থাকায় অষ্টম বেঙ্গলকে ষোলশহরে রাখা হয়েছিল। আরো একটা কারণ ছিল; শিগগিরই তারা পশ্চিম পাকিস্তান চলে যাবে। মেজর জিয়া ছিলেন এই রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক বা সেকেন্ড ইন কমান্ড। তিনি সচেতন ছিলেন যে, শত শত সৈনিক এবং হাজার হাজার স্বাধীনতাকামী চট্টগ্রামবাসীর নিরাপত্তা ও আশা-আকাক্সক্ষার সাথে তার কর্মতৎপরতা জড়িত। তাই পুরো মার্চ মাস তিনি এ ব্যাপারে মনোনিবেশ করেন। আজকের চট্টগ্রাম সেনানিবাসের বায়েজিদ বোস্তামি গেট দিয়ে সেনানিবাসে প্রবেশ করলে ১০০ গজ যাওয়া মাত্রই হাতের ডানে পড়বে ‘স্মৃতি অম্লান’ নামক মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। সেখানে গেলেই অনেক কিছু জানা যাবে। যা হোক, মূল আলোচনায় ফিরে আসি। চট্টগ্রাম মহানগরের ষোলশহরে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিয়ে ২৬ মার্চ ১৯৭১-এর প্রথম প্রহরেই তিনি পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন, মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করেন এবং স্বাধীনতার ঘোষণা করেন। ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রথমে নিজের নামে ও নিজের দায়িত্বে ঘোষণা করেন। পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুর নামে পুনরায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

মুক্তিযুদ্ধ ও সেনাবাহিনীর উপপ্রধান
৯ মাস সেক্টর কমান্ডার এবং ফোর্স কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তথা যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয় তথা আমরা বিজয় অর্জন করি। ১৯৭২ সালের এপ্রিলে নতুন করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ও বাংলাদেশ নৌবাহিনী স্বতন্ত্র পরিচয়ে যাত্রা শুরু করে। আশা করা হয়েছিল, তৎকালীন জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশ সরকার সেনাবাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করবেন। কিন্তু একই ব্যাচ বা পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি কাকুলের ১২তম লং কোর্সের সহপাঠী, কিন্তু জিয়াউর রহমান থেকে কনিষ্ঠ, তৎকালীন কে এম সফিউল্লাহকে সরকার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম সেনাপ্রধান নিয়োগ দেয়। অনেকেই মনে করেছিলেন, জিয়াউর রহমান পদত্যাগ করবেন। কিন্তু জিয়াউর রহমান দেশের খেদমত করার নিমিত্তে সেনাবাহিনীতে থেকে যান, সরকারের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য নিয়ে এবং একজন শৃঙ্খলামুখী অফিসার হিসেবে ১৯৭৫-এর ২৪ আগস্ট সকাল পর্যন্ত সেনাবাহিনীর উপপ্রধান হিসেবে চাকরি করেন। পরবর্তীকালে সেনাবাহিনী প্রধান হন। ৩ নভেম্বর ১৯৭৫, তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ বীর উত্তমের নেতৃত্বে একটি সেনা-অভ্যুত্থান বা মিলিটারি কু-দ্য-তা অনুষ্ঠিত হয়। অভ্যুত্থানকারীরা জিয়াউর রহমানকে বন্দী করে এবং পদচ্যুত করে; যেটা সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিকেরা পছন্দ করেননি। জিয়াউর রহমান ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন।
৭ নভেম্বর ১৯৭৫ ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসে ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ অতি গুরুত্বপূর্ণ। ওই দিন যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং সেনাবাহিনীর অস্তিত্ব টলটলায়মান ছিল; তখন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সুদৃঢ়ভাবে, প্রত্যক্ষভাবে সেনাবাহিনীর এবং পরোক্ষভাবে পুরো জাতির হাল ধরেন। বীর উত্তম জিয়াউর রহমান, বীরত্বের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন। তিনি সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন; গোপন রাজনীতিকে ক্রমান্বয়ে অপসারণ করেন।

কিছু অসাধারণ অর্জন
তিনি ছিলেন জনগণের হৃদয়ের মানুষ। তিনি ছিলেন কাজের মানুষ। সামরিক শৃঙ্খলাকে, সামরিক আবেগকে তিনি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিয়ে আসেন। তার দূরদৃষ্টিমূলক, রাষ্ট্রনায়কোচিত কর্মকাণ্ডের কারণে বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে প্রথম পা রাখে; বাংলাদেশ পৃথিবীর জাতিগুলোর মিলনমেলায় নিজের নাম উজ্জ্বলভাবে প্রস্ফুটিত করে। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমান দেশগুলো, তাৎক্ষণিক প্রতিবেশী অমুসলমান দেশগুলো এবং বিশ্বের নেতৃত্ব প্রদানকারী পাশ্চাত্যের দেশগুলোর সাথে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। ইরাক ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। উভয় পক্ষের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ওই যুদ্ধ নিরসনের লক্ষ্যে যেই তিন সদস্যের তথা তিনজন রাষ্ট্রপ্রধানের কমিটি করা হয়েছিল, সেই কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সর্বোপরি উদীয়মান সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি চীনের সাথে যুগপৎ ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক বিরোধীরা তার সমালোচনা করতেই পারেন। কিন্তু বিশ্লেষকেরা বিনাদ্বিধায় বলবেন, জিয়াউর রহমান সমন্বয়ের রাজনীতি, সহনশীলতার রাজনীতি, সমঝোতার রাজনীতি ও বহুদলীয় রাজনৈতিক গণতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন। গবেষকেরা স্বীকার করেন, তিনি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তৃণমূল মানুষের অংশগ্রহণে বিশ্বাস করতেন, কঠোর শৃঙ্খলায় বিশ্বাস করতেন এবং নিজেকে দুর্নীতির ঊর্ধে রাখায় বিশ্বাস করতেন। তিনি তরুণ ও মেধাবীদের রাজনীতিতে আগ্রহী করে তোলার প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন। সব কিছু মিলিয়ে তিনি সেনাপতি থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়েছিলেন। তিনি বন্দুকের যোদ্ধা থেকে কোদালের কর্মী হয়ে দেশ গড়ার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছিলেন।

৩০ মের ঘটনা প্রসঙ্গে জানার সুযোগ ও অছিলা
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যু ছিল চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অবস্থানকারী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি অংশ কর্তৃক পরিচালিত বিদ্রোহের ফলে (ইংরেজি পরিভাষায় : আফটার ইফেক্ট অব এ মিউটিনি কন্ডাক্টেড বাই পার্ট অব দ্য বাংলাদেশ আর্মি লোকেটেড ইন চিটাগং ক্যান্টনমেন্ট)। বিদ্রোহকে ইংরেজি পরিভাষায় ও সামরিক ইংরেজি পরিভাষায় মিউটিনি বলা হয়। ১৯৮১ সালের ৩০ মে সংঘটিত চট্টগ্রাম সেনা বিদ্রোহ বা মিউটিনির বিচার হয়েছিল। কিন্তু আজ অবধি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যার কোনো বিচার হয়নি। মিউটিনি বা বিদ্রোহের বিচার হয়েছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আইন (ইংরেজি পরিভাষায় : বাংলাদেশ আর্মি অ্যাক্ট)-এর ৩১ ধারা মোতাবেক। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আইন মোতাবেক, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য ব্যারিস্টার, অ্যাডভোকেট তথা আইনজীবী অথবা সেটি সম্ভব না হলে সামরিক অফিসারদের মধ্য থেকে আত্মপক্ষ সমর্থনকারী কর্মকর্তা পাওয়ার অধিকার রাখতেন। ২৯ জন অভিযুক্ত ব্যক্তির মধ্যে ২৫ জনই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা অফিসার বা মুক্তিযোদ্ধা জুনিয়র কমিশনড অফিসার। অতএব, স্বাভাবিকভাবেই ওই ২৯ জনের আবেদন ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের মধ্য থেকেই যেন কাউকে না কাউকে আত্মপক্ষ সমর্থনকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্তি দেয়া হয়। ১৯৮১ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃপক্ষ মোট তিনজন আত্মপক্ষ সমর্থনকারী কর্মকর্তা (ইংরেজি সামরিক পরিভাষায় : ডিফেন্ডিং অফিসার) নিযুক্ত করতে সম্মত হয়। ১৯৮১ সালের জুন মাসের জ্যেষ্ঠতার ক্রমানুসারে ওই তিনজন ব্যক্তি হচ্ছেন- পাকিস্তান থেকে প্রত্যাগত আর্টিলারি কোরের অফিসার, ১৯৭৩-৭৪ সালে পাকিস্তান থেকে প্রত্যাগত ব্রিগেডিয়ার (পরবর্তীকালে মেজর জেনারেল) আনোয়ার হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা, কর্নেল (পরবর্তীকালে মেজর জেনারেল) মোহাম্মদ আইনুদ্দিন বীর প্রতীক, মুক্তিযোদ্ধা, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (পরবর্তীকালে মেজর জেনারেল) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক তথা এই কলামের লেখক। পাঠক যেন মনে করেন না যে, এই তিনজন ব্যক্তির দায়িত্ব ছিল প্রেসিডেন্ট হত্যা সমর্থন করা।

এই তিনজন অফিসারের দায়িত্ব ছিল ২৯ জন অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থন করা; তথা এটা প্রমাণে সহায়তা করা যে, তারা বিদ্রোহের জন্য দায়ী না বা তারা বিদ্রোহ করেননি। কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে অভিযুক্তদের বিচার হয়েছিল; সেনাবাহিনী আইন (অর্থাৎ বাংলাদেশ আর্মি অ্যাক্ট) মোতাবেকই কোর্ট মার্শালের রায় বাস্তবায়ন হয়েছিল। কিন্তু সেই কোর্ট মার্শাল সম্বন্ধে, সেই কোর্ট মার্শালের পরিচালনা সম্বন্ধে, সেই কোর্ট মার্শালের নিরপেক্ষতা সম্বন্ধে আমার ব্যতিক্রমী মতামত আছে, যেটি আমার লেখা বই ‘মিশ্র কথন’-এ লিখেছি, স্থানাভাবে এখানে লিখছি না। কোর্ট মার্শাল (তথা আদালতটি) বসেছিল এবং চলেছিল চট্টগ্রাম মহানগরের লালদীঘির পাড়ে অবস্থিত কারাগারের অভ্যন্তরে। ওই কারাগারেই অভিযুক্ত ২৯ জন বন্দী ছিলেন। ওই ২৯ জনের আত্মপক্ষ সমর্থন করতে হলে ঘটনা সম্বন্ধে জানতেই হবে। জানার জন্য ওই ২৯ জন অভিযুক্তের সাথে আমরা আলাপ করেছিলাম, ওই ২৯ জনের মধ্যে বেশির ভাগেরই বাব-মা, স্ত্রী, ভাইবোনের সাথেও আমরা কথা বলেছিলাম। আমরা তিনজনের মধ্যে ব্রিগেডিয়ার আনোয়ার একটু কম জড়িত হয়েছিলেন; কর্নেল আইনউদ্দিন এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইবরাহিম বেশি জড়িত হয়েছিলেন; বেশি কথা শুনেছিলেন; বেশি খবর জেনেছিলেন। আলাপের কারণে তাৎক্ষণিক ঘটনা প্রসঙ্গে এবং তার আগেরও অনেক ঘটনা প্রসঙ্গে আমাদের জানার সুযোগ হয়েছিল। এটা অত্যন্ত বিরল সুযোগ ছিল। আশ্চর্যজনক মনে হলেও বাস্তবতা হলো- ভীতিকর পরিস্থিতিতে আমরা কোনো লিখিত নোট রাখতে পারিনি, যা কিছু জমা রাখার সেটা জমা রেখেছিলাম স্মৃতির মণিকোঠায়। অপ্রিয় বাস্তবতা হলো, কালের পরিক্রমায় অনেক কিছু স্মৃতিশক্তি থেকে ছুটে যায় বা ছুটে যাচ্ছে।

মহাদুর্ঘটনার দায়দায়িত্ব
সেনাবাহিনীতে চাকরি করার কারণে সক্রিয় চাকরি জীবনে এ ধরনের মিউটিনি ও কোর্ট মার্শাল ইত্যাদি বিষয়ে লেখালেখি কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত ছিল। কিন্তু ঘটনার ৩০ বছর পর (১৯৮১-২০১১) আমি ‘মিশ্র কথন’ নামে বইটি লিখেছি। বইটি লেখার সময় অনেক কথা, যেগুলো অভিযুক্তদের কাছ থেকে জেনেছিলাম; সেগুলো উল্লেখ করতে পারিনি। কারণ, সেগুলো গবেষকের দৃষ্টিতে বা আইনজীবীর দৃষ্টিতে প্রমাণযোগ্য নয়; কিন্তু আমার কাছে অতি বিশ্বাসযোগ্য। প্রখ্যাত সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ দীর্ঘ দিন গভীর ও বিস্তৃত গবেষণার পর তার বই লিখেছেন, ইংরেজি ও বাংলা ভাষায়। আমি ইচ্ছাকৃতভাবে অনেকগুলোর ঘটনা আমার বইয়ে আলোচনায় আনিনি; মাহফুজ উল্লাহ তার বইয়ে এনেছেন। সারমর্ম : তৎকালীন (১৯৭৮ মে ’৮১) চট্টগ্রাম সেনানিবাসের পদাতিক ডিভিশনের জিওসি তৎকালীন মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর বীর উত্তম চাচ্ছিলেন জিয়াউর রহমানকে কাবু করতে; জেনারেল মঞ্জুরকে প্রত্যক্ষভাবে না হলেও সুনির্দিষ্ট-পরোক্ষভাবে উৎসাহ জোগাচ্ছিলেন ঢাকায় অবস্থানকারী কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব এবং বাংলাদেশের বাইরের কেউ না কেউ। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের দু-একটি পত্রিকায় এবং অন্যান্য দেশের পত্রিকায় প্রকাশিত বিশ্লেষণমূলক সংবাদে এবং অনেক বাংলাদেশী লেখকের পুস্তকে এ ধরনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত আছে। বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব এবং ১৯৯১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ইমাম উদ্দিন চৌধুরী তার লিখিত আত্মজীবনীমূলক পুস্তকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘনিষ্ঠ সহচর এবং ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ঘনিষ্ঠ সরকারি সহকর্মী কর্নেল অলি আহমদ বীর বিক্রম, মরহুম মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী বীর বিক্রম, বিএনপি সরকারের সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা এবং আরো কেউ কেউ তাদের লেখা পুস্তক, কলাম বা ইন্টারভিউতে এ ধরনের ইশারা দিয়েছেন।

আনুষঙ্গিক গবেষণা ও লেখালেখি
২৯ মে ১৯৮১ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন। মূল কাজ ছিল রাজনৈতিক এবং তার মধ্যেও বিএনপি-দলীয় রাজনৈতিক কর্ম। এ সুযোগটি ষড়যন্ত্রকারীরা কাজে লাগায়। প্রশ্ন : সুযোগটি কী? উত্তর : রাষ্ট্রপতিকে হাতের নাগালে পাওয়া। প্রশ্ন : সুযোগটি কী কাজে লাগালেন? উত্তর : তাকে হত্যা করা। ৩০ মে ১৯৮১ সালের আগেকার দিনগুলোতে ষড়যন্ত্রকারীরা জিয়াউর রহমান বীর উত্তমকে হত্যা করার জন্য কী কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন বা কী কী প্রস্তুতি নিয়েছিলেন অথবা কেনই বা তাদের একাধিক ষড়যন্ত্র সফল হয়নি, এ কথাগুলো বিভিন্ন জ্ঞানী ব্যক্তি তাদের পুস্তকে লিখেছেন; আন্তর্জাতিক ও জাতীয় জার্নালে লিখেছেন। আমিও শুধু দু’টি বইয়ের রেফারেন্স এখানে দিচ্ছি। প্রথম বইটির নাম ‘মিশ্র কথন’; লেখকের নাম মেজর জেনারেল (অব:) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক; প্রকাশক : অনন্যা, ২০১১ সাল (বইটি এখন ই-বুক হিসেবেও পাঠকের জন্য উন্মুক্ত)। দ্বিতীয় বইটি ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় একই লেখকের বই, নাম ‘প্রেসিডেন্ট জিয়া অব বাংলাদেশ : এ পলিটিক্যাল বায়োগ্রাফি’; লেখকের নাম মাহফুজ উল্লাহ; প্রকাশক : এ্যাডর্ন পাবলিকেশন, প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৬। প্রথম বইটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হচ্ছে জিয়াউর রহমানের মৃত্যু প্রসঙ্গে; অপরপক্ষে দ্বিতীয় বৃহৎ বইটি পুরোটাই হলো জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবনী। মাহফুজ উল্লাহর বইটি একটি অনবদ্য রচনা, আগ্রহীদের জন্য অপরিহার্য পাঠ।

১৯ দফা, ভিশন ২০৩০ এবং ইবরাহিম
যারা জিয়াউর রহমানকে ভালোবাসেন তাদের অনুভূতি হলো, জিয়াউর রহমান ১৯ দফার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের জন্য একটি ভিশন তুলে ধরেছিলেন। জিয়াপ্রেমিকদের অনুভূতি হলো, জিয়ার অনুসরণের মধ্যেই বিএনপির সাফল্যের চাবিকাঠি নিহিত। বিএনপি এখন একা নয়; কোটি কোটি মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার মূর্ত প্রতীক এখনকার বিএনপি। বিএনপি ২০ দলীয় জোটের প্রধান শরিক। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক ১৯ দফার ধারাবাহিকতায় আজ থেকে সাত-আট মাস আগে বিএনপি চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ‘ভিশন-২০৩০’ জাতির সামনে উপস্থাপন করেছেন। আশা করা যায়, পার্লামেন্ট নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ও ২০ দল যদি ক্ষমতায় যায়, তাহলে ভিশন-২০৩০ বাস্তবায়ন সহজ হবে। যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনুকূল থাকে, যদি নির্বাচনী খেলার মাঠ সমান থাকে, যদি নির্বাচন কমিশনের ক্রমে ক্রমে কমতে থাকা আস্থা কিছুটা হলেও অবশিষ্ট থাকে এবং বেগম জিয়ার সম্মতি সাপেক্ষে ২০ দলীয় জোট নির্বাচনে যেতেও পারে। তবে এখনো সময় অনেক বাকি। ইতিহাস খ্যাত মহান সাধক নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার বিখ্যাত বচন ‘দিল্লি হনুজ দূর আস্ত’ সম্বন্ধে লিখেছি এই পত্রিকাতেই বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ (শিরোনাম : ইতিহাসের দিল্লি ও ক্ষমতার দিল্লি)। ওই সুবাদেই আমিও বলছি : পার্লামেন্ট নির্বাচন হনুজ দূর আস্ত। তবে যদি নির্বাচন কাছে আসে এবং জোটগতভাবে যাওয়া হয়, তাহলে কল্যাণ পার্টিও নির্বাচনে যাবে, জেনারেল ইবরাহিমও নির্বাচনে যাবে। ছয় বছর আট মাস আগে দেশনেত্রী বেগম জিয়ার মৌখিক নির্দেশনায় গত ছয় বছর আট মাসের অধিক সময় যেখানে রাজনৈতিকভাবে ব্যয় করেছি, সেই হাটহাজারী থেকেই ইনশাআল্লাহ নির্বাচন করব। তবে একটি শর্ত, যদি প্রতীকী অর্থেই নির্বাচন কাছে আসে। উদ্দেশ্য, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং গণতান্ত্রিক উন্নয়নের একজন কর্মী হওয়া।

বঙ্গবন্ধু ও শহীদ জিয়ার জন্য প্রার্থনা
জিয়াউর রহমান একজন ‘বীর উত্তম’, যেমন ছিলেন তেমনই আছেন এবং ইনশাআল্লাহ থাকবেন। তাকে বীর উত্তম খেতাব দিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর সরকার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান না হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন হতো কি না এবং স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হতো কি না সেটি বিরাট সন্দেহের বিষয়; অর্থাৎ বাংলাদেশ সৃষ্টি এবং বঙ্গবন্ধু নাম দু’টি অবিচ্ছেদ্য। এতদসত্ত্বেও ইতিহাসের দুঃখজনক ঘটনা হলো- বঙ্গবন্ধুও ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর সকালে নিহত হয়েছিলেন। যেকোনো কারণেই হোক, আওয়ামী লীগ তাকে শহীদ বঙ্গবন্ধু বা শহীদ মুজিব বলে না, আমি এর ভালো-মন্দ আলোচনায় যাবো না। উভয়ের জীবন নিয়ে আলোচনা করার জন্য উপযুক্ত ক্ষেত্র বা স্পেস এই কলামে নেই। তবে এটুকু বলতেই হবে, উভয়ের নামের শেষ শব্দ ‘রহমান’। মহান আল্লাহ তায়ালার ৯৯টি গুণবাচক নামের মধ্যে অন্যতম সুপরিচিত ও তাৎপর্যপূর্ণ নাম হচ্ছে ‘রহমান’। এ জন্যই আমার প্রার্থনা থাকবে, ‘রহমানুর রাহিম’ মহান আল্লাহ তায়ালা যেন উভয়কে শাহাদতের মর্যাদা দান করেন।

লেখক : মেজর জেনারেল (অব.); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি


আরো সংবাদ