১৬ নভেম্বর ২০১৮

নিঃসঙ্গ যোদ্ধা

নিঃসঙ্গ যোদ্ধা -

প্রতিদিনের ঘটনাবলি মানুষের কোনো এক অনুভূতিকে স্পর্শ করবেই। স্থানীয়, আন্তর্জাতিক অথবা ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডগুলো তাই সবাইকে শঙ্কিত, ভীত অথবা আনন্দিত করে। তবে একটি প্রশ্ন উঠবেই; তা হলো, কেন? এবং প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এ জন্য যে এগুলো নিয়ে যে ব্যাখ্যা বা যুক্তি কারণ হিসেবে দেয়া হয়, তা কখনই পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য হয় না। গ্রহণযোগ্য হয় না এ জন্য যে, বিশ্লেষণের মুখে এসব বক্তব্য টিকতে পারে না। অন্য কথায় বক্তব্যের ভিত্তি দুর্বল হওয়ায় বিশ্লেষণে সব হারিয়ে যায়। আর একটি কারণ এবং সম্ভবত প্রধান কারণ, আজকের বিশ্বে মিথ্যার আধিপত্য।
আজকে মিথ্যার আধিপত্যের শক্তি ও বিস্তার এত বিশাল এবং শক্তিশালী যে, তার মাঝ দিয়ে সত্য প্রকাশিত হতে পারে না বেশির ভাগ সময়। তবুও এটাই হয়তো প্রাকৃতিক নিয়ম যে, একপর্যায়ে সত্য বেরিয়ে আসে, দেরিতে হলেও। তাই বুঝি সেই বিখ্যাত প্রবাদের সৃষ্টি সত্যের জয় সর্বত্রই। তবে এই জয়লাভ সহজে বা তাৎক্ষণিক সব সময় হতে পারে না। সেজন্য অন্যায়-অবিচার তাদের রাজত্ব চালিয়ে যেতে পারে।

এ বিষয় নিয়ে আলোচনা, অনুসন্ধান ও তর্কের শেষ নেই। একটি বিষয় খুব বেশি এসে পড়ে। তা হলো, বিভ্রান্তি বা উন্মাদগ্রস্ততা। সময়কে উন্মাদগ্রস্ত করে ফেলা হয়েছে। এ বিষয় নিয়ে এক মার্কিন লেখক সাড়া জাগানো বই লেখেন। ‘ট্রুথ ইজ এ লোনলি ওয়ারিয়র’ বলে এ বইটি ‘সত্য’ নিয়ে লেখা হলেও এটা যেন সমাজ-মানুষের শাশ্বত চিত্র এবং এটা প্রকাশিত হওয়ার পরই কয়েক লাখ কপি বিক্রি হয়। জেমস পারলফ কী বিষয় লিখলেন, এত বিশালসংখ্যক পাঠক হুমড়ি খেয়ে পড়ল? এর জবাব লেখক বইয়ের উপশিরোনামায় দিয়েছেন। ‘আনমাসকিং দি ফোর্সেস বিহাইন্ড গ্লোবাল ডেস্ট্রাকশন’ (বৈশ্বিক ধ্বংসের পেছনের শক্তির উদঘাটন)। আজকের দুনিয়ার পরিচিত সব সমস্যার অবতারণা করে পারলফ লিখেছেন, ‘এখন একমাত্র যোদ্ধা হচ্ছে সত্য’, যা নিজেকে প্রকাশ যুদ্ধে নিরত। এর পেছনে রয়েছে অর্থ এবং অর্থকে আয়ত্ত করতে নিরন্তর লড়াই চলছে ক্ষমতা দখলের। আর বিশ্বব্যাপী প্রশাসন (এস্টাবলিশমেন্ট) বলে পরিচিত মাত্র দশমিক ১% ক্ষুদ্র গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করছে এই ক্ষমতা।
পারলফ তার উপসংহারে ১৮টি ধারণা দিয়েছেন এবং তার আগে ২৩ অধ্যায়ে ২৬টি প্রশ্ন করেছেন এবং তার জবাব খুঁজেছেন। পাঠক তার দৈনন্দিন জীবনে এর প্রতিফলন দেখেই সম্ভবত আকৃষ্ট হয়েছে বইটির প্রতি। অবশ্য পারলফের আরেকটি বহুলপঠিত বই ‘দি শ্যাডোজ অব পাওয়ার’, যেখানে ‘ট্রুথের’ অপর লেখার বইটির প্রেরণা লক্ষ করা যায়। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন, ছায়ায় অবস্থানরতরাই ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে।

যে ছয়টি যুদ্ধ আধুনিক বিশ্বের চেহারা নির্মাণ করেছে, তার স্বরূপ তিনি সংক্ষেপে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। আর প্রত্যেক যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য ছিল ‘সত্যকে গোপন করা’ এবং ক্ষমতা ও সম্পদকে কুক্ষিগত করা। প্রতিটি যুদ্ধ ইচ্ছাকৃতভাবে শুরু করা হয়। যেমন- পার্ল হার্বার যুদ্ধটি। ১৯৪১ সালের মধ্যে জাপান ও আমেরিকার সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে এবং জাপান পার্ল হার্বার আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। তার সহযোগী জার্মানির সাথে গোপন তথ্য বিনিময় করছিল। এ সময় একদিন ব্রিটিশ ফরেন মিনিস্টার এডওয়ার্ড গ্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের উচ্চপদস্থ অ্যাডভাইজার এডওয়ার্ড ম্যান্ডেল হাউসকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘যদি জার্মানরা মার্কিন নাগরিক বহনকারী কোনো যাত্রীবাহী সমুদ্রজাহাজ ডুবিয়ে দেয় তাহলে আমেরিকা কী করবে?’ হাউস বললেন, ‘ক্রোধের আগুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আচ্ছন্ন করবে এবং এটা (দেশটিকে) যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলবে।’ এ দিকে ব্রিটিশেরা জার্মানদের গোপন কোড ভেঙে ফেলে এবং তা দিয়ে তারা জানতে পারে জার্মানদের গোপন সাবমেরিনগুলো কোথায় অবস্থান করছে। সমুদ্র যাত্রীবাহী জাহাজ ‘লুসিটানিয়াকে’ সে পথে পাঠানো হয়, তার সাথে রক্ষাকারী যুদ্ধজাহাজকে বাদ দিয়েই। লুসিটানিয়ার যাত্রীদের বেশির ভাগই ছিল মার্কিনি। যা হওয়ার তাই হলো; জার্মান টর্পেডোর আঘাতে লুসিটানিয়া ডুবে গেল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চলতি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক কলিন সিম্পসন তার বই ‘লুসিটানিয়াতে’ লিখেছেন- ‘পুরো ঘটনাটি একটি ষড়যন্ত্রের অংশ বলা যায় এবং প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের জ্ঞাতসারেই তা বাস্তবায়ন হয়। আর এ সত্যটি কখনো সরকারিভাবে স্বীকার করা হয় না।’

এভাবে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ মেইনকে কিউবার উপকূলে ডুবিয়ে দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সর্বপ্রথম যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলা হয় ১৮৯৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। অনেক অনুসন্ধানের পর সবাই একমত হন কিউবা দখলের উদ্দেশ্যে জন ডি রকফেলার এবং স্ট্যান্ডার্ড ওয়েল কোম্পানি পেছন থেকে এ ঘটনাগুলো ঘটায়। কিউবা চিনি, তেল ও গ্যাসের আধার। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য রকফেলারের ব্যাংক ২০০ মিলিয়ন ডলার সাহায্য করে।
কোরিয়ার যুদ্ধ সবচেয়ে জটিল ও গোপন ষড়যন্ত্রের ফসল। নানা যুদ্ধ-সঙ্ঘাতে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার উদ্ভব ঘটে এবং পেছনের প্রধান শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর পেছনের ইতিহাস জটিল। যেমন- বিখ্যাত ‘বিগ থ্রি (আমেরিকা, রাশিয়া ও ব্রিটেন) ইয়াল্টা এবং তেহরানে মিলিত হয়ে জাপান-জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট রাশিয়ার নেতা যোশেফ স্টালিনকে এ যুদ্ধে যোগদানের আহ্বান জানালে তিনি রাজি হন। তবে তার কোনো অস্ত্র নেই বললে, রুজভেল্ট ৬০০ জাহাজভর্তি অস্ত্র পাঠিয়ে দেন। স্টালিন জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেও জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে রাজি হননি।

সবচেয়ে মজার ঘটনা হলো, রাশিয়া চীনে ঢুকে আত্মসমর্পণকারী জাপানের বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার মাও সে তুংকে দেন। এ অস্ত্রে বলীয়ান হয়ে তিনি চীনে ন্যাশনালিস্ট সরকারকে পরাজিত করেন এবং কমিউনিস্ট শাসন প্রচলন করেন।
কোরিয়া-ভিয়েতনাম যুদ্ধের অন্যতম হোতা অ্যাডমিরাল জেমস স্টকডেল ছিলেন ফাইটার পাইলট। তিনি এর শুরুর চমৎকার বিবরণ দিয়েছেন। তিনি ঘুমিয়েছিলেন টঙ্কিন ঘাঁটিতে। তার অধস্তন অফিসার ঘুম থেকে তাকে জাগিয়ে বলল, ওয়াশিংটন থেকে হুকুম এসেছে আক্রমণ করতে হবে। কেন, প্রশ্ন করলে অফিসারটি বলে- ‘ওরা আক্রমণ করেছে, তার প্রতিশোধ নিতে হবে।’ কিন্তু কোথায় আক্রমণ করল, জিজ্ঞেস করলাম। স্টকডেল লিখেছেন, অফিসারটি বলল, ওয়াশিংটনের হুকুম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল এবং মারা পড়ল ৫০ হাজার মার্কিন যোদ্ধা আর কোরিয়া দুই ভাগ হয়ে গেল; তার সাথে গেল কয়েক লাখ প্রাণ। এ বিশাল যুদ্ধের আসল সত্য কখনো বলা হয় না। তবে এই ‘নিঃসঙ্গ যোদ্ধা সত্য’ অবশেষে বিশ্বের সামনে আবির্ভূত হলো মিথ্যার পর্দা ভেদ করে।
ঠিক একই পথ ধরে ইরাকের যুদ্ধ চলছে। সাদ্দাম হোসেন মানবতা ধ্বংসের অস্ত্রের মালিক বলে আক্রমণ করা হয়, যা পরবর্তী সময়ে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ঘোষণা দিলেন, এই মারণাস্ত্র ধ্বংস করতে হবে। তিনি সত্য জানতেন, কিন্তু মিথ্যার আশ্রয় নিলেন। শুরু হলো মধ্যপ্রাচ্য ধ্বংস, যা আজো চলছে। এখানেও ‘নিঃসঙ্গ যোদ্ধা সত্য’ আত্মপ্রকাশ করল অবশেষে। তবে তত দিনে ধ্বংস ও হত্যাকাণ্ড দিয়ে নতুন ইতিহাস লেখা হয়ে গেছে।

পারলফের প্রশ্নগুলোর জবাবে সব অশান্তির ঘটনার মূলে পরাশক্তির অবস্থানের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশিত হয়েছে। যেমন- কেন প্রেসিডেন্ট উইলসন লুসিটানিয়া জাহাজ ডোবার দলিল লুকিয়ে ফেলতে বললেন? আবার পার্ল হার্বার আক্রমণের ওপর অনুসন্ধানের পর দুই জেনারেল কিমেল এবং শর্ট কোর্ট মার্শাল করার দাবি করলেন! কারণ, অনুসন্ধান রিপোর্টটি চেপে যাওয়া হয়। যখন সোভিয়েতরা প্যাসিফিকে যুদ্ধই করেনি, তখন কেন কোরিয়াকে ভাগ করে উত্তরাংশ তাদের দেয়া হলো? কোন ছোট প্রতিষ্ঠান থেকে (১৯২১ জন্ম) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২১ জন ডিফেন্স সেক্রেটারি, ১৯ জন ট্রেজারি সেক্রেটারি, ১৮ জন সেক্রেটারি স্টেট এবং ১৬ জন সিআইএ’র ডাইরেক্টর নিযুক্ত হয়েছেন? কেন ভিয়েতনাম যুদ্ধ ১৪ বছর স্থায়ী হলো, যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মাত্র সাড়ে তিন বছরে বিজয় লাভ হয়? কংগ্রেসের অনুসন্ধানকারী নরমান ডডকে কী তথ্য দিয়েছিল ফোর্ড ফাউন্ডেশন যে, তিনি ভিরমি খাওয়ার উপক্রম হন? অজ্ঞাত-অখ্যাত জিমি কার্টার হঠাৎ করে প্রেসিডেন্ট হলেন কেমন করে? কেন অতীতের সব রাজার দুর্নাম করা হয়েছে? কোনো মার্কিনি ধনাঢ্যের ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ মস্কো বিমানবন্দরে ‘ঠাণ্ডা যুদ্ধের’ (কোল্ড ওয়ার) তুঙ্গে থাকার সময় নামার অধিকার দেয়া হয়েছিল এবং কেন? গ্রিন মুভমেন্টে কে কোটি কোটি ডলার দিয়েছে এবং কেন? টিকা সম্পর্কে সাহসী ডাক্তারেরা যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা কেন সংবাদমাধ্যম ছাপে না (কোনো কোনো টিকা মহামারীর জন্য দায়ী)? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কেন কয়েক যুগ ধরে মুদ্রাস্ফীতি ঘটল? এমন ২৬টি প্রশ্ন করে জেমস পারলফ তার বইতে প্রমাণ করেছেন, সব সময় মিথ্যাকে চাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন, কেমন করে ছোট গোষ্ঠী যাকে সবাই ‘এস্টাবলিশমেন্ট’ (প্রশাসন ইত্যাদি একত্রে) বলে চেনে, সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এটি প্রাথমিকভাবে ‘কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশনস’ (সিএফআর) বলে পরিচিত। যার অনুকরণে বিশ্বের সব দেশেই এমন সংগঠন আছে। তারা একে অন্যের সাথে গভীর যোগাযোগ রাখে। এ ছাড়া আছে ‘ফ্রিম্যাসন’সহ অনেক প্রতিষ্ঠান, যা রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে পেছন থেকে নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন- ব্রিটেনে রয়াল ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স, রাশিয়াতে ইনস্টিটিউট অব ওয়ার্ল্ড ইকোনমিকস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস, চীনে- চাইনিজ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস। এরা রাষ্ট্রীয় নীতিগুলো নির্ধারণ ও প্রভাবিত করে। তবে মূল উদ্দেশ্য থাকে সত্যকে নিয়ন্ত্রণ করা।
পারলফ এই রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার নাম দিয়েছেন ‘স্যাটানিক এস্টাবলিশমেন্ট’ (শয়তানের প্রশাসন)। এ জন্য যে, এটা জনগণের কল্যাণের নামে আবির্ভূত হলেও পায়রবি করে ছোট ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর।
এসব প্রতিষ্ঠান ও কর্মকাণ্ডের সংগঠন হয়েছিল শুধু জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। ব্যাংকের সৃষ্টি হয়েছিল এই পদ্ধতিকে জীবন্ত রাখার জন্য এবং এই প্রবাহের কোনো ছেদ পড়েনি। রকফেলার-রথচাইল্ডরা এর মাধ্যমে বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করছে, জনগণকে শাসন করছে তাদের সম্পূর্ণ অগোচরে। এক গোষ্ঠীর ছয়জন এই বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণ করে।

তবে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে ‘গণতন্ত্র’ ব্যবস্থার উদ্ভবের মাঝ দিয়ে। প্রচণ্ড নিন্দা প্রচারণা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মাঝ দিয়ে পূর্বতন রাজন্যপদ্ধতির পরিবর্তন হয়। রথচাইল্ডরা নিজে সম্রাট বা রাজা হতে পারেনি। তাই তারা এ ব্যবস্থা পরিবর্তনে সাহায্য করে। রাজারা সব সময় চেষ্টা করত অধীনস্থ সবাইকে এক করে শাসন করতে। এর পরিবর্তে আসে ‘গণতন্ত্র’, যা প্রথমেই জনগণকে বিভক্ত করে ভোটের মাধ্যমে। যে ৫১ শতাংশ ভোট পায়, সে-ই ক্ষমতায় যায়। তাই এই বিভক্তিকরণ। গণতান্ত্রিক এবং রাজন্য ব্যবস্থার কর্মকাণ্ডের একটি চিত্র পারলফ দিয়েছেন। রাশিয়া রাজারা ১৮২৬ ও ১৯০৪ সালের মধ্যে ৪৬৭ জনকে হত্যা করেছিল। কিন্তু গণতান্ত্রিক অভ্যুত্থানের পর স্টালিন ও লেলিন লাখ লাখ লোক হত্যা করেন তাদের পদ্ধতি চালু করার জন্য। ফরাসি বিপ্লবের সময় বাস্তিল দুর্গে ছিল মাত্র সাতজন কয়েদি। কিন্তু বিপ্লবের মাঝে এবং পরে মৃত্যুবরণ করে ১০ লাখের বেশি ফরাসি। ঠিক একই ঘটনা ঘটে চীনে। প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান জেনারেল জর্জ মার্শালের মাধ্যমে চিয়াং কাইশেককে অনুরোধ করেন তার সরকারে মাও সে তুংকে নেয়ার জন্য। বিনিময়ে মার্কিন সহায়তা দেয়ার কথা বলেন। চিয়াং অনুরোধ রক্ষা করতে অস্বীকার করলে মাও তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। এ সত্যও প্রকাশ করা হয়নি তখন। আর সাথে দুই দশক ধরে হত্যাযজ্ঞ চালান।
পারলফের একটি মন্তব্য হলো, কমিউনিস্ট ও ক্যাপিটালিস্টদের মধ্যে সব সময় একটা সম্পর্ক ছিল বলে দাবি করেন জন লেহম্যান, রোনাল্ড রিগানের নেভি সেক্রেটারি। যেমন- রাশিয়ানরা কেমন করে মার্কিনি প্রযুক্তি পেল এবং তা দিয়ে রাষ্ট্র গড়ল? পারলফ বলেছেন, ব্যবসায়িক আদান-প্রদানের মাঝ দিয়ে। যেমন ১৯২০ সালে রকফেলার তাদের ব্যাংকের মধ্য দিয়ে রাশিয়ান বন্ড বিক্রি করে এবং তাদের তেল শোধনাগার তৈরি করে দেয়।

আসলে সিএফআর-এর ৩০০ সদস্য বিশ্ব শাসন করছে কখনো সরকারগুলোর সম্মতিতে, কখনো বা বাধ্য করে। এর কেন্দ্রবিন্দুতে আছে রকফেলার-রথচাইল্ড। তবে এই ৩০০ সদস্যের কমিটির ওপরে আছে ৩৩ সদস্যের কমিটি, যা প্রতি বছর উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ায় বোহেমিয়ান প্রোডে বসে এই পিরামিডের মতো সংস্থার মধ্য দিয়ে বিশ্ব শাসন চালাচ্ছে। মূলত ব্যাংক ও আর্থিক ব্যবস্থা দিয়ে এটা চললেও শাসনের সব অঙ্গ এক সময় এতে এসে মেশে। এর নিয়মাদি সৃষ্টি করা হয় ‘দি প্রটোকল অব দি লার্নেড জিওন’ অনুসারে। এটা গোপন তবে সব ক্ষমতাবান ও দখলদারেরা এটা জানে। ক্ষমতার এই উন্মাদনা বিশ্বে বৃহৎশক্তিগুলোকে আবৃত করে ফেলেছে। লেখক অধ্যাপক ড. নাসের ঘায়েমি (টাফট বিশ্ববিদ্যালয়) তার সাম্প্রতিক এক বই ‘এ ফার্স্টরেট ম্যাডনেস’-এ আহ্বান জানিয়েছে এই উন্মাদনা বন্ধ করতে। তিনি স্পষ্ট লিখেছেন, বিশ্ব এখন পরিচালিত এমন পাগলদের দ্বারা, যারা নিজেদের ভালোও বুঝতে পারছে না। সবচেয়ে মারাত্মক হলো ‘সত্য শৃঙ্খলাবদ্ধ’ আর মিথ্যা নৃত্য করছে। তার এই বক্তব্যের ওপর মন্তব্য করেছেন ড. কার্টিস ডি ডিলনসহ বহু পাঠক। তাদের মাঝে একজন চমৎকার বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আজকের দিনের প্রধান পাগলামি হলো যেনতেন প্রকারে সাফল্য লাভ করাতে। তার জন্য কোনো বাধা-নিয়ম থাকবে না।’ প্রযুক্তির এই যুগে এই মানসিকতা মানবসভ্যতাকে এক ভয়ঙ্কর মোড়ে এনেছে।
এই ভয়ঙ্কর মোড় থেকে ফিরতে হলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে ভাবতে হবে এবং কাজ করতে হবে। তা হলো কোনোক্রমেই যেন ক্ষমতাবানেরা মানবতাকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে না পারে। এ প্রচেষ্টা শুধু কিছু চিন্তাশীল ব্যক্তি করলেই চলবে না- সবাইকে করতে হবে, যদি এই শেষবারের ধাক্কায় মানবজাতিকে মহাধ্বংস থেকে বাঁচাতে হয়। আর তার প্রধান অস্ত্র হবে সত্য বলার অবাধ অধিকার ও চেষ্টা- সত্য যেন এক নিঃসঙ্গ যোদ্ধা না থাকে।


আরো সংবাদ