১৭ জানুয়ারি ২০২০

জাফলংয়ের পথের বাঁকে সংগ্রামপুঞ্জি

-

অনিক দাশের ব্যাটারিচালিত গাড়িটা বেশ ঝকঝকে। পথে নেমেছে দুই মাসও হয়নি। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত গাড়িটা চালায় অনিক। অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে ছেলেটা। তবে স্কুলে যেতে নৌকা করে পিয়াইন নদী পার হয়ে যেতে হয় গুচ্ছগ্রাম। সেটাও জাফলংয়েই কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য এক পরিবেশ। শরৎচন্দ্রের ‘বিলাসী’ গল্পের মতো এত কষ্ট করে বিদ্যাদেবীর আরাধনা করতে কোনো চাপই নেই অনিকের পরিবারের। সংগ্রামপুঞ্জিতে প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে মোটে দু’টি। প্রাথমিকেই তাই এ গ্রামের বেশির ভাগ ছেলেমেয়ের পড়ালেখা শেষ হয়ে যায়।
এই এলাকার ইতিহাসটি বেশ চমকপ্রদ। গোয়াইনঘাট একসময় ছিল জৈন্তাপুর রাজ্যের অধীনে। স্বাধীন সার্বভৌম এই রাজ্যের রানীর বিভিন্ন নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখেছি তামাবিল মহাসড়কের এখানে সেখানে। পলাশীর যুদ্ধের প্রায় আশি বছর পর, ১৮৩৫ সালে জৈন্তাপুর ব্রিটিশদের কব্জায় আসে। তখন থেকে মুসলমানরা এখানে স্থায়ী বসবাস শুরু করে। দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র চুনাপাথরের খনি, সমতল ভূমির চা-বাগান, খাসিয়া পল্লীর নিজস্ব জগৎ এই পর্যটন কেন্দ্রের বিশেষ আকর্ষণ।
জাফলং পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় একটি স্পট। সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাট। এখানে আছে পাঁচটি ‘পরগনা’। ধরগ্রাম, আড়াইখা, পিয়াইনগুল, পাঁচভাগ আর জাফলং। পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ থাকে জাফলং জিরো পয়েন্ট, সংগ্রামপুঞ্জি ঝরনা (মায়াবী ঝরনা) এবং কাছাকাছি আরো কিছু ঝরনার দিকে। এই সংগ্রামপুঞ্জি বা মায়াবী ঝরনার ঠিক দক্ষিণ দিকেই একই নামের গ্রাম সংগ্রামপুঞ্জি। অনিক দাশের অটোগাড়িতে চেপে আমরা চলে যাই গ্রামের ভেতরে।
খুব ছোট, ছিমছাম আর পরিচ্ছন্ন একটা গ্রাম। ছোট ছোট টিনের চালওয়ালা একতলা-দোতলা বাড়ি। তিনতলা পর্যন্ত মাথা উঁচু করার সাহস পায়নি কোনো ছাদ। এটাই এখানকার ঐতিহ্য। বাড়িগুলোর নকশাতে বাঙালিয়ানার চেয়ে ভারতের মেঘালয়ের ছাপ বেশি। প্রায় প্রতিটি বাড়িতে সুপারি আর পানের চাষ হয়। সবচেয়ে বড় সুপারি বাগান এখানকার জমিদারের।
জমিদার কিন্তু মহিলা। আসলে এখানকার অধিবাসী মূলত খাসিয়া। খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী এই আদিবাসি ছাড়াও কিছু হিন্দু আর বৌদ্ধ অধিবাসী আছে গ্রামে। মোট সংখ্যা চার অঙ্ক এখনো স্পর্শ করেনি। খাসিয়ারা মাতৃকেন্দ্রিক পরিবার চর্চা করে। অর্থাৎ উপার্জন, তদারকি, সম্পদ বণ্টন, শাসনের ব্যাপারগুলো মেয়েরা দেখে। আর পুরুষেরা গৃহস্থালি কাজকর্ম, রান্নাবান্না, সন্তান পালনের কাজ করে। তবে ব্যাপারটা বাস্তবে খুবই অদল-বদলপ্রবণ মনে হলো।
অনিকের ভাষায় এই গ্রামের মূল আকর্ষণ জমিদার বাড়ি। দুইতলা সাদার মাঝে নীলের কাজ করা বাড়িটা গ্রামের কেন্দ্রে। মোটামুটি হকি খেলার মাঠের অর্ধেক আয়তনের বাড়ির দোতলার বারান্দায় একজন মহিলা দাঁড়িয়ে ছিলেন। অনিক জানাল তিনিই জমিদার। বাড়ির ভেতরে যাওয়া নিষেধ। বিনা অনুমতিতে ছবি তোলার প্রশ্নই আসে না। জমিদারকে দেখে মোটেও মনে হলো না তিনি ছবি তোলার অনুমতি দেবেন। আমার সাথে থাকা ভ্রমণ সঙ্গীরা বলল, ভাই ছবি তোলা বাদ দেন।
গ্রামের শেষ মাথায় চা বাগান। কয়েক বর্গমাইল এলাকাজুড়ে সমভূমির এই চা বাগানটাও জমিদারের অধীনে। তবে এখানকার চা পাতার মান পাহাড়ি পাতার মতো এত ভালো নয়। সবুজ কার্পেটের মতো বাগানটা দেখলে মনে হয় গা এলিয়ে দিই। বাগানের পাশেই কিছু দোকানি (পুরুষ) চা পাতা, সুপারি, পাথরের গয়না নিয়ে বসে আছেন। আমাদের মতো পর্যটকরাই এদের একমাত্র উদ্দেশ্য। তবে অনিক আগেই বলে দিয়েছে, এখান থেকে কিনলে খুব ঠকবেন।
অধিকাংশ অধিবাসী বাসায় গরু, ছাগল, মুরগি পালন করে। এরা জমিদারকে নিয়মিত খাজনা দেয়। ভারত থেকে ব্যবসায়িরা বিভিন্ন পণ্য গাড়িতে করে নিয়মিত বিক্রি করে যায় এখানে। এখানে বাংলা ছাড়াও নিজেদের মাতৃভাষায় পড়ালেখা শেখানো হয়। প্রাইমারি স্কুল ছাড়াও এখানে আছে গির্জা, খ্রিষ্টান কবরস্থান, একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। গ্রামের বাইরের দিকের পুরাতন সংগ্রামপুঞ্জি ভবনটি ছেড়ে নতুন গ্রামের ভবনটি ভেতরে চলে এসেছে।
ঝরনা দেখতে প্রতিদিনই অসংখ্য পর্যটক আসে জাফলংয়ে। সংগ্রামপুঞ্জি গ্রামটাও অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন আপনার দর্শনীয় স্থানে। জাফলংয়ে এলে সবারই একটিবার সংগ্রামপুঞ্জি ঘুরে যাওয়া উচিত।
নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে আপনাদের জন্য কিছু টিপস :
১. শীতকালে জাফলং, বিছানাকান্দি না আসাই ভালো। এগুলোর আসল মজা বর্ষায়।
২. ভাড়া করা গাড়ির চালকের সাথে নির্লজ্জের মতো দামাদামি করে নেবেন।
৩. নদী পার হয়ে জিরো পয়েন্টে যাওয়ার জন্য ট্রলারগুলো সিন্ডিকেট করে গলাকাটা দাম হাঁকাবে। আবহাওয়া ভালো থাকলে নৌকায় করে ভেঙে ভেঙে বিভিন্ন স্পটে যাওয়ার চিন্তা করতে পারেন।
৪. ঝরনার জন্য পাথর বেয়ে উপরে ওঠা খুবই বিপজ্জনক। পিচ্ছিল পাথরে পিছলে পড়ে অনেকের মৃত্যুও হতে পারে। তাই সতর্ক থাকবেন।
৬. অনেকের মুঠোফোনের সলিল সমাধি ঘটে, তাই সাবধান। ঝরনার পানিতে ভিজতে চাইলে শুকনো কাপড়সহ প্রস্তুতি নিয়ে আসবেন।


আরো সংবাদ

বিপিএলের নতুন চ্যাম্পিয়ন রাজশাহী ‘কেরলে কেউ খাবারের সাথে ধর্ম মেশায় না’ সাংবাদিকতার ইতিহাসে প্রথম! রাজার পোশাকে, হাতে তলোয়ার নিয়ে রিপোটিং (ভিডিও) দাবানলে বিধ্বস্ত অস্ট্রেলিয়ায় বৃষ্টি, ১৮ মাসের বাচ্চার নাচ ভাইরাল দূতাবাস অ্যাপে খুব সহজে ৩৪ সেবা পাওয়া যাচ্ছে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী লজ্জাজনক হারের পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় ভারতের সোলাইমানি হত্যার দায়ে ট্রাম্পের প্রাণদণ্ড হওয়া উচিত : মার্কিন সাংবাদিক ইরান-মার্কিন সঙ্ঘাত : ওআইসির আত্মসমালোচনার সুযোগ যে কথা বলতে চাই না প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ, ভারতের নির্ভয়া কাণ্ডে ফাঁসি ১ ফেব্রুয়ারি ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’ : প্রসঙ্গ কথা

সকল