২০ জানুয়ারি ২০২০

আমাদের গণিত স্যার

-

বেশ কয়েক বছর আগেই জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। ছাত্র অবস্থায়ও ছিলেন অত্যন্ত তুখোড়। দশম শ্রেণীতে থাকা কালীন একবার এক গণিত কম্পিটিশনে গোল্ড মেডেল পান। নাম আবদুল গফুর। গফুর স্যার নামে এলাকায় ছোট-বড় সবাই চেনে। নামকরা এক হাইস্কুলের গণিত শিক্ষক তিনি। তাকে গণিতের জাহাজ হিসেবে সবাই মানে। আশপাশের দশ গ্রামে তার নামডাক। কেউ কেউ গণিত জাদুকর বলেও ডেকে থাকেন। দূর-দূরান্ত থেকে অনেক ছাত্রছাত্রী তার কাছে পড়তে আসে।
ছাত্রদের সাথে তিনি খুব মজা করে থাকেন। গণিতের মতো জটিল বিষয়ও তিনি পানির মতো সহজ করে শিখিয়ে থাকেন। ছাত্ররা যেন গণিত দেখে ভয় না পায়। তিনি বলেন, শোনো বাবারা, গণিত দেখে ভয় পেলে চলবে না বরং গণিতকে ভালোবাসতে হবে। কোনো ছাত্রছাত্রী গণিত সমাধান করতে পারলে তিনি গুড না বলে থাকেন ডুগ। বেশ হয়েছে না বলে বলেন, ব্রেশ হয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা হেসে গড়িয়ে পড়ে।
ষষ্ঠ হতে দশম শ্রেণীর সব গণিত ও ফলাফল তার নখদর্পণে। ক্লাসে গিয়ে তিনি বলেন, কোন অনুশীলনীর কত নাম্বার করতে হবে বলো। ছাত্ররা বলা মাত্র তিনি তা বই না দেখেই নিমেষেই সমাধান করে ফেলতেন। সহজ করে বুঝিয়ে দিতেন। ক্লাস শেষে প্রতিদিনই তিনি ছাত্রদের মজার মজার গল্প শোনাতেন। নিজের ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণ করতেন।
‘শোনো বাবারা, আমরা তোমাদের মতো মোবাইল বা কম্পিউটার চালাতে পারিনি। এগুলো আমাদের সময় ছিল না। আমরা পড়ার সময় মনোযোগ দিয়ে পড়তাম আবার খেলার সময় মজা করে খেলতাম। তোমরা ঘরে পড়ে থাকো আর আমরা পড়া শেষে মাঠে চলে যেতাম। তোমাদের মতো এত রোগ শোক আমাদের হতো না।’
এখন এসব অতীত। স্যার আর আগের মতো নেই। বয়স হয়েছে। চার মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। তারা তাদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। একমাত্র ছেলে লেখাপড়া শেষ করে বাবার মতো শিক্ষক হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য, হঠাৎ স্ট্রোক করে ছেলেটা মারা যায়। নিজের চোখের সামনে একমাত্র জোয়ান ছেলের এমন অকাল মৃত্যু তিনি সহ্য করতে পারেননি।
স্যার রিটায়ার্ড করেছেন অনেক আগেই। নানা রোগ তাকে ঘিরে ধরেছে। অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারেন না। এখন আর কোনো ছাত্রছাত্রীও তার কাছে পড়তে আসে না। যে সমাজ একসময় তাকে মাথায় তুলে রেখেছে, আজ স্বেতী রোগের কারণে সে সমাজ তাকে এড়িয়ে চলে। গ্রামের সবাই বলাবলি করে গফুর স্যার নাকি পাগল হয়ে গেছেন। সারা দিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ান আর বিরবির করে গণিতের বিভিন্ন সূত্র আওড়ান। কাউকে দেখলেই বলেন, (ধ+ন)২ সূত্রটা বলত। সবাই হাসাহাসি করে। পারলি না বলে স্যার আকাশের দিকে তাকিয়ে সূত্রটা বারবার বলতে থাকেন। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা আসে। অন্ধকার বাড়তে থাকে। একসময়ের তুখোড় গণিত স্যার অন্ধকারে মিলিয়ে যান।
সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় প্রিয়জন

 


আরো সংবাদ




krunker gebze evden eve nakliyat