০৬ ডিসেম্বর ২০১৯

বাংলাদেশের অর্থনীতি অর্জন এবং চ্যালেঞ্জ

-

একটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত থাকে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এ লক্ষ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ তার একটি হচ্ছেÑ আমাদের প্রবৃদ্ধির মাত্রা আরো বাড়াতে হবে। প্রবৃদ্ধির মাত্রা সাধারণত বোঝানো হয় জাতীয় উৎপাদন বা জিডিপি বৃদ্ধি। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে দারিদ্র্যবিমোচন একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। কেননা দারিদ্র্যসীমার নিচে আমাদের দেশের বিরাট জনসংখ্যা বসবাস করছে আরেকটি বিষয় হচ্ছেÑ মূল্যস্ফীতি।
এই লক্ষ্যগুলো অর্জনের ক্ষেত্রে আমাদের কিছুটা সাফল্য আছে। কিন্তু এতে তুষ্টির অবকাশ নেই। এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে আছে। অর্জনের ক্ষেত্র আমরা দেশের দুই ভাগে ভাগ করতে পারি। একটি হচ্ছে সময়ের সাথে সাথে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কতটুক অগ্রসর হতে পেরেছি। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছেÑ আমাদের পাশের যে দেশগুলো রয়েছে সেসব দেশের তুলনায় কতটুকু অর্জন হয়েছে। ভালো নাকি মন্দ হয়েছে? এর থেকে আমি যদি প্রবৃদ্ধির কথা বলি, তা হলে বলবÑ এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন বেশ সন্তোষজনক। আমাদের দেশে ১৯৮০ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩.০৮ শতাংশ। ২০০৮ থেকে ২০১০ এ বেড়েছে ৫.০৯ শতাংশ। ২০১১ থেকে ২০১৫ সময়কালে বেড়েছে ৬.০২ শতাংশ। ২০১৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত বেড়েছে ৭.০৪ শতাংশ। আমি এশিয়ার ১২টি দেশের সাথে বাংলাদেশের অর্থনীতি তুলনা করেছি। তাতে দেখেছি ২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ছয়টি দেশের প্রবৃদ্ধির হার বেশি ছিলে এবং ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পাঁচটি দেশের বেশি ছিল। ২০১৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি। কাজেই প্রবৃদ্ধির হার বেশ সন্তোষজনক। তবে বর্তমান যে মাথাপিছু আয় আছে এবং দারিদ্র্যসীমার নিচে যারা বাস করে সে পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের প্রবৃদ্ধির হার আরো বাড়ানো দরকার। কিছু কিছু দেশ কোনো কোনো সময়ে ডাবল ডিজিট অর্জন করতে পেরেছে। আমাদেরও সামনে সেই রকম অগ্রসর হতে হবে।
প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখে যেসব দিক সেগুলো নিয়ে একটু আলোকপাত করা যেতে পারে। তন্মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলো বিনিয়োগ। বিনিয়োগ আমাদের কিছুটা বেড়েছে! ২০০০ সালে জিডিপির আনুপাতিক হার অনুসারে ছিল ২৪ শতাংশ। তা ২০১৭ সালে দাঁড়িয়েছে ৩০ শতাংশ। কিন্তু বেসরকারি খাতে গত এক দশকে ২২ শতাংশের ধারে কাছেও যায়নি। কাজেই যেটুকুই বেড়েছে তা সরকারি বিনোয়োগের মাধ্যমে এসেছে।
বেসরকারি খাতে বিনোয়োগ বাড়ানোর জন্য আমাদের বিশেষ দৃষ্টি দেয়া দরকার। এ ব্যাপারে সরকারের কিছুটা উদ্যোগ আছে কিন্তু খুব একটা সন্তোষজনক নয়। এর মধ্যে হচ্ছে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট, পরিবহন ও টেলিকমিনিকেশন ইত্যাদি। এ ছাড়া রয়েছে এনার্জি তথা গ্যাস-বিদ্যুৎ। তার পর আমাদের দেশে রয়েছে সুশাসনের যথেষ্ট ঘাটতি। বিশ্বব্যাংকের র্যাংকিংয়ে আমাদের অবস্থান খুবই করুণ। যেমন ২০১৮ সালে আমাদের অবস্থান দাঁড়িয়েছে ১৭৬ এ। অর্থাৎ পৃথিবীর ১৭৫টি দেশের পরে আমাদের অবস্থান।
মানবসম্পদ উন্নয়ন খ্বুই জরুরি। মানবসম্পদ উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্বব্যাংকের র্যাংকিংয়ে যে সুশাসনের কথা বলেছিলাম সেটা সূচকে নির্ণয় করা হয়। সেখানে সেই দৃষ্টিতে সুশাসন, দুর্নীতি দমন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সহিংসতা না থাকা ইত্যাদিতে ১২টি দেশের মধ্যে আমাদের চেয়ে ১০ দেশের অবস্থান ভালো। তার পর জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে সাত দেশের অবস্থান আমাদের চেয়ে ভালো। যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক গুণগত মান নিয়ন্ত্রণে রেগুলেট কমিশন থাকে। সে দৃষ্টিতে আমাদের দেশ সর্বনিম্ন। এর মধ্যে ১১টি বিষয় সহজেই চলে আসে। এর মধ্যে একটি হলোÑ একটি ব্যবসা শুরু করতে কত দিন সময় লাগে, তার পরে কনস্ট্রাকশন পারমিট কত দিন কত সময় লাগে, তার পরে বিদ্যুৎ, ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বিল পাওয়া, করের কী রকম জটিলতা আছে,আমদানি রফতানির ক্ষেত্রে কী ধরনের জটিলতা থাকে এবং শ্রমবাজারের নিয়োগ ইত্যাদি।
এ ছাড়া দিন দিন আরো একটি চ্যালেঞ্জ বড় হয়ে দেখা দিচ্ছেÑ সেটি হলো ব্যাংকিং ব্যবস্থা। এটার মাত্রাও ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। এখন তো এটা প্রায় দুই লাখে দাঁড়িয়েছে। এটাকে পুনর্বিন্যাস করা যেতে পারে। এটারও একটা আনুপাতিক হার নির্ধারণ করা যেতে পারে। ডিসেম্বর ২০১০ এ ছিল ৮.০৮ শতাংশ। এখন জুন ২০১৯ এ দাঁড়িয়েছে ১১.০৭ শতাংশ। এর পেছনে যে কারণগুলো সেগুলো আমাদের জানা আছে কিন্তু এ ব্যাপারে সেটা খুব একটা জোরদার নয়। এর মধ্যে একটা হচ্ছে ব্যাংগুলোর সুশাসনের অভাব। রিলেশনশিপ বিষয়টা চলে আসে সহজে আগে। অর্থাৎ কিভাবে দায়িত্ব এলো আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ইত্যাদি বা যাদের পলিটিক্যাল লিংক আছে তাদের সে ধরনের লোকজনকে দেখি। ঋণ আদান প্রধানের প্রস্তাব ও বাস্তবায়ন। এ ক্ষেত্রে ঋণ ও ঋণখেলাপি বিষয়টা মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। এই ঋণ আদায়েরও যথেষ্ট অনিয়ম রয়েছে। আবার রাজনৈতিকভাবেও ঋণ দেয়া ঋণ আদায় করার ফরমালিটির সমস্যা। আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে বিচারিক ব্যবস্থার দিকগুলো। যার ফলে দেখা যাচ্ছেÑ আদালতে হাজার হাজার মামলা জমা হয়ে আছে। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ থাকায় অনেক টাকা আটকে আছে। আমাদের মতো গরিব দেশে অনেক বেশি ব্যাংক, যার ব্যবসা-বাণিজ্য মোটেও ভালো হচ্ছে না। সব মিলে ব্যাংকিং খাতে যে দুরবস্থা, তা সমাধান করাই লাগবে। ইতোমধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, সাধারণ মানুষের আস্থা ব্যাংকি খাত থেকে উঠে যাচ্ছে। তার ফলে আমানত প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। এই কম থেকেই ঋণ দেয়ার ব্যবস্থাপনা কমে যায়। ঋণের সূচক প্রবাহ আগস্ট ২০১৯ এ এসে দেখতে পেয়েছি ১০ শতাংশের একটু বেশি। যেটা বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি টার্গেট ছিল সাড়ে ১৭ শতাংশ; যা হোক এই সমস্যাগুলো সমাধান করে বেসরকারি ব্যাংক ব্যবস্থায় নজর দিতে হবে। কেননা তাও ডাবল ডিজিটে নিয়ে যেতে চাই।
সরকারি খাতের বিনিয়োগের সমস্যা আছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে প্রকল্প সময়মতো বাস্তবায়ন হয় না। বেশি কালক্ষেপণের ফলে এগুলোর সুফল পেতে দেরি হয়। যেটা পরিকল্পনা ছিল দুই বা তিন বছরের সেটা ছয়-সাত বছর বা আরো বেশি সময় লেগে যায়। কিছু দিন আগে একটা প্রতিবেদন তৈরি করেছিল। সেখানে তারা দেখতে পেয়েছেÑ বর্তমান হারে যদি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হয়। ২০১৫ অর্থবছরে এক হাজার ৩৪টি প্রকল্প তারা বিশ্লেষণ করে সেখানে দেখিয়েছে ১৫৪টি প্রকল্প লাগবে ৬ থেকে ১০ বছর, ১০৬টি প্রকল্প ১১ থেকে ১০০ বছর এবং ৩২টি ১০০ বছরেরও বেশি। কাজেই এটা একটা বড় রকমের সমস্যা। কমসংখ্যক অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবে এ সমস্যা সমাধান করা যেতে পারে। এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সাথে যারা জড়িত তাদের জবাবদিহিতা খুব দরকার। এই দু’টি বিষয় নিশ্চিত না হতে পারলে আমরা এ সমস্যা থেকে বের হতে পারব না।
বিনোয়োগ প্রবৃদ্ধির জন্য আমাদের মানবসম্পদের যথাযথ ব্যবহার করতে হবে। এই সম্পদ আমাদের শ্রেষ্ঠ এক সম্পদ। এটা খুবই একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য শিক্ষা-দীক্ষা ও প্রশিক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম।
শ্রমিকও আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পদ। শ্রমিক ইনডোর্সমেন্ট ১০০ পার্সেন্ট। কিন্তু এটা বড় আকারে ড্রপআউট হয় অর্থাৎ ঝরে পড়ে। এ ক্ষেত্রে এশিয়ার যে ১২টি দেশের কথা বলেছি তাদের চেয়ে আমাদের কম। তার পরও মাধ্যমিক পর্যায়ে আমাদের ইনডোর্সমেন্ট হয় ৬০ পার্সেন্ট। প্রাথমিক পর্যায়ে ১০০ পার্সেন্ট হয়। আর মাঝারি পর্যায়ে অর্থাৎ ফোর সেকেন্ডারি লেবেলে ১৩ পার্সেন্টে নেমে আসে। শুধু পাকিস্তান ছাড়া বাকি ১১টি দেশের মধ্যে আমরা নিচে। এ ক্ষেত্রে আমাদের আরো নজর দেয়া লাগবে।
এর সাথে সাথে বেসরকারি খাতেরও একটা ভূমিকা আছে। এ ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গির জন্য বিভিন্ন কারিকুলাম জানতে হবে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারে।
আমাদের দেশ থেকে এগিয়ে ইন্ডিয়া, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানÑ তারা প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স নিজের দেশে পাঠায়। সেই তুলনায় আমাদের দেশে এখনো অনেক কম। এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশের লোকদের সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমে সমন্বয় করা দরকার। এতে আমাদের দেশেও রেমিট্যান্স বেড়ে যাবে।
প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে রফতানি। এখানে বেশ কিছু প্রবৃদ্ধি রয়েছে। আনুপাতিক হারে বলতে গেলে এটা ছিল ১৯৮৫ সালে ৫ শতাংশ। ২০১৭ সালে এটা ১৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও এশিয়ার অধিকাংশ দেশ আমাদের চেয়ে এগিয়ে আছে। শুধু পাকিস্তান আছে আমাদের নিচে। সাম্প্রতিককালে আমাদের রফতানি কিছুটা হলেও হতাশাব্যঞ্জক।
এর কারণ হলো ২০১৮-১৯ সালে আমাদের রফতানি ছিল ১০.৫০ শতাংশ কিন্তু তারপরে থেকে বেশ কিছুটা কমে আসছে এবং জুলাই থেকে আগস্ট ২০১৮-১৯ আর্থবছরে আমাদের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২.০৫ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে আমাদের রফতানিকৃত পণ্যের সংখ্যা বাড়াতে হবে। এখনো আমরা ইউরোপ এবং আমেরিকার বাজারের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের আরো নতুন নতুন বাজার ও পণ্য সৃষ্টি করতে হবে। কিছুটা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে যেমনÑ জাপান কানাডায় রফতানি হয়েছে কিন্তু এ ক্ষেত্রে আরো বেশি ভূমিকা রাখা দরকার। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশীদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্স একটি গুরুত্বপূর্ণ। এই রেমিট্যান্সের অবস্থা মোটামুটি ভালো আছে। এই অর্থবছরে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৬.০৫ অগ্রগতি আছে কিন্তু এই অর্থ বছরের আগের অর্থ বছরে ছিল ১৪ শাতাংশ। যা হোক, এই ক্ষেত্রেও আরো নতুন বাজার সৃষ্টি করা, আরো দক্ষলোক সৃষ্টি করা লাগবে। এই দক্ষলোক যদি পাঠাতে পারি তাহলে আমাদের রেমিট্যান্স আরো বেড়ে যাবে। বাংলাদেশে মাথাপিছু রেমিট্যান্স তুলনা করে দেখেছিÑ নেপাল, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ফিলিপাইন থেকে আমাদের রেমিট্যান্স কম। এর কারণ হচ্ছে আমাদের শ্রমিকদের দক্ষতা অনেক কম। দেখা যাচ্ছে আমাদের শ্রমিকরা ডমিস্টিক অ্যানিমেলের কাজ করে, বাসাবাড়ি, ক্লিনারের, বাথরুমের কাজ করে অথবা কোনো রেস্টুরেন্টে ইত্যাদিতে কাজ করে। যদি দক্ষ শ্রমিক পাঠাতে পারি তাহলে রেমিট্যান্স বেড়ে যাবে অনেক।
দারিদ্র্যবিমোচনে আমাদের অগ্রগতি ভালোই হয়েছে। তবে সাম্প্রতিকালে এই অগ্রগতিটা শ্লথ হয়ে গেছে। ২০০০ সালে প্রায় ৪৯ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত। এটা ২০১৬ তে ২৪.০৩ শতাংশে নেমে এসেছে। বর্তমানে তা ২১.০৮ বা প্রায় ২২ শতাংশ। কাজেই এ ক্ষেত্রে বেশ উন্নতি হয়েছে। কিন্তু বার্ষিক গড় হার যে দারিদ্র্যবিমোচনের সেটা ক্রমেই কমে আসছে। ২০০০ থেকে ২০০৫ এ এই বার্ষিক গড় হার দারিদ্র্যবিমোচনে ছিল ১.০৮ শতাংশ, ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল হলো ১.০৫ শতাংশ এবং ২০১০ থেকে ২০১৮ এ ১.০২ শাতাংশে নেমে এসেছে। কাজইে আমাদের যে ২১.০৮ বা ২২ শতাংশ যে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে তা শ্রীলঙ্কার দ্বিগুণ। কাজইে এই সমস্যার উত্তরণের উপায় খোঁজা লাগবে। এটার জন্য আমাদের যেটা করা লাগবেÑ এক দিকে আয় বৈষম্য ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে বাংলাদেশে, এটি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। তারপরে সামাজিক নিরাপত্তা বাজেটে আনতে হবে। এবং দরিদ্র মানুষ যেন স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা সেবা স্বল্প খরচে পায় সে ব্যবস্থা করতে হবে। বাজারমুখী শিক্ষার মাধ্যমে তাদের কর্মব্যবস্থা সৃষ্টিকরতে পারে সে বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে।
এই হলো আমার একটা বর্তমান চিন্তাধারা। কিন্তু আমি যে মূল্যস্ফীতির কথা বলে ছিলাম সেটা হলোÑ আমাদের দেশ মোটামুটি একটা সহনীয়পর্যায় আছে। তার পরও বলছি, আমাদের আশপাশের দেশগুলো কিন্তু আমাদের চেয়ে মূল্যস্ফীতি অনেক কম। যদি ২০১৭ সালের পরিসংখ্যানে দেখি, তা হলে বলব শ্রীলঙ্কা ছাড়া বাকি সব দেশের মূল্যস্ফীতি আমাদের দেশের চেয়ে অনেক কম। কাজেই মূল্যস্ফীতি বাড়লেও কিন্তু দারিদ্র্যবিমোচনের হার অনেকটা কমে যায়। জিনিসপত্রের দাম বাড়লে দরিদ্ররা নিত্যপণ্যও কিনতে পারে না।
সবশেষে আমাদের আরেকটা চ্যালেঞ্জ হলো স্বল্পোন্নত দেশ থেকে আমরা ২০২৪ সালে বের হয়ে যাবো। সে হিসাবে আমাদের ইউরোপ আমেরিকার বাজার ধরে রাখতে হবে। আমাদের প্রোডাক্ট উৎপাদন বাড়াতে হবে। এছাড়া আরেকটি বিষয় হলো, বর্তমানে আমাদের স্বল্প উন্নত দেশ হিসেবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে যে আর্থিক সাহায্য পাই সেটার স্ট্রান্ফার কন্ডিশন বুঝতে হবে। এতে বর্তমানে যে অনুকূল পরিস্থিতি আছে সেটা থাকবে না। এর ফলে সুদের হার বেড়ে যাবে। কাজেই সেদিকটা আমাদের চেষ্টা করা লাগবে; যাতে আমরা সাহায্যটা সুষ্ঠুভাবে পেয়ে দেশের সার্বিক উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারি।
সবশেষে নীতিনির্ধারণী-বিষয়ক কিছু কথা বলতে চাই। এর মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে ফিজিক্যাাল এনার্জি সাপ্লাই, গভর্ন্যান্স বিজনেস এ বিষয়গুলো ভাবতে হবে। যাতে করে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আরো বাড়তে পারে। সরকারি খাতের বিনিয়োগ গুলোর বস্তুনিষ্ঠ চিন্তার মাধ্যমে প্রাধিকার নির্ণয় করা এবং গৃহিত প্রকল্পগুলো সময় মতো বাস্তবায়ন করা। প্রকল্পের সংখ্যা কমাতে আর্থিক বরাদ্দ দেয়া। তার পরে আমাদের যে প্রশাসনিক যন্ত্র আছে তাদের দক্ষতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে। মানবসম্পদ উন্নয়নে আমাদের উচ্চশিক্ষায় নজর দিতে হবে। নজর দিতে হবে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ বিষয়টিও। আরো বেশি নারীশ্রমিক যেন উৎপাদনে ভূমিকা পালন করতে পারে সে ব্যাপারেও নিশ্চিত হতে হবে। রফতানির ক্ষেত্রে পোশাক শিল্পের নির্ভরশীলতা কমিয়ে অন্যান্য বিষয় বাড়াতে হবে। ভালো পণ্যের সংখা বাড়াতে হবে। এখানে আমরা যে পণ্যগুলো পাঠাই সে গুলোর মান বাড়িয়ে দাম বাড়িয়ে এগিয়ে যেতে পারি। এখনো আমরা মধ্যপ্রাচ্যে নির্ভরশীল। এ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি করতে হবে।
তার পরে আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার বেষ্টনী বাড়াতে হবে। এখানে দেখা যায় যারা উপকৃত হওয়ার কথা তারা না হয়ে যারা উপকৃত হওয়ার কথা নয় তারা উপকৃত হয়। যেমন স্থানীয় রাজনৈতিক কারণে রাজনৈতিক বলয়ের মানুষেরাই উপকৃত হয়। প্রায় সময়ই মিডিয়াতে এই বিষয়গুলো উঠে আসে। এখানেও প্রায় সময় যারা ধরা পড়ার কথা, তারা ধরা পড়ে না।
আমাদের কর ব্যবস্থাও দারিদ্র্যবিমোচনে ভূমিকা পালন করে। এই দিকটাও খেয়াল রাখতে হবে। এবং মূল্যস্ফীতির মাত্রাটা আরো কমিয়ে আনা উচিত বলে মনে করি। সে সাথে কৃষকদেরও মূল্যায়ন করতে হবে। সব মিলিয়ে যেটা বলতে চাই আমাদের অর্জন প্রশংসার দাবিদার কিন্তু আত্মতুষ্টির কোনো অবকাশ নেই। কেননা এখনো আমাদের অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বা পূর্ব-দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে আমরা অনেক পেছনে। তাই যে চ্যালেঞ্জগুলো উল্লেখ করেছি সেগুলো সমাধান করেই আমাদের আত্মতুষ্টি অর্জন করতে হবে। হ


আরো সংবাদ




Paykwik Paykasa
Paykwik