২১ অক্টোবর ২০১৮

একটি সাদামাটা মেয়ের গল্প

-


মেয়েটা বড্ড অন্তর্মুখী। এক্কেবারে মাটির মতো। মাটির সোঁদা গন্ধ লেগে থাকে তার শরীরে। পড়ালেখা করে একটা মাদরাসায়। সৌদি আরবের মেয়েদের মতো সব সময় আবায়া পরে। আবায়া ব্যতীত কখনোই বাইরে বের হয় না। তাকে দেখার সুযোগ নেই। চোখগুলো শুধু দেখা যায়। মাঝে মাঝে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকায়। চাতকি চাউনি। চাউনিতে এক ধরনের মায়া কাজ করে। গভীর দৃষ্টিতে তাকালে উপলব্ধি হয়, এ চাউনি কোনো স্বাভাবিক চাউনি না। এ চাউনি যেন শূন্যতার কোলাহল বা কোনো কিছুর জন্য অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষারত এমন। মেয়েটার নাম আশিফা। সাজিদা খালার বড় মেয়ে। সেবার সাজিদা খালার বাসায় কুষ্টিয়া গিয়েছিলাম প্রয়োজনীয় একটা কাজে। আমি ঘরকুনো স্বভাবের মানুষ। আত্মীয়স্বজনদের বাসায় খুব একটা যাওয়া হয় না। চার দেয়ালের ভেতর আবদ্ধ পরিবেশে রঙতুলি দিয়ে ছবি আঁকাআঁকি আর টুকটাক লেখালেখি পর্যন্তই আমার সীমাবদ্ধ জীবনযাপন।
যাকগে সে কথা। সাজিদা খালা আমাকে তাদের বাসায় দেখে যারপরনাই খুশি হলেন। খালা খুবই অতিথিপরায়ণ মানুষ। অতিথিদের আপ্যায়নে তার জুড়ি নেই। আমাকে অত্যন্ত স্নেহভরে আপ্যায়ন করলেন। আশিফাও আপ্যায়নে কোনো ত্রুটি রাখেনি। মেয়েটাকে আমি যতই দেখি ততই মুগ্ধ হই। বাসার ভেতরেও সে অত্যন্ত পরিপাটি এবং পোশাক-আশাকে যথেষ্ট মার্জিত। সব মিলিয়ে বলা যায়, অত্যন্ত গোছালো একটি মেয়ে। ওর সাথে অনেকক্ষণ কথা বললাম। মেয়েটা লাজুকও বটে।
কথাবার্তায় ঝরে পড়ে অবারিত লজ্জা। একপর্যায়ে জানতে পারলাম, সেও টুকটাক লেখালেখি করে। অনেক ম্যাগাজিন, পত্রিকায় নাকি ওর অনেক লেখা ছাপাও হয়েছে। আমিও লেখালেখি করি জেনে অনেক খুশি হলো। আমার লেখা অনেক কবিতা ওকে পড়তে দিয়েছিলাম। সে পড়েছিল। ফিডব্যাকও দিয়েছিল। তবে সেটা খুবই বাজে, আমার লেখাগুলো নাকি অশ্লীল যৌনতায় ভরা।
অনেক দিন পরে মাসিক একটা ম্যাগাজিনে আমি আশিফার লেখা দেখতে পাই। ভালোই লেখে। ওর লেখার হাত অতটা খারাপ না। তারপর এই ম্যাগাজিনে আমিও অনেকগুলো লেখা পাঠাই। গুটিকয়েক লেখা ব্যতীত প্রায় সব লেখাই ছাপা হয়েছিল। অনেকে ফোন করেও জানিয়েছিল যে, আমি নাকি ভালোই লেখি। এই ম্যাগাজিনে লেখা চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনেকেই অনুপ্রেরণা দিয়েছে। অনেক দিন হয়ে গেল এই ম্যাগাজিনে আর লিখি না। হঠাৎ একদিন রাতে একটা ফোন এলো। অপরিচিত নাম্বার। কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মেয়েকণ্ঠ ভেসে এলোÑ আপনি কি..., আমি আশিফা?
প্রথমে কণ্ঠ চিনতে পারিনি। নাম বলায় চিনতে আর তেমন অসুবিধা হয়নি। আমি বলিÑ আজ্ঞে হ্যাঁ। আমিই সেই অধম। বলুন আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি? হয়তো সে এরকম উত্তরের জন্য প্রস্তুত ছিল না। তাই ফোন কেটে দিয়েছে। কিছুক্ষণ পর দেখি, আবার ফোন দিয়েছে। রিসিভার তুলতেই সে বলে উঠলÑ ভাইয়া, আমি সাজিদা খালার মেয়ে আশিফা। আপনি এরকমভাবে কথা বলছেন কেন? এরপর সে আমাকে এরকম অজস্র প্রশ্নবাণে জর্জরিত করল।
এক পর্যায়ে জানতে চাইল, আমি আর তার ম্যাগাজিনে লিখি না কেন? ওর কাছ থেকে এই প্রশ্ন শুনে ভালোই লাগল। তার মানে সে আমার লেখাগুলো পড়েছে। তখন হঠাৎ মনে হলোÑ সে যদি আমার লেখা পড়েই থাকে, তাহলে আমি আর লিখছি না কেন? আসলেই তো! আমি কেন লিখছি না?

প্রিয়জন-১৬৪৯
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


আরো সংবাদ