২১ অক্টোবর ২০১৮

সবচেয়ে বড় রোজা আইসল্যান্ডে, ছোট চিলিতে

আইসল্যান্ডের কয়েকজন মুসলিম - সংগ্রহ

সময়ের পার্থক্যের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যেমন একদিন আগে-পরে হয়, তেমনি অঞ্চল ভেদে রোজার সময়ও কম-বেশি হয়ে থাকে। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা পালন করেন ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা; কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সূর্যদয় ও সূযাস্তের পার্থক্যের কারণে  রোজার সময়ও কম বেশি হয়। কোন কোন অঞ্চলে সেটি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি আবার কোন অঞ্চলে অনেক কম।

এ বছর কোন কোন দেশে ২০ ঘণ্টার বেশি আবার কোন দেশে ১১ ঘণ্টারও কম সময় রোজা রাখাতে হচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরেই সবচেয়ে বেশি সময় রোজা পালন করতে হচ্ছে ইউরোপের দ্বীপরাষ্ট্র আইসল্যান্ডের মুসলিমদের। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের এই ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রটিতে এখন সবচেয়ে বড় দিন। ঘড়ির কাটার হিসেবে যা ২০ ঘণ্টা ১৭ মিনিট। দেশটির স্থানীয় সময় রাত আড়াইটায় সুবহে সাদিক হয়, আর ইফতার অর্থ সূর্যাস্ত হয় পৌনে এগারোটায়। এত দীর্ঘ সময় রোজা রাখতে সমস্যায় পড়ছেন দেশটির অল্প সংখ্যক মুসলিম নাগরিক। দেশটির মুসলিম জনসংখ্যা আটশোর মতো।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রোজার সময় আইসল্যান্ডের প্রতিবেশী ও ডেনমার্ক শাসিত দ্বীপ গ্রিণল্যান্ডে। দেশটিতে এ বছর রোজার সময় ১৯ ঘণ্টা ২৫ মিনিট। আর বাল্টিক অঞ্চলের দেশ ফিনল্যান্ড আছে তৃতীয় অবস্থানে, দেশটির মুসলিমরা রোজা রাখছে ১৯ ঘণ্টা ২১ মিনিট। এরপর যথাক্রমে একই অঞ্চলের নরওয়ে(১৯ ঘণ্টা ১৯ মিনিট), সুইডেন (১৯ ঘণ্টা ১২ মিনিট)।

উত্তর মেরুর অন্যান্য দেশগুলোতেও এরকম দীর্ঘ সময় রোজা রাখতে হচ্ছে মুসলিমদের। অন্যদিকে এই গ্রহের অন্য প্রান্তে অর্থাৎ দক্ষিণ মেরুতে পাওয়া যাচ্ছে বিপরীত চিত্র। দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের দেশ চিলির মুসলিমরা সবচেয়ে কম সময় রোজা রাখছে। দেশটিতে এখন ১০ ঘণ্টা ৩৩ মিনিট দীর্ঘ হচ্ছে দিন। আইসল্যান্ডের তুলনায় যা প্রায় ১১ ঘণ্টা কম। এছাড়া নিউজিল্যান্ডে রোজা হচ্ছে ১১ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট, দক্ষিণ আফ্রিকায় ১১ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট। ব্রাজিল আর অস্ট্রেলিয়ায় হুবহু একই সময় রোজা রাখতে হচ্ছে, ১১ ঘণ্টা ৫৯ মিনিট।

অন্যান্য নবী-রাসুলদের(সা.) যুগে রোজা

ইসলামের পাঁচটি মূল ভিত্তির একটি হলো রোজা। প্রতিবছর পবিত্র রমজান মাস জুড়ে সারা বিশ্বের মুসলিমরা সাওম পালন করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।

আল্লাহপাক রোজা যে শুধু আমাদের ওপর ফরজ করেছেন তা নয়, মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর আগেও অন্যান্য নবী-রাসুলের যুগে রোজার বিধান ছিলো। পৃথিবীর প্রথম মানুষ আমাদের আদি পিতা হযরত আদম(আ.) ও বিবি হাওয়াও রোজা রেখেছিলেন বলে জানা যায়।

পরবর্তীতে অন্যান্য নবী রসুল(সা.) ও উম্মতের ওপরও রোজার বিধান আরোপ করা হয়েছিল। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছে, ‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমনিভাবে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা খোদাভীরুতা অর্জন করতে পারো। (সূরা বাকারা, আয়াত-১৮৩)।
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা আলুসি (র.) তার ‘রুহুল মাআনি’ তাফসিরে উল্লেখ করেছেন যে, উপরোক্ত আয়াতে ‘মিনকাবলিকুম’ দ্বারা হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে হজরত ঈসা (আ.) পর্যন্ত সব নবী-রসুলের সময়কে বুঝানো হয়েছে।

মহান আল্লাহতায়ালা হজরত আদম (আ.)-কে জান্নাতে প্রেরণ করে একটি গাছের ফল খেতে নিষেধ করেছিলেন। মূলত সেটিই ছিলো মানুষের প্রতি আল্লাহর প্রথম সংযমের নির্দেশ। আল কোরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করতে থাক এবং সেখানে যা চাও, যেখান থেকে চাও, পরিতৃপ্তসহ খেতে থাক, কিন্তু তোমরা ওই গাছের কাছে যেও না। (যদি যাও বা তার ফল খাও) তাহলে জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।’ (সূরা বাকারা, আয়াত-৩৫)। হজরত আদম (আ.) ও হজরত হাওয়া (আ.) শয়তানের প্ররোচনায় ওই গাছের ফল খেয়েছিলেন এবং পরিণামে মহান আল্লাহতায়ালা তাদের তাদের বেহেশত থেকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন।

এই ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়েছিলেন হজরত আদম (আ.) ও হজরত হাওয়া (আ.)। এই ভুল থেকে ক্ষমা পেতে তওবা ইস্তিগফার করেন এবং এর কাফ্ফারা হিসেবে ধারাবাহিক ৪০ বছর রোজা রেখেছিলেন তারা।
হজরত আদম (আ.)-এর পর অন্য নবী-রসুলগণের যুগেও রোজার বিধান ছিল। তবে যুগে যুগে তাদের রোজা নিয়ম ও বিধানের ভিন্নতা ছিলো। হজরত নুহ (আ.) এর উপরও রোজা ফরজ ছিল। রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘হজরত নুহ (আ.) শাওয়াল মাসের প্রথম দিন ও জিলহজ মাসের দশম দিন ব্যাতীত সারা বছর রোজা রাখতেন। (ইবনে মাজাহ)।
হজরত মুসা (আ.) এর ওপর তাওরাত কিতাব অবতীর্ণ হওয়ার আগে তিনি ৩০ দিন রোজা রেখেছিলেন বলে জানা যায়। আর ওহি নাজিল হওযার পর আল্লাহ তাকে আরও দশ ১০ দিন রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। হজরত ইদ্রিস (আ.) সাড়া বছর রোজা রাখতেন। হজরত দাউদ (আ.) একদিন পর পর রোজা রাখতেন বলে জানা যায়।

হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর রোজা সম্পর্কে আমাদের নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) বলেন, ইব্রাহিম (আ.) প্রতি মাসের তিনদিন রোজা রাখতেন (ইবনে মাযাহ)। যাদের উপর প্রধান চারখানা আসমানি কিতাব নাযিল হয়েছে তার একজন হলেন হযরত দাউদ (আ.)। তার উপর নাযিলকৃত আসমানি কিতাবের নাম ‘যাবুর’। হযরত দাউদ (আ.) একদিন রোজা রাখতেন আর একদিন বাদ দিতেন। তার রোজার ব্যাপারে মুসলিম শরিফে উল্লেখ রয়েছে।

মহানবী (সা.) মদিনায় আগমন করার পর শুধু মহররমের আশুরায় রোজা রাখতেন। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা থেকে জানা যায়, রসুল (সা.) মদিনায় এসে ইহুদিদের মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখতে দেখেন। এদিন হজরত মুসা (আ.) ও তার কওমকে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্ত করেছিলেন আল্লাহপাক ফলে শুকরিয়াস্বরূপ এ দিন মুসা (আ.) রোজা রেখেছিলেন। সেই দিনটির স্মরণেই ইহুদিরা আশুরায় রোজা রাখত।
রসুল(সা.) বললেন, আমরা তোমাদের(ইহুদিদের) চেয়ে মুসাকে (আ.) অনুসরণের অধিক হকদার। এরপর তিনি আশুরার দিন রোজা রাখলেন এবং সাহাবায়ে কেরামদের রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করলেন।

এরপর দ্বিতীয় হিজরির ১০ শাবান আসে আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে রোজা ফরজের বিধানের কোরআনের আয়াত। সেই থেকে প্রতিবছর রমজান মাসজুড়ে রোজা পালন ফরজ হয় উম্মতের ওপর।


আরো সংবাদ