১৭ অক্টোবর ২০১৯

অবারিত প্রকৃতির মায়াবী হাতছানি

-

বৃষ্টিভেজা গভীর রাতে সুনসান নিরিবিলি রাজপথে গাড়ি চলছে শাঁ শাঁ করে। ঢাকা ছাড়ার পর বাতিহীন অন্ধকার পথের শুরু। তবে ঘুট ঘুটে অন্ধকারেরও আলো আছে। সেই আলোর অনুভূতি ভিন্ন শিহরণের। সকাল ৯টার মধ্যেই সিলেটের বাদাঘাট পৌঁছাই। আগে থেকেই আমাদের জন্য নোঙর করা ছিল বিশাল এক বালুর কার্গো। ৯ জনের জন্য কমপক্ষে ৩০০ জন ধারণক্ষমতার কার্গো। এ যেন মশা মারতে কামানের গোলা। বাদাঘাট থেকে কার্গো ছেড়ে যখন ডাকাতি হাওরে পড়ে, তখন প্রকৃতির কী যে অনিন্দ্য রূপ তা বুঝানো যাবে না। একটা জায়গায় তো মনেই হবে আপনি সিলেট নয় সুন্দরবনের কোনো সরু খাল দিয়ে যাচ্ছেন। এককথায় ওয়াও ! হাওর শেষে ধলাই নদী। সে আরেক নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের ছড়া কবিতা। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর কোম্পানীগঞ্জের দয়ার বাজার পৌঁছি। সিলেট টুরিস্ট ক্লাবের সদস্য সজ্জন ব্যক্তি জামান ভাই আমাদের জায়গা দিলেন তার বাড়িতে।
জুমার নামাজ পড়ে খেয়ে দেয়ে বিকালটা কাটাই মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশ।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। বাজার থেকে চাল ডাল মুরগি তেল মসলা কিনে আশ্রয় পাওয়া বাড়ির বিশাল উঠোনেই চলে বারবিকিউর প্রস্তুতি। সঙ্গে লেটকা খিচুড়ি। খেয়ে দেয়ে যাই এবার ঘুমাতে। পরদিন সকালে ছুটি উৎমা ছড়ার পথে। কিছুটা পথ চলার পরেই চোখ আটকাবে অধরা পাহাড়ের সবুজ গালিচায় মোড়ানো ক্যানভাসে। আরো কিছুটা পথ এগোলে পাহাড়ের গা বেয়ে অবিরাম ধারায় নেমে আসা ঝরনার অট্টহাসি সঙ্গী করে পৌঁছে যাবেন নৈসর্গিক সৌন্দর্যের উৎমা ছড়ার বাহুতে। মোটরবাইক থেকে নেমেই হই আশ্চর্য! এ কী, মানুষ যতদূর খোঁজ পেয়েছেÑ তার চেয়েও ছড়িয়ে আছে, অনেক অনেক বেশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। অনেকটা সময় কাটিয়ে যাই এবার তুরং ছড়ার পানে। ভোলাগঞ্জের ফারুক ভাই জায়গাটার খোঁজ দিয়েছেন। হাফিজ ভাইয়ের বাইকে চড়ে ছুটি। যতই এগিয়ে যাই ততই যেন মুগ্ধতা ভর করে। সে এক অপার্থিব অনুভূতি। নৈঃশব্দের মায়াবী পথের দৃশ্যÑ আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে থাকা দিগন্তছোঁয়া পাহাড়, সেই পাহাড়ে ঘুমিয়ে থাকা শুভ্র মেঘের ভেলা, নীল আসমানের আলোক রশ্মি, বাঁশ বাগানের ছায়া, বিস্তৃত ফসলের মাঠÑ সব মিলিয়ে অবারিত প্রকৃতির মায়াবী হাতছানি। বাইক ছেড়ে এবার গ্রামের মেঠোপথ ধরে সামান্য কিছু পথ মাড়িয়ে হাজির হই প্রকৃতিকন্যা তুড়ং ছড়ার জমিনে। চার পাশ সুনসান নিরিবিলি। নিঝুম নিঃস্তব্ধতার তুড়ং ছড়ার একমাত্র সঙ্গী পাথরের গা ভিজিয়ে অবিরাম ধারায় ধেয়ে আসা স্বচ্ছ পানির কলকল শব্দ। এমন নয়ন জুড়ানো প্রকৃতির কাছে হার মেনে আবারো নিজেদের সমর্পণ করি হিমহিম স্ফটিক শীতল স্বচ্ছ পানিতে। তুড়ং ছড়াকে অনেকে কুলি ছড়া নামেও ডেকে থাকে। দু-চারজন বাসিন্দা যাও দেখলাম, তারাও যেন প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে শান্ত কোমল। অপার সৌন্দর্যের তুড়ং ছড়ার ধবধবে সাদা পানি, সবুজ বৃক্ষ, লালচে -বাদামি রঙা পাথর সব মিলিয়ে এক অন্য জগৎ। পানির স্বচ্ছতা এতটাই যে, হাঁটু সমান পানির নিচের পাথরগুলোও স্পষ্ট দেখা যায়। আরো দেখা যাবে উজান থেকে ভাটিতে পানি নামার অভূতপূর্ব দৃশ্য। তুড়ং ছড়ার ভৌগোলিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অবগাহন কয়েক পাতা লিখেও শেষ হওয়ার নয়। যা শুধু স্বচোখে দেখে অনুভব করা সম্ভব। আমাদের তুড়ং ছড়া ভারতের চেরাপুঞ্জি লাগোয়া। এবার বিদায়ের পালা, পাথর আর মায়াবিনী প্রকৃতির রাজ্য থেকে।

কিভাবে যাবেন : ঢাকার গাবতলী ও সায়েদাবাদ থেকে সিলেটে যাওয়ার বিভিন্ন পরিবহনের দিনে-রাতে বাস সার্ভিস রয়েছে। এছাড়া ট্রেন ও আকাশপথেও যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সিলেট শহরের আম্বরখানা থেকে সিএনজিতে কোম্পানীগঞ্জ দয়ার বাজার। অথবা নদী পথের সৌন্দর্য দেখতে চাইলে, সিলেটের বাদাঘাট থেকে নৌপথে দয়ার বাজার। সেখান থেকে আবারো সিএনজিতে চড়ে, মাত্র বারো কিলোমিটার দূরবর্তী চড়ার বাজার যেতে হবে। বাজার থেকে ১০ মিনিট হাঁটলেই মিলে যাবে উৎমা ছড়ার সৌন্দর্য। আর তুড়ং ছড়া যাওয়ার জন্য ভাড়ায় চালিত মোটরবাইক রয়েছে।
থাকবেন কোথায়, খাবেন কী : ঢাকা থেকে আগের দিন রাতে রওনা দিয়ে পরের দিন সারা দিন ঘুরে আবারো ফিরে আসতে হবে সিলেট শহরে। দয়ার বাজারে খাবারের হোটেল পাবেন। রাতে থাকার জন্য সিলেট শহরে মিলবে বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল।

ছবি : হাফিজুর রাহমান ও দে-ছুট

 


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum
portugal golden visa