২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

বন্ধুত্বের বন্ধন : রঙের ঝলক

-

পঁচিশ বছরের উচ্ছ্বল তরুণ জুনায়েদ খুবই আনন্দিত। কারণ তাদের বাসায় এক ব্যতিক্রমী জমজমাট বার্থডে পার্টির আয়োজন করা হয়েছে। তবে সেই পার্টি তার বা তার কোনো ভাই-বোনের নয়। উদযাপন করা হচ্ছে তার মা রোকেয়া হোসেনের জন্মদিন। আরো মজা হচ্ছে, সেই পার্টিতে তার মায়ের স্কুলজীবনের বান্ধবীরাও একই সাথে কেক কাটবেন অর্থাৎ একটি সম্মিলিত বার্থডে পার্টি। আর এই পুরো অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্ব নিয়েছে জুনায়েদ। কেক অর্ডার, ডেকোরেশন, গিফট সব কিছুর ব্যবস্থা করেছে জুনায়েদ। মা ও তার বান্ধবীদের বন্ধুত্ব দেখে সে নিজেও অভিভূত। আসলে বন্ধুত্ব যে কতটা গভীর আর আনন্দদায়ক সম্পর্ক হতে পারে সেটাই যেন সে নতুন করে অনুধাবন করতে পেরেছে।
রোকেয়া হোসেন পুরোদস্তুর একজন গৃহিণী। তাই বলে কি বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেবেন না। প্রায় ২৫ বছর আগে স্কুলজীবন শেষ করেছেন কিন্তু সেই বন্ধুত্ব এখনো শেষ হয়নি। বরং হয়েছে আরো গভীর। মাধ্যমিকের পর প্রায় সবাই তখন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও প্রযুক্তির কল্যাণে স্কুলের বান্ধবীরা আবার একত্রিত হয়েছেন। ৩০ জনের বিশাল গ্রুপ তাদের। এদের মধ্যে অনেকে দেশের বাইরেও থাকেন। তবে ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ভাইবার প্রভৃতির কল্যাণে সবার সাথেই সবার নিয়মিত যোগাযোগ। যখনই কেউ দেশে আসেন তখনই সব বন্ধু মিলে হয় জমজমাট আড্ডা। খাওয়া-দাওয়া, গল্প করা, মজা করাÑ ঠিক যেন স্কুলজীবনে ফিরে যাওয়া। সেই কিশোরীর অনাবিল আনন্দ, সেই উচ্ছ্বাস।
জীবনের শত ব্যস্ততা, সংসার, সামাজিকতা, দায়িত্ব সবকিছু থেকে বেরিয়ে কয়েক ঘণ্টা সময় যেন শুধু নিজেদের জন্য উপভোগ করা। আর এই আনন্দটুকু পাওয়ার পেছনে যা ভূমিকা রাখে সেটি হলো বন্ধুত্ব। বন্ধুত্বই মানুষকে সেই অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে যেখানে পাওয়া যায় অফুরন্ত আনন্দ, বেঁচে থাকার শক্তি, সব সমস্যাকে মোকাবেলা করার প্রেরণা।
সমাজবদ্ধ মানুষের জীবনের খুব কাছের, খুব গভীর যে সম্পর্কগুলো রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম বন্ধুত্ব। বন্ধুত্ব হচ্ছে সেই সম্পর্ক যা মানুষকে অর্জন করতে হয়। নিজের পছন্দের একজন বা অনেকজনও হতে পারে যাকে আমরা পছন্দ করে নেই বন্ধু হিসেবে। সেদিক থেকে বন্ধুত্বকে বলা যায় অর্জিত সম্পর্ক। আর তাই এই সম্পর্কের ভিত্তি হয় আন্তরিকতা, সহমর্মিতা, আস্থা ও নির্ভরতা।
বন্ধুত্ব হচ্ছে সেই সম্পর্ক যা কোনো বয়স, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান, স্থান, কাল, পাত্র দিয়ে আবদ্ধ করা যায় না। এসব সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে সত্যিকারের বন্ধুত্ব। বন্ধুর কাছে বন্ধুই মুখ্য। ভালো বা মন্দ সব কিছু মিলিয়েই গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। একেবারে শিশুদের মধ্যে যেমন বন্ধুত্বের নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠতে দেখা যায়, তেমনি অনেক বয়সীদের মধ্যেও দেখা যায় প্রগাঢ় বন্ধুত্ব। বন্ধু হচ্ছে সেইজন যার সাথে মন খুলে গল্প করা যায়, আড্ডা দেয়া যায়, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে চা খাওয়া যায়। জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলোতে খুঁজে নিতে সাহায্য করে বন্ধুরাই। আবার মনের কষ্টগুলো সহজেই শেয়ার করার মতো মানুষও বন্ধুরাই হতে পারে। এমনকি বিপদের সময় বন্ধুরাই হতে পারে প্রধান অবলম্বন। সত্যিকারের বন্ধুত্ব হতে পারে মানুষের জীবনে অনেক বড় প্রাপ্তি।
মানুষের জীবনের প্রতি স্তরেই থাকতে পারে বন্ধুত্ব। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে বন্ধুত্ব এক বিশাল ব্যাপার। অনেক সময় আত্মীয়স্বজনও এতটা গুরুত্ব পায় না, যতটা গুরুত্ব পায় এদের বন্ধুত্ব। পড়াশোনার পাশাপাশি চলে আড্ডা, খাওয়া-দাওয়া, সিনেমা দেখা, মজা করা আরো কত কী। আবার গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত, গুরুগম্ভীর রাশভারী ব্যক্তির জীবনেও থাকে বন্ধু। বন্ধুদের আড্ডায় প্রাণ খুলে হাসতে দেখা যায় তাকেও।
আসলে বন্ধুবিহীন জীবন যেন অনেকটাই নিস্তব্ধ, নিঃতরঙ্গ। তাই তো বন্ধুত্ব বেঁচে থাকবে চিরকাল, যুগে যুগে সবার মাঝে।

 


আরো সংবাদ