১৬ নভেম্বর ২০১৮

কোরবানি একটি ইবাদত

কোরবানি একটি ইবাদত - ছবি : সংগৃহীত

মানব ইতিহাসের প্রথম থেকেই কোরবানি করার বিধান ছিল। পবিত্র কুরআনের সূরা আল মায়িদার ২৭ নম্বর আয়াতে এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। আর এই বিধানটি প্রত্যেক জাতির জন্য প্রযোজ্য ছিল। আল্লাহ সুবাহানু তায়ালা বলেন, ‘আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানির এই বিধান করে দিয়েছি’ (সূরা হাজ্জ : ৩৪)। যা আমাদের জন্যও পালনের নির্দেশ এসেছে। (ভবিষ্যৎ মানুষদের জন্য এ বিধান জারি রেখে) তার স্মরণে আমি অব্যাহত রেখে দিয়েছি’ ; (সূরা সাফফাত : ১০৮)। অর্থাৎ পশু কোরবানির বিধানটি ইবরাহিম আ:-এর পরবর্তী মানুষের জন্যও চালু রাখা হয়েছে। যা পালন করা আমাদের জন্য ওয়াজিব। (সূরা কাওসারের দ্বিতীয় নম্বর আয়াতে) আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর স্মরণ বা ইবাদতের দিকনির্দেশনা দিয়ে বলেন, ‘অতএব তোমার পালনকর্তার উদ্দেশে তুমি সালাত পড়ো এবং (তাঁর নামে) কোরবানি করো’। এবং অন্য সূরার আয়াতে বলেন, ‘(হে রাসূল সা:) তুমি বলে দাও, আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ সবকিছু সারা জাহানের রব মহান আল্লাহর জন্য’ (সূরা আনআম : ১৬২)। নিঃসন্দেহে কোরবানি একটি ইবাদত, যার একমাত্র উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি হওয়া বাঞ্ছনীয়। এই রকম প্রত্যেক ইবাদত কবুলের প্রথম শর্ত হলো, ইবাদতে ইখলাস থাকা।

এই দিনের শিক্ষা হচ্ছে- বিশেষ কিছু ইবাদত করা। এ ছাড়া, আত্মত্যাগ এবং নিজের আনন্দে, খাদ্যে আত্মীয়, গরিব-দুখীদের শরিক করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সচেষ্ট হওয়া। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহিম আ: আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কী করে আত্মত্যাগ করেছিলেন। আমাদের উদ্বুদ্ধ করে নিজেদের আনন্দ, খানাপিনা আত্মীয়-পরিজন এবং গরিব-দুখীদের সাথে ভাগ করে নিতে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আল্লাহর কাছে ওই সবের গোশত এবং রক্ত পৌঁছে না বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া (আল্লাহ ভিরুতা)। এভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো এ জন্য যে, তিনি তোমাদের পথ-প্রদর্শন করেছেন। সুতরাং আপনি সুসংবাদ দিন সৎ কর্মপরায়ণদেরকে (সূরা হাজ্জ : ৩৭)। গোসল করা, ঈদের সালাত পড়া, এর জন্য সুগন্ধি ব্যবহার, সুন্দর পোশাক পরিধান করা। তাকবির পাঠ করা, কোরবানির পশু জবাই করা এবং এর গোশত আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব ও দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা।

১. তাকবির পাঠ করা : আরাফার দিনের ফজর থেকে শুরু করে জিলহজ মাসের ১৩ তারিখের আসর পর্যন্ত তাকবির বলা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর তোমরা আল্লাহকে স্মরণ করো নির্দিষ্ট দিনসমূহে’ (সূরা বাকারা : ২০৩)। তাকবির বলার নিয়ম- আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।

২. গোসল করা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়া : ঈদের দিন সকালে গোসল করে পবিত্র হয়ে (পুরুষদের জন্য) সুগন্ধি মাখা ও সবার সুন্দর পোশাক পরা সুন্নত। মহিলাদের উচিত পবিত্রতা অর্জন, উত্তম পোশাক ও সাজগোজের সাথে সাথে তাদের পর্দার ব্যাপারেও সচেতন থাকা।
৩. ঈদগাহে সালাত পড়া : ঈদগাহে সালাত আদায় করা সুন্নত। কারণ, রাসূলুল্লাহ সা: ঈদগাহে সালাত পড়েছেন। তবে বৃষ্টি বা অন্য কোনো কারণে মসজিদে পড়া বৈধ।

৪. জামাতের সাথে ঈদের সালাত আদায় করা এবং খুতবা শোনা : ইবনে তাইমিয়াসহ অনেক গবেষক আলেমদের মতে, ঈদের সালাত জামাতে পড়া ওয়াজিব। এই মর্মে হাদিস বর্ণিত হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অতএব তোমরা রবের উদ্দেশ্যেই সালাত পড়ো এবং কোরবানি করো’ (সূরা কাউসার: ২)। সুতরাং ওজর ছাড়া তা বাদ দেয়া যাবে না। পুরুষদের সাথে নারীরাও ঈদের সালাতে হাজির হবে। এমনকি ঋতুবতী ও কুমারী মেয়েরাও। তবে ঋতুবতী নারী শুধু খুতবা শুনবে, ঈদের সালাত থেকে বিরত থাকবে।
৫. রাস্তা পরিবর্তন করা : এক রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে যাওয়া এবং অপর রাস্তা দিয়ে ঈদগাহ থেকে প্রত্যাবর্তন মুস্তাহাব। রাসূলুল্লাহ সা: এমনটি করতেন।

৬. কোরবানি করা : এই দিনে ঈদের সালাতের পর কোরবানি করা। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈদের আগে জবাই করল, তার উচিত তদস্থলে আরেকটি কোরবানি করা। আর যে এখনো কোরবানি করেনি, তার উচিত এখন কোরবানি করা’ (বুখারি ও মুসলিম)। কোরবানি পরবর্তী আরো তিন দিন কোরবানি করার সময় থাকে। যথা : যেহেতু রাসূলূল্লাহ সা: বলেছেন, ‘তাশরিকের প্রতিটি দিনই হলো কোরবানির দিন’ (সিলসিলা সহিহাহ :২৪৬৭)।

৭. গোস্ত বিতরণ ও সংরক্ষণ : কোরবানি করা এবং কোরবানির গোশত বিতরণ করা ভিন্ন দুটি আমল। দুটি আমলের সাওয়াবও আলাদা। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় পশু জবাইয়ের মাধ্যমেই এই কোরবানির ওয়াজিব আমলটি আদায় হয়ে যায়। আর এর গোশত বণ্টনের বিষয়টি তেমন নয়, কিছুটা ঐচ্ছিক। তবে গোশত বণ্টনের শরিয়তে নির্দেশনা দেয়া আছে। তা হলো সে নিজ পরিবার-পরিজনকে নিয়ে খাবে এবং পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন, যারা কোরবানির সামর্থ্য রাখে না তাদেরও দান করবে।

৮. কোরবানির গোশত আহার করা : ঈদুল আজহার দিন রাসূলূল্লাহ সা: ঈদগাহ থেকে ফিরে আসার আগে খাবার গ্রহণ করতেন না। বরং তিনি কোরবানি করার পর তার গোশত খেতেন (যাদুল মায়াদ : ১/৪৪১)।
৯. ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা : পরস্পরে শুভেচ্ছা বিনিময় করা সাহাবিদের থেকে প্রমাণিত। সুতরাং আমাদের এই দিনে আত্মীয়-পরিজন, প্রতিবেশী (বিধর্মী হলে নিয়ত থাকা- ইসলামের সৌন্দর্য প্রদর্শন এবং দাওয়াহ) এবং বন্ধুদের সম্ভাষণ জানানো উচিত।

১০. তাওবাহ, দোয়া ও জিকির : এই দিনটি কিছুতেই হেলায় না কাটিয়ে তাওবাহ, ইস্তিগফার, তাজবিহ- তাহলিল করা এবং বেশি বেশি আল্লাহর কাছে দোয়া করা উচিত।
পরিশেষে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা- তিনি যেন আমাদেরকে এমন উত্তম আমল করার তাওফিক দান করেন, যাতে আমরা তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি। তিনি যেন আমাদেরকে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান দান করেন এবং ওই সব লোকদের অন্তর্ভুক্ত করেন, যারা এই দিনগুলো অর্থাৎ জিলহজের মাসের প্রথম ১০ দিনে শুধু তাঁরই সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নেক আমলে সচেষ্ট হয়।
লেখক : প্রবাসী, লস এঞ্জেলেস; ইউএসএ


আরো পড়ুন :
কোরবানির ঈদ
হেলাল বিশ্বাস
সারা দুনিয়ার মুসলমানের সার্বজনীন আনন্দ উৎসব হলো ঈদ। অন্যান্য জাতির আনন্দ উৎসব থেকে মুসলমানদের পালিত ঈদ উৎসব সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিক, ভিন্ন মেজাজে পালিত হয়। কারণ ঈদ উৎসব পালিত হয় শরিয়ত নির্ধারিত সীমার মধ্যে। ইচ্ছে করলেই যে কেউ এ উৎসবকে তার নিজের মতো করে উদযাপন করতে পারে না। বছরে দু’টি ঈদ পালিত হয়। এর একটি হলো ঈদুল ফিতর এবং অপরটি ঈদুল আজহা। দু’টি ঈদেই দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ সম্মিলিতভাবে পালন করা হলেও অন্যান্য নিয়মনীতির মধ্যে রয়েছে ভিন্নতা। ঈদুল ফিতরে পবিত্র রমজানের এক মাসের কঠোর সিয়াম সাধনার পর রোজা ভাঙার আনন্দে মুসলমানরা মেতে উঠে।

ঈদের জামাতে রওনা হওয়ার আগেই ফিতরা পরিশোধ করে। কিন্তু ঈদুল আজহার দিন ফিতরা দেয়ার কোনো বিধান নেই। ঈদুল ফিতরের দিন জামাতে যাওয়ার আগে মিষ্টিমুখ করা সুন্নত, কিন্তু ঈদুল আজহার দিন নাস্তা না করেই জামাতে যাওয়ার বিধান রয়েছে। ঈদুল ফিতরে রয়েছে নিয়ন্ত্রিত আনন্দ-উল্লাসের ছড়াছড়ি। অপর দিকে, ঈদুল আজহাতে রয়েছে ত্যাগ, তিতিক্ষা ও সংযমের শিক্ষা।

ঈদ কী : ঈদের শাব্দিক অর্থ আনন্দ। আরবি ‘আ-দা’ ‘ইয়াঊদু’ থেকে ঈদ শব্দটি এসেছে। ফিরে আসা, প্রত্যাবর্তন করা- এর আভিধানিক অর্থ। আর এ থেকেই গ্রহণ করা হয়েছে ‘ঈদ’ শব্দটি। আর একটু ব্যাখ্যা করে বললে ‘ঈদ’-এর আভিধানিক অর্থ হলো : ক. সেই সব দিন, যাতে সমবেত হয়; খ. খুশি ও আনন্দ ফিরে আসার মওসুম; গ. সেই দিন, যা প্রতি বছর আনন্দ ও খুশি বয়ে আনে (ইবন মনজুর, লিসানুল আরব)।
আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, বছরে ঈদ দু’টি। এর একটি ঈদুল ফিতর, অপরটি ঈদুল আজহা। আমাদের আলোচ্য বিষয় ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ।

‘কুরব’ আরবি এই ধাতু থেকে ‘কুরবান’ শব্দের উৎপত্তি। ‘কুরব’ ধাতুর অর্থ নিকট বা নৈকট্য। আর কোরবানি অর্থ আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায় বা পন্থা। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায়, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আল্লাহ প্রেমে বিভোর হয়ে আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের জন্য যে হালাল পশু কোরবানি দেয়া হয় তাকে কোরবানি বলে। জিলহজ মাসের ১০-১২ তারিখ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত কোরবানি করার সময়। এই তিন দিনের যেকোনো দিনই কোরবানি করা যাবে। তবে ১০ তারিখে কোরবানি করাই সর্বোত্তম।’
পবিত্র কুরআনে কোরবানির বিষয়ে ইরশাদ হচ্ছে- ‘তোমার প্রতিপালকের জন্য নামাজ পড়ো এবং কোরবানি দাও’ (আল-কাউসার : ২)।

ঈদ উৎসবের শুরু : মদিনায় হিজরতের আগে ঈদ উৎসব পালন করা হয়েছে এমন কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। রাসূলুল্লাহ সা:-এর মদিনায় হিজরতের আগেই বহুসংখ্যক মদিনাবাসী ইসলামে দীক্ষিত হন। এ নবদীক্ষিত মুসলমানরা জাহেলি আমলে পালনকৃত মেহিরজান ও নওরোজ নামক উৎসব দু’টি পালন অব্যাহত রেখেছিল। এ বিষয়ে হজরত আনাস রা: বর্ণনা করেন, ‘রাসূলুল্লাহ সা: মদিনায় হিজরত করে দেখতে পান, মদিনাবাসী বিশেষ দু’টি দিনে (হেমন্ত ও বসন্তের পুর্ণিমার রজনীতে) খেলাধুলা ও আমোদ-প্রমোদে কাটিয়ে দেয়। মহানবী সা: প্রশ্ন করেন- এ দু’টি দিবসের স্বরূপ ও তাৎপর্য কী? তারা জানাল : আমরা জাহেলিয়াতের যুগে এ দিন দু’টি খেলাধুলা ও আমোদ-প্রমোদের জন্য উদযাপন করতাম। প্রিয় নবী সা: বললেন, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য এ দু’দিনের পরিবর্তে উত্তম দু’টি দিন ধার্য করেছেন। একটি ঈদুল ফিতর, অপরটি ঈদুল আজহা’ (আবু দাউদ শরিফ)।

কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, ৬২৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়। তবে বেশির ভাগের মতে, দ্বিতীয় হিজরি অর্থাৎ ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে ঈদুল ফিতরের উৎসব প্রবর্তিত হয়। এ বিষয়ে প্রসিদ্ধ হাদিস শাস্ত্র বিশারদ ইবন হিব্বান র. বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সা: সর্বপ্রথম যে ঈদের নামাজ পড়েছেন তা হিজরতের দ্বিতীয় বছরে ফিতরের নামাজ। সে সালের শাবান মাসে রমজানের রোজা ফরজ হয়। অতঃপর হুজুর সা: মৃত্যু পর্যন্ত তার উপর আমল করতে থাকেন।’

ইতিহাসের প্রথম কোরবানি : পৃথিবীর প্রথম মানুষ ও প্রথম নবী হজরত আদম আ:-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিল প্রথম কোরবানি করেন। হাবিল বড় এবং কাবিল ছিলেন ছোট। আদম আ: ও হাওয়া আ:-এর জমজ সন্তান জন্ম হতো। এর একজন পুত্র ও অপরজন কন্যাসন্তান হতো। ওই সময়কার শরিয়তের নিয়ম ছিলÑ এক জোড়া পুত্রসন্তানের সাথে অপর জোড়া কন্যাসন্তানের বিয়ে হতো। কিন্তু কাবিল তৎকালীন সময়ের বৈবাহিক নীতি লঙ্ঘন করে নিজের জমজ বোন অর্থাৎ হাবিলের জন্য নির্ধারিত কন্যাকে বিয়ে করার ঘোষণা দেন। যখন স্বাভাবিক সালিসে এ ঘটনার ফয়সালা হলো না- তখন হজরত আদম আ: উদ্ভূত জটিলতা নিরসনের জন্য উভয়কে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানির নির্দেশ দিলেন। সিদ্ধান্ত হলো- যার কোরবানি কবুল হবে, সেই অপূর্ব সুন্দরী বোনকে বিয়ে করবে। ওই সময় নিয়ম ছিল, কবুলকৃত কোরবানির গোশত ইত্যাদিকে আকাশ থেকে অগ্নিশিখা এসে ভস্মীভূত করে দিত। অর্থাৎ যার কোরবানি কবুল হতো না, তার কোরবানিকৃত পশুকে অগ্নিশিখা স্পর্শ করত না।
হাবিল ও কাবিল যথারীতি কোরবানি করলেন। কিন্তু হাবিলের কোরবানিকৃত পশুকে অগ্নিশিখা ভস্মীভূত করলেও কাবিলের কোরবানিকৃত পশুকে অগ্নিশিখা স্পর্শ করল না। এতে করে কাবিল ক্ষেপে গেল এবং হাবিলকে বলল, ‘আমি তোমাকে হত্যা করব’।

জবাবে হাবিল বলল, ‘আল্লাহ তো মুত্তাকিদের কোরবানিই কবুল করেন।’ এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘আদমের দুই পুত্রের (হাবিল ও কাবিল) বৃত্তান্ত তুমি তাদের যথাযথভাবে শোনাও। যখন তারা উভয়েই কোরবানি করেছিল, তখন একজনের কোরবানি কবুল হলো, অন্যজনের কবুল হলো না’ (সূরা মায়েদা : ২৭)।
ইবরাহিম আ:-এর কোরবানি : মুসলিম জাতির পিতা হলেন হজরত ইবরাহিম আ:। তার অন্য আরেকটি সম্মানজন উপাধি হলো ‘খলিলুল্লাহ’ বা আল্লাহর বন্ধু। বলা যায়, জন্ম থেকেই ইবরাহিম আ: নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কোরবানি দেয়ার মধ্য দিয়েই অগ্রসর হয়েছেন। শেষ জীবনে অর্থাৎ একান্ত বৃদ্ধ বয়সে এসে তিনি পুত্রসন্তান ইসমাইলকে লাভ করেন। কিন্তু এ বৃদ্ধ বয়সের সন্তানকেও আল্লাহর হুকুমে স্ত্রী হাজেরাসহ মক্কার নির্জন প্রান্তরে রেখে আসেন। আবার এই সন্তান যখন একটু বড় হয়, চলতে ফিরতে পারেন তখন ইবরাহিম আ: পরপর তিনবার কোরবানি করার নির্দেশপ্রাপ্ত হন। প্রথম দুইবার তিনি অনেকগুলো পশু কোরবানি করেন। কিন্তু এরপরও তিনি তৃতীয়বার স্বপ্ন দেখেন প্রিয়তম বস্তু কোরবানি করার।

এ বিষয়ে ইরশাদ হচ্ছে- ‘অতঃপর সে (ইসমাইল) আ: যখন চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হলো, তখন ইবরাহিম তাকে বললেন, বৎস! এখন তোমার অভিমত কি বলো? সে বলল, পিতা আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। আল্লাহ চাহে তো আপনি আমাকে ধৈর্যশীল হিসেবে পাবেন। যখন পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইবরাহিম আ: তাকে জবেহ করার জন্য শায়িত করলেন, ‘আমি তাকে ডেকে বললাম : হে ইবরাহিম! তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে। আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তার পরিবর্তে দিলাম এক মহান জন্তু। আমি তার জন্য এ বিষয়টি পরবর্তীদের মধ্যে রেখে দিয়েছি যে, ইবরাহিমের প্রতি সালাম বর্ষিত হোক’ (সূরা আস সাফফাত : ১০২-১০৯)।

হজরত মুহাম্মদ সা:-এর কোরবানি : রাসূল সা: নিয়মিত কোরবানি করেছেন এবং সহচরদের কোরবানি করার জন্য উৎসাহিত করেছেন। এমনকি যারা কোরবানি করার ব্যাপারে গাফেল তাদের বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে’ (ইবনে মাজা)। হজরত আয়েশা রা: ও হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত, ‘রাসূলুল্লাহ সা: কোরবানির জন্য দু’টি মোটাতাজা, গোশতে ভরা শিংযুক্ত, ধূসর বর্ণের মেষ ক্রয় করতেন। অতঃপর দু’টির একটি নিজ উম্মতের জন্য যারা আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দেয় এবং নবুওয়তের সাক্ষ্য দেয় তাদের পক্ষ থেকে এবং অপরটি মুহাম্মদ সা: ও তাঁর পরিবারবর্গের পক্ষ থেকে কোরবানি করতেন’ (ইবনে মাজা)।

হজরত আয়েশা রা: আরো বলেছেন, ‘বিদায় হজে রাসূল সা: তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে একটি মাত্র গরু কোরবানি করেছেন’ (ইবনে মাজা)। এ ছাড়া হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ সা:-এর সাথে ঈদুল আজহার নামাজ পড়তে মাঠে হাজির হলাম। তিনি তাঁর ভাষণ শেষে মিম্বর থেকে নামলেন। অতঃপর একটি ভেড়া নিয়ে আসা হলে রাসূলুল্লাহ সা: তা নিজ হস্তে জবাই করলেন এবং বললেন, আল্লাহর নামে এবং আল্লাহই মহান এই কোরবানি আমার পক্ষ থেকে এবং আমার উম্মতের পক্ষ থেকে যারা কোরবানি করতে পারেননি’ (তিরমিজি)।

কোরবানির তাৎপর্য : কোরবানি হলো উৎসর্গের আনন্দ উৎসব। পশু কোরবানি এখানে মুখ্য নয়, মুখ্য হলো মনের পশুকে কোরবানি করা। আসলে আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ কোরবানি করে তাকওয়া অর্জনই মূল লক্ষ্য। ইরশাদ হচ্ছে, ‘আল্লাহর কাছে এর গোশত ও রক্ত পৌঁছায় না, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া’ (সূরা হজ : ৩৭)। আল্লাহ পাক আরো ঘোষণা করেছেন, ‘বলো, আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ একমাত্র আল্লাহরই জন্য’ (আল-আনআম : ১৬২)।

কোরবানির তাৎপর্য ও ফজিলত বলে শেষ করার মতো নয়। হজরত আবু সাঈদ খুদরি রা: বর্ণিত এ হাদিস থেকে তা সহজে বোঝা যায়। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: হজরত ফাতেমা রা:কে বললেন, ‘ফাতেমা! তোমার কোরবানির পশুর কাছে দাঁড়িয়ে থাকো। কারণ, কোরবানির পশুর যে রক্ত মাটিতে পড়বে তার বদলে আল্লাহ আগের গুনাহগুলো মাফ করে দেবেন।’ এ কথা শোনার পর হজরত ফাতেমা রা: প্রশ্ন করলেন, এ সুসংবাদ কি শুধু আহলে বাইতের জন্য, না সব উম্মতের জন্য? রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, সব উম্মতের জন্য’ (জামিউল ফাওয়ায়েদ)। হজরত যায়েদ বিন আরকাম রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সা:কে সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর হাবিব! কোরবানি কী? জবাবে তিনি বললেন, ‘তা তোমাদের পিতা ইবরাহিম আ:-এর সুন্নত।’ তারা আবার বললেন, এতে কি আমাদের কল্যাণ নিহিত আছে? তিনি বললেন, ‘এর প্রত্যেকটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি রয়েছে।’ তারা আবারো বললেন, বকরির পশমও কি তাই? জবাবে তিনি বললেন, ‘বকরির প্রতিটি পশমেও একটি করে নেকি আছে।’
লেখক : সাংবাদিক

 


আরো সংবাদ