১৭ নভেম্বর ২০১৮

নারীরা যেভাবে হজ করবেন

নারীরা যেভাবে হজ করবেন - ছবি : সংগৃহীত

হজ সর্বসম্মতভাবে ইসলামের একটি রুকন এবং ইসলামের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ। কুরআনের বহু আয়াতে এবং অসংখ্য হাদিসে এর তাগিদ ও গুরুত্ব ব্যক্ত করা হয়েছে।
ওলামায়ে কেরামের মতে হিজরি নবম বছরে সূরা আল ইমরানের একটি আয়াতের মাধ্যমে হজ ফরজ করা হয়েছে। (ইবনে কাসির)।

মুসলমান বোনেরা আমার, হজে যাওয়ার নিয়ত করলে অবশ্যই হজের মাসআলা-মাসায়েল, নিয়ম কানুন, ইবাদতের পদ্ধতি, মক্কা-মদিনায় করণীয় এবং হজে নিষিদ্ধ কার্যাবলী সম্পর্কে জেনে নেয়া আবশ্যক। মানুষ মাত্রই ভুল করে। তাই আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা ও আন্তরিক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ত্রুটিহীন হজ সম্পন্ন করা হয়তো সম্ভব হবে না। আল্লাহ রহমানুর রাহিমের দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করে আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে হজের ক্রিয়াকর্ম পালন করতে সচেষ্ট থাকব, আশা করি। কেননা হজ ও ওমরার আহকামের গাফেলতি করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
কাদের জন্য হজ ফরজ? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়, প্রত্যেক সামর্থ্যবান নর-নারীর জন্য হজ ফরজ। পবিত্র কুরআন মাজিদে আল্লাহ পাক বলেন, আল্লাহর উদ্দেশে আল্লাহর ঘর কাবা শরিফে হজব্রত পালন করা সে সব মানুষের ওপর ফরজ যাদের তথায় পৌঁছবার মতো সঙ্গতি আছে। মহিলাদের হজ ফরজ হতে তার মালিকানায় সম্পদ অথবা নগদ অর্থ থাকতে হবে; যা কর্মজীবী মহিলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে প্রত্যেক নারীর বাবা বা স্বামীর সম্পদে অধিকার থাকলেও তাদের জীবদ্দশায় মালিকানার দাবিদার হয় না।

তবে বাবা মারা গেলে, পৈতৃক সম্পদ ভাইদের কাছে থাকলেও সম্পদের মূল্য অনুপাতে হজ ফরজ হতে পারে। মুসলিম মহিলাদের হজে যেতে যেহেতু সাথে একজন পুরুষ মাহরাম অবশ্যই থাকতে হয়; ওই মাহরামের স্বেচ্ছায় খরচ বহনের সঙ্গতি বা ইচ্ছা না থাকলে মহিলা দু’জনের খরচ বহন করে হজ সম্পাদন করবেন। স্বামী বা ছেলে বা মাহরাম স্বেচ্ছায় খরচ বহন করলে ভাগ্যের কথা।

হজের প্রস্তুতি : হজের ধর্মীয় প্রস্তুতিতে পুরুষ-মহিলার পার্থক্য খুব সামান্যই। পবিত্র কাবার তাওয়াফে, মিনা-মুজদালিফা-আরাফাতে দোয়া দরুদ, এহরাম অবস্থায় করণীয় ও বর্জনীয় ইত্যাদিতে হজের আহকাম সবার জন্য এক। তবে পোশাকের বেলায় এবং সা’ঈতে রমল করার ক্ষেত্রে পুরুষ মহিলায় কিছু পার্থক্য আছে। সাফা-মারওয়ার সা’ঈতে নির্ধারিত স্থানে পুরুষদের দ্রুতলয়ে হাঁটা কিন্তু মহিলাদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক। আবার এহরামের ক্ষেত্রে মহিলাদের পোশাক স্বাভাবিক কিন্তু পুরুষেরা মাত্র দুখণ্ড সেলাইবিহীন বস্ত্র পরিধান করেন। মহিলাদের পোশাকে বাধ্যবাধ্যকতা না থাকলেও সাদা পোশাক ও বোরখা থাকা বাঞ্চনীয়। তাদের মুখমণ্ডল কাপড়ে আবৃত করা যাবে না। (তবে মুখমণ্ডল পর্দা করতে চাইলে কাপড় যাতে মুখে না লাগে সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।)

মানসিক প্রস্তুতি : বোনেরা, হজে যাওয়ার নিয়ত করে থাকলে প্রথম থেকেই হজবিষয়ক বই পুস্তক, হাদিস শরিফ, বিভিন্ন পুস্তিকা পড়ে জ্ঞান আহরণের চেষ্টা করা ভালো। ঘরের বাইরে মাসাধিকাল থাকতে হবে চিন্তা করে ওই সময়ের জন্য পরিবারের খাওয়া-দাওয়া, সন্তানদের লেখাপড়া, চিকিৎসা ইত্যাদির প্রয়াজনে একজন বিশ্বস্ত নিকটাত্মীয়কে রেখে যাওয়ার ব্যবস্থা করা উত্তম। বাকিটা আল্লাহর হাতে সোপর্দ করে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকবেন।

নামাজের প্রস্তুতি : মক্কা-মদিনার মসজিদে, আরাফাত-মিনায়, অন্য গুরত্বপূর্ণ মসজিদগুলোতে নামাজ আদায় করার প্রয়োজনে হজের আগেই এ বিষয়ে জ্ঞান নিতে হবে; যেহেতু আমাদের বেশির ভাগ মহিলারই মসজিদে নামাজ পড়ার অভিজ্ঞতা নেই তাই প্রত্যেক হাজী সাহেবানদের মসজিদে সশরীরে গিয়ে পাঞ্জেগানা নামাজ আদায় করার দৃঢ় ইচ্ছা থাকা কাম্য।
দুঃখজনক হলেও সত্যি মহিলাদের মসজিদে না গিয়ে হোটেলে বা আবাসস্থলে বসে গল্প গুজবে সময় কাটাতে দেখা যায়। মা বোনদের প্রতি অনুরোধ, আল্লাহর ঘরে, নবীজীর মসজিদে নামাজ আদায়কে গুরুত্ব দিবেন, গাফেলতি করবেন না।

পবিত্র মক্কার হেরেমে পুরুষ ও মহিলার নামাজে আলাদা ব্যবস্থা নেই। কেননা পবিত্র কাবার তাওয়াফে যেহেতু পুরুষ-মহিলা এক সাথে শামিল হন নামাজের ক্ষেত্রেও প্রতিটি দরজা দিয়ে ঢুকে সামনে পুরুষ, পিছনে মহিলা অথবা স্বজনদের সাথে পুরুষ মহিলা পাশাপাশি নামাজ আদায় করে থাকেন। তবে মহিলারা চাইলে পার্টিশানের আড়ালে অন্য মহিলার সাথে পর্দা করে নামাজ আদায় করতে পারেন। নামাজ শেষে নিজ নিজ মাহরামের সাথে পূর্ব নির্ধারিত স্থানে মিলিত হবেন। বর্তমানে মোবাইলের যুগে এক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
রাসূলুল্লাহ সা: বলেন ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য হজ করল, তাতে অশ্লীল ও গুনাহের কার্যাদি থেকে বেঁচে থাকল, সে হজ থেকে এমতাবস্থায় ফিরে আসে যেন আজই মাতৃগর্ভ থেকে জন্ম নিয়েছে। অর্থাৎ, জন্মের সময় শিশু যেরূপ নিষ্পাপ থাকে; সে-ও তদ্রুপ হয়ে যায়। (বুখারি, মুসলিম মাযহারি।)

পর্দা পালন মহিলাদের জন্য নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতের মতই ফরজ। কাজেই মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের আশায়, বিগত জীবনের গুনাহ মাফের চেষ্টায় হজে গিয়ে আল্লাহর খাস এলাকা মক্কা-মদিনায় যাতে পর্দা ভঙ্গ না হয় সেদিকে অবশ্যই লক্ষ রাখা উচিত।

ওমরা, তাওয়াফ, সা’ঈ : পবিত্র হজ পালন করতে গিয়ে আবশ্যকীয় ওমরা তাওয়াফ পালন ছাড়াও প্রত্যেকে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় বেশি বেশি তাওয়াফ ও ওমরা করার চেষ্টা করে থাকেন। এগুলো অবশ্যই নিজ নিজ মাহরামের সাথে পালন করা উচিত। ১০-ই জিলহজ হতে ১২ জিলহজ পর্যন্ত ৩ দিন জামারায় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করার জন্য কম ভিড়ে সুবিধাজনক সময়ে মাহরামের সাথে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। এ ছাড়া অন্য সময়ে মক্কা মদিনায় মসজিদে যাতায়াত, নামাজান্তে কাবাঘরের তাওয়াফ ইত্যাদি ইচ্ছা করলে কাফেলার সমমনা বোনদের সাথে দলবদ্ধভাবে করলে যেমন বেশি ইবাদতে মশগুল থাকা যায় তেমনি মাহরাম ভাইয়েরা ও নিজ নিজ মহিলারা চিন্তামুক্ত থাকতে পারেন।

হজে নিষিদ্ধ বিষয় : হজে পালনীয় বিষয়ের পাশাপাশি নিষিদ্ধ বিষয় সম্পর্কে প্রত্যেকের অবগত থাকা উচিত। কেননা পবিত্র কুরআনে সূরা বাকারায় হজে করণীয় বিষয়াদি বর্ণনার পাশাপাশি এহরাম অবস্থায় বর্জনীয় বা নিষিদ্ধ বিষয়গুলোর উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এ সূরায় ১৯৭ নম্বর আয়াতে হেদায়েত করা হয়েছে যে, হজের পবিত্র সময়ে ও পবিত্র স্থানগুলোকে প্রত্যেক হাজী সাহেব-সাহেবানদের নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করা উচিত। অধিকন্তু পবিত্র স্থানগুলোতে যেতে পারার সুবর্ণ সুযোগে আল্লাহর জিকর, এবাদত এবং সৎকাজে আত্মনিয়োগ করার তাগিদ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ পাক আমাদের নেক আমল করার; বেশি বেশি দোয়া, ইস্তেগফার, ওমরা, তাওয়াফ ও অন্যের সেবা করার তাওফিক ও সুযোগ করে দিয়ে মাবরুর হজের সওয়ার অর্জনের সৌভাগ্য দান করুন।
লেখক : প্রবন্ধকার

আরো পড়ুন :
মসজিদে পালনীয় আদব
হাফেজ মো: আবদুল কুদ্দুস

মসজিদ আল্লাহর ঘর। এখানে সবাই আসেন ইবাদতের জন্য। এই ইবাদত পালনের পাশাপাশি মসজিদে প্রবেশ ও প্রস্থানের কিছু আদব রয়েছে। যেমন- আমরা অনেকেই যখন মসজিদে প্রবেশ করি কোন পা দিয়ে প্রবেশ করব, তা ভুলে যাই। মসজিদে প্রবেশের আদব হচ্ছে- সবসময় ডান পা দিয়ে প্রবেশ করা। এ ক্ষেত্রে একটি দোয়া আছে। পবিত্র কাবা শরিফ ও মদিনা শরিফের দরজায় যা লেখা আছে- বিসমিল্লাহি ওসলাতু ওসালামু আলা রাসূলিল্লাহি আল্লাহুম্মাফতাহলি আবওয়াবা রাহমাতিক। একইভাবে মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময়ও বিসমিল্লাহি ওসলাতু ওসালামু আলা রাসূলিল্লাহি আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা মিন ফাদলিক। এই দোয়া পড়ে মসজিদে প্রবেশ করতে হয়। আর যদি এত বড় দোয়া মনে না থাকে বা কোনো দোয়াই না জানেন, শুধু ‘বিসমিল্লাহ’ পড়ে মসজিদে প্রবেশ করলেও সওয়াব পাওয়া যাবে।

মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় বড় একটি আদব হচ্ছে- হাত থেকে মাটিতে জুতা আস্তে ফেলা। আমাদের চলাফেরায় কখনো যেন অহঙ্কার বা তাকাব্বরি প্রকাশ না পায় সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। আল্লাহ অহঙ্কারীদের পছন্দ করেন না। সূরা লোকমানের ১৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা উদ্ধতভাবে পৃথিবীতে বিচরণ করো না, কেন না, আল্লাহ অহঙ্কারীকে পছন্দ করেন না।’ সূরা বনি ইসরাইলের ৩৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা আরো ইরশাদ করেন, ‘ভূ-পৃষ্ঠে দম্ভভরে বিচরণ করো না, তুমি তো কখনোই পদভারে ভূ-পৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবে না।’ এখানে ভূ-পৃষ্ঠ বলতে মাটিকেই বুঝানো হয়েছে। এমন কোনো মুহূর্ত নেই- যে সময় মানুষ মাটির ওপর অবস্থান করে না। ঘরে বা বাইরে মাটিকে আল্লাহ এভাবেই মানুষের অধীন করে দিয়েছেন। মানুষ তার বান্দা হিসেবে এর ওপর বিচরণ করে, বসবাস করে, ফসল ফলায়, ফল-ফলাদি ভক্ষণ করে, বৃক্ষরোপণ করে, এর থেকে রিজিক আহরণ করে। আল্লাহ ভূমিকে যাবতীয় বস্তু থেকে নত ও পতিত করে সৃষ্টি করেছেন। মানুষের সৃষ্টিও মাটি থেকে। মানুষের মরণও এই মাটিতে। সুতরাং এমন নত বস্তুর হক আদায় করতে গেলে মানুষকেও নত হতে হবে। এটাই কুরআনের শিক্ষা।

আমাদের অনেকেই মসজিদে প্রবেশ করে গল্প শুরু করে দেই। মসজিদ গল্পের জায়গা নয়। মসজিদ নিছক ইবাদতের জায়গা। হাদিস শরিফে মসজিদে কথা বলার ব্যাপারে এমনো জোর তাগিদ এসেছে- ‘মসজিদে দুনিয়াদারি বাজে গল্প করা হারাম।’ মসজিদে কথা বলবেন, ওয়াজ করবেন, মুসল্লিদের দ্বীনের ব্যাপারে নসিহত করার এখতিয়ার শুধু ইমাম সাহেবের। অন্যদের কথা বলার সুযোগ নেই। একান্ত কোনো মাসয়ালা-মাসায়েল জানা বা কোনো বিষয়ের পরামর্শ থাকলে তা ভদ্রভাবে, নম্রতার সাথে, আদবের সাথে, লিখিতভাবে করা ভালো।

আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার জন্য শুধু নামাজ, রোজা, হজ বা জাকাত আদায় করলেই চলবে না, এসব গুণাবলিও অর্জন করতে হবে। বিনয় ও নম্রতা উত্তম চরিত্রের ভূষণ। আল্লাহ তায়ালা বিনয় ও নম্রতা সম্পর্কে সূরা আশ-শুয়ারার ২১৫ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেছেন, ‘যারা তোমার অনুসরণ করে সে সব বিশ্বাসীর প্রতি বিনয়ী হও।’ এ ছাড়া হাদিসে কুদসিতে বিনয়ী গুণ অর্জনে উদ্বুদ্ধ করে বিধৃৃত হয়েছে- ‘আমি সে সব লোকের সালাতই কবুল করি, যারা মর্যাদার সাথে বিনয়াবনত হয় এবং আমার সৃষ্টির সাথে রূঢ় আচরণ করে না।’ (বাযযার আল মুসনাদ) হাদিস শরিফে আরো এসেছে- ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নম্রতা অবলম্বন করবে, আল্লাহ তায়ালা তার সম্মান বাড়িয়ে দেবেন।’ (সহিহ মুসলিম)

তাই আসুন আমরা মসজিদে যাবো শুধু নামাজ পড়ার জন্য নয়, এ ছাড়াও মসজিদের আরো যে আদব রযেছে, যেমন- উচ্চস্বরে কথা না বলা, নামাজের তাসবিহগুলো নীরবে পড়া, নামাজে এমনভাবে দাঁড়ানো, শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এমনভাবে রাখা, যাতে কারো কষ্ট না হয়। পরস্পর পরস্পরকে সালাম দেয়া, মুসাফাহা করা, কৌশল বিনিময় করা, অপর মুসলমানের জন্য দোয়া করা। এসব গুণাবলি অর্জনের চেষ্টা করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে কবুল করুন। আমিন।
লেখক : প্রবন্ধকার

 


আরো সংবাদ