১৮ নভেম্বর ২০১৮

দুই ওয়াক্ত নামাজ হয় কাজানের কুল শরীফ মসজিদে

দৃষ্টি নন্দন কুল শরীফ মসজিদ - ছবি : নয়া দিগন্ত

রাশিয়ার সর্ববৃহৎ নদী ভলগা। একই সাথে পুরো ইউরোপেরও। ৩ হাজার ৫৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদী ছুঁয়ে গেছে এবারের বিশ্বকাপের তিন ভেন্যু কাজান, সামারা ও নিজনি নভগোরদ শহরকে। কাজান এরিনা (স্টেডিয়াম) ও সামারা এরিনার বেশ কাছ দিয়ে বয়ে গেছে এই ভলগা নদী।

কাজানে এই ভলগা নদীর তীরেই অবস্থিত কুল শরীফ মসজিদ। রাশিয়ার অন্যতম মুসলিম অধ্যুষিত প্রদেশ তাতারস্তানের রাজধানী কাজান। বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই দেশের অন্য দুই মুসলিম প্রদেশ হলো চেচনিয়া ও দাগেস্তান। তাতারস্তানের জনগোষ্ঠির ৬০ ভাগ মুসলিম। কাজেই এখানে মসজিদের উপস্থিতি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। স্থানীয় তাতার মুসলিমদের সাথে আলাপ করে জানা গেলে, অনেক মসিজদ রয়েছে কাজানসহ পুরো তাতারস্তানে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ও দৃষ্টি নন্দন স্থাপত্য কুল শরীফ মসজিদ। গাঢ় নীল রঙের এই মসজিদের বিশাল গুম্বুজ ও চারটি সু-উচ্চ মিনার চোখে পড়ে বহু দূর থেকে। রাতে যখন আলো জ্বলে উঠে এই মিনার ও গুম্বুজে তখন আরো সুন্দর লাগে এই মসজিদকে।

চারদিক থেকেই দেখে চোখ জুড়ায় কুল শরীফ মসজিদ

 

ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও এই নয়নাভিরাম মসজিদে নামাজ পড়া হয়নি। ব্যস্ততার কারণে কাজানের হোটেল ক্যাপিটাল থেকে জোহর ও আসরের নামাজের সময় বের হতে পারিনি। পরিকল্পনা ছিল সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজ আদায় করার। তাই আগেভাগে গিয়ে উপস্থিত হই মসজিদ চত্তরে; কিন্তু মসজিদে গিয়ে দেখা গেল সব দরজাই বন্ধ। কেন বন্ধ সেটার উত্তর দিতে পারলেন না ঘুরতে আসা তাতার মুসলিম ইরদিম। ইংরেজি জানেন না তাই বেশি কিছু জানা যায়নি তার কাছ থেকে। টেনে নিয়ে গিয়ে দরজার সাথে সাটানো সাইনবোর্ড দেখিয়ে বললেন, এই যে লেখা আছে, সকাল নয়টা থেকে বিকেল সাতটা পর্যন্ত খোলা এই মসজিদ। জানলেন, এখানে দিনে দুই বেলা নামাজ হয়। তা যোহর ও আসর। বাকী সময়ে বন্ধ থাকে এই ইবাদত ঘর।

বিকেল সাতটা শুনে পাঠকদের খটকা লাগতে পারে- তাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, রাশিয়ায় সন্ধ্যা হয় স্থানীয় সময় ‘রাত’ নয়টায়। তাই সাতটা তো বিকেলই। জানা গেল, এই মসজিদে নিয়মিত জুমার নামাজ আদায় করেন স্থানীয় মুসলিমরা। ঈদের নামাজও হয়। তখন মুসলিমদের ঢল নামে কুল শরীফ মসজিদে। নামজের সময় ছাড়া বাকী সময়ে বন্ধ থাকে এই মসজিদের দরজা। না রেখে যে উপায়ও নেই। গ্রীষ্মকালে দর্শনার্থীরা বিশেষ করে মহিলারা স্বল্প পোশাকে ঘুরতে ও ছবি তুলতে আসেন এখানে।

কুল শরিফ মসজিদের আরেকটি ভিউ

 

পুরো মসজিদ চত্তরকে বলা হয় কাজান ক্রেমলিন। মসজিদের ১ শত গজ দূরেই অবস্থান বিশাল এক গির্জার। নাম ব্লাগোভিশানস্কি চার্চ। মুসলিম ও খৃষ্টানরা জানালেন এই দুই ধর্মের মানুষদের মধ্যে যে সম্প্রতির বন্ধন বিদ্যমান তা বুঝাতেই পাশাপাশি মসজিদ ও গির্জার অবস্থান। তাতার মুসলিমদের অনেকে জানালেন, খ্রিস্টান প্রধান দেশটিতে তারা বেশ শান্তিতে আছেন। কোনো সমস্যা নেই। অনুপস্থিত ধর্মীয় উত্তেজনাও। 

পাশেই অবস্থান সুইউমবিকে টাওয়ারের। পুরোনো এই টাওয়ারকে ঘিরে আছে এক ভালোবাসার কাহিনী। সাত দিনের মধ্যে টাওয়ার নির্মাণ করতে পারলে তাকে বিয়ে করতে রাজী হবেন এক মহিলা। এই শর্ত দেয়া হয় স্থানীয় অধিপতিকে। নির্ধারিত সময়ের আগে ঠিকই টাওয়ার নির্মাণ শেষ করেছিলেন ওই অধিপতি। কিন্তু এরপরই তার বোধদয় হয়- ওই মহিলাতো আমাকে পছন্দ করেনি, করেছে টাওয়ারকে। তাই পরে তিনি আত্মহত্যা করেন।

রাতের কুল শরীফ মসজিদ আরো দৃষ্টি নন্দন

 

স্থানীয় মুসলিমদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার কমিউনিস্ট শাসন আমলে অন্য সব এলাকার মতো তাতারস্তানেও বহু মসজিদ ধবংস করা হয়েছিল। কিন্তু হাত দেয়া হয়নি এই কুল শরীফ মসজিদে। ধর্মবিদ্বেষী কমিউনিস্টরা অবশ্য বহু গির্জাও ধ্বংস করেছিল। তা রুশদের দেয়া তথ্য।

১৫৫২ সালে কাজান আক্রান্ত হলে তখন কাজান রক্ষায় যুদ্ধে নামেন ইমাম কুল ও তার ছাত্ররা। সেই যুদ্ধে মারা যান ইমাম কুল।  মসজিদের ভেতরে অবস্থান করছিলেন ইমাম কুল। তাকে সহই পুড়িয়ে ফেলা হয় মসজিদটি। ২০০৫ সালে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্যান্য মুসলিম দেশের আর্থিক সহযোগিতায় নতুন করে নির্মিত হয় আজকের এই আধুনিক ও চমৎকার মসজিদ। নামও দেয়া হয় তার নামে কুল শরীফ মসজিদ।

কাজানে আসা পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ এই মসজিদ। মসজিদটির ছবি সম্বলিত কার্ডও বিক্রি হচ্ছে আশপাশে। পর্যটনের প্রচারণায় আছে এই মসজিদের ছবি। তবে খারাপ লেগেছে যখন স্বল্প পোশাকের নারী পর্যটকরা এসে এই মসজিদের পাশে দাঁড়িয়ে নিজেদের ক্যামেরাবন্দী করছিল। অন্য ধর্মাবলম্বী ছাড়াও স্থানীয় তাতার মুসলিম মেয়েদেরও দেখলাম ছোট পোশাকে মসজিদের পাশে ঘুরাঘুরি করতে। আবার হিজাব পরাও আছেন কেউ কেউ।

বিশাল এলাকা জুড়ে এই মসজিদ চত্তর। চারপাশে দেয়াল ঘেরা। বেশ উঁচুতে অবস্থান এই মসজিদের। ঘুরে ঘুরে মাটির উপর নির্মিত সিড়ি ডিঙিয়ে যেতে হয় মসজিদে। অবশ্য তাতে ক্লান্তি লাগে না। পাশেই থাকা ভলগা নদীর বাতাসে ক্লান্তি বহুদূরে পালায়। তিন চারটি গেট দিয়ে প্রবেশ করা যায় কুল শরীফ মসজিদে। মসজিদ চত্তরে উঠে পুরো এলাকা চমৎকার দৃষ্টিগোচর হয়। মসজিদ লাগোয়া আরো কিছু ভবন আছে। তা প্রশাসনিক ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হয়। পানি সংরক্ষণ এবং অগ্নি নির্বাপনের জন্য যে ঘর নির্মাণ করা হয়েছে তাও মসজিদের গম্বুজের রঙে। সব মিলে এক অসাধারণ পরিবেশ।

কাজানকে বলা হয় রাশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম নগরী। সেই সাথে তৃতীয় রাজধানীও। নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও খেলাধুলার জন্য বিখ্যাত এই শহর। নামকরা অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অবস্থিত এখানে। জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেশ কম। ২১ জন বাংলাদেশী ছাত্র সহ হাজার হাজার বিদেশী ছাত্র পড়ছেন এখানে। স্থানীয় ফুটবল ক্লাব রুবিন কাজান বেশ নাম করা রাশিয়া ও ইউরোপে। তাদের নিজস্ব মাঠ কাজান সেন্ট্রাল স্টেডিয়াম। তা এই মসজিদের একটু সামনেই। এখন বিশ্বকাপ ভেন্যূ কাজান এরিনাও তাদের দখলে। ২০১৩ সালে কাজানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল গ্রীষ্মকালীন বিশ্ব ইউনিভার্সিটি গেসম প্রতিযোগিতা। ১৬২ দেশের ১০ হাজার ৪০০ অ্যাথলেট এতে অংশ নেয়। যা ছিল গেমসের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ। কাজান এরিনার পাশেই সেই গেমসের সুইমিং পুল।

 

মসজিদের সামনে লেখক

 

রুশদের সাথে বিবাদে না গিয়ে তাতার মুসলমানরা ক্রমশ নিজেদের এলাকাকে উন্নত করেছেন। কাজান রেল স্টেশনে নামাজ পড়ার জন্য আলাদা জায়গা আছে। এর অজুখানা আবার কার্পেটে মোড়ানো। সব মিলে কাজান মুসলিম ঐতিহ্যের অনন্য এক নগরী।

লেখক : দৈনিক নয়া দিগন্তের সিনিয়র স্পোর্টস রিপোর্টার।


আরো সংবাদ