২২ জুলাই ২০১৮

হজ করার শ্রেষ্ঠ সময় কখন?

হজ করার শ্রেষ্ঠ সময় কখন? - ছবি : সংগৃহীত

আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান, মানসিকভাবে সুস্থ এমন প্রত্যেক মুসলমান নরনারীর ওপর অন্তত জীবনে একবার হজ করা ফরজ। যেকোনো মুসলিমের ওপর হজ ফরজ হওয়ার ব্যাপারে আর্থিক যোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্ববহ। শারীরিক যোগ্যতাকেও খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। কোনো মুসলমান আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান হওয়া সত্ত্বেও যদি সে শারীরিকভাবে অক্ষম বা দুর্বল হয় তবে তার ওপরও হজের হুকুম শিথিলযোগ্য। আবার মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির ওপরও হজ ফরজ হওয়ার বিষয়ে ছাড় রয়েছে। কাজেই হজ ফরজ হওয়ার শর্তগুলোকে অতি যত্নের সাথে মূল্যায়ন করে তা বিবেচনায় নিয়ে আসা জরুরি। কেননা হজের এমন কিছু আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে, যা আর্থিক, মানসিক ও শারীরিক বা কায়িক শক্তির সাথে সম্পৃক্ত।

হজ ফরজ করার ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘মানুষের পক্ষ থেকে যারা এই ঘরে (কাবাঘর) পৌঁছার সামর্থ্য রাখে তারা যেন হজ সম্পন্ন করে, তাদের ওপর এটি আল্লাহর হক। আর যে ব্যক্তি এ নির্দেশ মেনে চলতে অস্বীকার করবে তার জেনে রাখা উচিত, আল্লাহ বিশ্ববাসীর প্রতি মুখাপেক্ষী নন।’ (সূরা আলে ইমরান: ৯৭)। পবিত্র কুরআনের নির্দেশ মতে- আর্থিক ও শারীরিকভাবে সামর্থ্যবান ব্যক্তি হজ করার ব্যাপারে শৈথিল্য দেখাতে পারে না।

একজন মানুষ কঠোর পরিশ্রমে যৌবনে অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে হজের নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়ে যেতে পারেন; কিন্তু বার্ধ্যকে সে তার অর্জিত সম্পদ যে হারিয়ে ফেলবেন না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অর্থাৎ হজের নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার যোগ্যতা বা সামর্থ্য সব সময় একই রকম থাকে না। আবার শারীরিকভাবেও একজন মানুষ সব সময় একই রকম সুস্থ থাকতে পারে না। যেকোনো সময় দুর্ঘটনায় পড়ে বা অসুখবিসুখে হজ করার মতো শারীরিক যোগ্যতা হারিয়ে ফেলতে পারেন। কাজেই যোগ্যতা অর্জন করার সাথে সাথে হজ করা না হলে সে জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মুসলিমদের তুলনায় বাংলাদেশের মুসলিমগণ অপেক্ষাকৃত বৃদ্ধ বয়সে হজ সম্পাদন করে থাকেন। সব ধরনের যোগ্যতা অনেক আগেই অর্জন করার পরও যখন দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসে, পিঠ কুঁজো হয়ে শরীর নুয়ে পড়ে, হাঁটুতে যখন পর্যাপ্ত বল থাকে না, তখন দায়মুক্তির হজ করার জন্য এ দেশের বেশির ভাগ মুসলিম মনস্থির করেন। অথচ আল্লাহর রাসূল সা: ঘোষণা করেছেন- ‘যৌবন বয়সের ইবাদত আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বহু মানুষকে দেখা যায় জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নামাজ ধরেন, কুরআন পড়া শেখার চেষ্টা করেন, মুখে দাড়ি রাখেন, তারপর হজ করেন। এ রকম করা যেন এক ধরনের নিয়মে পরিণত হয়েছে। একটা জিনিস খেয়াল করলে দেখা যায়, সব মানুষই জীবনে যতটুকু অন্যায়, অবিচার, জুলম, নির্যাতন, খুন, জখম, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, ঘুষ, যেনা, ব্যভিচার যা করেছেন; তা যুবক বয়সেই করেছেন। সাধারণত বৃদ্ধ বয়সে মানুষ এসব অন্যায় অপকর্ম থেকে নিজেকে বিরত রাখেন। মানুষ যাতে অসামাজিক কাজে নিজেকে নিমজ্জিত রাখতে না পারে সে জন্যই আল্লাহ পাক যুবক বয়সে ইবাদত করার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। অথচ মানুষ সব ধরনের কুকর্ম করা শেষ করে শেষ বয়সে এসে সেসব কৃত অপকর্ম থেকে মুক্তি লাভের প্রত্যাশায় ইবাদতে মনোনিবেশ করে। যেন উল্টোপথে চলছে এ দেশের মুসলিম সমাজ।

হজ এমন একটি ইবাদত যা পূর্ণ করার জন্য আর্থিক সামর্থ্য ও শারীরিক সামর্থ্য দুটোই একসাথে দরকার হয়। আর এ দুটো সামর্থ্যই প্রায় প্রত্যেকটি মানুষ তার যুবক বয়সেই অর্জন করার যোগ্যতা রাখে। বেশির ভাগ মানুষই তরুণ বয়সে অর্থ উপার্জন করে থাকে। অতএব তরুণ বয়সেই হজ করা উত্তম। প্রথম যে ব্যক্তি তরুণ বয়সে কাবাঘর তাওয়াফ করেছিলেন, তিনি হজরত আদম আ:। হজরত ইব্রাহিম আ: তিনিও তরুণ বয়সে কাবা প্রদক্ষিণ করেছিলেন। তরুণ বয়সের হাজি ছিলেন হজরত ইসমাইল আ:। এক সন্তানের জননী ইসমাইল মাতা হজরত হাজেরা সাফা-মারওয়া দৌড়ে হজ সম্পাদন করেছিলেন। তাঁরা প্রত্যেকেই বয়সের ভারে নুয়ে পড়ার আগেই কাবা তাওয়াফ করেছিলেন।

বাংলাদেশের মুসলিম তরুণেরা আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান হলেই কেউ কেউ বউবাচ্চা নিয়ে ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন শহরে ঘুরতে যান। অনেক যুবকই বিয়ের পর বিপুল অঙ্কের টাকা খরচ করে এসব জায়গায় হানিমুনে বের হন আর বৃদ্ধ বয়সে হজ করে পাপমুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেন। অথচ তারা তরুণ বয়সে হজ করে নিজের জীবনটাকে পরিচ্ছন্ন রাখতে পারেন অতি সহজেই। বিয়ের পর হানিমুনের ধারণাটা এসেছে পশ্চিমা জগৎ থেকে। হজ করার মতো তাদের (পশ্চিমাদের) কোনো সুযোগ (অপশন) নেই বলেই তারা ওসব হানিমুন-টানিমুন করে। মুসলিমদের মতো হজের বিধান থাকলে হয়তো তারাও বিয়ের পর হানিমুনের বদলে নিশ্চয় হজই করত। বাংলাদেশের মুসলিম তরুণেরা এমন একটি চেতনা লালন করেন যে, মুখে দাড়ি রাখলে বা অল্প বয়সে হজ করলে ছোটখাটো ইসলাম পরিপন্থী কাজগুলো আর করা যাবে না। অর্থাৎ জীবনকে উপভোগ না করেই মুরব্বি বনে যাওয়া- এমন সব উদ্ভব টাইপের ভুল ধারণার বশবর্তী হয়েই তারা তরুণ বয়সে মুখে দাড়ি রাখতে বা হজ করতে নারাজ। এতে বুঝা যায়, তরুণেরা ইসলাম পরিপন্থী কাজ করতেও রাজি; তবু অল্প বয়সে হজ করতে রাজি নন।

মুসলিম সমাজে এমন ব্যক্তিও আছেন, যারা ভাবেন এ বছর নয়; আগামী বছর হজ করবেন। এ রকম করতে করতে অনেক বছর কেটে যায়। একসময় ছেলেমেয়েরা বিয়ের উপযুক্ত হয়ে ওঠে। তখন ভাবেন, ছেলেমেয়ের বিয়ে সমাপ্ত করেই আল্লাহ বাঁচালে হজে যাবেন। এ সময়টা যখন আসে তখন তিনি বৃদ্ধ। আর বৃদ্ধ হাজীরা কী হজ করেন তা তাদের জিজ্ঞেস করলেই বুঝতে পারা যায়।

হজ একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত। হজের আনুষ্ঠানিকতাগুলো মানুষের শারীরিক শক্তির সাথে সম্পৃক্ত। সাফা থেকে মারওয়া আবার মারওয়া থেকে সাফা পাহাড় দৌড়ানো। কাবাঘর সাতবার প্রদক্ষিণ করা। সাতবার করে ২১টি পাথর নিক্ষেপ করা। নিজের কোরবানি নিজে জবাই করা। মিনা মুজদালিফা হয়ে আরাফাতের মাঠে হেঁটে যাওয়া আবার আসা। হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর চুম্বন করা। ওজু-গোসলসহ নিজের কাজ নিজে করা। লাখ লাখ মানুষের ভিড়ের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে প্রচণ্ড রোদে এসব কাজ সম্পাদন করা খুবই কষ্টসাধ্য এবং শ্রমসাধ্য ব্যাপার। যে বয়সে ওজুর পানিটুকু নিজের বাড়িতে নাতিনাতনীর কাছে চেয়ে নিতে হয়, সে বয়সে হজে গিয়ে এসব কাজ করা সত্যিই খুবই কষ্টের কারণ হয়ে যায়। তা ছাড়া হজের মাধ্যমে যে ইসলামের ইতিহাস সরেজমিন প্রত্যক্ষ করা যায়, বৃদ্ধ বয়সে এসে সেটাও সেভাবে জানা-বুঝা সম্ভব হয়ে ওঠে না।

হজ গমনে বিত্তবান তরুণদের উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে দায়িত্বশীল মুসলিম স্কলারদের জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। এ বিষয়ে সরকারকেও দায়িত্ব নিতে হবে। স্কুল-কলেজের শিক্ষক, মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ সবাই মিলে এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা জরুরি, যাতে তরুণ বয়সে হজ করা একটা আন্দোলনে রূপ নেয়। বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশে তরুণদের জন্য হজের বিশেষ প্যাকেজের ব্যবস্থা করা হয়। এ দেশেও তা করা যেতে পারে। দেশে যত তরুণ হাজী তৈরি হবে, সমাজ থেকে তত অপরাধপ্রবণতা হ্রাস পেতে থাকবে বলে আশা করা যায়।
লেখক : গবেষক

আরো পড়ুন :

জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব
আনিসুর রহমান এরশাদ
মহানবী সা: সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে জিবরাইল আ:-এর মাধ্যমে স্রষ্টা প্রদত্ত জ্ঞান আহরণ করেছেন। হেরা গুহায় ধ্যান করেছেন মানবজাতির সঙ্কট থেকে মুক্তির পথ ও পদ্ধতি নিয়ে। জ্ঞানকে সংরক্ষণের জন্য মুখস্থকরণ, অন্যকে অবহিতকরণ তথা জ্ঞানবিতরণ ও লিপিবদ্ধকরণের কৌশল অবলম্বন করেছেন। তিনি জ্ঞান অর্জনকে উৎসাহিত করতে বলেছেন, ‘জ্ঞানার্জন করা প্রত্যেক মুসলমান নর ও নারীর জন্য ফরজ। যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়, সে আল্লাহর পথে রয়েছে যে পর্যন্ত না সে প্রত্যাবর্তন করে।’ (তিরমিজি ও দারেম, মেশকাত শরিফ)

জ্ঞানের ব্যবহারগত দিকটাকে গুরুত্ব দেয়া : মহানবী সা: জ্ঞানের ব্যবহারগত দিককে খুব বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘হে আবুযার! ওই ব্যক্তি কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট, যে নিজের জ্ঞান থেকে উপকৃত হয় না।’

জ্ঞানচর্চাকে উৎসাহিতকরণ : একদিন হজরত রাসূল সা: দেখলেন মসজিদে দু’টি দল বসে আছে। একটি দল ইসলামি জ্ঞানচর্চায় ব্যস্ত এবং অপরটি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা ও মুনাজাতে ব্যস্ত। আল্লাহর নবী সা: বললেন, ‘উভয় দলই আমার পছন্দের, কিন্তু জ্ঞানচর্চাকারী দলটি প্রার্থনায়রত দলটি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। আর আমি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষকে শিক্ষা দানের লক্ষ্যে প্রেরিত হয়েছি।’ অতঃপর মহানবী সা: জ্ঞানচর্চাকারী দলটিতে গিয়ে বসলেন।

জ্ঞানীকে সম্মানজনকভাবে উপস্থাপন : মহানবী সা: বলেন, ‘লজ্জা দুই প্রকারের। বুদ্ধিবৃত্তিক লজ্জা এবং বোকামিপূর্ণ লজ্জা। বুদ্ধিবৃত্তিক লজ্জা জ্ঞান থেকে উৎসারিত এবং বোকামিপূর্ণ লজ্জা অজ্ঞতা মূর্খতা হতে উৎসারিত হয়।’

জ্ঞানের উত্তম প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ : হজরত মুস্তাফা সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে ক্ষণিকের জন্য হেয় ও প্রতিপন্ন হতে প্রস্তুত হয় না, সে সারা জীবন অজ্ঞতার কারণে হেয় ও প্রতিপন্ন হয়।’ জ্ঞান অর্জন গুরুত্বপূর্ণ এ ব্যাপারে দ্বিধাদ্বন্দ্ব না থাকলেও প্রশ্ন উঠতে পারে উপায় ও পদ্ধতি নিয়ে। উপায় চারটি : ০১. নিজে জানা; ০২. অপরকে জানানো; ০৩. যারা চিন্তা গবেষণায় অগ্রসর কিন্তু কর্মে পিছিয়ে অথবা যারা চিন্তা গবেষণা ও কর্মে অগ্রসর তাদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে। যারা চিন্তা গবেষণায় পশ্চাৎপদ কিন্তু কর্মে অগ্রসর অথবা চিন্তা গবেষণা ও কর্মে পশ্চাৎপদ তাদের অবস্থার পরির্বতনে বা উন্নয়নের চেষ্টায়। নবী করিম সা: বলেছেন : ‘জ্ঞানী ব্যক্তিরা দুই প্রকারের : যে আলেম নিজের জ্ঞানের ওপর আমল করে তার জ্ঞান তার জন্য পরিত্রাণদাতা হয়। আর যে আলেম নিজের জ্ঞানকে ত্যাগ করে সে ধ্বংস হয়ে যায়’।

জ্ঞান বিতরণ সম্মানযোগ্য ও শ্রদ্ধেয় : মহানবী সা: বলেন, ‘বিজ্ঞান শিক্ষা দাও, এটি মানুষকে আল্লাহভীতি শিক্ষা দেয়, যে জ্ঞানার্জন করে, সে আল্লাহকে সম্মান করে, যে তা দান করে সে যেন শিক্ষা দেয়, এ জ্ঞান যে ধারণ করে সে সম্মানযোগ্য ও শ্রদ্ধেয়। কারণ বিজ্ঞান মানুষকে ভুল ও পাপ থেকে রক্ষা করে এবং বেহেশতের পথ আলোকিত করে।’

জ্ঞানার্জনকে উত্তম ইবাদত ঘোষণা : হজরত আয়েশা রা: বলেন, আমি রাসূল সা:-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা আমার কাছে অহি পাঠিয়েছেন, যে ব্যক্তি ইলম তলবের উদ্দেশ্যে কোনো পথ অবলম্বন করবে, তার জন্য আমি জান্নাতের পথ সহজ করে দেবো এবং যে ব্যক্তির দুই চক্ষু আমি নিয়েছি তাকে তার পরিবর্তে আমি জান্নাত দান করব।’ ইবাদত অধিক হওয়া অপেক্ষা ইলম অধিক হওয়া উত্তম। দ্বীনের তথা ইলম ও আমলের আসল হচ্ছে শোবা-সন্দেহের জিনিস থেকে বেঁচে থাকা।’

জ্ঞানেই পরকালীন জীবনের মুক্তি : হজরত আবু হুরাইরা রা: বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘মুমিনের মৃত্যুর পরও তার আমল ও নেক কাজগুলোর মধ্যে যার সওয়াব তার কাছে পৌঁছতে থাকবে তা হচ্ছে ইলম, নেক সন্তান এবং সদকায়ে জারিয়াহ।’ জ্ঞান ছাড়া দুনিয়া কিংবা পরকাল কোনো জীবনেই মুক্তি মিলবে না। যে জ্ঞানটা বিবৃতিমূলক জ্ঞান বা প্রকাশিত তা জানার জন্য যেভাবে জ্ঞান সাধককে চেষ্টা করতে হয় সেভাবেই বুদ্ধিবৃত্তিক গুণকে সাধারণ স্তরের ঊর্ধ্বে ওঠানো সম্ভব নয়। মনে রাখা জরুরি, তাত্ত্বিক জ্ঞান বস্তু সমন্বয়ের সক্ষমতা দেয়, কিন্তু ব্যবহারিক জ্ঞান কিভাবে চলতে হবে, বলতে হবে তার ক্ষমতা দেয়। বিচারিক ক্ষমতাকে প্রবল করতে হলে অভিজ্ঞতানির্ভর বোধকে গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি সচেতনতার মাত্রাকে সূক্ষ্ম বিবেচনার উপযোগী পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। এটা নিঃসন্দেহে সত্য যে, অভিজ্ঞতার মাধ্যমেও লাভ হয় জ্ঞান। কিন্তু অভিজ্ঞতা কি প্রত্যক্ষ নাকি পরোক্ষ- সেটি বুঝাও গুরুত্বপূর্ণ।

জ্ঞানীরাই জান্নাতে যাবে : সহিহ-আল বুখারি শরিফে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান আহরণ করে সে প্রচুর লাভ করে, আর যে ব্যক্তি কোনো পথচলাকালে জ্ঞান লাভ করে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।’
জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি : শিক্ষা সম্প্রসারণে মহানবী সা: প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। শিক্ষা প্রদানের জন্য সাফা পাহাড়ের পাদদেশে বিশিষ্ট সাহাবি আরকাম বিন আবুল আরকামের বাড়িকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহার করেন। সে হিসেবে দারুল আরকামই ইসলামের প্রথম আনুষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানে ধর্মশিক্ষা দেয়া হতো।
জ্ঞানভিত্তিক সংগঠন প্রতিষ্ঠাকরণ : হিজরত-উত্তরকালে মহানবী সা: মসজিদে নববীতে সাহাবিদের শিক্ষা দান করতেন; যা ইতিহাসে ‘মাদরাসাতুস সুফফা’ নামে অভিহিত ছিল। এটা ছিল জ্ঞানভিত্তিক সংগঠন। জ্ঞানভিত্তিক সংগঠন মানেই হচ্ছে এমন একটি সংগঠন, যেখানে বুদ্ধিমত্তা ও সফলতার সাথে সাংগঠনিক পরিসরে শিক্ষা আদান-প্রদান এবং জ্ঞান সৃষ্টি-সংগ্রহ-বিতরণের প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। সংগঠনের স্বকীয়তা বা স্বতন্ত্রতা অক্ষুণœ রাখার স্বার্থে সংগঠনের নিজস্ব জ্ঞানকে ব্যবহার করে।

উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া : মসজিদে নববী ছাড়াও সেই সময় মদিনায় কয়েকটি স্থানে মসজিদভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে ইসলামের উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষাদানের ইতিহাস পাওয়া যায়। শিক্ষার জন্য নিয়মতান্ত্রিক পাঠ্যসূচির প্রয়োজন। মহানবী সা: একটি সমন্বিত সিলেবাস নির্ধারণ করেন। তিনি ইসলামি শিক্ষার জন্য মহাগ্রন্থ আল কুরআন শিক্ষার সাথে সাথে আকাইদ ও ইবাদতের নিয়ম-কানুন, স্বাস্থ্যশিক্ষা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক শিক্ষা, রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়মনীতি, জীববিদ্যা, প্রকৃতিবিদ্যা, ইতিহাস-ঐতিহ্য, চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-নক্ষত্র আকাশ-বাতাস প্রভৃতির সমন্বয়ে বিজ্ঞান শিক্ষা এবং স্রষ্টা ও সৃষ্টির সম্পর্কবিষয়ক নানা ধরনের শিক্ষা দিতেন। সাহাবিরা অল্প সময়ের মধ্যে পবিত্র কুরআন শিক্ষার পাশাপাশি সাহিত্য, উত্তরাধিকারী আইন, চিকিৎসাবিদ্যা, ফিকহ, তাজবিদ, দর্শনসহ সময়োপযোগী পণ্য বিপণন প্রক্রিয়াও রপ্ত করতে পারতেন। যুদ্ধবিদ্যা ও সমরাস্ত্র তৈরিতেও তারা পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। সাহাবিদের মধ্যে কয়েকজন সাহাবি বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাপক পাণ্ডিত্য লাভ করেন। বিশেষ করে হজরত জায়িদ বিন সাবিত রা: ফারায়িজ শাস্ত্র বা উত্তরাধিকারী আইন, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: তাফসির শাস্ত্র, হজরত হাসসান বিন সাবিত রা: সাহিত্য ক্ষেত্রে ব্যাপক ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। গ্রিক, কিবতি, ফারসি, হিব্রু, ইথিওপীয় প্রভৃতি বিদেশী ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রেও মহানবী সা: ব্যাপক গুরুত্ব দিতেন।

নারী শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া : নারী শিক্ষাকে মহানবী সা: সমভাবে গুরুত্ব দিতেন। পুরুষদের মতো নারীদেরও জ্ঞানার্জন ফরজ করেছেন। হিজরতের পর তিনি সপ্তাহে এক দিন শুধু নারীদের শিক্ষা-দীক্ষার জন্য সময় দিতেন। নারীদের পুঁথিগত শিক্ষার পাশাপাশি নানা প্রশ্নের জবাবও দিতেন তিনি। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা:, হাফসা রা:, উম্মে সালমা রা:সহ অনেক নারী সাহাবিকে তিনি উঁচুমানের শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছিলেন।

উপসংহার : মহানবী সা:-এর প্রদর্শিত পন্থায় জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে আলোকিত মানুষ তৈরি দেশ-জাতি-মানবতার টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার স্বার্থে অপরিহার্য। জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হবে সমাজ, তৈরি হবে আলোকিত মানুষ। এ জন্য চাই জ্ঞানভিত্তিক আন্দোলন, জ্ঞানভিত্তিক সংগঠন, জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। এ ক্ষেত্রে সম্মিলিত প্রয়াসের কোনো বিকল্প নেই। দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সা:-এর আদর্শই অনেক বেশি কার্যকর।
লেখক : প্রবন্ধকার


আরো সংবাদ