১৩ ডিসেম্বর ২০১৮

হাজার মাসের চেয়েও মর্যাদার যে রাত

হাজার মাসের চেয়েও মর্যাদার যে মাস - ছবি : সংগৃহীত

মাহে রমজানুল মোবারকের আজ ২৬ তারিখ। আজকের দিবাগত রাত বা রমজানের ২৭তম রাত সাধারণভাবে লাইলাতুল কদর বা কদরের রাত হিসেবে পরিচিত। আভিধানিকভাবে লাইলাতুল কদর অর্থ সম্মানের রাত। অত্যন্ত মহিমান্বিত একটি রাত এ নামে আখ্যায়িত হয়েছে। কুরআন মাজিদে একটি সূরা নাজিল হয়েছে এ প্রসঙ্গে।

তাফসিরের কিতাবগুলোতে বর্ণিত আছে, আগের যুগের উম্মতেরা দীর্ঘ হায়াত পেতেন এবং দীর্ঘকাল ইবাদত-বন্দেগি করতে পারতেন বলে বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এ বর্ণনা শুনে সাহাবায়ে কেরাম হতাশ হন যে, আমরা স্বল্প আয়ুর কারণে আগের উম্মতের মতো মর্যাদা ও সম্মান লাভের যোগ্যতা অর্জন করতে পারব না। তাই আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজিদের এই সূরা নাজিল করে জানিয়ে দিলেন যে, উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য এক রাতের ইবাদতের বিনিময়ে হাজার মাস বা ৮৩ বছর চার মাসের চেয়েও বেশি সময় ধরে ইবাদতের ছওয়াব লাভের সুযোগ রয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা এ রাতেই কুরআন মাজিদ নাজিল করেছেন বলে জানিয়ে দিয়েছেন। তেমনি এ রাতের মর্যাদা হাজার মাসের চেয়ে বেশি বলেও ঘোষণা করেছেন। কিস্তু কোন রাত এটি তা বলে দেননি। হাদিস শরিফেও নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি কোনটি কদরের রাত। নিঃসন্দেহে এতে অনেক রহস্য ও তাৎপর্য নিহিত রয়েছে। 

হয়তো আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাননি মুসলমানরা একটি রাতের ভরসায় বসে থেকে সারা বছর বা সারা মাস অবহেলায় কাটিয়ে দিক। এ জন্য এটাকে রহস্যময় করে রাখা হয়েছে। তা ছাড়া পরিশ্রম ও সাধনার মাধ্যমেই মূল্যবান কিছু অর্জন করতে হয়। যে রাতের মূল্য হাজার মাসের চেয়ে বেশি, তা যদি সহজে পাওয়া যেত, তাহলে মানুষ হয়তো এটাকে বেশি গুরুত্ব দিত না। তাই তা অনির্দিষ্ট করে রেখে মানুষকে অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে কদরের রাত অনুসন্ধানের তাগিদ দিয়েছেন। 
কেউ কেউ রমজানের যেকোনো অংশে এ রাত হতে পারে বলে মন্তব্য করেন। তবে বেশির ভাগ মনীষীর মতে, রমজানের শেষ দশকেই তা লুকায়িত রয়েছে। আবার কারো কারো মতে, এ রাতের তারিখ পরিবর্তনশীল। কোনো বছর একুশ, কোনো বছর সাতাইশ, আবার কোনো বছর ঊনত্রিশ তারিখের রাত লাইলাতুল কদর হয়। কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে অনেক মনীষী রমজানের সাতাইশ তারিখের রাতকে লাইলাতুল কদর হিসেবে চিহ্নিহ্নত করেছেন।

এ ব্যাপারে সাহাবিদের মধ্যে হজরত উবাই ইবনে কা’ব রাযিয়াল্লাহু আনহুর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি জোর দিয়ে বলতেন, রমজানের সাতাইশতম রাতই কদরের রাত। অন্য দিকে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন- এটা রমজানের বাইরেও হতে পারে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর মন্তব্য সম্পর্কে হজরত উবাই ইবনে কা’ব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন- আমার ভাই আবদুল্লাহ ভালো করেই জানেন, এটা রমজানের মধ্যে এবং তা সাতাইশতম রাত; কিন্তু লোকেরা এ রাতের ভরসায় বসে থাকবে এবং আলসেমিতে সারা বছর ও সারা রমজান মাস কাটিয়ে দেবে এ ভয়ে তিনি তা লোকদেরকে জানাতে চান না। হজরত উবাই ইবনে কা’ব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে প্রশ্ন করা হয়েছিল- আপনি কিভাবে নিশ্চিত হলেন সাতাইশ রমজানের রাতটিই কদরের রাত? জবাবে তিনি বলেন- এ রাতের যেসব আলামত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে বলেছেন আমরা সেগুলো সাতাইশ তারিখে পেয়েছি। হজরত ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং হজরত আবদুল কাদের জিলানি রহমাতুল্লাহি আলাইহিসহ একদল মনীষীর ব্যাপারে বলা হয়, তারা রমজানের সাতাইশ তারিখের রাতকে লাইলাতুল কদর বলে মনে করতেন। এসব মনীষীর নাম যুক্ত হওয়ায় রমজানের ছাব্বিশ তরিখ দিবাগত রাতটি অত্যন্ত আগ্রহ-উদ্দীপনা নিয়ে ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে অতিবাহিত করার ধারা চালু হয়েছে। 

তবে মনে রাখা প্রয়োজন, কদরের রাতের যে মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য, তার মূল উপাদান কুরআন মাজিদ। শেষ নবীর উম্মতের জন্য জীবনব্যবস্থার চূড়ান্ত নির্দেশনা হিসেবে কুরআন মাজিদ নাজিলের সাথে রাতটি সস্পর্কিত হওয়ায় এই মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য সাব্যস্ত হয়েছে। অতএব এ রাতের সুফল পুরো মাত্রায় পাওয়ার জন্য কুরআন মাজিদের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করাই আসল উপায়।

কোরআন পাঠ ও অধ্যয়ন এবং কুরআনি বিধান ও নির্দেশনা অনুসরণেই নিহিত রয়েছে মানুষের প্রকৃত সাফল্য। তাই লাইলাতুল কদরে সালাত, তিলাওয়াত ও জিকির-তাসবিহের সাথে যেমন অতীত জীবনের পাপরাশি মোচনের জন্য মহান প্রভুর কাছে আকুল আবেদন জানাতে হবে, তেমনি তার তাওফিক প্রার্থনা করতে হবে কুরআনকে জীবনের দিশারী হিসেবে মেনে চলার।


আরো সংবাদ