২১ অক্টোবর ২০১৯

বড় জা’র দেয়া মরিচ মেশানো গরম পানিতে দগ্ধ সাবিনা

বড় জা’র দেয়া মরিচ মেশানো গরম পানিতে দগ্ধ সাবিনা - নয়া দিগন্ত

গাছ কর্তন করতে বাঁধা দেয়ার জেরে রংপুরের গংগাচড়ায় লক্ষিটারী ইউনিয়নের পূর্ব মান্দ্রাইন গ্রামে নিজ ভাসুরের স্ত্রীর দেয়া গরম পানিতে ঝলসে গেছে সাবিনা বেগম (৩০) নামের এক গৃহবধূর পুরো শরীর। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে চিকিৎসাধীন ওই গৃহবধূর মুখের আকৃতি আর আগের মতো ফেরানো যাবে না, তার জীবন এখন সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক। এ ঘটনায় মামলা হলেও ৮ দিনেও অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসাপাতালের বার্ণ ইউনিটে চিকিৎসাধীন সাবিনা বেগমের স্বামী গোলাম রব্বানী নয়া দিগন্ত অনলাইনকে জানান, গত ১১ জুন সকালে আমার বসত ভিটায় লাগানো বেশ কিছু বিভিন্ন ধরণের গাছ আমার ভাই তরিক মিয়া ও তার স্ত্রী আমেনা বেগম ওরফে ময়না বুড়ি কেটে ফেলে। এসময় আমার স্ত্রী সাবিনা বেগম তাদের বাঁধা দেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তারা দুজনই সেখানে থাকা বাঁশ দিয়ে আমার স্ত্রীর শরীরে উপর্যপুরি মারতে থাকে। মারধরের একপর্যায়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আমার স্ত্রী।

এসময় আমার ভাবী আমেনা বেগম বাড়িতে গিয়ে চুলায় থাকা ফুটন্ত গরম পানির মধ্যে মরিচের গুড়ো মিশিয়ে নিয়ে এসে আমার স্ত্রীর মুখে ও বুকে নিক্ষেপ করে। এতে আমার স্ত্রী সাবিনার পুরো মুখ ও বুক দগ্ধ হয়ে ঝলসে যায়। শুধু তাই নয়, গরম পানি নিক্ষেপের পর আমার স্ত্রীকে তারা গলাটিপে হত্যার চেষ্টা করে। স্ত্রী ও আমার চিৎকার শুনে এলাকাবাসী ছুটে আসলে আমার ভাই ও ভাবী পালিয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় এলাকাবাসীর সহযোগিতায় স্ত্রীকে আমি রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসি।

বুধবার সকালে সরেজমিনে হাসাপাতালে বার্ণ ইউনিটে গিয়ে দেখা গেছে, ইউনিটের নিচ তলার ৩৭ নং ওয়ার্ডের ৪নং বেডে চিকিৎসাধীন আছেন গৃহবধূ সাবিনা বেগম। নিক্ষেপ করা মরিচ মিশ্রিত গরম পানিতে তার মুখ ঝলসে গেছে। মুখের কোনো আকৃতি নেই। তার বেডের পাশে অসহায়ের মতো চোখের পানি ঝরাচ্ছেন তার ১০ বছরে কন্যা রিতু মনি, স্বামী এবং ভাই সাইদ মিয়া।

সাবিনা বেগমের কন্যা রিতু মনি (১০) নয়া দিগন্ত অনলাইনকে জানায়, আমার মাকে আমার চাচী ময়না বুড়ি আমার সামনে মরিচ মিশানো গরম পানি মুখে ও বুকে ঢেলে দেয়। আমার মা তখন খুব জোড়ে চিৎকার দেয়। এখন আমার মায়ের মুখ আর মুখ নাই। খুব কষ্ট হচ্ছে আমার।

ভূক্তভোগী গৃহবধূ সাবিনার ভাই সাইদ মিয়া নয়া দিগন্ত অনলাইনকে বলেন, আমি নিজেই এক শারীরিক প্রতিবন্ধি হওয়ায় পরিবারের বোঝা হয়ে আছি। এখন আমার সুস্থ্য বোনকে আমেনা বেগম যেভাবে গরম পানি নিয়ে মুখ ও বুক ঝলসে দিলো। তার আর আকৃতি আগের মতো থাকবে না। বোনটার দুটি ছোট ছোট মেয়ে আছে। তাদের মুখের দিকে তাকাতে পারছি না। কিভাবে এই কষ্ট লাঘব করবো। মানুষ এতো নিষ্ঠুর হয় কিভাবে?

রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রধান ডা. মারুফুল ইসলাম মারুফ নয়া দিগন্ত অনলাইনকে জানান, সাবিনার শরীরের ২৮ ভাগ পুড়ে গেছে। তাকে সুস্থ্য করার জন্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। তবে তার মুখের অবস্থা আগের মত ফিরানো যাবে না।

সাবিনার স্বামী গোলাম রব্বানী নয়া দিগন্ত অনলাইনকে আরো জানান, আমার স্ত্রীর ওপর হামলার বিষয়টি থানায় জানিয়ে ঘটনার দিনই আমি মামলা দায়ের করেছি। কিন্তু কাউকেই গ্রেফতার করেনি পুলিশ। আসামীরা এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমার টাকা পয়সা নাই। সেজন্য কোথাও গিয়ে বিচার পাচ্ছি না।

এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গঙ্গাচড়া মডেল থানার এসআই আবু বকর ফকরুল আলম নয়া দিগন্ত অনলাইনকে জানান, ঘটনাটি আমাদের কাছে আসার সাথে সাথেই মামলা নেয়া হয়েছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে নিবিড় তদন্ত করছি। আসামীরা গা ঢাকা দিয়েছে। তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

গংগাচড়া থানার ওসি সুশান্ত কুমার সরকার নয়া দিগন্ত অনলাইনকে জানান, মরিচ মেশানো গরম পানি মুখে ও বুকে নিক্ষেপ করে জঘন্য অপরাধ করেছেন অভিযুক্তরা। তারা যেখানেই থাকুক তাদের গ্রেফতার করে আইনের মুখোমুখি করা হবে। এখানে যত রাঘব-বোয়াল থাকুক না কেন তাদের কোনো ছাড় দেয়া হবে না।

এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর মহানগর কমিটির সভাপতি ফখরুল আনাম বেঞ্জু নয়া দিগন্ত অনলাইনকে জানান, এতবড় একটি ঘটনা। কিন্তু পুলিশ এখনও আসামিদের গ্রেফতার করতে না পারার বিষয়টি খুব দুঃখজনক। গ্রেফতার না হওয়ার পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকলে তা উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের খতিয়ে দেখা জরুরী। এছাড়াও তিনি হামলার শিকার গৃহবধূর সুচিকিৎসার জন্য প্রয়োজনে ঢাকা কিংবা বাইরে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার উদ্যোগ নেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান।


আরো সংবাদ

সকল




portugal golden visa
paykwik