২০ অক্টোবর ২০১৮

লন্ডনে খোলা আকাশের নিচে ইফতার

লন্ডনের রাস্তায় একসাথে ইফতার করেন কয়েক শ’ রোজাদার - ছবি : সংগ্রহ

লন্ডনের সাংস্কৃতিক ও অ্যাকাডেমিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত প্রশস্ত রাস্তাটির নাম ‘ম্যালেট স্ট্রিট গার্ডেনস’। সুদূর অতীত থেকেই এই রাস্তাটি বিভিন্ন কারণে বিখ্যাত হলেও গত প্রায় চার বছরেরও বেশি সময় ধরে অন্য আরেকটি কারণে ম্যালেট স্ট্রিট আরো খ্যাতি অর্জন করেছে। এই জায়গাটি বর্তমানে ‘রমাদান টেন্ট প্রজেক্টের (আরটিপি) প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। 

প্রতি বছর পবিত্র রমজান মাসে আরটিপি এখানে সবার জন্য উন্মুক্ত ইফতারের আয়োজন করে। সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে আয়োজিত এই ইফতার মাহফিলে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ জন রোজাদার ইফতারে অংশগ্রহণ করেন। প্রতিদিন ইফতারের প্রায় এক ঘণ্টা আগে অর্থাৎ ৮টায় সানকেন উদ্যানের বাইরের লোহার গেট খুলে দেয়া হয় এবং রোজাদারদের ইফতার মাহফিলে স্বাগত জানানো হয়। উল্লেখ্য, গত শুক্রবার স্থানীয় সময় অনুযায়ী লন্ডনে ইফতারের সময় ছিল সন্ধ্যা ৯:১৫ পিএম।

স্বেচ্ছাসেবকেরা ইফতার মাহফিলে রোজাদারদের স্বাগত জানান এবং মসজিদের মতই জুতা খুলে মাহফিলের ভেতর প্রবেশ করার সুবিধার্থে আগত সব অতিথিকেই তারা নীল রঙয়ের প্লাস্টিক ব্যাগ সরবরাহ করেন। স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের (এসওএএস) ছাত্র থাকা অবস্থায়ই ২০১১ সালে ওমর সালাহ রমাদান টেন্ট প্রজেক্ট (আরটিপি) প্রতিষ্ঠা করেন। বিভিন্ন দেশ থেকে এখানে পড়তে আসা ছাত্ররা যেন তাদের পারিবারিক ও সাম্প্রদায়িক রীতিনীতির অভাব বোধ না করেন, সেই উদ্দেশ্যেই একটি সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে তিনি উন্মুক্ত ইফতার মাহফিলের আয়োজন শুরু করেন।

সালাহ বলেন, ‘নিজের বাড়ি ও পরিবার থেকে দূরে থাকা মানুষদের বাড়ির এবং পারিবারিক অনুভূতি এনে দিতেই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এসওএএস ক্যাম্পাসের ভেতর আয়োজিত প্রথম উন্মুক্ত ইফতারে মাটিতে ঘাসের ওপর বসে আমরা প্রায় ১৫ জন ইফতার করেছিলাম।’ তারপর থেকে এই আয়োজন দিনে দিনে আরো সমৃদ্ধ হয়েছে এবং সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। 

সালাহ আরো বলেন, ‘এরপর ধীরে ধীরে আমাদের এই আয়োজন গৃহহীন, পথচারী, পেশাজীবী, অন্য ধর্ম ও বর্ণের মানুষসহ সব শ্রেণীর মানুষকে একই তাঁবুর নিচে একত্রিত করেছে।’ পবিত্র রমজান মাসে তুরস্কের শহর ইস্তাম্বুলের বিভিন্ন জায়গায় তাঁবু বানিয়ে ইফতার আয়োজনের ঐতিহ্য তাকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে উৎসাহিত করেছে বলে জানান সালাহ।

তিনি বলেন, ‘মাটিতে পাশাপাশি বসে একসাথে ইফতার করা আমাদেরকে বিনয়ী ও নিরহঙ্কারী হতে শিক্ষা দেয়। হতে পারেন আপনি অনেক বড় বিনিয়োগকারী ব্যাংকার বা হতে পারেন দারোয়ান, এখানে আমরা সবাই পাশাপাশি বসি এবং সবার সাথে সমান আচরণ করা হয়।’ প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাম্বিয়া থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত চারটি দেশের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত উন্মুক্ত ইফতারে এখন পর্যন্ত ৫০ হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেছেন। এ বছর যুক্তরাজ্যের ব্রাডফোর্ড, বার্মিংহাম এবং ম্যানচেস্টার শহরে প্রথমবারের মত উন্মুক্ত ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হয়।

সবার জন্য উন্মুক্ত ইফতার মাহফিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্রিটিশ মুসলিমদের একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত করা ও ব্রিটেনে ক্রমবর্ধমান মুসলিম বিদ্বেষী পরিবেশ সৃষ্টির সাথে জড়িত মানুষদেরকে সুন্দর ইসলামি রীতিনীতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া। সালাহ বলেন, ‘মুসলমানদের ব্যাপারে প্রায়ই এমনসব কথা বলা হয় যা কখনো বলা উচিত নয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে মুসলমানদেরকে যেভাবে চিত্রায়িত করা হয় তার বিরুদ্ধে ইসলামের প্রকৃত তথ্য প্রতিষ্ঠা করার একটা বড় সুযোগ এই উন্মুক্ত ইফতার মাহফিল। এর মাধ্যমে আমাদের মধ্যকার বন্ধনও সুদৃঢ় হয়। এটি আসলে একটি কূটনৈতিক পন্থা।’ 

আরো পড়ুন : মসজিদে নববিতে স্মৃতিময় ইফতার
সুফিয়ান ফারাবী
বাইতুল্লাহ থেকে জিয়ারতের উদ্দেশ্যে মদিনায় এলাম। মক্কা থেকে সকাল ছ‘টায় গাড়িতে চড়ি। আসতে সময় লেগেছে প্রায় দশঘন্টা। রাস্তায় একটি উট গাড়িচাপায় মারা যায়। একারণে রাস্তায় প্রচুর জ্যাম ছিল। আসতে দু‘ঘন্টা বেশি লেগেছে। সাধারণত মক্কা থেকে মদীনায় আসতে সাত থেকে আটঘন্টা লাগে। দীর্ঘ সফরের কারণে শরীর খুব ক্লান্ত । গায়ে প্রচুর ধুলো। গোসল ছাড়া উপায় নেই। আমি মুয়াল্লিম সাহেবের কাছে গিয়ে বললাম, মুফতি সাহেব! আমার গোসল করা প্রয়োজন। শরীরে প্রচণ্ড ময়লা।

মুফতি সাহেব বললেন, দাঁড়ান। এখনি মাশওয়ারা (পরামর্শ) হবে। মুফতি সাহেব কাফেলার সবাইকে ডেকে পাঠালেন। সবাই প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উপস্থিত হলেন। সম্ভবত তারা মাশওয়ারার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। মুফতি সাহেব সকলকে উদ্দেশ করে বললেন, এখন বাজে বিকেল চারটা। আসরের নামাজের বাকি মাত্র ত্রিশ মিনিট। আর ইফতারির বাকি এখনো আড়াই ঘন্টা। এখন কি আপনারা গোসল করে বেলাল মসজিদে নামাজ আদায় করে মসজিদে নববিতে যাবেন। নাকি এখনি মসজিদে নববীতে যাবেন?

আমাদের কাফেলায় আমি ছাড়া সবাই এর আগে হজ্ব বা উমরায় এসেছেন। আমাদের সফরসঙ্গী মাওলানা আহসান মাহবুব এ নিয়ে চারবার উমরা করছেন।

তিনি বললেন, মুফতি সাহেব! আমার মনে হয় গোসল নামাজ সেরে একসাথে মসজিদে নববিতে যাওয়াই উত্তম হবে। কারণ তখন আমরা ইফতারি, তারাবি ও কিয়ামুল লাইল শেষ করে হোটেলে ফিরব। আর তা না হলে ইফতারি করে আমাদের আবার হোটেলে আসতে হবে গোসলের জন্য। সবাই তার কথার সাথে একমত হলেন। ফয়সালা হলো- আমরা বেলাল মসজিদে নামাজ পড়ে তারপর মসজিদে নববিতে যাব। আমরা সবাই গোসল করে নামাজ আদায় করলাম। তারপর ছুটলাম মসজিদে নববির দিকে। এখান থেকে রাসূল সা.-এর রওজা প্রায় এক কিলোমিটার।

রমজান মাসে মসজিদের আশেপাশের হোটেলগুলো খালি পাওয়া যায় না। কিছু খালি থাকলেও সেগুলোর প্রতিরাতের ভাড়া পাঁচ হাজার রিয়াল। অর্থাৎ বাংলাদেশী টাকায় এক লাখ টাকা। ধনীরা এসব হোটেলে থাকেন। মানে একদম ফাইভস্টার। হাঁটতে হাঁটতে আমরা মসজিদে নববীর কাছে চলে আসলাম। ওই তো! মসজিদে নববীর উঁচু মিনারগুলো দেখা যাচ্ছে। আমার মনে সঙ্গে সঙ্গেই উদয় হলো- এক অন্যরকম আবেশ।

মনের অজান্তেই কখন যে বলে ফেললাম, আস সালাতু ওয়াস সালামু আলাইকা ইয়া রাসুলাল্লাহ্। আস সালাতু ওয়াস সালামু.....।  আবেগে চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। তখনো বুঝতে পারিনি যে, আমি কাঁদছি। চোখের পানি যখন গাল গড়িয়ে ঠোটের কাছে এসে জমলো তখন টের পেলাম। কিছুক্ষণ কান্নার পর চোখ মুছলাম। মনে মনে ভাবছি, জীবনের এই দু‘ফোটা অশ্রু বৃথা যায়নি। এ দু‘ফোটা অশ্রু বির্সজন দিয়েছি রাসুলের প্রেমে। এ দু‘ফোটা অশ্রু সার্থক।

কথাগুলো ভেবে ভেবে চোখ মুছতে মুছতে একদম রওজার সামনে এসে দাঁড়ালাম। আবারো সালাম দিয়ে জিয়ারতের কিছু দোয়া দুরুদ পাঠ করলাম। সে যে কী অনুভূতি! কী আত্মতৃপ্তি! বলে বুঝানো যাবে না। ভাষায় প্রকাশ করলে যথাযথ হবে না। কাগজে লিখলে ফুটে উঠবে না। এটা মনের আবেগ, মনের ভালোবাসা। তাই মনেই থাকুক।

জিয়ারত শেষে আমরা ইফতারিতে বসলাম। প্রতিদিন প্রায় দশহাজার রোজাদার এখানে একসাথে ইফতারি করেন। আরবের শেখ, কোটিপতি ও দরিদ্র-অসহায় মানুষ এক দস্তরখানায় বসে। এটাই বোধহয় পৃথিবীর একমাত্র স্থান যেখানে ধনী-গরীবের মধ্যে কোনো র্পাথক্য নেই। এমনকি র্পাথক্য হয় না জাতীয়তারও। এখানে বাঙালি, সৌদিয়ান, তুর্কি, রোহিঙ্গা সবাই সমান।

ইফতারির সময় ঘনিয়ে এসেছে। আমি রোজাদারদের দিকে তাকিয়ে আছি নিবিড় চোখে। তারা নিবিষ্ট চিত্তে দোয়া করছেন। সবার চেহারা মলিন। অসহায় অসহায় ভাব। সবাই নিজ নিজ পাপের ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। যেন তারা সর্বহারা।

আমার পাশে বসেছেন এক সৌদি ধনকুবের। বয়স ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ হবে। সাধারণত এ বয়সী টগবগে যুবকদের কাঁদতে দেখা যায় না। কিন্তু তিনি কাঁদছেন। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছেন। অঝরে অশ্রু ঝরছে তাঁর চোখ দিয়ে। আহ, কী দামী তার রোদন! কী দামী তার অশ্রু! কী দামী এই মানুষটি!

মুয়াজ্জিন আজান দিয়েছেন। আমরা জান্নাতি পরিবেশে ইফতারি শুরু করলাম আজওয়া খেজুর দিয়ে।


আরো সংবাদ