১৪ অক্টোবর ২০১৯

বগুড়ায় এক পরিবারের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের পাওনা দুই শ’ কোটি টাকা

জহুরুল হক মোমিন ও শিরিন আখতার ঝুনু - ছবি : সংগৃহীত

বগুড়ায় বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় দুই শ’ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত দেয়নি এক প্রভাবশালী পরিবার। ওই পরিবারের সদস্যরা হলেন- জহুরুল হক মোমিন, মোমিনের স্ত্রী শিরিন আখতার ঝুনু, তার আপন ভাই এনামুল হক বাবু এবং বাবুর স্ত্রী আইরিন হক রুমা। তারা প্রভাবশালী হওয়ায় ব্যাংকগুলো লোন আদায় করতে হিমশিম খাচ্ছেন।

জানা গেছে, ইতোমধ্যে জহুরুল হক মোমিন ব্যাংকের মামলায় জেল খেটেছেন। অপর দিকে ২০১২ সাল থেকে গ্রেফতারি পরওয়ানা নিয়ে প্রকাশ্যে ছিলেন মোমিনের স্ত্রী শিরিন। ২০১৮ সালের ১১ জুন মধ্যরাতে তিনি বগুড়ার জলেশ্বরীতলা এলাকা থেকে গ্রেফতার হন। তবে গ্রেফতারের মাত্র ছয় ঘন্টা পরেই তিনি জামিনে ছাড়া পান। বিশেষ ক্ষমতা বলে ওই দম্পত্তি আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শুধু জহুরুল হক মোমিনের নামে অর্থঋণ আদালতে ৮টি মামলা রয়েছে। আট মামলায় তার কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের পাওনা দেড় শ’ কোটি টাকার বেশি । তার আপন ভাই, স্ত্রী এবং ভাই এর স্ত্রী মিলে প্রায় দুই শ’ কোটি টাকার কাছাকাছি তাদের ব্যাংক ঋণ। মোমিনের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালে অর্থঋণ আদালতে ৮টি মামলায় ২০১০ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে রায়ও দেয়া হয়। সেখানে তাকে পৃথকভাবে প্রতিটি মামলায় ১ বছর বিনাশ্রম কারাদন্ড এবং জরিমানা যথাক্রময়ে ২৩৬/২০০৯ নং মামলায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা, ৮৮/২০০৯ নং মামলায় ২১ কোটি ৯৪ লাখ, ৮৯/২০০৯ নং মামলায় ৩০ কোটি ৮০ লাখ টাকা, ৪১৫/২০০৯ নং মামলায় ১০ কোটি টাকা, ৫১৮/২০০৯ নং মামলায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ১২১/২০০৯ নং মামলায় ৫১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা, ১২২/২০০৯ নং মামলায় ৩৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং ৪১৬/২০০৯ নং মামলায় ৩ কোটি টাকা সাজাপ্রাপ্ত হন।

সব মিলিয়ে বগুড়া শহরের বিভিন্ন ব্যাংক জহুরুল হক মোমিনের কাছে পাবে দেড়শ’ কোটি টাকারও বেশি। মোমিন ব্যাংকের এসব মামলায় ২০১৩ সালের ৪ জুলাই জেলে যান। সাড়ে চার বছর কারাবাসের পর হাইকোর্টে ১০ লাখ টাকা জমা দিয়ে মুচলেকায় জামিনে ছাড়া পান। জামিনের সময় আদালতকে অঙ্গিকার দিয়েছিলেন ব্যাংকের ঋণের টাকা তিনি ওই বছরের মধ্যেই পরিশোধ করবেন। কিন্তু এখনও ব্যাংকে টাকা ফেরত দেননি।

সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড বগুড়া শাখা থেকে রিমা ফ্লাওয়ার মিলের নামে জহুরুল হক মোমিন ১২ কোটি ৯৮ লাখ ৫৭ হাজার, এনামুল হক বাবুর স্ত্রী আইরিন হক রুমার কাছে ব্যাংকের বর্তমান পাওনা ৩ কোটি ১৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা।
এছাড়াও সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক বগুড়া শাখা থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে একটি চক্র ৪১ কোটি টাকা উত্তোলন করে। সেই মামলাটি এখন দুদক পরিচালনা করছে। ওই মামলায় জহুরুল হক মোমিন ৯ কোটি ৮২ লাখ ৫২ হাজার এবং তার আপন ভাই এনামুল হক বাবু ৬ কোটি ৭৫ লাখ ৫ হাজার আত্মসাৎ করেছেন। ওই মামলায় দুই ভাই বর্তমানে ওয়ারেন্টের আসামী।

ইসলামী ব্যাংকের দায়ের করা মামলা সূত্রে জানা যায়, শিরিন আখতার ঝুনু তার ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান শিরিন ট্রেডিং অ্যান্ড কোমম্পানির নামে ইসলামী ব্যাংক বগুড়া শাখা থেকে বিভিন্ন সময় লোন নিয়ে পরিশোধ করেননি। ব্যাংক বিভিন্নভাবে তার সাথে কথা বলেও টাকা আদায় করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ২০০৯ সালের ২ আগস্ট বগুড়া জেলা অর্থঋণ আদালতে একটি মামলা করেন। তৎকালী ব্যাংকের বগুড়া শাখার সিনিয়র অফিসার রেজাউল করিম মামলাটির বাদী হন। ওই মালায় আদালাত ২০১২ সালের ১৬ জুলাই ৪কোটি ৪৬ লাখ ৪৬ হাজার ৩১৬ টাকা পরিশোধ এবং তাকে গ্রেফতারের আদেশ দেয়।

অপরদিকে শিরিনের স্বামাী জহুরুল হক মোমিন ইসলামী ব্যাংক বগুড়া শাখা, প্রাইম ব্যাংক, এসআইবিএল ব্যাংকসহ বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংক থেকে দেড় শ’ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়ে পরিশোধ করেননি। এর মধ্যে কিছু ব্যাংক তাদের বন্ধক সম্পত্তি দখল করেছে। ইসলামী ব্যাংক বগুড়া শাখা মোমিনের বিরুদ্ধেও মামলা করেছে। সেই মামলায় মোমিন ইতোমধ্যে জেলও খেটেছেন। বর্তমানে তিনি জামিনে আছেন।

ইসলামী ব্যাংক বগুড়া শাখার বিনিয়োগ বিভাগের প্রধান তৌহিদ রেজা জানান, মাহিন ফুড এর মালিক জহুরুল হক মোমিন এর কাছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে লিমিটেড এর বর্তমান মোট পাওয়া না ৩১ কোটি ৮৩ লাখ ৭০হাজার ৮৯০ টাকা। পাওনা আদায়ে মামলা করা হয়েছিল ব্যাংক থেকে । ওই মামলায় রায়ও হয়েছে। তবে রায় কার্যকর হয়নি এখনো। পরে আমরা সার্টিফিকেট শাখায় মামলা করেছি। তখন গত বছরের ডিসেম্বর মাসে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছিল। তখন আদালতে ১০ লাখ টাকা জমা দিয়ে মুচলেকা দিয়েছিল যে বাকি টাকা ওই বছরের মধ্যেই পরিশোধ করবেন। কিন্তু সে আদালতের কাছে দেয়া ওয়াদা এখন পর্যন্ত রক্ষা করেনি। উল্টো তিনি ওই মামলার বিপরীতে হাইকোর্টে রীট করে সময় ক্ষেপন করছেন।

ইতোমধ্যে তিনি আদালতে রীট করেই ১০ বছর পার করেছেন। আদালত যতবারেই ব্যাংকের পক্ষে রায় দেয় ততোবারেই তিনি রীট করেন। মোমিনের দায়ের করা সর্ব শেষ আপিলও খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। ইতোমধ্যেই ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখা সম্পত্তি নিম্ম আদালত দখল সত্ত্ব ব্যাংককে বুঝিয়ে দেয়। পরবর্তীতে তিনি আবারো আপিল করেন। সেই আপিলও আদালত খারিজ করে দিয়েছেন। মোমিনের স্ত্রী শিরিন আখতার ঝুনুর কাছে বর্তমানে ব্যাংক এর পাওনা ১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। তিনি আরো জানান, ২০১৮ সালে ১১ জুন মোমিনের স্ত্রী পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন। তখনও তিনি আদালতে মিথ্যা বলে জামিন নিয়েছেন। পরবর্তীতে অর্ধেক টাকা পরিশোধের কথা বললেও এখনো কোন টাকা ব্যাংকে পরিশোধ করেন নি।

অপরদিকে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড বগুড়া শাখা সূত্রে জানাযায়, রিমা ফ্লাওয়ার মিলের মালিক জহুরুল হক মোমিনের কাছে ব্যাংক ৯ কোটি ৮২ লাখ ৫২ হাজার এবং তার আপন ভাই নিলয় এন্টার প্রাইজ এর মালিক এনামুল হক বাবু ৬ কোটি ৭৫ লাখ ৫ হাজার ব্যাংক থেকে জালিয়াতির করে টাকা উত্তোলন করেছেন। এছাড়াও ব্যাংক তাদের কাছে বিনিয়োগের আরো প্রায় ১৬ কোটি কাটা পাবে। দীর্ঘদিন ধরে তারা ব্যাংককে ওই টাকা ফেরত দিচ্ছে না। ফলে মামলা করা হয়েছে ব্যাংকের পক্ষ থেকে। ওই মামলায় গ্রেফতারি পরওয়ানা জারি হলেও ওই দুই ভাই গ্রেফতার হচ্ছে না। ফলে ব্যাংকের টাকাও আদায় সম্ভব হচ্ছে না।

এদিকে এই দম্পত্তির সাথে কোনভাবেই পেরে উঠতে পারছে না ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। সাধারণ মানুষের আমানত তারা লোন নিয়ে নিজেরা অঢেল সম্পত্তি করেছেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের সহজ কিস্তির সুযোগ করে দেয়ার প্রস্তাব দিলেও তারা কথা শোনননি।

এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংক বগুড়া শাখার ভাইস প্রেসিডেন্ট ও শাখা প্রধান আশরাফুল আলম জানান, মোমিন এবং শিরিনকে ব্যাংক থেকে বহুবার ঋণ পরিশোধের জন্য বলা হলেও তারা কোন ভাবেই টাকা ফেরত দেয়নি। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যাংক মামলা করতে বাধ্য হয়েছে। মামলায় ব্যাংকের পক্ষে আদালত রায় দিলেও সেই রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন তারা। আদালত তার বন্ধকি সম্পত্তি ব্যাংককে দখল করে দিলেও মোমিন পেশি শক্তির বলে সেই সম্পত্তিতে প্রভাব খাটাচ্ছে।

এ বিষয়ে জহুরুল হক মোমিনের সাথে কথা বললে তিনি জানান ,এ বিষয়ে তার কোন বক্তব্য নেই।


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum