২২ জুন ২০১৮

দেরিতে পাকছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম - ছবি : সংগৃহীত

আগাম আম না পাড়ার সরকারি নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম পাড়তে পারছেন না আমচাষিরা। আম পাকার জন্য যে তাপমাত্রার প্রয়োজন হয় প্রকৃতিতে এত দিন তার অভাব ছিল। ফলে আম পাকতে দেরি হচ্ছে। এর ফলে বাজার শুরু হতেও দেরি হচ্ছে এ বছর। 
সরকারি নিষেধাজ্ঞায় ছিল ২০ মে থেকে গুটি জাতের আম নামানো যাবে। ২৫ মে গোপালভোগ, ২৮ মে হিমসাগর বা ক্ষিরসাপাত, ন্যাংড়া ৬ জুন ও ফজলি ১৬ জুন থেকে নামানো যাবে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার ১০ দিন পার হওয়ার পরও বাজারে গুটি আমই নামেনি। নিরাপদ ও বিষমুক্ত আম উৎপাদনে ভোক্তাদের স্বার্থে স্থানীয় প্রশাসন নির্ধারিত সময়ের আগে আম না পাড়ায় ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। 

এ সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে বাজারে বিভিন্ন জাতের আমের সমাহার থাকার কথা ছিল। মওসুম শুরু হওয়ার ১০ দিন পরও বাজারে কোনো পাকা আম নেই। এমনকি গুটি জাতের যেসব আম সপ্তাাহখানেক আগেই পাকা দেখা দেয়, সেগুলোও পাকেনি। এর প্রধানতম কারণ তাপমাত্রা। আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন আম বিজ্ঞানী ড. শরফ উদ্দিন জানান, আম পাকতে কমপক্ষে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা প্রয়োজন হয়। অথচ এপ্রিল ও মে মাসজুড়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থেকেছে এবং তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রির বেশি ছিল না। মাত্র ৩ দিন হলো তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি অতিক্রম করেছে। ফলে দেরিতেই আম পাকা দেখা দিয়েছে। তা ছাড়া এ বছর শীত দীর্ঘায়িত হয়ে প্রাকৃতিকভাবে এক সপ্তাহ পর আমগাছ মুকুলিত হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এর ফলে আরো পিছিয়ে পড়েছে আম পাকার সময়। তবে আগামী সপ্তাহ থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে জাঁকজমক আম বাজার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন তিনি।
একই অভিমত ব্যক্ত করেন কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক মন্জুরুল হুদা। তার মতে আমের পরিপক্বতা আসতে দেরি হয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে শীত বর্ধিত থাকায় এবং বৃষ্টির পরিমাণ বেশি থাকায় নিয়মমতো আম পাকতে দেরি হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে বাজারে কেমিক্যালযুক্ত আম বাজারজাত হওয়ার সুযোগ হয়নি। ফলে একশ্রেণীর সুযোগ সন্ধানী আম ব্যবসায়ী আগাম পাকা আমের বাজার সৃষ্টি করতে পারেনি। অবশ্য ঢাকার বাজারে বিগত সপ্তাহ কাল ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের নামে যে আম বিক্রি হচ্ছে তা স্রেফ ধাপ্পাবাজি ছিল বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জকে আমের রাজধানী বলে উল্লেখ করা হয়ে থকে। এই রাজধানীর আম সংশ্লিষ্ট চাষি ও শ্রমিকেরা এখন অনেকটা অলস জীবনযাপন করছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার গোবরাতলা এলাকার আমচাষি মনিরুল ইসলাম জানান, কয়েক দফা শিলাবৃষ্টির ফলে আমের ক্ষতি হয়েছে সত্যি তবে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আম নামানোর অপেক্ষায় আছি। এ দিকে তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেও মাঝে মধ্যেই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে। ফলে ভয় পেয়ে বসছে। এ এলাকার অনেকেই সারা বছরের সঞ্চয় আম বাগান ক্রয়ে ব্যয় করেছে। এখন টাকা ওঠানোর অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। দেরিতে আম পাকা নিয়ে অনেক আমচাষিই এখন উদ্বিগ্ন। 

এ দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে এবার ২৯ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হচ্ছে। কৃষি বিভাগের তথ্য মতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা দুই লাখ ৫০ হাজার মেট্রিকটন। অবশ্য আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান লক্ষ্যমাত্রা দুই লাখ ৬০ হাজার টন নির্ধারণ করেছে। চার-পাঁচটি শিলাবৃষ্টি সত্ত্বেও প্রবল মাত্রার ঝড় না থাকায় আম ফলনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। একটি পরিসংখ্যান মতে সারা দেশের ২৮ ভাগ আশ্বিনা, ২০ ভাগ হিমসাগর, ১৫ ভাগ আম্রপালি, ১৪ ভাগ ফজলি, ১০ ভাগ ন্যাংড়া ও ১০ ভাগ গুটি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়।

দেরিতে আম পাকা নিয়ে বিদেশে আমের রফতানিতেও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফ্রুট ব্যাগিং করে রাখা আম পর্যাপ্ত তাপমাত্রা না পেলে গুণগত মানসম্পন্ন হতে বাধার সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করা হচেছ। ২০১৭ সালে ৩২৪ টন চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বিশ্ববাজারে যাওয়ার সুযোগ পেলেও গত বছর রফতানি হয়েছে মাত্র ২ টন। আম রফতানি বিষয়ে সঠিক কোনো লক্ষ্যমাত্রা না থাকলেও এ বছর অন্তত ১ হাজার টন আম রফতানির জন্য প্রস্তুত হচ্ছে বলে জানা গেছে। আর এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে প্রায় আট কোটি আমে ফ্রুট ব্যাগ পরানো হয়েছে বলে আম গবেষণা কেন্দ্রের সূত্রে জানা গেছে।


আরো সংবাদ