১৬ অক্টোবর ২০১৯

সতর্কবার্তা

-

আলোচনার মাধ্যমে কি কাশ্মির সঙ্কটের সমাধান হবে? কাশ্মির নিয়ে যুদ্ধ হয়েছে, কয়েক দফা আলোচনাও হয়েছে। কিন্তু এ সঙ্কটের কোনো সমাধানই হয়নি। এখন আরো একবার বিশ্ব ভারত ও পাকিস্তানের ওপর চাপ দিচ্ছে, কাশ্মির সঙ্কট যেন আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হয়। পাকিস্তান আলোচনার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বেশ দম্ভের সাথে ঘোষণা করেছেন, ‘আলোচনা হবে, তবে আজাদ কাশ্মির নিয়ে।’ বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক বিবাদ সমাধানের সর্বোত্তম পন্থা মনে করা হয় আলোচনাকে। কিন্তু দোহাতে পরাশক্তি আমেরিকা ও আফগান তালেবানের মাঝে আলোচনা সারা বিশ্বের শোষিত-শাসিত জাতিকে শিক্ষা দিয়েছে, আলোচনা ওই সময় অগ্রসর হয়, যখন দুর্বলের হাতেও বন্দুক থাকে এবং সে মরতে-মারতে পারার পর্যায়ে উত্তীর্ণ হয়। আমেরিকা ও তার দোসররা কয়েক বছর পর্যন্ত তালেবানকে ‘সন্ত্রাসী’ রূপে আখ্যায়িত করেছে। আর এখন ওই ‘সন্ত্রাসী’দের সাথে আলোচনার নবম রাউন্ড পূর্ণ করা হচ্ছে। কাশ্মির সঙ্কটেরও আফগানিস্তানের সাথে খুব গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আমরা যদি ইতিহাসের ওপর দৃষ্টিপাত করি, তাহলে জানা যাবে, আফগান ও ব্রিটিশ বাহিনীর মধ্যকার প্রথম লড়াইয়ে রাজা গুলাব সিং ব্রিটিশকে সহায়তা করেছিলেন। এরপর যখন ১৮৪৫ সালে ব্রিটিশ বাহিনীর সাথে শিখদের লড়াই হলো, তখন রাজা গুলাব সিং শিখদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেন। এর পুরস্কার হিসেবে পরের বছর ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল হেনরি হার্ডিঞ্জ অমৃতসর চুক্তির মাধ্যমে জম্মু ও কাশ্মির রাজ্যকে মাত্র ৭৫ লাখ নানক শাহী মুদ্রার বিনিময়ে গুলাব সিংয়ের কাছে বিক্রি করে দেন। গুলাব সিং শ্রীনগর দখলে নেয়ার জন্য জম্মু থেকে বাহিনী পাঠালে প্রচণ্ড বিক্ষোভ হয়, এতে হার্ডিঞ্জ তাকে সহায়তা করেন। এ ‘কাশ্মির বিক্রেতা’ ইংরেজ গভর্নর পরবর্তীকালে ব্রিটিশ বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ ও ফিল্ড মার্শাল হয়েছেন। ১৯৪৭ সালে আরেক ইংরেজ গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন গুলাব সিংয়ের পরিবারের যোগসাজশে জম্মু-কাশ্মির রাজ্যকে ভারতের সাথে যুক্ত করিয়ে দিলেন। এর বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ হয় এবং ভারত ও পাকিস্তানে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ভারত যখন কাশ্মিরকে হাতছাড়া হতে দেখল, তখন তারা লেজগুটিয়ে পালিয়ে গিয়ে জাতিসঙ্ঘে পৌঁছে এবং অস্ত্রবিরতি করায়। পাকিস্তান জাতিসঙ্ঘের ওপর আস্থা রেখে কাশ্মিরের স্বাধীনতার এ প্রথম সুযোগটি নষ্ট করে দেয়।
জাতিসঙ্ঘ কাশ্মির সঙ্কটের সমাধানের জন্য ১৩ আগস্ট ১৯৪৮ এবং ৫ জানুয়ারি ১৯৪৯ সালের প্রস্তাব পাস করে, যার অধীনে কাশ্মিরিদের গণভোটের মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যতের ফয়সালার অধিকার দেয়া হয়। কিন্তু যখন জম্মু-কাশ্মিরের ওপর ভারতের সামরিক দখলদারিত্ব দৃঢ়তা লাভ করে, তখন তারা ওই প্রস্তাবাবলি ভুলে যায়। ওই সময় নিরাপত্তা পরিষদ অস্ট্রেলিয়ার বিচারক ওয়েন ডিক্সনকে কাশ্মির সঙ্কট সমাধানের জন্য মধ্যস্থতাকারী নিযুক্ত করেছিল। ডিক্সন জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাব অনুযায়ী একটি সাধারণ ও স্বচ্ছ গণভোটের আয়োজনের পরিবর্তে বেশ জটিল পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন, যাকে ‘ডিক্সন প্লান’ বলা হয়। তিনি বলেন, জম্মু-কাশ্মিরকে চারটি জোনে ভাগ করে দেয়া হোক। কাশ্মির, জম্মু, লাদাখ এবং আজাদ কাশ্মির ও উত্তরাঞ্চলীয় জোট। এরপর ওই চারটি জোনে জেলায় জেলায় গণভোট করানো হোক। পাকিস্তান এ পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে। কেননা এর উদ্দেশ্য ছিল জম্মু ও লাদাখকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া। পরে ডিক্সন ‘চেনাব ফর্মুলা’ পেশ করেন, যার অধীনে চেনাব বা চন্দ্রভাগা নদীকে ভিত্তি করে বৃহত্তর কাশ্মিরকে ভাগ করার প্রস্তাব পেশ করা হয়, যাতে কুপওয়ারা, শ্রীনগর, বারামুল্লা, ইসলামাবাদ, পুলওয়ামা, বুদগাম, পুঞ্ছ ও রাজৌরি পাকিস্তানে এসে যাবে এবং জম্মু ভারতে অন্তর্ভুক্ত হবে। পাকিস্তান এ প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছিল। ১৯৫৬ সালে সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইসেন হাওয়ার তার কাছে পাকিস্তানে একটি সেনাঘাঁটি চেয়ে বসেন। সোহরাওয়ার্দী শর্তারোপ করেন, কাশ্মির সমস্যার সমাধান করা হলে পাকিস্তান পেশোয়ারের কাছে আমেরিকাকে সেনাঘাঁটি দেবে। আমেরিকার প্রচেষ্টায় ১৯৫৭ সালের জানুয়ারিতে কাশ্মির ইস্যু আরো একবার নিরাপত্তা পরিষদের অ্যাজেন্ডায় আসে। কিন্তু ১৯৫৭ সালের অক্টোবরে মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা জোরপূর্বক সোহরাওয়ার্দীর কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগপত্র নিয়ে নেন। আহমদ মুনীরের কাছে সাক্ষাৎকারে আইয়ুব খানের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী মুরিদ হুসাইন বলেছেন, পদত্যাগের পর সোহরাওয়ার্দী বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রিত্ব আসা-যাওয়ার বিষয়। কিন্তু কাশ্মির সব সময়ের জন্য হাতছাড়া হয়ে গেল (আনকাহী সিয়াসাত- পৃ. ২২)।
তৃতীয়বার কাশ্মিরের স্বাধীনতার সুযোগ আসে ১৯৬২ সালে, যখন চীন ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। চীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানকে বার্তা প্রেরণ করে যে, ভারতীয় সেনাবাহিনী চীনের সীমান্তে জড়ো হয়েছে। কাশ্মির এখন খালি; তাকে স্বাধীন করিয়ে নিন। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হ্যারাল্ড ম্যাকমিলান আইয়ুব খানকে কাশ্মিরে হামলা থেকে বিরত রাখেন। আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র সাবেক কর্মকর্তা ব্র“স রিডেল তার JFK's Forgotten Crisis গ্রন্থে সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন, কিভাবে পাকিস্তানকে কাশ্মির হামলা থেকে বিরত রাখা হয়েছিল। ওই সময় ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৬২ সালে (ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী) পণ্ডিত নেহরু ওয়াশিংটন পোস্টকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, কাশ্মিরের অস্ত্রবিরতি রেখায় সামান্য রদবদল করে এটাকে সীমান্ত হিসেবে মেনে নেবেন। ১৯৬৩ সালের জানুয়ারি মাসে এ প্রস্তাবের ওপর পাকিস্তান ও ভারতের মাঝে আলোচনা হয়। তখন পাকিস্তান কাশ্মিরি নেতাদের আস্থায় আনার দাবি করেছিল এবং আলোচনা ব্যর্থ হয়ে যায়।
১৯৬৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মিস ফাতেমা জিন্নাহর বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম করায় আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এটা নিরসনের জন্য আইয়ুব খান অপারেশন জিব্রাল্টারের অনুমতি দিয়েছিলেন। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর একটি দল অধিকৃত জম্মু-কাশ্মিরে ঢুকে পড়ে। এ দিকে ভারত হামলা চালায় লাহোরে। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপে ১৭ দিন পরে দুই দেশের অস্ত্রবিরতি ঘটে।
১৯৮৯ সালে আফগানিস্তান থেকে রুশ (সোভিয়েত) বাহিনীর প্রত্যাবর্তনের পর কাশ্মিরেও সশস্ত্র আন্দোলনের সূচনা হলো। জম্মু-কাশ্মির লিবারেশন ফ্রন্টের মরহুম নেতা আমানুল্লাহ খান তার আত্মজীবনী ‘জুহদে মুসালসাল’-এর তৃতীয় খণ্ডে লিখেছেন, তার দল ১৯৮৭ সালে স্বাধীন সার্বভৌম কাশ্মিরের জন্য সশস্ত্র আন্দোলন জেনারেল জিয়াউল হকের শক্তি ও সহায়তায় শুরু করে। কিন্তু জিয়াউল হকের মৃত্যুর পর জেকেএলএফের মোকাবেলায় হিজবুল মুজাহিদীনকে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়। তা সত্ত্বেও ১৯৯৫ সালে কাশ্মির স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। জেকেএলএফ হিজবুল মুজাহিদীনের দ্বন্দ্ব শেষ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু পাকিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে পারিনি।
১৯৯৯ সালে কারগিল অপারেশনের মাধ্যমে কাশ্মিরের স্বাধীনতার জন্য আরো একবার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। কিন্তু ভুল কর্মকৌশলের কারণে এক দিকে কাশ্মিরের স্বাধীনতা আন্দোলনের ওপর সন্ত্রাসের দাগ লেগে যায়; অপর দিকে সাধারণ জনগণ ও সেনাবাহিনীর সম্পর্কের মাঝে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। আর প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ক্ষমতা শেষ হয়ে যায়। ২০০৭ সালে পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ এবং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং কাশ্মির সমস্যার ওই সমাধানে একমত হন, যা প্রথমবার ওয়েন ডিক্সন পেশ করেছিলেন এবং পরে নেহরুও এই ফর্মুলা পেশ করেছিলেন যে, নিয়ন্ত্রণ রেখাকে স্বতন্ত্র সীমান্ত রূপে মানতে হবে। কাশ্মিরের হুররিয়্যাত কনফারেন্সের নেতা সায়্যিদ আলী গিলানি এ ফর্মুলাকে ‘কাশ্মিরিদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা’ আখ্যায়িত করে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এরপর আইনজীবীদের আন্দোলনে পারভেজ মোশাররফের পতন ঘটে এবং তার ফর্মুলা আর বাস্তবায়ন করতে পারেননি।
২০১৯ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে ভারত সরকার যে পদক্ষেপ নিচ্ছে, তাতে মনে হয়, মোশাররফ ও মনমোহন সিংয়ের মাঝে চূড়ান্ত হওয়া ফর্মুলা পূর্ণ শক্তি দিয়ে বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। তবে বিষয়টা এত সহজ নয়। রাজনাথ সিংয়ের হুমকিকে শুধু ‘রাজনৈতিক বাড়াবাড়ি’ মনে করা ঠিক হবে না। জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৯৬৭ সালে তার The Myth of Independence গ্রন্থে লিখেছেন, নেহরুর চিন্তাভাবনা সেটাই, যা আরএসএসের নেতা বিষয়ক দামোদর সাভারকারের ছিল। তিনি অখণ্ড ভারতে বিশ্বাসী। তিনি শুধু কাশ্মির দখলেরই চেষ্টা করবেন না, বরং পাকিস্তানকেও ভেঙে ফেলার পরিকল্পনা এঁটে বসে আছেন। এ গ্রন্থ প্রকাশের চার বছর পরই পাকিস্তান ভেঙে যায়। ভুট্টো আরো লিখেছেন, ‘পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রতিটি ষড়যন্ত্রে ভারত আমেরিকার সমর্থন পেয়েছে, আগামী দিনেও পাবে। এরা উভয়ে মিলে পাকিস্তানের অস্তিত্ব মিটিয়ে দিতে চায় এবং কাশ্মিরিরা পাকিস্তান রক্ষার লড়াই করছে।’ ভুট্টোকে আমরা ফাঁসিতে ঝুলিয়েছি, তবে তার সতর্কবার্তা যেন উপেক্ষা না করি। কেননা শত্র“র দৃষ্টি শুধু আজাদ কাশ্মির নয়, বরং পাকিস্তানের ওপরও রয়েছে। হ
পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
[email protected]
লেখক : পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট, পাকিস্তানের জিও টিভির নির্বাহী সম্পাদক
প্রেসিডেন্ট জি নিউজ নেটওয়ার্ক (জিএনএন)

 


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum