১৮ অক্টোবর ২০১৯

বিশ্ব জাগছে ইউএস স্যাঙ্কশন ও ডলার ডমিনেশনের বিরুদ্ধে

বহমান এই সময়ে
-

শুধু কিউবা, নিকারাগুয়া, ইরান, রাশিয়া কিংবা চীনই বিরোধিতা করছে না; ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত একপক্ষীয় দমনমূলক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে। এর বিরোধিতা করছে ইউরোপীয় ইউনিয়নও। এই নিষেধাজ্ঞা কার্যত ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে পরিণত হয়েছে এক ইকোনমিক ব্লকেডে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন গত ৪ সেপ্টেম্বর বলেছেÑ হোয়াইট হাউজ সম্প্রতি ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে যে নয়া ‘টোটাল ব্লকেড’ পদক্ষেপ নিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন তা প্রত্যাখ্যান করছে। যদিও ইইউ ভেনিজুয়েলার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তবু ইউ দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত ‘এক্সট্রাটেরিটরিয়াল স্যাঙ্কশন আরোপের বিরুদ্ধে। ইইউ মুখপাত্র কার্লোস মার্টিন রইজ ডি গর্ডিজুয়েলা বলেছেন : We oppose the extraterritorial application of unilateral measures"। ইউরোপের পক্ষ থেকে এই বিবৃতি দেয়া হলো তখন, যখন চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র নির্বাহী ডিক্রির অংশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ভেনিজুয়েলাবিরোধী অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেশটির বাইরেও সম্প্রসারণের ঘোষণা দেয় এবং বলে, সেখানে ভেনিজুয়েলার সম্পদ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সম্পদ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোও পর্যন্ত বিব্রত বোধ করে যখন ফোনি ‘ইন্টিরিম প্রেসিডেন্ট’ জুয়ান গুয়াইদো বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র এ ব্যাপারে আরো অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে।
উপরে উল্লিখিত সবগুলো দেশসহ আরো অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ভেনিজুয়েলাবিরোধী অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে তাদের বিরোধিতার কথা জানিয়েছে। ভেনিজুয়েলা ও ইরান যুক্তরাষ্ট্রের রিজিম চেঞ্জের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে এ দেশ দু’টি গোটা বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করছে যুক্তরাষ্ট্রের এই উৎপীড়নমূলক আচরণের বিরুদ্ধে। এই উদ্যোগ সফল হলে নিশ্চিতভাবে বিশ্বের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্য কমিয়ে আনবে। সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছেÑ বিশ্বপর্যায়ের এই জনপ্রিয় সামাজিক আন্দোলনটি গড়ে উঠছে যুক্তরাষ্ট্রের একপক্ষীয় কর্তৃত্বপরায়ণতা ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে।
বলা যায়, বিশ্বের অনেক দেশ এখন একতাবদ্ধ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। ছয় মাস আগে, যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা চালায় এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ভেনিজুয়েলায় জুয়ান গুয়াইদোর নেতৃত্বে একটি পুতুল সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষিত ওই ব্যক্তির বেশির ভাগ ভেনিজুয়েলানদের কাছে তেমন কোনো পরিচিতি নেই। তিনি বড় মাপের কোনো রাজনীতিবিদও নন। তিনি কোনো মতে বিলুপ্ত ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন। আজ এটি স্পষ্ট, এই অভ্যুত্থান চেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
গত জুলাইয়ে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট ১২০টি দেশের প্রতিনিধিরা কারাকাসে সমবেত হয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ভেনিজুয়েলাবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে। সেখানে প্রচুর তিরস্কার উচ্চারিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। সেখানে এক বিবৃতিতে বলা হয়, শুধু ভেনিজুয়েলাই পারে নিজের ভাগ্য নির্ধারণ করতে। জাতিসঙ্ঘের সনদ অনুসারে, অন্য কোনো দেশ সেখানে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব সম্মেলনের শুরুতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জাতিসঙ্ঘের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য দেশ এবং বিশ্বের ৫৫ শতাংশ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে এই জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন। এর ফলে এটি হচ্ছে জাতিসঙ্ঘের পরই দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ব সংস্থা।
ইরানের পরাষ্ট্রমন্ত্রী জাবেদ জরিফ বৈঠকে উপস্থিত থেকে ভেনিজুয়েলার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভেনিজুয়েলার জনগণের প্রতিরোধের বিষয়টি বিশ্বের সব দেশের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে ঘোষিত অর্থনৈতিক ব্লকেড ও ডলার ডমিনেশন-বিরোধী মনোভাবও বিশ্বব্যাপী জোরদার করে তুলছে। বতর্মানে ২১টি দেশ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার তালিকায়। আরো বহু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের এই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার নেতিবাচক প্রভাবের শিকার। প্রকৃতপক্ষে, যুক্তরাষ্ট্র যে কাজটি করছে, তা হলোÑ এসব দেশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র একপক্ষীয়ভাবে দমনমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে। আর এটি করা হচ্ছে জাতিসঙ্ঘের সনদ ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে। জাতিসঙ্ঘের সনদ মতে, নিষেধাজ্ঞা সেখানেই প্রযোজ্য, যেখানে তা কোনো শাস্তি হিসেবে কার্যকর করা হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বেলায় তা করা হয় না।
জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনের বৈঠকে ঘোষিত হয় ‘কারাকাস ডিক্লারেশন’। খবরে প্রকাশ, বৈঠকে প্রতিনিধিরা সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে মাল্টিপোলার বিশ্বের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করে। সেখানে প্রত্যাশা ঘোষণা করা হয় এমন একটি ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্সিয়াল সিস্টেম গঠনের, যা হবে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণমুক্ত। এই ডিক্লারেশনের একটি ক্লজে ভিয়েনা কনভেনশন অনুসরণের আহ্বান রয়েছে। ভিয়েনা কনভেনশনে বিধান রয়েছে ডিপ্লোমেটিক মিশনগুলোর সুরক্ষার। সন্দেহ নেই, এ বিধানটি করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের ভেনিজুয়েলার ডিপ্লোমেটিক মিশনের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার প্রতিবাদে। এতে যে বিষয়টি জোর দেয়া হয়ছে, তা হলো বিশ্বের প্রতিটি দেশ সম্মিলিতভাবে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় ডিপ্লোমেটিক মিশনগুলোর সুরক্ষা দিতে হবে।
আসলে যুক্তরাষ্ট্রের একপক্ষীয় দমনমূলক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কার্যত পরিণত হয়েছে ‘ইকোনমিক টেররিজমে’। আন্তর্জাতিক মহলে বিভিন্ন মহল ইকোনমিক স্যাঙ্কশনকে খোলাখুলি অভিহিত করছে ‘ইকোনমিক টেররিজম’ নামে। নন-অ্যালাইন মুভমেন্ট (ন্যাম) মিটিংয়ে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা বর্ণনা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তাদের দেশের জনগণের ওপর কী কী ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। ইরানের পরারাষ্ট্রমন্ত্রী জারিফ একটি বিষয় স্পষ্ট করেছেনÑ ইরানের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা ইকোনমিক টেররিজম ঠিক ‘গুগল টেররিজম’-এর মতোই। অভিধানে এর সংজ্ঞা দেয়া হয় এভাবে : ‘unlawful use of violence or intimidation, especially against civilians, in pursuit of political gains’…। তিনি বলেন, “অতএব বন্ধুরা দয়া করে ‘স্যাঙ্কশন’ পদবাচ্যটি ব্যবহার বন্ধ করুন। এ পদবাচ্যটির একটি বৈধ অর্থ আছে। এটিকে বলতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ তথা ‘ইকোনমিক টেররিজম’। আমাদের এ কথাটি বারবার উচ্চারণ করতে হবে।”
যুক্তরাষ্ট্রে ‘অবৈধ একপক্ষীয় দমনমূলক পদক্ষেপ’ (ইললিগ্যাল ইউনিলেটারেল কো-আরসিভ মিজারস)-এর ফলে ভেনিজুয়েলায় ২০১৭ ও ২০১৮ সালে ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। ভেনিজুয়েলার শীর্ষ সারির জনৈক অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সিসকো রড্রিগেজ বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার (স্যাঙ্কশন) ফলে ভেনিজুয়েলার বছরে ক্ষতি হচ্ছে ১৬৯০ কোটি ডলার। সেখানে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে দেশটিতে লাখ লাখ মানুষ মারা যেতে পারে। ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ স্বাক্ষরের দুই দিন পর ২৫ হাজার খাদ্য ও খাদ্য তৈরির ভোজ্যতেল বহনকারী একটি জাহাজ ভেনিজুয়েলায় যেতে দেয়া হয়নি।
ন্যাম সম্মেলন এই মর্মে সম্মত হয়, তারা যুক্তরাষ্ট্রের এই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাব সম্পর্কে একটি সমীক্ষা চালাবে। এর ফলে এটি বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের এই অবৈধ একপক্ষীয় দমনমূলক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। রাশিয়া হচ্ছে ন্যামের একটি পর্যক্ষেক সদস্য দেশ। এই সম্মেলনে রাশিয়ার প্রতিনিধিত্ব করেন ভাইস মিনিস্টার সারগেই রিয়াবকভ। তিনি বলেছেন, এক দিকে যুক্তরাষ্ট্র স্যাঙ্কশনের মাধ্যমে ভেনিজুয়েলাকে গলা টিপে ধরছে, অপর দিকে দেশটির পকেট কাটছে পাশ্চাত্যের ব্যাংকে রাখা এর অর্থ বাজেয়াপ্ত করে। রিয়াবকভ স্বাধীন নিউজ ওয়েভসাইট ‘দ্য গ্রেজোন’-কে জানিয়েছেন, ‘সাম্প্রতিক দশকে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৭০টি দেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। আর এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে বিশ্বের কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ মানুষের ওপর।’
যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের কূটনীতিবিদদের হুমকি দিয়েছিল, যাতে তারা ন্যাম সম্মেলনে যোগ না দেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তাতে সফল হয়নি। ভেনিজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জর্জ অ্যারিয়াজা ন্যাম সম্মেলনের সাফল্যকে বর্ণনা করেছেন ‘যুক্তরাষ্ট্রের একটি কূটনৈতিক ব্যর্থতা’ হিসেবে। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রজোটবহির্ভূত ১২০টি দেশ এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছে। এরা মুক্ত থাকতে চায়, চায় স্বাধীন থাকতে। তিনি জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনকে বর্ণনা করেছেন একটি ‘ইউনিলেটারিজম-বিরোধী ভ্যাকসিন’ হিসেবে।
ন্যাম সম্মেলনের সভায় কথা বলেছেন ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরো। তিনি মার্চকে উল্লেখ করেন স্বাধীনতামুখী ও ইউএস এম্পায়ারের অবসানের ইতিহাস হিসেবে। তিনি একুশ শতাব্দীকে বর্ণনা করেন, ‘দ্য সেঞ্চুরি অব ফ্রিডম’ এবং সাম্রাজ্য অবসানের সেঞ্চুরি হিসেবে। আর এর সূচনা বছর হচ্ছে ২০১৯ সাল। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো কিছুই আমাদের রুখতে পারবে না, থামাতে পারবে না।
ভেনিজুয়েলাবিরোধী ইউএস নিষেধাজ্ঞা ও দেশটির বিরুদ্ধে অব্যাহত সামরিক হামলার হুমকি কার্যত সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী প্রতিবাদ বিক্ষোভকে আরো জোরদার করে তুলেছে। জনপ্রিয় এই প্রতিবাদ সংশ্লিষ্ট করছে আরো অনেক সামাজিক আন্দোলন সংগঠনকে। এরা এখন কড়া নিন্দাবাদ বর্ষণ করছে যুক্তরাষ্ট্রের ভেনিজুয়েলা ও ইরানবিরোধী অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার। জাতিসঙ্ঘের সনদ মেনে চলার প্রতি জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের নবায়িত প্রতিশ্রুতি ছাড়াও বিভিন্ন জনপ্রিয় আন্দোলনও একই বিষয় নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এই আগস্টের প্রথম দিকে চালু করা হয় ‘গ্লোবাল অ্যাপিল টু সেভ ইন্টারন্যাশনাল ল’। এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রয়াস চালানো হচ্ছে বিশ্বের জনগণের একটি গ্লোবাল নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করতে। সেই সাথে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে, যাতে দাবি তোলা হবে জাতিসঙ্ঘের সনদ মেনে চলার ব্যাপারে এবং বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় এই সনদকে একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। এই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে মানবাধিকার সংরক্ষণ এবং দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব রক্ষায়।
আগামী ২০-২৩ সেপ্টেম্বর বেশ কিছু সংগঠনের একটি জোট আয়োজন করতে যাচ্ছে একটি জন-উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি। তাদের ভাষায়Ñ এর লক্ষ্য ‘টু স্টপ ইউএস ওয়ার মেশিন অ্যান্ড সেভ দ্য প্ল্যানেট’। এতে ২ সেপ্টেম্বরের ক্লাইমেট স্ট্রাইকের সময়ে বিশেষভাবে আলোকপাত করা হবে পৃথিবীকে দূষিত করার ব্যাপারে ইউএস মিলিটারিজমের ভূমিকা সম্পর্কে। ২১ সেপ্টেম্বরে পুয়ের্তোরিকো ইন্ডিপেন্ডেন্স মার্চে যোগ দিয়ে আহ্বান জানানো হাবে এর ডিকলোনাইজেশনের। সমবেত জনতা ২ সেপ্টেম্বর হেরাল্ড স্কয়ারে দুপুরে একটি মিছিল-সমাবেশ করবে। ২৩ মার্চে এই জোট আয়োজন করবে সান্ধ্য অনুষ্ঠান : A Path To International Peace : Realizing the Vision of the United Nations Charter। এতে যোগদানের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন ফ্রি, তবে রেজিস্ট্রেশন প্রয়োজন হবে। এ অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হবে, যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ব্যাপারে কাজ করে যাওয়া সামাজিক আন্দোলন ও সরকারি প্রতিনিধিদের ব্যাপারে।
গত ২৫-২৮ জুলাইয়ে কারাকাসে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ‘সাও পাওলো ফোরাম’-এর সম্মেলন। এতে অংশ নিয়েছিল ১৯০টি রাজনৈতিক, সামাজিক ও শ্রমিক সংগঠন। আরো যোগ দিয়েছিলেন ল্যাটিন আমেরিকা ক্যারাবিয়ান অঞ্চলসহ বিভিন্ন মহাদেশের অনেক পার্লামেন্টারিয়ান ও বুদ্ধিজীবী। চার দিনের এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন ৭০০ প্রতিনিধি। সেখানে তারা যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর সুদৃঢ় ঐক্য প্রদর্শন করেন। ‘ভেনিজুয়েলান অ্যাম্বাসি প্রটেকশন কালেকটিভ’-এর একডজন সদস্য এই ফোরামে যোগ দেন। এরা ফোরামে বক্তব্য রাখেন। তারা তাদের কাজের জন্য ও আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখার ব্যাপারে কাজ করার জন্য সবার প্রশংসা কুড়ান। এই কালেকটিভের সদস্যরা ফোরামে যোগদানের ব্যাপারে এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিমান ভেনিজুয়েলায় যায় না। একজন সদস্য এই ফোরামে যোগদান শেষে ফেরার পথে যুক্তরাষ্ট্রের বর্ডারে হেনস্তার শিকার হন। ভেনিজুয়েলা, কিউবা, নিকারাগুয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণের শিকার অন্যান্য প্রগতিশীল সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে এই ফেরাম একটি চূড়ান্ত ঘোষণা প্রকাশ করে। সেখানে লুলাসহ রাজনৈতিক কারণে বন্দী করে রাখা অন্য নেতাদের মুক্তিও দাবি করা হয়।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাধারণ মানুষ প্রতিবাদী হয়ে উঠছে নানা দেশে যুক্তরাষ্ট্রের অযাচিত দমনমূলক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে। হন্ডুরাসে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-প্ররোচিত এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়া প্রেসিডেন্ট জুয়ার ওরল্যান্ডোর বিরুদ্ধে। এই সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে অভিযোগ আনা হয়েছে মাদকপণ্য পাচারের। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশিক্ষিত পুলিশ সন্ত্রাসের মাধ্যমে এই প্রতিবাদ দমন করছে। রাজনৈতিক বন্দীদের অনশন কর্মসূচি রূপ নেয় হারনান্দেজের পদত্যাগের দাবিতে।
নিকারাগুয়ায় গত বছরের মার্কিন অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার পর এখন শান্তি ফিরে এসেছে। একজন ইউএস-ফান্ডেড হিউম্যান রাইটস ডিরেক্টরকে অভিযুক্ত করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের রিজিম চেঞ্জ ডলারের ব্যাপক চুরি ও মৃতের সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোর জন্য। নিকারাগুয়ার বিষয়টি বুঝতে সামাজিক আন্দোলনের এক নেতার লেখা একটি বই পড়ে দেখা যায়। আরো অনেক কিছু ঘটছে কিউবা, কলম্বিয়া, ব্রাজিল, ইকুয়েডর ও আরো অনেক দেশে; যেখানে প্রতিবাদ করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্যের।
আরেকটি টপ টার্গেট হচ্ছে ইরান। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরকার দেশটির সাথে পারমাণবিক অস্ত্রচুক্তি বাতিলের পর দেশটির বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধ ক্রমেই জোরদার করে চলেছে। ইরান খুবই কৌশলের সাথে হরমুজ প্রণালীতে মোকাবেলা করে চলেছে যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রাসন। যুক্তরাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে এর প্রচলিত মিত্র ফ্রান্স ও জার্মানিকে সাথে পাচ্ছে না। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের কূটনৈতিক মহলে এ নিয়ে এক ধরনের উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এর পরও ইরানবিরোধী যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধের ফলে দেশটিতে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুর শিকার হচ্ছে।
অথচ ইরান এমন একটি দেশ, যেটি কখনোই অন্য দেশের সম্পদ চুরির জন্য অন্য দেশকে আক্রমণ করেনি কিংবা অনুপ্রবেশ করেনি। এরা এদের কূটনৈতিক দক্ষতা ও সমঝোতার জন্য গর্বিত। এ কথাটিই ইরাক-ইরান যুদ্ধের জনৈক প্রবীণ ব্যক্তি এক খোলা চিঠিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে লিখে জানিয়েছিলেন। তিনি সতর্কবাণী উল্লেখ করে বলেন, যুদ্ধের সূচনাকারীরাই পরাজয় বরণ করে, আর ইরানের ওপর আক্রমণ বুমেরাং হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য। একইভাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জারিফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের একপক্ষীয় দমনমূলক পদক্ষেপ হিসেবে পরিচালিত ইকোনমিক টেররিজম যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বুমেরাং হবে।
আসলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, জন বোল্টন ও মাইক পম্পেওর পরিচালিত আগ্রাসী কর্মকাণ্ড বুমেরাং হয়ে দেখা দিতে শুরু করেছে। এর বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে, তাতে করে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তির অনেক দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে আসছে। আসলে আমরা অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে যতটা শক্তিশালী ভাবি, তার চেয়ে বেশি এটি ভঙ্গুর। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জারিফ পরিস্থিতির সারসংক্ষেপ করে জানিয়েছেন, ‘গত বছর তুরস্কের সাথে আমাদের দ্বিপক্ষীয় লেনদেনের ৩৪ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে নিজস্ব মুদ্রায়। একই কাজটি আমাদের চলছে চীন, ভারত, রাশিয়ার ও এ অঞ্চলের আরো দেশের সাথে।’ অনেক দেশ এখন ডলারের ডমিনেশনের বিরুদ্ধে কাজ করছে। জেপি মর্গানের বেসরকারি ব্যাংক এর গ্রাহকদের পরামর্শ দিয়েছে, মার্কিন ডলার ডমিন্যান্ট কারেন্সি হিসেবে এর অবস্থান হারাতে পারে। এ কথা জানিয়ে গ্রাহকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তাদের মুদ্রার ধারণে বৈচিত্র্য আনয়ন করতে। নয়া আর্থিক কাঠামো সৃষ্টি করছে ইউরোপ, রাশিয়া, ইরান, চীন অন্যান্য দেশÑ এরা ব্যবসাবাণিজ্য পরিচালনা করবে ডলারহীনভাবে। এ দিকে ডলারের দাম কমছে। গত মাসে ক্রেডিট সুইস বলেছে, এই দাম কমে যাওয়া অব্যাহত থাকবে।
মনে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব এই গতি পরিবর্তন করতে পারবে না। আমেরিকান এক্সেপশনালিজমের অতিকথন মনে হয় আর কাজে আসছে না। কারণ, গোটা বিশ্বের মানুষ এখন আমেরিকান অর্থনৈতিক ও যুদ্ধসন্ত্রাসে জর্জরিত। তাই বিশ্বের মানুষ তাদের অধিকার আদায়ের জন্য গড়ে তুলছে আমেরিকাবিরোধী সামাজিক আন্দোলন। এরা লড়বে আমেরিকার দমনমূলক একপক্ষীয় অর্থনৈতিক ও যুদ্ধসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। হ

 


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum
portugal golden visa