১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সুখবর-দুঃসংবাদ

বৃত্তের বাইরে
-

খবর ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক দুই-ই হতে পারে। নৈর্ব্যক্তিক আর পক্ষপাতহীন। ইতি-নেতি নিরপেক্ষ। তবে এর আগে ‘সু’ জুড়ে দিলে হয় সুখবর। এর মানে দাঁড়ায় ইতিবাচক। ঋণাত্মক অর্থ বহন করে না এটা। তখন সবার জন্য বিষয়টি প্রীতিকর। শুনলে মন জুড়িয়ে যায়। হৃদয়ে বয় সুখের বাতাস। অন্তর্জ্বালা হয় প্রশমিত। তেমনি সুসংবাদের উল্টো শব্দ ‘দুঃসংবাদ’। যে বার্তা কারো কাক্সিক্ষত নয়; অনাকাক্সিক্ষত। আবার সুখ ও দুঃখ হাত ধরাধরি করে চলে। যেন অনেকটা মানিকজোড়। ট্রেন লাইনের মতো সমান্তরাল। তবে এমনও দেখা যায়, কারো জীবনে সহসা সুখের দেখা মেলে না। কালে-ভদ্রে দেখা দেয়। কায়িক পরিশ্রম করেন যারা, তারা হচ্ছেন সেই গোত্রীয়। তবে প্রবাদ আছেÑ ‘পরিশ্রম সৌভাগ্যের পরশমণি।’ কিন্তু একালে এর অর্থ হলো, পরিশ্রম করতে হয় কৌশলে। তক্কে তক্কে থাকতে হয়। কখন কিভাবে কতটা পরিশ্রম করতে হবে, এ কৌশল জানা থাকতে হয়। না হলে চলে না। তবেই মওকা মারা যায়।
গতর খাটালেই যে সৌভাগ্য এসে ধরা দেবে; তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। বুদ্ধিমান শ্রমজীবীদের জন্য রয়েছে মস্তবড় সুখবর। তা জেনে সর্বহারাদের হৃদয়ে বইতে শুরু করেছে সুখের বাতাস। কারণ, গতর খাটিয়ে অর্থ উপার্জনের গ্লানি দূর হলো বলে। সুদিন আসতে আর বাকি নেই। বার্তাটি জানার পর কারো চোখ ছানাবড়া হতে পারে। চড়কগাছ হলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। জিজ্ঞাসু নয়নে তাকাতে পারে যে কেউ। চলতি পথে হলে পথিক নির্ঘাত ঘাড় ঘুরিয়ে শোনার কসরত করবেন।
ভূমিকা, মানে ভনিতা বাদ দিয়ে আসল কথায় আসা যাক। এ কথা ঠিক, সব কাজের একটি প্রারম্ভ কথা চাই। সোজাসাপটা বলে দিলে আবেদন অনেক সময় ম্লান হতে পারে। অভিজ্ঞতা তাই বলে। বাস্তবতা মেনে অভিজ্ঞতার আলোকে পথ চললে হোঁচট খেতে হয় না। বরং অনায়াসে লক্ষ্যে পৌঁছানোর সম্ভাবনা থাকে। আসল কথার আগে বুদ্ধিমানরা অভিজ্ঞান কাজে লাগাতে কসুর করেন না। সে জন্য এই নাতিদীর্ঘ পূর্বকথা। জব্বর খবর, মানে সুখবর হলো, রেলের একটি কারিগরি প্রকল্পে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের পারিশ্রমিক ধরা হয়েছে মাসে সোয়া চার লাখ টাকা। ভাবা যায়? এর সরল অর্থ হলোÑ গতর খেটে আকাশছোঁয়া আয়রোজগার এ দেশেও অসম্ভব নয়। তবে কারিগরি প্রকল্প কিনা, সেখানে আবার ক্লিনারদের জন্য কারিগরি জ্ঞান বাধ্যতামূলক করা না হয়! তাহলে সনাতন পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কপাল মন্দ। তাদের আশা তখন মাঠে মারা যাবে। এটিও মন্দ নয়। প্রকল্পের হর্তাকর্তাদের বখাটে আর বেকার পোলাপান আত্মীয়স্বজন যদি থাকে তাদের পথে আনতে কাজে লাগিয়ে দিলেই হলো। তাতে রথ দেখা আর কলা বেচা দুইই হলো। আয়রোজগারও হলো, আবার বিপথ থেকে পথেও এলো।
পত্রিকার খবর, রেলওয়ের কারিগরি প্রকল্পে ক্লিনারের বেতন মাসে চার লাখ ২০ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। আর অফিস সহায়কের বেতন প্রতি মাসে ৮৩ হাজার ৯৫০ টাকা। যেখানে ‘ক্যাড’ অপারেটরের বেতন সাধারণত ৫০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা ধরা হয়, সেখানে এ প্রকল্পে ধরা হয়েছে সোয়া লাখ টাকা। আর বিদেশী পরামর্শকদের বেতন মাসে গড়ে ১৬ লাখ টাকা। এসব ব্যয়কে পরিকল্পনা কমিশন ‘অত্যধিক ও গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে মন্তব্য করেছে কার্যপত্রে। প্রকল্পে ‘অত্যধিক পরামর্শক রাখা হয়েছে’ বলেও মন্তব্য করা হয়েছে। আর অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্পের নামে বাংলাদেশে লাগামহীন লুটপাট চলছে। দুর্নীতির বিচার ও শাস্তি না হওয়ায় লুটপাটের মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এসব এখনই কঠোর হাতে দমন করতে হবে (৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, নয়া দিগন্ত)।
এর আগের খবর হলো, ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের গ্রিন সিটি হাউজিং প্রকল্পের ফ্ল্যাটে এক একটি বালিশ ওঠাতে শ্রমিকদের মজুরি দেয়া হয়েছে ৯৩১ টাকা। বিশ্বাস হচ্ছে না? অবিশ্বাস্য লাগছে? অকল্পনীয় মনে হয়? প্রকল্পের নথিপত্র কিন্তু এটাই বলে। তাই অবিশ্বাসের জায়গা নেই। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, দেবে না কেন? এ কি যেনতেন বালিশ? অবিশ্বাস্য রকমের তুলতুলে, মখমলের আগেকার দিনের রাজা-বাদশাহরাও এটাকে দেখলে ‘টাসকি’ খেয়ে যেতেন। তাদেরও সামর্থ্যে এমন বালিশ সংগ্রহ করা হতো দুরূহ। এর ব্যয়ের দিকটা চিন্তা করে সাত-পাঁচ ভাবতেন। এ খবর রটে গেলে প্রজারা হয়তো বিদ্রোহ করে বসত। তাতে রাজ্য হারানোর ভয় ছিল। আলোচ্য প্রকল্পে শুধু বালিশ কেনা হয়েছে ৩৩০টি। প্রতিটির দাম পাঁচ হাজার ৯৫৭ টাকা। এগুলো আবার ফ্ল্যাটে ওঠাতে খরচ করা হয়েছে ৯৩১ টাকা করে। মোট খরচ হয় দুই কোটি ২৭ লাখ তিন হাজার ৪০ টাকা।
সমালোচকেরা শুধু সমালোচনায় ব্যস্ত সময় পার করেন। কেউ কেউ ভাবতে পারেন, তাদের বিবেচনাবোধ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে; হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। শৈল্পিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বলতে হয়, সমঝদার নন তারা। অন্য অর্থে, বেরসিক। রসবোধের বড়ই অভাব-আকাল পড়েছে তাদের। নিন্দাবাদের আগে তাদের ভাবা উচিত ছিল যারা এগুলো ব্যবহার করবেন, তাদের একটা ইজ্জত আছে না? আর গতরখাটাদের ঠকিয়ে লাভ কী? এই পারিশ্রমিক না দিলে বেইনসাফি হয়। আমরা বলতে বাধ্যÑ এটি না করলে বেইনসাফি হতো। সেই ভাবনা বিবেচনায় নিয়েই এমন মজুরি। এ ধরনের বেতনভাতা দেশে শ্রমবিভাজন ঘোচাতে সহায়ক হবে। এটি আগামী দিনে নজির হিসেবে পেশ করা যাবে। পরিণামে ধনী-গরিবের আয়বৈষম্য কমবে দ্রুততার সাথে; বিষয়টিকে বাঁকা চোখে দেখার কিছু নেই।
উল্লিখিত দু’টি সুখবরে দেশের শ্রমজীবী সব মানুষের খোশমেজাজে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার সময় এসেছে। কারণ, মনুষ্য জাতির আদি অভ্যাস হলো তীর্থের কাক হয়ে সুদিনের জন্য বসে থাকা। কখন ঘুচবে দুর্দিন। শরীরে পরশ বোলাবে সুশীতল হাওয়া। সেই দখিনা বায়ু লেগে মনে আসবে বসন্তের ছোঁয়া। মানে, সুখের সুমিষ্ট হাওয়ায় মন হবে রোমাঞ্চিত। চিরবিদায় নেবে দুঃখ। তখন জীবনের প্রাপ্তি শুধুই মুঠি মুঠি সুখ।
অবশ্য সুখবরের সাথে সাথে দেশের জনসাধারণের জন্য মন খারাপ করা একটি খবরও বলতে হয়। খবরটি এমনÑ দেশের উচ্চবিত্ত কিছু মানুষের মধ্যে কুক্ষিগত হয়ে আছে বেশির ভাগ সম্পদ। বর্তমানে মাত্র ২৫৫ জন ব্যক্তির কাছে বাংলাদেশের বেশির ভাগ সম্পদ আটকে আছে বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির আয়োজনে ‘বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্য : সমাধান কোন পথে?’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এ কথা বলেন। (৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, মানবজমিন)।
ওই প্রতিবেদন থেকে আরো জানা গেল, ধনাঢ্য ব্যক্তিদের আয় বৃদ্ধির হার বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশেই। বছরে এ দেশ থেকে পাচার হচ্ছে ৭৫ হাজার কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছেন গার্মেন্ট মালিকরা। কিন্তু এই খাতের ৩৫ লাখ শ্রমিক আগের মতো দরিদ্রই থেকে গেছেন। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে নিয়মিত প্রতারিত হচ্ছে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ। মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমের মালিক এবং টরোন্টোর ‘বেগম পাড়ার’ বাড়ির মালিকদের মধ্যেও দুর্নীতিবাজ ইঞ্জিনিয়ার, সিভিল আমলা, সামরিক অফিসার, অর্থনীতিবিদদের পরিবারের পাশাপাশি গার্মেন্ট মালিকদের পরিবারই বেশি চিহ্নিত করা যাচ্ছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ীও দেশে প্রকট আকারে বৈষম্য বাড়ছে; যা স্বীকার করেছেন সম্মেলনে উপস্থিত অন্য বক্তারাও।
খবরটি পড়ে স্বল্পসংখ্যক ব্যক্তির সৌভাগ্যবান হওয়ার গল্প অনেককে হতাশ করতে পারে। সাথে সাথে শ্রমজীবীবান্ধব আগের দু’টি খবরের সৌরভ ম্লান করে দিতে পারে। কারণ, দেশে শ্রমজীবী-গরিবদের জন্য রাষ্ট্রীয় তরফ থেকে সহায়ক কোনো কর্মসূচি নেয়ার সরল অর্থ আর থাকে না বৈষম্য দূর করা। সন্দেহ বাতিক হৃদয় অবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। বর্তমান রাষ্ট্রীয় কাঠামোই যে সবলবান্ধব। দুর্বলকে আরো দুর্বল করে সবলের বাড়বাড়ন্ত সেখানে মুখ্য। তাদের জন্য নানা কর্মসূচি সমাজে বিদ্যমান। রাষ্ট্রকে মানবিক হয়ে উঠতে শাসকশ্রেণীকে মানবিকতার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। তবেই সম্ভব ধনী-গরিবের বৈষম্য কমিয়ে আনা। হ
[email protected]

 


আরো সংবাদ