২৪ আগস্ট ২০১৯

প্রিয় অপ্রিয় প্রিয়া সাহা

-

আগ্রহ ভরে শুনছিলাম প্রিয়া সাহার অভিযোগগুলো। তার পেছনে দাঁড়ানো দীর্ঘ দাড়িওয়ালা ব্যক্তিকেও দেখছিলাম। হয়তো সে ভদ্রলোককেও ‘সাজিয়ে নেয়া হয়েছে’ কোনো একটি দেশের বিরুদ্ধে বলানোর জন্য। রানীর বেশে ট্রাম্পের পাশে দাঁড়ানো মহিলাকেও দেখছিলাম। আপনার মনে হতে পারে, মহিলাটি ট্রাম্পকে বলছেনÑ একজন ‘নির্যাতিতা’ নারী আপনাকে কিছু বলতে চায়। এমনিতেই প্রিয়া সাহা মুখটা এগিয়ে, বডিটা বাঁকিয়ে ট্রাম্পকে তার অভিযোগের কথা বলতে লাগলেন। ট্রাম্পের চোখ যেন কপালে উঠে গেল। বাম পাশে বসা আরেকজনের কাছে জানতে চাইলেন, ভদ্রমহিলার অভিযোগ কি সত্য হতে পারে, জবাবে প্রিয়া সাহা জোর দিয়েই বললেনÑ ‘হ্যাঁ, সংখ্যালঘু হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টানরা শুধু বসতবাড়ি ছাড়া হয়নি, তাদের বাংলাদেশেই থাকতে দেয়া হচ্ছে না, বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, রাষ্ট্রযন্ত্র মুসলিম সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দিচ্ছে, আমরা কোনো বিচার পাচ্ছি না। আমার অভিযোগ সত্য।’ যেভাবে বিষয়টা টেলিকাস্ট হয়েছে মনে হওয়া খুব স্বাভাবিক যে, কাকতালীয়ভাবে ট্রাম্পের সাথে প্রিয়া সাহার দেখা। যেন সুযোগ বুঝে অভিযোগগুলো ট্রাম্পকে বলা। বিষয়টা ঠিক তা নয়।
বিবিসি বাংলার একটি অনুষ্ঠান হয়েছিল হবিগঞ্জে। অনেকেই সেখানে আমন্ত্রিত ছিলাম। আমাকে একটি প্রশ্ন করার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। কী প্রশ্ন করব, তা কয়েক দিন আগেই জানিয়ে দেয়া হয়েছিল। কোন সময় কোন ভঙ্গিতে প্রশ্ন করতে হবে, কার পরে কার আগে কার পাশে বসা থাকতে হবে, কোন সময় আমার প্রশ্নটির জন্য হাত তুলতে হবে সব কিছুই ছকবাঁধা। এমন সাজানো প্রশ্ন করতে রাজি হইনি। অন্য কেউ রাজি হয়েছেন, প্রশ্ন করেছেন। যখন টিভিতে এটা দেখলাম, নিজেই বুঝতে অসুবিধা হয়েছে, প্রশ্নটি তাৎক্ষণিকভাবে করা নাকি দু-তিন দিন আগে থেকে ট্রায়াল দিয়ে শেখানো-বুঝানো প্রশ্নটি শুধু পড়ে শোনানো হয়েছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের বড়মাপের মিডিয়াগুলো একই কাজ করে থাকে। অর্থাৎ তারা যা চান, ঠিক তা আপনার কাছ থেকে তাদের মতো করে আদায় করে নিয়ে থাকেন। এখানে ব্যক্তির স্বাধীনতা থাকে না বললেই চলে। এখন তো কঠিনভাবে পালনীয় একটি বিষয় হচ্ছে, আপনি যদি কোনো ভিআইপির সাক্ষাৎকার নিতে চান তাহলে তাকে সরাসরি কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। সব প্রশ্ন ই-মেইলে তার কাছে পাঠাতে হবে। তার কর্মচারীরা সেটি নিয়ে গবেষণা করবেন। তারপর প্রশ্নের জবাব লিখে কয়েক ধাপে তা বিচার-বিশ্লেষণ করে আপনার কাছে পাঠিয়ে দেয়া হবে। সেটিই এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ।
আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে বলা হয়ে থাকে ‘বিশ্ব প্রেসিডেন্ট’। আমরা মানি আর না মানি, সেটিই আপাতত সত্য। সে প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত পৌঁছা অন্তত কয়েক মাসের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপার। প্রিয়া সাহার অভিযোগগুলো তাৎক্ষণিক তো নয়ই, বরং কয়েক মাসের রিহার্সেলের বিষয়। বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেছেন, প্রিয়া সাহার অভিযোগ সত্য নয়। অবিশ্বাস করার কোনো অবকাশ নেই যে, মার্কিন দূতাবাস তার অভিযোগের বিষয়ে আগে থেকেই অবগত এবং সেভাবেই তাকে ‘তৈরি করা হয়েছে’। এমন ধরনের অভিযোগ প্রিয়া সাহার মুখ থেকে বের করিয়ে আনতে অনেক শ্রম ঘাম মেধা অর্থের ব্যাপার। না থাকাটাই বরং অস্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে অন্য কোনো দেশের হাত রয়েছে বলেও আমরা বিশ্বাস করি। প্রিয়া সাহা আমেরিকায় যেতে নির্ধারিত ফ্লাইট মিস করেছিলেন। তখন মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তাকে আরেকটি ফ্লাইটে আমেরিকায় পৌঁছে দেয়া কি কোনো ছোটখাটো বিষয়? আমার বিশ্বাস, কোনো রাষ্ট্রযন্ত্রের সংযোগ ছাড়া কোনো মন্ত্রী বা এমপির দ্বারাও বিকল্প ফ্লাইটে এভাবে আমেরিকায় যাওয়া সম্ভব নয়। প্রিয়া সাহা আসলে কী বার্তা দিতে চেয়েছেন? বাংলাদেশ কি একটি উগ্র মৌলবাদীদের দেশ, যেখানে বারুদের গন্ধে শ্বাস নেয়া যায় না? প্রিয়া সরাসরি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ও সরকারের বিরুদ্ধে একধরনের যুদ্ধে নেমেছেন, বাংলাদেশের বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন, সেই ইস্যুতে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সরাসরি হস্তক্ষেপ ও সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি। তা সত্ত্বেও প্রিয়া সাহাদের হয়তো কিছুই হবে না, তবে বাংলাদেশের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে, ভবিষ্যতেও হতে পারে। প্রিয়া সাহার অভিযোগ খণ্ডন করতে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বাংলাদেশকে হয়তো অনেক মূল্য দিতে হবে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র যদি মৌলবাদীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে থাকে, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টানের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া দুর্বৃত্তদের শেল্টার দিয়ে থাকে তাহলে সে অভিযোগ ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধেই যায়? সেটি কি তারা মেনে নেবেন? প্রিয়া সাহা একটি শ্রেণীর মানুষের কাছে বেশ প্রিয় হয়ে গেছেন, আবার একটি অংশের কাছে হয়েছেন অপ্রিয়। বড় বড় এমপি, মন্ত্রীর সাথে প্রিয়া সাহার হাস্যোজ্জ্বল কালো মুখটি মিডিয়ায় বারবার জ্বলজ্বল করে ওঠে। জানতে বড় ইচ্ছা হয় তাকে এত দূর কার স্বার্থে টেনে তোলা হয়েছে? এত দিন কার স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে? আমরা খুবই লজ্জিত যে, এমন এক মহিলার স্বামী হবিগঞ্জে চাকরি করেছেন। হবিগঞ্জের আলো-বাতাসে তিনি শ্বাস নিয়েছেন, সেই আলো-বাতাস থেকে আমাকেও শ্বাস নিতে হবে। হ
লেখক : আইনজীবী ও সংবাদকর্মী


আরো সংবাদ




mp3 indir bedava internet