২২ আগস্ট ২০১৯

মুরসির মৃত্যু ও পাশ্চাত্যের প্রতারণা

-

নিজেদের সঙ্কীর্ণ স্বার্থের জন্য পাশ্চাত্যের নেতারা মধ্যপ্রাচ্যে সত্যিকারের গণতন্ত্রকে সমর্থন জানাতে পারেননি। মিসরের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির সাম্প্রতিক মৃত্যু থেকে অত্যন্ত নাটকীয় শিক্ষা নিতে হবে যে, আরব বিশ্বের গণতন্ত্রায়ন হতে হলে পশ্চিমা সরকারগুলোর ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়েই তা সম্পন্ন করতে হবে।
মিসরের প্রথম ও একমাত্র গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত, বেসামরিক প্রেসিডেন্টের হত্যা বা খুন সত্ত্বেও পশ্চিমা সরকারগুলোর কর্ণপাত না করার মতো নীরবতার কারণ হলো, এটা একটা হত্যাকাণ্ড। ধীরে ধীরে পরামর্শের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। বিশ্বে এটা একটা বড় ঘটনা। এটা কোনো ক্ষুদ্র ফুটনোট নয়। অনেকে অবশ্য এ ঘটনাকে সে হিসেবে উল্লেখ করতে চায়। মুরসির উত্তরাধিকার (লিগ্যাসি) কী হওয়া উচিত তা নিয়ে ইতোমধ্যে বিতর্ক শুরু হয়ে গেছে। কেউ কেউ দাবি করছেন, মুরসিকে বিয়োগান্তভাবে স্মরণ করা হবে অর্থাৎ তিনি করুণভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। কারণ তার নির্বাচনী বিজয়ের পর আরবের স্বৈরশাসকেরা ‘গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতাকে সহ্য করা হবে না’ বলে যে বার্তা দিয়েছিলেন সেটিই বাস্তবায়ন হয়েছে। অন্যান্যরা আশাবাদী হয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করছেন যে, করুণ মৃত্যু মুরসিকে এমন এক মর্যাদা দেবে, যে মর্যাদা তিনি জীবনে কখনো অর্জন করতে পারতেন না। যাই হোক না কেন, তার মৃত্যু থেকে আমাদের অনেক কিছু শিক্ষণীয় রয়েছে।
দশকের পর দশক তথা দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিমাদের মধ্যে যে মিথ্যা ধারণা সর্বাধিক প্রচলিত, তা হচ্ছে ‘ইসলামপন্থীরা’ জিহাদিদের সাথে মিলে একত্রে ‘পশ্চিমা সভ্যতার’ বিরুদ্ধে একটি হুমকি এবং মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডও সে ধরনের একটি হুমকি; সেটিকে বাতিল করে দিয়ে ইসলামপন্থীরা তথা ব্রাদারহুড একটি গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে প্রমাণ হয়েছে। একই সময়ে ইসলামবিরোধী ‘ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদীরা’ অথবা ‘প্রগতিশীল’রা জেনারেল আবদুল ফাত্তাহ আল সিসির ফ্যাসিবাদী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। অর্থাৎ কথিত প্রগতিবাদী সেক্যুলাররা প্রকারান্তরে ফ্যাসিবাদী স্বৈরশাসকদের সমর্থক। মিসরের তামারুদ প্রতিবাদী আন্দোলন স্বৈরশাসক সিসির সাথে হাত মিলিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে তিউনিসিয়ায় দ্বিতীয় আরো একটি অভ্যুত্থান ঘটানোর জন্য অসন্তোষ তৈরি করতে চেয়েছিল। কিন্তু সৌভাগ্যবশত তাদের সে অপপ্রয়াস ব্যর্থ হয়।
পশ্চিমা সভ্যতা এবং তাদের রাজনৈতিক মিডিয়া ‘নিরাপদ’ উদারপন্থী পশ্চিমা ভাবাপন্ন বা পাশ্চাত্যঘেঁষা মুসলিম বনাম রক্ষণশীল, জঘন্য ‘ইসলামপন্থী’ নাম দিয়ে মুসলমানদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টির অপপ্রয়াস এখনো চালিয়ে যাচ্ছে। মুরসির ব্যর্থতা সত্ত্বেও, তিনি মিসরে একটি তাৎপর্যপূর্ণ গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের অংশ ছিলেন। সেটা পশ্চিমা সমর্থিত ফ্যাসিবাদী, সর্বাত্মকবাদী, স্বৈরাচারী খুনি সরকারের চেয়ে ভালো ছিল। পাশ্চাত্যের সমর্থিত ওই ফ্যাসিবাদী সরকারই মিসরে ক্ষমতা দখল করে রেখেছে।
রাজনৈতিক ইসলামের ওপর বিশেষভাবে গবেষণায় নিয়োজিত দুই গবেষক শাদি হামিদ এবং মেরিদিত হুইলার দি আটলান্টিকের জন্য তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধে বস্তুনিষ্ঠভাবে সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন, মুরসির এক বছর প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনকালে তিনি মিসরের গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ছিলেন এবং তার কর্মকাণ্ড সে উদ্দেশ্যে ছিল নিবেদিত। স্বৈরতন্ত্র এবং গণতন্ত্র পরিমাপের জন্য অত্যন্ত ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত অন্যতম বাস্তবসম্মত পদ্ধতি, দ্য পলিসিলাইন ইনডেক্স ব্যবহার করে হামিদ এবং হুইলার দেখান যে, গণতান্ত্রিক শর্তাবলি অনুযায়ী যদিও মিসরের ওই সময়ের পরিবেশে সেটি পালন করা সত্যিকারভাবে অসম্ভব ছিলÑ তবু মুরসির অপূর্ণাঙ্গ বা অকালপক্ব প্রশাসন এর আগের প্রশাসনের চেয়ে অনেক ভালো ছিল এবং পরে পশ্চিমা জগৎ সমর্থিত সিসির ফ্যাসিবাদী, সর্বাত্মকবাদী, স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের তুলনায় অধিকতর উত্তম ছিল।
সৌভাগ্যবশত বিশ্বের অনেক দেশে মুরসির লিগ্যাসিকে গণতান্ত্রিক এবং আশাবাদী হিসেবে সঠিকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং তার মর্মান্তিক মৃত্যু সত্ত্বেও তার অবস্থান ও মর্যাদার ব্যাপারে সঠিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। মুরসির ব্যাপারটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কেউ কেউ তিউনিশিয়ার আন নাহদার উদাহরণ তুলে ধরে অন্য উদাহরণ অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তারা আন নাহদার বিস্ময়কর ও প্রশংসনীয় ‘সিভিক’ আচরণ অনেক পশ্চিমা রাজনৈতিক দলের জন্য একটি মানদণ্ড হতে পারে বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। তারা তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের অধীনে একে পার্টির প্রথম দশকের শাসনকেও উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।
মুরসির ব্যক্তিগত আচার আচরণ ছিল অত্যন্ত উচ্চমানের ও শ্রদ্ধা করার মতো। অত্যন্ত নৃশংসভাবে ২০১৩ সাল থেকে তাকে নির্জন কারাগারে আবদ্ধ রাখা হয়েছিল। তাকে প্রয়োজনীয় খাবার ও ওষুধ থেকে বঞ্চিত করা হয় এবং দীর্ঘ কয়েক বছর কারান্তরালে আটকে রাখার সময় মাত্র তিনবার পরিবার পরিজনের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ দেয়া হয়। তার পরও সাবেক এই প্রেসিডেন্ট কখনো ঘৃণ্য ও প্রতিহিংসামূলক আচরণ দেখাননি।
অপরিসীম ধৈর্য ও মর্যাদার সাথে মুরসি সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদ পরিহার এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের আদর্শিক গাইডলাইন অনুসরণ করে সময় অতিবাহিত করেছেন। তিনি সন্ত্রাসবাদের পরিবর্তে মধ্যপন্থা, উদারতা ও গণতান্ত্রিক পথ অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সত্যিকারের ইসলামী চেতনা ও মূল্যবোধের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এবং একজন মহান দেশপ্রেমিক ও সত্যিকারের গণতন্ত্রের মূর্তপ্রতীক। পশ্চিমা মিডিয়া এবং রাজনীতিবিদেরা মুরসিকে এ জন্য কোনো কৃতিত্ব দেবেন না বরং তারা এখন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েও নীরবতা পালন করে সিসির ফ্যাসিবাদী সরকারের পক্ষ নিয়েছেন।
সম্ভবত কেউ কেউ তাদের অপরাধী মানসিকতা এবং অপরাধমূলক নীতির পরিসমাপ্তি ঘটায় সেখানে হাফ ছেড়ে বেঁচে গেছে। সিসি মিসরের হাজার হাজার নির্দোষ নাগরিকের লাশ নিয়ে যে পাশবিক উল্লাস প্রকাশ করেছিলেন এবং পশ্চিমাদের সাথে যে লজ্জাজনক বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছিলেন তারই কথা পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছে মুরসির মৃত্যু। এ ঘটনা অবশ্যই পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, তথাকথিত ‘সেক্যুলার, উদার গণতান্ত্রিক’ সরকারগুলো নির্যাতন, নৃশংসতা ও সিসি সরকারের গণহত্যায় পরিপূর্ণভাবে সহায়তা করেছে। তাদের নতুন আরব ‘লৌহমানব’ বিরোধী দলের হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মীকে কারারুদ্ধ করে মিসরীয়দের ধ্বংস করে দিচ্ছে। পুরোটা সময় পশ্চিমা দেশগুলো এই স্বৈরাচারী সরকারকে সক্রিয় কূটনৈতিক, রাজনৈতিক, আর্থিক ও সামরিক সহায়তা দিয়ে গেছে। এমনকি, তারা বিরোধীদের দমন-পীড়নের জন্য সিসি সরকারের কাছে অস্ত্র বিক্রিও করেছেন। মুরসির মৃত্যু পুনরায় প্রমাণ করেছে যে, যখনই এই অঞ্চলে গণতন্ত্র হত্যার ঘটনা ঘটেছে তখনই ফ্রান্স, ব্রিটেন, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য সরকার কায়রো থেকে রিয়াদ পর্যন্ত ফ্যাসিবাদী সরকারগুলোর সহায়তায় এগিয়ে এসেছে। ‘স্বাধীনতা ও মানবাধিকার’ নিয়ে তাদের অবিরাম বক্তব্যে কেবল শত্রুতা ও ভণ্ডামিরই প্রকাশ ঘটেছে।
ইসলামপন্থীরা অনেকবার মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। তাদের রাজনৈতিকভাবে একঘরে করে রাখা হয়েছে অথবা রাজনীতির ময়দান থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। তাই তাদের বাধ্য হয়ে সেখানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হয়েছে। সৌদি আরব ও মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুডকে ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠনের তকমা দিয়ে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
অন্যায়ের কাছে মাথানত না করে মুরসি বীরের মতো শাহাদত বরণ করেছেন। ইসলাম ও আরব গণতন্ত্র হয়তো ভবিষ্যতে আরো জোরদার এবং বিশেষভাবে মুসলিম ব্রাদারহুড ও ইসলামী আন্দোলন শক্তিশালীও হতে পারে। মুরসি জীবিত বা মৃত উভয় অবস্থাতেই ব্রাদারহুডের গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা, ইসলামী কর্তৃত্ব এবং ভাবমর্যাদা অনেক বৃদ্ধি করেছেন। তিনি ফ্যাসিবাদী, স্বৈরাচারী এবং কথিত প্রগতিশীল ও উদারপন্থীদের মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছেন। কারণ এই মুখোশধারীরা মিসরে ‘আরব বসন্ত’কে হত্যা করেছে। পশ্চিমা দেশগুলোর সরকার এবং রাষ্ট্রপ্রধানরাÑ ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পর্যন্তÑ কেউ জনপ্রিয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কখনো অনুমোদন করবেন না। মুরসি হলেন এর উদাহরণ। অথচ ‘কায়রোর কসাই’ সিসি, ইসরাইলের নেতানিয়াহু যতই গণহত্যা চালাক না কেন তাদের প্রতি পশ্চিমারা নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সমর্থন দেয়ার যখনই কোনো সুযোগ এসেছে প্রতিবারই পশ্চিমারা তার বিরোধিতা করেছে বা ওই সুযোগকে নস্যাৎ করে দিয়েছে অথবা ওই ব্যাপারে নিষ্ক্রিয় থেকেছে। তাই আমরা এই উপসংহারে আসতে পারি যে, ‘আরব বসন্ত’ অথবা অন্যভাবে কোনো সত্যিকারের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বীজ যদি মধ্যপ্রাচ্যে শিকড় গেড়ে বসে সেটি অবশ্যই পশ্চিমা দেশগুলোর আশীর্বাদপুষ্ট হতে হবে। তাদের কোনো সহায়তা ব্যতীত এবং তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। হ
লেখক : যুক্তরাষ্ট্রে ভার্জিনিয়ার ওয়েসলিবান কলেজের বিভাগীয় প্রধান। সমসাময়িক ফ্রান্স এবং ইউরোপে ইসলামের ওপর বহু নিবন্ধ লিখেছেন।
মিডল ইস্ট আই থেকে ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার


আরো সংবাদ




mp3 indir bedava internet