১৭ জুন ২০১৯

জাতের মেয়ে

-

জাতের মেয়ে খুঁজতে খুঁজতে গাজী বাড়ির ক্ষয়িষ্ণু পরিবারের গাজী জামাল উদ্দিনের মেয়েটার সন্ধান পায়। কন্যার বয়স কম, তাতে কী! মেয়ে মানুষের বয়স দিয়ে কিছু যায় আসে না। তাই প্রধান বাড়ির ২১ বছর বয়সী বর আলী প্রধানের সাথে গাজী বাড়ির ১৩ বছর বয়সী কনের বিয়ে হয়ে গেল।
বউ ঘরে তুলে বরের বাবা বলেন, ‘ছেলে বিয়ে দিলাম জাত দেখেÑ মেয়ে বিয়ে দেবো ভাত দেখে। রাজ্যের সাধ্যি-সাধনা করে পরিবারের বড় ছেলের জন্য একখান জাতের মেয়ে বউ করে আনলাম।’
বিয়ের বছর পাঁচেকের মধ্যেই বড় বউ অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। শাশুড়ির নির্দেশে, গর্ভের ছয় মাস থেকে গর্ভধারিণীকে নিরামিষ খাওয়া শুরু করতে হবে। প্রধান পরিবারে ভাতের সাথে দুধ খাওয়ার প্রচলন থাকলেও পোয়াতিদের জন্য তা বারণ। শাশুড়ি নিয়ন্ত্রিত পরিবারে শাশুড়ির হাত ছাড়া পোয়াতিদের একটা ডিম খাওয়ারও সুযোগ ছিল না। পোয়াতিদের প্রধান খাবার ছিল, ভাতের সাথে মরিচবাটা, শুঁটকি কিংবা আলুভর্তা। অনেক সময় গরম ভাতের মাড়ের সাথে পোড়ামরিচ মিলিয়ে এদের সকালের নাশতা খেতে দেয়া হতো। গর্ভের সন্তান হৃষ্টপুষ্ট হলে ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় মা ও সন্তান উভয়ের জন্যই সমস্যা হতে পারে। তাই গর্ভের সন্তান হৃষ্টপুষ্ট হওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য যা যা করা দরকার তা করা হতো।
সময়মতো বাড়ির বড় বউ একটি রুগ্ণ সন্তান প্রসব করে। এখন সন্তানকে বালা-মুসিবতের হাত থেকে বাঁচানোর পালা। এ উদ্দেশ্যে প্রথমেই আঁতুড়ঘর সুরক্ষা করতে হয়। এ উদ্দেশ্যে সদ্যোজাত শিশুসহ প্রসূতির জন্য বাইরের আলো-বাতাস বন্ধ করে দেয়া হয়। সদ্যোজাত শিশুর প্রধান শত্রু ছিল টাকুরা। জন্মের অল্পদিনের মধ্যেই কোনো কোনো শিশু টাকুরার নজরে পড়ে যেত। আর রক্ষা থাকে না। শিশুর মুখ ও শরীর বিবর্ণরূপ ধারণসহ নানাভাবে বিকৃত হয়ে হাত-পা খিঁচিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। টাকুরা নামের এই অশুভ শক্তি সবসময় অদৃশ্য থেকে সদ্যোজাত শিশুদের খুঁজে বেড়ায়। টাকুরারা শিশু ছাড়া গবাদিপশুর দিকে ফিরেও তাকায় না। তাই এদের নজর এড়ানোর জন্য আঁতুড়ঘরের বদ্ধ দরজার সামনে গরুর মাথার খুলি ও হাড় ঝুলিয়ে রাখা হতো। চারপাশে গোবর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আঁতুড়ঘরকে গোয়ালঘরের নমুনা করাসহ পুরনো পাতিলে চুনকাম করে রেখে দেয়া হতো। বদ্ধ আঁতুড়ঘরের বাইরে প্রত্যেক কোণে ঘন কাঁটাযুক্ত গাছের ডালপালা গুঁজে রাখাসহ ভেতরে ধুপ-ধুনা সহযোগে অহরহ আগুন জ্বালিয়ে রাখতে হয়। ধূপের ধোঁয়া যত বেশি হবে ততই নাকি মঙ্গল। আঁতুড়ঘর ধোঁয়াচ্ছন্ন রাখার জন্য আগুনের মধ্যে কখনো কখনো ভেজা খড়কুটো ঢুকিয়ে দিত। টাকুরার নজর এড়ানোর জন্য আঁতুড়ঘরকে বাড়ির পরিত্যক্ত আস্তাবল বা গোয়ালঘরের মতো করে রাখতে যা যা করা দরকার তা থেকে কিছুই বাদ পড়ত না।
নবজাতকের কাঁচা নাড়ি শক্ত হওয়ার জন্য প্রসূতির প্রধান ও পুষ্টিকর খাবার ছিল গরম ভাতের সাথে সরিষা কিংবা কালিজিরার ভর্তা এবং শুকনো মরিচবাটা। বড় বউ শাশুড়ির কঠোর নিয়ম-নীতির বাইরে গিয়ে গোপনে একবার ভাজা মাছ খেতে গিয়ে ধরা পড়ে যায়। চুরি করে খাওয়ার শাস্তি হিসেবে প্রতিদিন প্রসূতির ভাতের থালায় আঙুল ঢুকিয়ে পরীক্ষা করা হতো। এদিকে বড় বউয়ের রুগ্ণ পুত্রসন্তান মাস ছয়েক যমের সাথে লড়াই করে হেরে যায়।
বছর খানেক পরে আরো একটি পুত্রসন্তান আসে বড় বউয়ের কোলে। ‘একই পথের পথিক’ হলো দ্বিতীয় পুত্রসন্তানটিও। তৃতীয় সন্তানটি ছিল কন্যা। যমের নজর এড়ানোর জন্য নাম রাখা হয়েছিল জার্মুনি। এর অর্থ কচুরিপানা, শত প্রতিকূল অবস্থায়ও যার ধ্বংস নেই। বাপের মতো হৃষ্টপুষ্ট জার্মুনি, কচুরিপানার মতোই প্রতিকূল পরিবেশে টিকে গিয়েছিল। তবে আট বছর বয়সে বাবার সাথে গোসল করতে গিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কারণে জলমগ্ন হয়ে পরপারে চলে যায় মেয়েটি।
শাশুড়ির কাছে বড় বউয়ের যেটুকু কদর ছিল, পরপর তিনটি সন্তান বিয়োগের পর সেটুকুও শেষ হয়ে যায়। শাশুড়ি কথায় কথায় বউকে ‘অপয়া’সহ তিন সন্তান মৃত্যুর জন্য দায়ী করে খাওয়া নিয়ে খোঁটা দিয়ে বলত, মা হতে হলে আগে জিহ্বা বাঁধতে হয়। যতদিন ‘জিহ্বা বাঁধা না হবে’ ততদিন পর্যন্ত মা হওয়ায় যোগ্যতাও অর্জন করা যাবে না।
জার্মুনি চলে যাওয়ার বছরখানেক পর আবার পোয়াতি হয় বড় বউ। সবাই আশা করেছিল, এবার একটি ছেলে হবে। শেষমেশ হয়েছে একখানা কন্যা সন্তান। উজ্জ্বল বর্ণের হওয়ায় নাম রাখেন নূরজাহান। তিন বছর বয়সের সময় দেশে মহামারী আকারে বসন্ত দেখা দেয়। বসন্তে আক্রান্ত হয় বড় বউও। যম আর মানুষে টানাটানির পর যম হেরে যায়। যম বউয়ের নিয়ে যায় রূপ, লাবণ্য আর লালিত্যকে। নির্দয় বসন্ত একগুচ্ছ গোলাপের মতো সুন্দর শরীরখানা লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে যায়।
শরীর ও সৌন্দর্য হারানোর পর বড় বউ ভোগবিলাসী স্বামীর দিক থেকে অশনিপাতের সংবাদ শুনতে পায়। মরিয়া হয়ে একটা পুত্র সন্তানের আশায় আবারো কন্যা সন্তান গর্ভে ধারণ করে। পঞ্চম কন্যা সন্তান প্রসবের পর শাশুড়ির পক্ষ থেকে আগের নিয়মের সাথে নতুন একটি নিয়ম যোগ হয়। নতুন নিয়ম হলো, রাত ৮টার পরে ঘরে বাতি জ্বালিয়ে রাখা যাবে না। ৮টার পর আঁতুড়ঘরে বাতি জ্বলতে দেখলেই শাশুড়ির কর্কশ কণ্ঠস্বর, ‘ভেদির (কন্যা সন্তানের অবহেলিত পরিচয়) ঘরে আবার বাতি! তেল কিনে আর কুলানো যাচ্ছে না।’
বউয়ের শেষ কন্যাটির নাম ইয়াসমিন। সে যেন শত প্রতিকূল অবস্থায় নিজকে টিকিয়ে রাখার জন্যই জন্মেছিল। সদ্যোজাত কন্যাকে ঘরের ভেতর শুইয়ে রেখে বড় বউকে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হয়। খড়ের আগুন দিয়ে সারারাত ধানসিদ্ধ করা, সিদ্ধ করা ধান রোদে শুকাতে দেয়া, ধান থেকে তুষ ছাড়ানো, ৮-১০টি গরুর গোয়ালঘর পরিষ্কার করা, একান্নবর্তী পরিবারের রান্নাবান্নাসহ সব কাজের জোগান দিতে হয় বড় বউকেই। বাইরের কাজ ছাড়াও, স্বামীর ওজু-গোসলের পানি গরম রাখা, রাতে যখন-তখন তামাক সাজিয়ে দেয়া, মনের মতো খানাপিনা পরিবেশন করা ইত্যাদি অন্দরমহলের কাজও তাকেই করতে হয়।
এত কাজ করার পরও তাকে সব সময় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার ভেতর কান খাড়া রাখতে হয়। কোনো কাজে তিলমাত্র ত্রুটি হলে আর রক্ষা থাকে না, বাপ-দাদা চৌদ্দ পুরুষকে উদ্ধারসহ তুচ্ছতাচ্ছিল্যভাবে স্বামীর বকুনি শুনতে হয়। বড় বউয়ের প্রতি স্বামী আলী প্রধানের ক্রমবর্ধমান অবহেলা, মানসিক নির্যাতন, তুচ্ছতাচ্ছিল্যের বিষয়গুলো টের পায় বউ। এটাও টের পায়Ñ সে দরিদ্র পরিবারের মেয়ে, বসন্ত রোগ তার শরীরকে জর্জরিত করে গেছেÑ এখন আর সে প্রধানের স্বাদ-আহ্লাদ পূরণ করতে পারে না। বড় বউ আরো টের পায়, এ সময় স্বামীর সংসারে টিকে থাকার জন্য একটা পুত্র সন্তান আবশ্যক। কারণ, প্রধান সাহেব তার শেষ কন্যা সন্তানকে কোলে নেয়া দূরের কথা, জন্মের ছয় মাস পর্যন্ত দেখতেই আসেননি। নানা কারণে, শেষ কন্যা সন্তানের খাবার ছিলÑ লোতা (সেদ্ধ চালের আটা দিয়ে বানানো লেই)।
বসন্ত বড় বউয়ের শরীরের সর্বত্র স্থায়ী দাগসহ পায়ের তলায় রেখে গেছে কয়েকটা শালকোঁড়া। এ কারণে বড় বউকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হয়। তাই স্বামীর কাছ থেকে পেয়েছে ‘ল্যাংড়ি’ উপাধি। এ অবস্থায়, হাড়ভাঙা শ্রম ও নির্যাতনে বড় বউয়ের শরীর ভেঙে পড়াসহ রোগবালাই বাসা বাঁধতে শুরু করে। এর ওপর স্বামী কথায় কথায় তাড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয়। বড় বউয়ের ভাইয়েরা দিনমজুর। এ অবস্থায় তাড়িয়ে দিলে দুই কন্যা সন্তানসহ কী উপায় হবে তার! তাই, একটা পুত্র সন্তানের জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিল বড় বউ। শেষ কন্যার এক বছর বয়সকালে মরিয়া হয়ে, আরো একটি সন্তান নেন বড় বউ।
এক দিকে রুগ্ণ বড় বউয়ের গর্ভের সন্তান বাড়তে শুরু করে, অপর দিকে আলী প্রধানের মনের ভেতর দ্বিতীয় বিয়ের অভিলাষও বাড়তে শুরু করে দেয়। কয়েক বাড়ি পরেই বাস করত এক বিধবা। সুঠাম দেহের অধিকারিণী বিধবা দুই পুত্রকন্যাসহ পিত্রালয়ের এক দোচালা ঘরে বাস করে। তার ছোট ভাই প্রধান সাহেবের বাড়ির কামলা। ওই সুবাদে বিধবার বাড়িতে প্রধানের অবাধ যাতায়াত। বিধবার ওপর প্রধান সাহেবের চোখ পড়ার বিষয়টি বড় বউ টের পেলেও করার কিছুই ছিল না। বড় বউয়ের গর্ভে সন্তান নড়াচড়ার অনুভব যেদিন হৃদয়ে প্রবেশ করে, সেদিন দ্বিতীয় বিয়ের খবরও বড় বউয়ের কানে প্রবেশ করে। প্রধান সাহেবের চোখে এমনিতেই বড় বউ দুই চোখের বিষ, তার ওপর নতুন বিয়ে করা ছোট বউকে পেয়ে বড় বউয়ের সাথে যোগ-জিজ্ঞাসা একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়।
এ দিকে, যথাসময়ে একটি পুত্র সন্তান প্রসব করে বড় বউ। সন্তানের মুখদর্শন করা মাত্র বড় বউয়ের মনে আহ্লাদ যেন ঠাঁই লয় না। বংশের প্রদীপ একটি পুত্র সস্তানের জন্য স্বামীর ঘরে তাকে পুরো তিন যুগ অপেক্ষা করতে হয়েছে। এবার স্ত্রী জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার স্বামীর কোলে তুলে দেয়ার পালা।
বড় বউ অভিমানসহ অপেক্ষায় ছিল, পুত্র সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ায় সংবাদ পেয়ে স্বামী তার কাছে ছুটে আসবে। মায়াবিনীর মায়াজাল ছিন্ন করে স্বামী ছুটে আসবে বড় বউয়ের কাছে। আবার আগের মতো আহ্লাদ করে বলবে, ‘বউ আমার মনের আশা পূরণ করতে পেরেছ।’
বড় বউয়ের কোনো কল্পনাই বাস্তবায়িত হচ্ছে না। দ্বিতীয় বিয়ের পর কয়েক মাস গত হলেও প্রধান তার বাবার ভয়ে নতুন বউকে ঘরে তুলতে পারছেন না।
বাড়িতে একাধিক বউ থাকলে শাশুড়িরা তাকিয়ে থাকেন বউদের বাপের বাড়ির দিকে। বড় বউ বাপের বাড়ি থেকে কিছুই আনতে পারে না বলে সব সময় থাকে ভীতসন্ত্রস্ত। এসব কারণে, শ্বশুরবাড়ির মধ্যে একমাত্র শ্বশুর ছাড়া আর কেউ বড় বউয়ের পক্ষে ছিল না। শ্বশুর বড় বউয়ের পক্ষে না থাকলে তাকে বহু আগেই স্বামীর বাড়ি ছাড়তে হতো।
নতুন বউকে বাড়ি না ওঠালে কী হবে, প্রধান সাহেব জরুরি সময় ছাড়া রাত-দিন পড়ে থাকেন নতুন বিবির কাছে। এক দিন দুই দিন করে সন্তান জন্মের দেড় মাস পার হয়ে গেলেও প্রধান সাহেব পুত্র সন্তানকে দেখতে না আসার মতো যন্ত্রণা কোনো মায়ের পক্ষেই সহ্য করার মতো নয়। অসহ্য হওয়ায়, একদিন বড় বউ শিশুপুত্রকে কোলে করে পাগলের মতো ঘর থেকে বের হয়ে পড়েন। রওনা হন ছোট বিবির বাড়ির দিকে।
‘ক্ষুদে বাবুকে নিয়ে এভাবে কোথায় যায় মা!’ বুঝে না বুঝে মায়ের পেছনে পেছনে হাঁটতে শুরু করে ইয়াসমিনও। বড় বউ ছোট বিবির বাড়িতে গিয়ে দেখতে পায়, দোচালা ঘরের দক্ষিণের দরজায় দু’জন দু’জনের মুখোমুখি বসে হাসাহাসি ও রঙঢঙ করছে। বড় বউ কাছাকাছি গিয়ে অনেক সাহস সঞ্চয়ের পরে প্রধান সাহেবকে লক্ষ্য করেÑ
‘তুমি একটা আস্ত ডাকাইত, তোমার ভেতরে সীমারের রক্ত। দেড় মাস হয় তোমার পুত্র হইছে। তোমার সন্তান কালো না ফর্সা, তুমি একবারও নজর মেলে দেখলে না। তুমি মানুষ নও, তুমি একটা আস্ত ডাকাইত।’
বড় বউকে বাচ্চা-কাচ্চাসহ সামনে দেখে অগ্নিমূর্তি ধারণ করে প্রধান সাহেব। বসার পিঁড়ি হাতে নিয়ে বড় বউকে লক্ষ করে, ‘ল্যাংড়ির ঘরের টেংড়ি, ফকিন্নির জাত, তোর কত্তবড় সাহস, আণ্ডা-বাচ্চাসহ তুই আইছস আমারে পাহারা দিতেÑ আজই তোর জীবনের শেষ দিন।’ বলেই পিঁড়িখান সজোরে ছুড়ে মারে বড় বউয়ের মাথা লক্ষ করে। হ


আরো সংবাদ