২৫ মে ২০১৯

মাহে রমজান ও তাকওয়া

-

রমজান অপার রহমতের ফল্গুধারা। রোজা ইবাদতের দরজা; শরীরের জাকাত। রোজা মানবজীবনে পরিবর্তন আনে। রমজানকে মহান আল্লাহ তায়ালা অসাধারণ বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল করেছেন। মানবজাতির আত্মিক উন্নতি, কল্যাণ এবং আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংশোধনের লক্ষ্যে আল্লাহ যুগে যুগে রমজান মাসে আসমানি গ্রন্থ নাজিল করেছেন। যেমনÑ হজরত মুসা আ:-এর ওপর তাওরাত ৬ রমজান, হজরত ঈসা আ:-এর ওপর ইনজিল ১৩-১৮ রমজান, হজরত দাউদ আ:-এর ওপর জবুর ১২ রমজান এবং হজরত মুহাম্মদ সা:-এর ওপর মহাগ্রন্থ আল কুরআন রমজান মাসের কদরের রাতে নাজিল হয়েছে।
রমজান বা রামাদান শব্দের উৎপত্তি আরবি রমজ বা রামদ ধাতু থেকে। রমজ/রামদ এর আভিধানিক অর্থ হ’লো দহন, জালানো, পোড়ানো। ‘রোজা’ ফারসি শব্দ। আরবিতে বলা হয় সাওম। এর অর্থ আত্মসংযম, সংযত রাখা, বিরত থাকা প্রভৃতি। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং ইবাদতের নিয়তে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যাবতীয় পানাহার ও ইন্দ্রিয়তৃপ্তি থেকে বিরত থাকার নামই রোজা বা সাওম। রোজা রাখার উদ্দেশ্য না খেয়ে শরীরকে দুর্বল বা অকর্মণ্য করা নয়, বরং শরীরকে সামান্য কষ্ট দিয়ে অভ্যাসের কিছু পরিবর্তন ও বিরুদ্ধচারণ করে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ ইত্যাদি রিপুকে বশ করে প্রবৃত্তি-নফসকে শায়েস্তা করা। তাই রমজান মাস আত্মশুদ্ধির মহতী উপলক্ষ।
রোজার মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন করা। অর্থাৎ আল্লাহভীতি অর্জন করা বা আল্লাহকে ভয়কারী হওয়া। তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে নীতি, আদর্শ, নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও গভীর জীবনবোধের সৃষ্টি হয়। প্রত্যেক রোজাদার ব্যক্তিকে অবশ্যই তাকওয়ার গুণাবলি অর্জন করতে হবে। এ জন্য মাহে রমজান ও তাকওয়া ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আরবি তাকওয়া শব্দের আভিধানিক অর্থ আল্লাহভীতি, পরহেজগারি, দ্বীনদারি, ভয় করা, বিরত থাকা, আত্মশুদ্ধি, নিজেকে কোনো বিপদ-আপদ বা অনিষ্ট থেকে রক্ষা করা প্রভৃতি। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় আল্লাহ তায়ালার ভয়ে সব ধরনের অন্যায়, অনাচার, অত্যাচার ও পাপাচার বর্জন করে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশানুযায়ী মানবজীবন পরিচালনা করার নামই তাকওয়া। ইসলামে তাকওয়া অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ। দ্বীনের প্রাণশক্তি এই তাকওয়া। মাহে রমজানে রোজার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হচ্ছে তাকওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। তাকওয়ার অধিকারী বা মুত্তাকির বৈশিষ্ট্য অর্জনের জন্য পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যেন তোমরা মুত্তাকি বা খোদাভীরু হতে পারো’ (সূরা আল বাকারা, আয়াত ১৮৩)। রমজান মানুষকে চিরন্তন কল্যাণের পথে নিয়ে যায়। রোজায় তাকওয়া বা আল্লাহভীতি নিশ্চিত হয় এবং অত্যন্ত গভীরভাবে ধর্মীয় অনুশাসন সঞ্চারিত হয়ে থাকে। এতে আখেরাতের জবাবদিহিও নিশ্চিত হয়। ঈমান ও আমলের ক্ষেত্রে মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণের মাপকাঠি হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। রোজার প্রকৃত হাকিকত বা তাৎপর্য এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় বিশেষ দিক হচ্ছে তাকওয়া ও অন্তরের পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। সুতরাং ইহকালীন কল্যাণ ও পারলৌকিক মুক্তির জন্য মাহে রমজানে যথাযথভাবে রোজা পালন করা অত্যাবশ্যক।
রোজা রাখার প্রথা সব যুগেই প্রচলিত ছিল। রোজা অতীতের নবী-রাসূলদের প্রতিও ফরজ করা হয়েছিল। হজরত আদম আ: থেকে হজরত নূহ আ: পর্যন্ত চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ পর্যন্ত রোজা ফরজ ছিল। যাকে ‘আইয়ামে বিজ’ বলা হতো। ইতিহাসে জানা যায়Ñ চীন, জাপান, কোরিয়া, মিসর ও গ্রিস প্রভৃতি দেশে রোজার প্রচলন ছিল। হজরত মূসা আ: তুর পাহাড়ে আল্লাহর কাছে তাওরাত প্রাপ্তির আগে ৪০ দিন পানাহার ত্যাগ করেছিলেন। হজরত ঈসা আ: ইনজিল প্রাপ্তির আগে রোজা রেখেছিলেন ৪০ দিন। অর্থাৎ ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের জন্য রোজা পালনের নিয়ম ছিল। ইহুদিদের ওপর প্রতি শনিবার এবং প্রতি বছরে মহররমের ১০ তারিখ আশুরার দিন ও অন্যান্য সময়েও রোজা আবশ্যক ছিল। খ্রিষ্টানরা মুসলমানদের মতো রোজা ফরজ হিসাবে পালন করতেন। রোজাব্রত পালনের মাধ্যমেই আত্মশুদ্ধি ও কঠোর সংযম সাধনার সন্ধান পাওয়া যায় বাইবেলে। বেদের অনুসারী হিন্দুদের মধ্যেও ব্রত অর্থাৎ উপবাসের নিয়ম আছে। সুতরাং জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সবার মধ্যে রোজা পালনের প্রমাণ পাওয়া যায়। নিয়ম-কানুন, ধরন-প্রক্রিয়া ও সময়ের ভিন্নতা থাকলেও মানবজাতির আত্মশুদ্ধির জন্য আদি যুগ থেকেই অনেক গোত্র, বর্ণ, সম্প্রদায় এবং বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর মধ্যে রোজার প্রথা প্রচলিত ছিল। ইসলামের প্রাথমিক যুগে তিন দিন রোজা রাখার বিধান ছিল। পরে দ্বিতীয় হিজরি সনে উম্মতে মুহাম্মদির ওপর মাহে রমজানের রোজা ফরজ হয়। রমজান মাস নারী-পুরুষদের আত্মশুদ্ধির প্রশিক্ষণ দেয় এবং নৈতিক মূল্যবোধকে শীর্ষস্থানে উন্নীত করে। সংযমের মাধ্যমে রোজা নর-নারীদের মধ্যে নৈতিকতা, আদর্শ, স্বচ্ছতা ও নিষ্ঠা প্রতিষ্ঠা করে। মানুষের প্রবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, মিথ্যার ওপর সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে, পশুত্বকে দমন করে মনুষ্যত্বকে প্রতিষ্ঠা করে।
রমজানে রোজা রাখার প্রতিদান সব কিছুর ঊর্ধ্বে। আল্লাহ তায়ালা এই ইবাদতকে তাঁর নিজের জন্য নিজস্ব এবং একান্ত করে রেখেছেন। তাই তিনি রোজাদারদের রোজা রাখার প্রতিদান নিজেই দেবেন। একবার আল্লাহ তায়ালা হজরত মুসা সা:-কে ডেকে বলেন, আমি উম্মতে মুহাম্মদিকে দু’টি নূর বা আলো দান করেছি যেন দু’টি অন্ধকার তার জন্য পরিষ্কার হয়; অর্থাৎ দু’টি অন্ধকার যেন ক্ষতিকর না হয়। নূর দু’টি হলো ০১. নূরুল রামাদান ০২. নূরুল কুরআন। অন্ধকার দু’টি হলো ০১. কবরের অন্ধকার ও ০২. কিয়ামতের অন্ধকার। নূরুল রামাদান রোজাদারের দিনে পানাহার থেকে বিরত রাখা এবং নূরুল কুরআন রাতে নিদ্রাগমন থেকে বিরত রাখার সুপারিশ করবে। পবিত্র কুরআনই মানবজাতির জন্য একমাত্র নির্ভুল পথনির্দেশিকা। আর পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে এই রমজান মাসেই। পাক কুরআনের বদৌলতে এ মাসের ফজিলত অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
রোজা আত্মিক নিয়মানুবর্তিতা শেখার একটি প্রধান উপায় যা মানুষকে নৈতিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে প্রকৃত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেয়। মাহে রমজানের মূল্যবোধ সমগ্র মুসলিম বিশ্বে সাম্য, মৈত্রী, ঐক্য, সংযম ও সহনশীলতা প্রদর্শনের শিক্ষা দেয়। রমজান এক মাস কিন্তু এর শিক্ষা বারো মাসের। রোজাদারের মধ্যে যে মানবিক মূল্যবোধ, আত্মিক, নৈতিক, আদর্শিক ও চারিত্রিক গুণাবলি বিকশিত হয়, তা যদি সারা বছর অব্যাহত থাকে, তাহলে সমাজ শান্তিপূর্ণ হতে পারে।হ
লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ, সরকারি কলেজ, কলারোয়া, সাতক্ষীরা


আরো সংবাদ




Instagram Web Viewer
agario agario - agario
hd film izle pvc zemin kaplama hd film izle Instagram Web Viewer instagram takipçi satın al Bursa evden eve taşımacılık gebze evden eve nakliyat Canlı Radyo Dinle Yatırımlık arsa Tesettürspor Ankara evden eve nakliyat İstanbul ilaçlama İstanbul böcek ilaçlama paykasa