২৪ মে ২০১৯

জনগণের প্রত্যাশা ও প্রেক্ষাপট

সময়-অসময়
-

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘ দিনের। কিন্তু এর প্রতিষ্ঠার চেয়ে ব্যক্তিশাসন প্রতিষ্ঠার কলাকৌশল অনেক বেশি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ব্যক্তিশাসন প্রতিষ্ঠার পক্ষে। কারণ ব্যক্তিশাসন প্রতিষ্ঠিত থাকলে কর্মচারীরা অর্থাৎ আমলারা সব সুযোগ সুবিধা ভোগ করে এবং তাদের ক্ষমতা প্রদর্শনের রাস্তা অনেক প্রশস্ত থাকে। কেননা, ব্যক্তিশাসনে জবাবদিহিতার পথ দিনে দিনে সরু হতে থাকে বিধায় রাজকর্মচারীরা নিজেকে ধরাকে সড়া জ্ঞান মনে করে যা খুশি তাই করতে পারে। শুধু ওপরের কর্মকর্তাকে সন্তুষ্ট রাখতে পারলেই তাদের পথে অন্য কোনো কাঁটা থাকে না। ফেনীর সোনাগাজীর নুসরাত থানার সর্বোচ্চ বড় কর্তার কাছে নালিশ করে উপহাসের পাত্র হয়েছেন। থানায় ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন নিজেকে জবাবদিহিতার আওতায় রাখার দায়িত্বের পরিবর্তে ভিডিওচিত্র ভাইরাল করে নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যাকে ত্বরান্বিত করেছে।
বিচার প্রক্রিয়া, বিচারকের স্বাধীনতা প্রভৃতি নিয়ে প্রতিনিয়তই অনেক কথা আওড়ানো হচ্ছে। বিচারকেরা সরকারের মুখের দিকে তাকিয়ে মামলার রায় দেনÑ এ কথাও অনেক বিচারপ্রার্থী বিশ্বাস করেন। বিচার বিভাগের ভাবমর্যাদা নিয়ে কথা বলার আগে বিচারপতি এস কে সিনহার বিদায় বেলাটি পর্যালোচনা করলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আজ কোথায় তা সহজেই উপলব্ধি করা যাবে।
ফেনী জেলাধীন সোনাগাজী উপজেলার ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফির প্রতি ওসি যে উপহাস করেছেন, তা বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় একটি চিত্র মাত্র। নির্যাতিত বিচার প্রার্থীদের প্রতি এমনি ধরনের উপহাস প্রতিনিয়ত করা হচ্ছে। মিডিয়ার কারণে কোনোটি প্রকাশ পায়, কোনোটি প্রকাশ পায় না। মাদক ব্যবসায়ীদের সরকার পুলিশ দিয়ে ক্রসফায়ার করে। পুলিশের একটি অংশ মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হচ্ছে, কিন্তু তাদের (পুলিশ) ক্রসফায়ার করা হচ্ছে না (মাদক ব্যবসায়ীদের প্রতি কোনো কারণেই বিন্দুমাত্র সমর্থন তো দূরের কথা ন্যূনতম সহানুভূতি থাকাও পাপ হবে। শুধু দেশে প্রশাসনিক ব্যবস্থার একটি চিত্র প্রকাশের জন্য এ উপমা দেয়া হলো)।
সরকারি দল অর্থাৎ ছাত্রলীগ, যুবলীগ পুলিশ পেটানোর অনেক সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশ পাচ্ছে। সরকারি দল পুলিশকে পেটালে পুলিশ ব্যবস্থা নেয় না বরং খুশি হয় বলে মনে হচ্ছে। এমনি একটি সংবাদ গত ১৮ এপ্রিল পত্রিকান্তরে প্রকাশ পেয়েছে। যার শিরোনাম ‘ওরা আ’লীগের, বিএনপি হইলে ব্যবস্থা নিতে পারতাম : আড়াইহাজার ওসি’। পাঠকের সুবিধার্থে সংবাদটি এখানে তুলে ধরা হলো :
“পুলিশ পিটিয়েছে আড়াইহাজার গোপালদী ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সুজয় কুমার সাহা ও তার কর্মীরা। গত ১৭ এপ্রিল দুপুরের দিকে গোপালদী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে ঢুকে তিন পুলিশকে পিটিয়ে আহত করে তারা। তবে, এ ঘটনায় পুলিশ বেধড়ক মার খেলেও আড়াইহাজার থানার ওসি মো: আক্তার হোসেন মোটেও ব্যথিত নন বরং তিনি পক্ষ অবলম্বন করেছেন হামলাকারী ছাত্রলীগের। একই সাথে তিনি পুলিশ পেটানো ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নিজের লোক বলেই মন্তব্য করেন। একই সাথে এ সক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ করেন তিনি।’
পুলিশ একটি দীর্ঘদিনের পুরনো এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। সব আইন তাদের দিয়ে কার্যকর হচ্ছে। দুর্নীতি দমন কমিশন পুলিশ বিভাগ থেকে ডেপুটেশনে অনেক জনবল এনেছে দুর্নীতির মামলা তদন্ত করার জন্য। অথচ পুলিশের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগই সবচেয়ে বেশি। সব সরকারই পুলিশকে লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করেছে। তবে বর্তমান সরকার একেবারেই পুলিশ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কারণ, একতরফা নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য পুলিশই ছিল সবচেয়ে বড় নিয়ামক শক্তি। এ কথাগুলোর পরিসমাপ্তি করতে চাইলে করা যায় না। কারণ রাষ্ট্র, সমাজ, ব্যক্তি সবই এখন আমলানির্ভর। জনপ্রতিনিধিদেরও পুলিশ এখন বুড়ো আঙুল দেখানোর খবর বিভিন্ন জেলায় চাউর হচ্ছে। তবে এ জন্য যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে। পুলিশ জানে জনপ্রতিনিধি পুলিশ বানিয়েছে এবং এ কথাটি অস্বীকার করার উপায় জনপ্রতিনিধিদের হেকমতে কুলাবে না। ফলে জনগণের স্বার্থে যারা সোচ্চার হওয়ার কথা তারাও আমলা ও পুলিশের কাছে জিম্মি। ফলে আমলা ও পুলিশের শক্তি এমনিভাবে প্রকাশ পেয়েছে, যার কাছে গোটা সমাজব্যবস্থা জিম্মি হয়ে পড়েছে। আমলা ও পুলিশের পোস্টিং প্রমোশন এখন রাজনৈতিক বিবেচনায় হয়, যার প্রকোপ এখন বহুগুণে বেড়েছে। চাকরির মেয়াদ শেষ হলেও অতি অনুগত আমলাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে নিয়মিত প্রমোশনের দরজা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। যাদের আত্মীয়স্বজন সরকারি দল করে না, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রমোশনের ফিটলিস্টে তাদের নাম ওঠে না।
দীর্ঘদিন পরে হলেও গত ১৫ এপ্রিলের বিজিএমইএ ভবন ভাঙার সংবাদ জাতির জন্য একটি সুখবর। সর্বোচ্চ বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপ না হলে সম্পদশালীদের স্বার্থরক্ষার এ ভবনটি ভাঙা সম্ভব হতো না। অর্থশালীরা মনে করে অর্থের কাছে সবাইকেই জিম্মি করা যায়। কিন্তু বিজিএমইএ ভবন ভাঙার সংবাদ ওই ধরনের মাসকিতার ওপর একটি চপেটাঘাত। বিশাল দ্বৈত্যাকার এ ভবনটি অবৈধ পন্থায় কিভাবে হাতিরঝিল সৌন্দর্য বর্ধিতকরণ এলাকায় গড়ে উঠল তা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা আবশ্যক। তবেই জনগণ জানতে পারত উপরতলার লোকদের হাত কতটুকু লম্বা। উপরতলার লোকদের খাই খাই স্বভাবের কারণে গোটা দেশের ৬৫%-৭০% সম্পদ তাদের হাতে এককভাবে কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে। অন্য দিকে, গরিব দিন দিন আরো নিঃস্ব হচ্ছে। ব্যাংক লুটেরা ও ভূমিদস্যুদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে গোটা অর্থনীতি। ব্যাংকের অর্থ তারাই ভিন্ন ভিন্ন নামে আত্মসাৎ করছে যারা পরিচালনা পর্ষদের প্রভাবশালী সদস্য। কৃষকদের কাছে থেকে জমি ক্রয় না করেই ড্রেজার দিয়ে ভরাট করে ফেলছে ফসলি জমি। অথচ ফসলি জমি যত্রতত্র ব্যবহার না করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা রয়েছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ-১৮ক মোতাবেক পরিবেশকে সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র বদ্ধপরিকর। অথচ সরকার বা পরিবেশ অধিদফতরের কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়া ভূমিদস্যুরা ঢাকার আশপাশে বিশেষ করে রাজউকের পূর্বাচল এলাকায় (রূপগঞ্জ উপজেলা) সংলগ্ন খাল, বিল, পুকুর, ঈদগাহ মাঠ, কবরস্থান প্রভৃতি ড্রেজার পাইপ সংযোগ করে বালু দিয়ে ভরাট করে ফেলছে। পরিবেশ অধিদফতর বা প্রশাসন এগুলো দেখেও দেখছে না। কারণ আবাসন প্রকল্প করার জন্য ন্যায্যমূল্য দিয়ে কৃষকের জমি কেনা প্রয়োজন হয় না, পরিবেশ অধিদফতর ও প্রশাসনকে কিনলেই হয়।
বিচার বিভাগের সংস্কার বিচারপ্রার্থী গণমানুষের দীর্ঘ দিনের দাবি। দেশের সর্বোচ্চ আদালত অনেক অবিচার তথা প্রশাসন বা আমলাদের অযাচিত কার্যকলাপ অনুভব করেও প্রতিকার করে না বা করতে পারে না। কারণ তারাও মনমানসিকতার দিক থেকে কোথায় অবস্থান করার কথা তা-ও উপলব্ধি করা দরকার। কারণ বিচারপতি এস কে সিনহার উত্থান ও পতনের বিষয়টি পর্যালোচনা করলেই সব কিছু বুঝে নেয়া যায়। সম্প্রতি শিশু ও মহিলাদের জবানবন্দী মহিলা ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে লিপিবদ্ধ করার সুপ্রিম কোর্টের আদেশ নিশ্চয় বিচার বিভাগের সংস্কারমূলক পদক্ষেপ। এ ধরনের পদক্ষেপ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। পাশাপাশি বিচারের সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য প্রসিকিউশন তথা পুলিশ, র্যাব, দুদক প্রভৃতির ওপর একক নির্ভরশীলতা ন্যায়বিচারের অন্তরায় বিধায় এ নির্ভরশীলতা থেকে বের হওয়ার উদ্যোগ বিচার বিভাগ থেকে নেয়া জনগণের প্রত্যাশা। হ
লেখক : কলামিস্ট ও আইনজীবী (আপিল বিভাগ)
[email protected]


আরো সংবাদ




Instagram Web Viewer
agario agario - agario